বই আলোচনা
Published : 04 Jun 2026, 02:59 AM
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি, টিকে থাকার সংগ্রাম এবং তাদের লোকবিশ্বাসের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা মিথলজিকে কেন্দ্র করে রচিত একটি অনন্য প্রামাণ্য দলিল ‘আদিবাসী জীবনকথা’।
লেখক ও গবেষক সালেক খোকন দীর্ঘ সময় ধরে সমতলে বসবাসরত আদিবাসীদের জনপদে ঘুরেছেন, মিশেছেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। তাদের গ্রাম পরিদর্শন এবং নিবিড় আলাপচারিতার নির্যাস থেকেই এ বইটির জন্ম।
মাঠপর্যায়ের এ কাজটি মোটেও সহজ নয়। তাহলে, আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা কী? এর উত্তর পাওয়া যায় বইটির ভূমিকায়।
সেখানে লেখক লিখছেন, “তেরো বছর আগের কথা। একদিন দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী হালজা মৌজায় ঝিনাইকুড়ি গ্রামে গিয়ে বেশ অবাক হই। অভাব-অনটন ও ভূমিকেন্দ্রিক নানা অবহেলার মাঝেও পূর্বপুরুষদের আদি ধর্মবিশ্বাসকে বুকে নিয়ে সেখানে কোনোরকমে টিকে আছে ‘কড়া’ নামের একটি আদিবাসী জাতি। খোঁজ নিয়ে জানলাম ঝিনাইকুড়ির ১৯টি পরিবার (এখন বেড়ে হয়েছে ২৪টি পরিবার) ছাড়াও ঘুঘুডাঙ্গায় বসবাস করে এ জাতির আরও চারটি পরিবার।… বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারিনি…সেই থেকে আদিবাসী বিষয়ে কলম ধরা শুরু।”
বইটিতে মান্দি বা গারো, সাঁওতাল, হাজং, ওরাঁও, মাহালী, মুন্ডা, পাহাড়িয়া ও মালোসহ বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর প্রাত্যহিক জীবনযাপন, সামাজিক প্রথা, অর্থনৈতিক কাঠামো, বর্ণিল সংস্কৃতি এবং বর্তমান সময়ের অস্তিত্ব রক্ষার সংকটগুলো নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বইটিতে আছে অনুভবের বয়ান ও জীবনঘনিষ্ঠ বর্ণনা। পড়ার সময় পাঠক শুরুতেই লেখকের সহজ অথচ জীবন্ত বর্ণনাভঙ্গিতে মুগ্ধ হবেন। সালেক খোকন আদিবাসী সমাজকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন কোনো আগন্তুক হিসেবে নন, বরং তাদের জীবনবাস্তবতার ভেতরে প্রবেশ করে সংবেদনশীল মানুষের মতো লিখেছেন।
ফলে এটি কেবল একটি তথ্যবহুল গবেষণাবই হয়ে থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছে মানবিক অনুভূতির এক সামাজিক দলিল। লেখক আদিবাসীদের নিজস্ব বয়ানে তাদের সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরেছেন এবং পাঠকদের সুবিধার্থে সেগুলোর ভাবার্থ দিয়েছেন।
উদাহরণ হিসেবে, কড়া সম্প্রদায়ের একটি গানের পঙক্তি উল্লেখ করা যায়: ‘সব গাতনি পিন্দ লাল লুগা/ নতুন নতুন সুপ দিয়া/ নতুন পারবেতি/ আজো কারমাকের রাতি।’ এর সহজ অর্থ দাঁড়ায়, ‘ননদরা লাল শাড়ি পরে নাও। নতুন কুলায় প্রদীপ নিয়ে তৈরি হও উপবাসীরা। আজ পূজা করতে হবে, আজ কারমা পূজার রাত।’
এই ছোট ছোট বর্ণনাই বলে দেয়, আদিবাসীদের জীবন কতটা নিবিড়ভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে। এ বইটি তাই যুগপৎ ইতিহাস ও সংগ্রামের দর্পণ।
সালেক খোকন কেবল আদিবাসীদের উৎসব বা সাংস্কৃতিক আচারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি তাদের বীরত্বগাথাও তুলে এনেছেন। সাঁওতাল বিদ্রোহ থেকে শুরু করে গারোদের সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদের অসামান্য অবদান নিয়ে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হয়ে আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা ও ধর্ম আজ বিলুপ্তির পথে, লেখক সেই সংকটের কথা জানিয়ে তা রক্ষার তাগিদ দিয়েছেন।
বইটিতে মোট অধ্যায় আছে ৪০টি। কয়েকটি অধ্যায়ের নাম বললেই এ গবেষণায় লেখকের আগ্রহ, বিষয় বৈচিত্র্য, সততা ও নিষ্ঠা টের পাওয়া যায়। যেমন- ‘শীতল গাঁওয়ের মালোপাড়ায়’, ‘ডালুদের সন্ধানে জয়রামকুড়ায়’, ‘সিধু-কানুর হুল ও তাঁদের উত্তরসূরিরা’, ‘কুকরী বনের সাঁওতালদের কথা’, ‘মায়ের ভাষা হারিয়ে ফেলছেন মাহালীরা’, ‘কড়া গ্রামের লোকচিকিৎসা ও বিশ্বাস’, ‘বাংলার প্রভাব ও আদিবাসী ভাষার বিপন্নতা’, ‘এক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে’, ‘সাঁওতাল যুবকের রক্তমাখা জমিতে আখচাষ’ এবং ‘সুমনা চিসিম: এক গারো নারী’ ইত্যাদি।
