Published : 07 Jul 2026, 10:04 PM
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের এত সংস্কার কাজের পরও রেকর্ড বৃষ্টিতে আবারও ডুবল বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা।
অবশ্য প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে সে তুলনায় জলাবদ্ধতা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অতীতের তুলনায় কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিনে ৪২ বছরের সর্বোচ্চ যে বৃষ্টিপাত হয়েছে, তাতে কোনো প্রস্তুতিই জলাবদ্ধতা ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট হত না। তাছাড়া প্রকল্পের সুফল পেতে কিছু অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটি সারানো জরুরি।
তবে নগরীর নানা প্রান্তের মানুষ অতীতের মতই জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন। নগরীর অন্তত তিনটি মূল সড়ক মঙ্গলবার দিনভর পানিতে তলিয়ে ছিল। রেললাইনে পানি উঠে আটকে যায় ট্রেন। দেয়াল ধসে যুবকের মৃত্যু হয়।
বিরূপ আবহাওয়ার কারণে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারেনি তিনটি ফ্লাইট। পতেঙ্গা এলাকায় একটি সড়কের অংশ অতি বৃষ্টিতে ধসে গেছে।
বৃষ্টির রেকর্ড
নিম্নচাপ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে রোববার থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি সোমবার অতি ভারি বর্ষণে পরিণত হয়। মঙ্গলবারও সেই ধারা চলে।
নগরীর পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস বিকাল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে, যা ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরআগে ১৯৮৩ সালের ৪ অগাস্ট সর্বোচ্চ ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছিল।
২০০৭ সালের ১১ জুন ৪০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে নগরী ও আশেপাশে এলাকায় মারা যান ১২৭ জন।
এরপর ২০১২ সালের ২৬ জুন ৪৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টিতে নগরীর আকবর শাহ মাজার পাহাড় ধসে ২৮ জনের মৃত্যু হয়।
২০১৭ সালের ১৩ জুন ১৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতে চট্টগ্রামসহ রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে পাহাড় ধসে প্রায় ১৫০ জন মারা যায়। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় রাঙামাটিতে।
২০২৩ সালের ৭ অগাস্ট ৩২২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে ও পাহাড়ি ঢলে নগরীতে জলাবদ্ধতা এবং জেলার চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ায় বন্যা হয়। সেদিন ডুবেছিল চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন।

কোথায় জলাবদ্ধতা
মঙ্গলবার সকাল থেকে অতি ভারি বৃষ্টির সঙ্গে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে জোয়ার শুরু হয়। ফলে নগরীতে জমা পানি আর খাল বেয়ে নদী বা সাগরে যেতে পারেনি।
ফলে একে একে নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি বাড়তে থাকে। কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার বেশ কিছু বাসাবাড়ির নিচতলায় পানি ঢুকে যায়।
কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, “হিজরা খালের কাজ শুরু হয়েছে সবার শেষে। কাজের জন্য খালের পাড়ে ভবন ভাঙা হয়েছে। খালে সীমানা দেয়ালও দেওয়া হয়নি এখনো। এখানে বাসাবাড়ির চেয়ে রাস্তা উঁচু। ভারি বৃষ্টিতে অনেক বাড়ির নিচতলায় পান ঢুকে গেছে। এই ভোগান্তি থেকে কবে মুক্তি পাব জানি না।”
হাটহাজারী-অক্সিজেন রোডের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দীঘির পাড় এলাকায় কোমর পানি জমে যায়। সেখান মূল সড়কে জমা পানিতে স্থানীয়দের জাল মেরে মাছ ধরতে দেখা যায়।
এছাড়া নগরীর কাস্টম হাউজ প্রাঙ্গণ, জামালখান বাই লেইন, রহমতগঞ্জ, হালিশহর আবাসিক এলাকা, আগ্রাবাদ বেপারীপাড়া কাঁচা বাজার ও মৌলভী পাড়া এলাকা, কাঠগড় মুসলিমাবাদ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
শহরের আরাকান সড়কের সিঅ্যান্ডবি ও মৌলভী পুকুর পাড় এলাকায় মূল সড়কে পানি ঠেলে বড় ও মাঝারি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে।
পোর্ট কানেক্টিং রোডের হালিশহর আবাসিক থেকে নয়া বাজার পর্যন্ত অংশে ভারী যানবাহান পানির ভিতর চলাচল করছিল।
হালিশহরে অফিসে কাজে এসে আটকে পড়া শফিকুল আলম বলেন, “মূল রাস্তাতেই পানির ঢেউ খেলছে। অলিগলিতে কোমর পানি। ঝুঁকি নিয়ে তবু চলাফেরা করতে হচ্ছে।”

ক্ষয়ক্ষতি যা হল
মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর পাঁচলাইশ থানার রহমান নগর বি ব্লক এলাকার ৪ নম্বর সড়কে দেয়াল ধসে শফিকুল ইসলাম নামে ৩২ বছর বয়সি একজন মারা যান। আহত হন মর্জিনা বেগম নামে ৫৫ বছর বয়সী এক নারী এবং দেড় বছরের শিশু সাইফা আক্তার।
বেলা ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে ষোলশহর এলাকায় রেলাইনে জমে থাকা পানিতে আটকা পড়ে কক্সবাজারগামী ট্রেন পর্যটক এক্সপ্রেস। তাতে প্রায় সাড়ে ছয়শ যাত্রীর ভোগান্তির শুরু হয়।
ষোলশহর স্টেশনের মাস্টার আরিফুল ইসলাম রাত ৮টায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ট্রেনটি তখনও স্টেশনেই আটকে ছিল।
বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এদিন তিনটি ফ্লাইট নামতে পারেনি। তীব্র বাতাসের কারণে বেশ কিছু ফ্লাইটের উড্ডয়ন ও অবতরণ বিলম্বিত হয় বলে জানান বিমান বন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইব্রাহীম খলিল।
অতি ভারী বৃষ্টিতে মঙ্গলবার সকালে নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় একটি বাইপাস সড়কের একাংশ ভেঙে পড়ে।
বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। যেসব বিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত হয়নি সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোমর পানি ঠেলে বাসায় ফিরতে দেখা গেছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আকবর শাহ এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ১০০ পরিবারকে স্থানীয় একটি স্কুলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া নগরীর অন্য স্থান ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রায় ৩ হাজার পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নেওয়া হয়েছে।