তাহলে বইটির মূল সুর কী? আমি বলবো, সেটা হলো আদিবাসীদের প্রকৃতিনির্ভর জীবনধারা। বন, পাহাড়, নদী ও ভূমিই তাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। কিন্তু আধুনিক উন্নয়নের দোহাই, ভূমি দখল এবং সামাজিক বৈষম্যের যাঁতাকলে সেই জীবন আজ বিপন্ন। এই রূঢ় বাস্তবতাকে লেখক সংবেদনশীলতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
এতে পাওয়া যায় বৈচিত্র্যের পরিচয় ও বহুত্ববাদী সমাজের চিত্র। সাধারণত আমরা আদিবাসীদের একটি একক গোষ্ঠী হিসেবে দেখার ভুল করি। কিন্তু এ বইটি স্পষ্ট করে বোঝায়, প্রতিটি জনগোষ্ঠীর ভাষা, ধর্ম, উৎসব ও প্রথা আলাদা। লেখক তাদের বিবাহরীতি, কৃষিকাজ, লোকবিশ্বাস এবং পারিবারিক সম্পর্কের যে নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন, তা পাঠককে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
আমাদের মূলধারার ইতিহাস ও সাহিত্যে আদিবাসীদের উপস্থিতি নগণ্য। লেখক সেই ‘অনুপস্থিত কণ্ঠস্বর’ সামনে নিয়ে এসেছেন। ভূমি হারানোর বেদনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা এবং কর্মসংস্থানের সংকটের মতো বিষয়গুলো এখানে উঠে এসেছে গভীরভাবে।
এ বইয়ের একটি অনন্য দিক হলো, লেখক আদিবাসীদের প্রতি কোনো করুণা প্রদর্শন করেননি; বরং তাদের সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক শক্তি ও আত্মমর্যাদাবোধকে উচ্চকিত করেছেন। বিশেষত আদিবাসী নারীদের জীবন এখানে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। তারা পরিবারের এবং অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও নানা প্রতিকূলতার মোকাবিলা করেন। লেখকের বর্ণনায় তাদের পরিশ্রম ও দায়িত্বশীল চরিত্রটি উজ্জ্বল হয়ে ধরা দিয়েছে।
কোনো সৃষ্টিই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। গবেষণার খাতিরে কিছু ক্ষেত্রে পাঠক হয়তো আরও বিশদ পরিসংখ্যান বা গভীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট প্রত্যাশা করতে পারেন। এ বইয়ে কিছু অধ্যায় কিছুটা সংক্ষিপ্ত মনে হয়েছে আমার। নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আরও বিস্তারিত আলোচনা থাকলে বইটি গবেষণার দিক থেকে আরও সমৃদ্ধ হতে পারত বলে মনে করি। তবে এর মানবিক আবেদন এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার গভীরতা এসব সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে গেছে।
ভালো বইয়ের বিশেষত্ব কী? ভালো বই পড়ার পর পাঠকের মনে সহমর্মিতার জন্ম হয়। সালেক খোকনের ‘আদিবাসী জীবনকথা’ তেমনই একটি বই। শহরকেন্দ্রিক নাগরিক সমাজের কাছে আদিবাসী জীবনের বাস্তবতা প্রায়ই অজানা থাকে; বইটি সেই অজানাকে জানার সুযোগ করে দিয়েছে। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন যে সব জনগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার ওপর নির্ভর করে, লেখক সেই সত্যটিই মনে করিয়ে দিয়েছেন।
সালেক খোকনের গদ্য প্রাঞ্জল ও সাবলীল। জটিল একাডেমিক শব্দের ভারে বইটি আক্রান্ত নয় বলে সাধারণ পাঠকও এটি স্বচ্ছন্দে পড়তে পারেন। গবেষণাধর্মী হওয়া সত্ত্বেও এর সাহিত্যিক আবহ পাঠকে আনন্দ দেবে।
পরিশেষে বলা যায়, ‘আদিবাসী জীবনকথা’ কেবল একটি বই নয়, এটি জীবনবাস্তবতার এক আন্তরিক দলিল। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি শ্রদ্ধা ও তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য এই বইটি প্রতিটি সচেতন মানুষের সংগ্রহে থাকা প্রয়োজন।
‘আদিবাসী জীবনকথা’ বইটি পাঠকের কাছে এনেছে প্রকাশনাসংস্থা ‘কথাপ্রকাশ’। প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী হাজরা। ২৮৮ পৃষ্ঠার এ বইটির মুদ্রিত মূল্য ৬০০ টাকা।