মেগা প্রকল্পের পরও কেন জলাবদ্ধতা
প্রত্যাশিত সীমার বাইরে বৃষ্টি হওয়া এবং সঙ্গে জোয়ার থাকাকে মঙ্গলবারের জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগরীর ৩৬টি খাল নিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এ প্রকল্পের পূর্ত কাজ পরিচালনা করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড।
মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর রাজাখালি আর্মি ক্যাম্পে ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন শীর্ষক’ মত বিনিময় সভা করে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড।
সেখানে প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহসিনুল হক চৌধুরী বলেন, “প্রকল্পে যে ড্রেনেজ ডিজাইন তাতে ৫০০-৫৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেও কিছু হবে না বলে প্রত্যাশা ছিল।
“কিন্তু যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে তা অপ্রত্যাশিত। ফলে প্রবর্তকে পানি নাই, কিন্তু একই হিজরা খালের পাড়ে কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলাসহ দুয়েকটি জায়গায় দুই থেকে আড়াই ফুট পানি উঠেছে। যে অবকাঠামো আছে, তাতে আমরা কনফিডেন্ট, বৃষ্টি থামলে পানি নেমে যাবে এক থেকে দুই ঘণ্টায়।”
তিনি বলেন, “৩০টি খালের কাজ ইতিমধ্যে শেষ করে ফেলেছি। বাকি খালগুলোর মধ্যে ৫টি খালের প্রায় ৯৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ বছর বৃষ্টি একটু তাড়াতাড়ি শুরু হয়েছে। মে মাসের মধ্যে কাজ শেষের লক্ষ্য ছিল। সম্ভব হয়নি। নভেম্বর ডিসেম্বরের মধ্যে পারব।”
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহসিন বলেন, “চট্টগ্রামবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই, জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ এ বছর ৮০-৯০ শতাংশ কমে যাবে। ফেব্রুয়ারি নাগাদ কাজ শেষ হলে ৩৬ খালের আশেপাশে আর অনেকদিন জলাবদ্ধতা হবে না।”
এদিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দিনভর মাঠে ছিলেন সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখার পর তিনি বলেন, “চট্টগ্রামে মৌসুমের রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই বৃষ্টির কারণে যাতে নগরবাসী দীর্ঘসময় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে না পড়েন, সে লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছি।
“নগরীর বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, মির্জাপুর, বৃহত্তর বাকলিয়া, কোতোয়ালি, দেওয়ানহাট, লালখান বাজার, আকবর শাহ, হালিশহর ও বন্দর এলাকায় এবার উল্লেখযোগ্য জলাবদ্ধতা দেখা যায়নি, যা চলমান উন্নয়নকাজের ইতিবাচক ফলাফল।”
মেয়র বলেন, “জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ, বিশেষ করে হিজড়া খাল, জামালখান খাল ও গুলজার খালের কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় এখনও জলাবদ্ধতার সমস্যা রয়ে গেছে।
“এছাড়া ৪০টি খালের উন্নয়নে নতুন ডিপিপি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে আমরা আশা করছি।”
মেয়র নগরবাসীকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সমাধান কী
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কিছু সুফল মিলেছে, আবার কিছু ‘অসম্পূর্ণতার’ কারণে সংকটও রয়ে গেছে।
“তবে আজ যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, তাতে যত প্রস্তুতিই থাকুক, জলাবদ্ধতা মোকাবেলা প্রায় অসম্ভব। কারণে এত পানি ধারণের ব্যবস্থাপনা আমাদের শহরে নেই।
“তবে এপ্রিলের শেষে জলাবদ্ধতার পর সরকারি সংস্থাগুলো কাজ করায় আজ বৃষ্টির পরিমাণের তুলনায় জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেনি। আজ যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে, সেটা মোকাবেলা করা যে কোনো ধরনের প্রস্তুতি নিয়েও সম্ভব হত না।”

১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের করা মাস্টারপ্ল্যানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে নগরীতে কিছু রিটেনশন পন্ড করার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্পে সেই প্রস্তাব ‘উপেক্ষা’ করা হয়েছে।
“এখন যখন খালগুলোর স্লুইস গেট আমরা বন্ধ রাখছি, তখন জোয়ারের পানি শহরে ঢুকতে পারছে না, সেটা সত্য। কিন্তু শহরে জমা পানিও নামতে পারছে না। রিটেনশন পন্ড থাকলে পানি সেখানে ধরে রাখা যেত।”
এই প্রকল্পের অধীনে যে ৩৬টি খাল আছে সেগুলো ছাড়া নগরীর বাকি খালগুলো নিয়ে আরেকটি প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে দেলোয়ার মজুমদার বলেন, “তবে নতুন প্রকল্প পূর্ণাঙ্গ হতে হবে। না হলে সেটি করেও সুফল মিলবে না।”
জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্পের ব্যয় কয়েক দফায় বাড়িয়ে সবশেষ নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এটি ছাড়াও সিডিএ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড আরো একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের মঙ্গলবারের সর্তকবার্তাতেও আগামী ৪৮ ঘণ্টা চট্টগ্রামে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে।