Published : 22 Apr 2026, 02:02 AM
চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের ঘটনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন দুই সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরা।
মঙ্গলবার রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট থেকে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়।
মিছিলটি জিরো পয়েন্ট থেকে সোহরাওয়ার্দী হল হয়ে এ এফ রহমান হলের গেইট দিয়ে প্রবেশ করে আলাওল হলের সামনে দিয়ে ২ নম্বর গেইট গিয়ে শেষ হয়।
এ সময় ছাত্রদলের মিছিল থেকে ‘গুপ্তদের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘একটা একটা শিবির ধর, ধইরা ধইরা জেলে ভর’, ‘গুপ্তদের আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে শোনা যায়।
মিছিল শেষে বিশ্ববিদ্যালয় ২ নম্বর গেইটে বক্তব্য রাখেন ছাত্রদলের নেতারা।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি মো. আলাউদ্দিন মহসিন বলেন, “সিটি কলেজে দেয়াল লিখনে ‘ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ’ লেখা ছিল, সেখানে কারা যেন ‘ছাত্র’ কেটে ‘গুপ্ত’ লিখেছিল। সেটা গুপ্তদের পছন্দ হয়নি তাই তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে।
“আমরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলতে চাই, আমরা অনেক নরম আচরণ করেছি, আর নয়। আমরা আর কোনো গুপ্ত রাজনীতি মেনে নেব না।”
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, “আমরা বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ চাই। আমরা প্রশাসনের কাছে গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানাই।

তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় এখনো বৈষম্যমুক্ত হয়নি। রাজাকার আলবদররা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে, তাদের দ্রুত অপসারণ করুন না হয় ছাত্রদল তাদের প্রতিহত করবে।”
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় বলেন, “যারা পূর্বের বিভিন্ন সময় গুপ্তবেশে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করেছে, আজকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালিয়েছে, আমরা বলতে চাই, এটা ৯০ এর রগকাটার যুগ নয়। আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে গুপ্তদের কালো হাত গুঁড়িয়ে দেব৷”
তিনি বলেন, “সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, গুপ্তদের আইনের আওতায় নিয়ে আসুন। আজকের এই কর্মসূচি থেকে গুপ্তদের রাজনীতির কবর ঘোষণা করা হল।”
এদিকে রাত সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট থেকে মিছিল বের করে ছাত্রশিবির।
মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট থেকে সোহরাওয়ার্দী হল হয়ে আলাওল হলের সামনে দিয়ে প্রবেশ করে জিরো পয়েন্টে গিয়ে শেষ হয়।
এ সময় শিবিরের মিছিলে ‘গুপ্ত গুপ্ত করিস না, পিঠের চামড়া থাকবে না’, ‘সবাই করে বার বার, শিবির করে একবার’, ‘আমার ভাই আহত কেন, তারেক তুই জবাব দে’, ‘চাঁদাবাজের ঠিকানা, এই ক্যাম্পাসে হবে না’, ‘লীগ গেছে যেই পথে, দল যাবে সেই পথে’, ‘লন্ডনের কামলা, সন্ত্রাসীদের সামলা’–ইত্যাদি স্লোগান দিতে শোনা যায়।
মিছিল শেষে বিশ্ববিদ্যালয় জিরো পয়েন্ট এলাকায় বক্তব্য দেন ছাত্রশিবিরের নেতারা।
চাকসুর ভিপি ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইব্রাহীম রনি বলেন, “এই হামলায় শুধু ছাত্রনামধারী ক্যাডাররাই ছিল না; যারা হাসিনার পক্ষে ছিল, তাদের ভাড়া করে এমন কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করা হয়েছে।
“আমরা চেয়েছিলাম সবাই সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে মিলেমিশে থাকবে। একটি আদর্শ পরিবেশ ও সমাজ গড়ার জন্য আমরা ৫ অগাস্ট লড়াই করেছি।”
তিনি বলেন, “এদেশ নিরাপত্তা চায়, শিক্ষা চায়, দুর্নীতি চায় না। কিন্তু আপনাদের নেতা ‘গুপ্ত’ নামে একটি শব্দ আবিষ্কার করেছেন। এ শব্দ ব্যবহার করে আবার ক্যাম্পাস উত্তপ্ত করার চেষ্টা করবেন না।
“আপনি এত বছর কোথায় ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী? দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করুন, না হলে এক ক্যাম্পাস থেকে অন্য ক্যাম্পাসে গেলে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।”
চাকসুর যোগাযোগ ও আবাসন বিষয়ক সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক মো. ইসহাক ভূঁঞা বলেন, “বিগত ১৭ বছরের শাসনামলের অবসানের পর দেশের ছাত্রসমাজ একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা দেখছি, পূর্ববর্তী সময়ে যে সন্ত্রাসী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা এখনো বিভিন্ন রূপে ক্যাম্পাসে বিদ্যমান।
“যারা এক সময় এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে পালিয়ে গেছে, তাদের জায়গায় নতুন করে অন্যরা একই অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আমরা তাদের হুঁশিয়ার করে বলতে চাই, আপনারা যদি একই পথে হাঁটতে চান, তবে অতীতের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিন। বাংলার ছাত্রসমাজ এই স্পর্ধা বেশিদিন মেনে নেবে না।”
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুল্লাহ খালেদ বলেন, “বিগত সময়ে সাধারণ নির্বাচনের পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। এরপর প্রতিটি ক্যাম্পাসে তারা রক্ত নিয়ে খেলা করেছে। আজ সেই ছাত্রলীগ দেশ থেকে নিষিদ্ধ।
“আজ একজন ইঞ্জিনিয়ারিং করে সংসদে গিয়ে চুপ করে বসে আছে, আর তার অনুসারীরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। আঘাত এলে তার পাল্টা আঘাত আসবে। আমরা শিক্ষিত সমাজসহ সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছি, এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন।”
এর আগে মঙ্গলবার বিকালে চট্টগ্রাম শহরে সরকারি সিটি কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সিটি কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্র শিবির গ্রাফিতি এঁকেছিল। তার নিচে লেখা ছিল, ‘ছাত্র-রাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস’।
তবে কে বা কারা ‘ছাত্র-রাজনীতি’ থেকে ‘ছাত্র’ শব্দটি কালো কালি দিয়ে মুছে ওপরে ‘গুপ্ত’ লিখে তীর চিহ্ন এঁকে দেয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা লেখালেখি করেন, যার জেরে সকালে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ও হাতাহাতি হয়।
এর প্রতিবাদে বিকালে নিউ মার্কেট মোড়ে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয় ছাত্র শিবির। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা কলেজের দিকে এগিয়ে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
সে সময় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। আতঙ্কে ওই এলাকায় যানবাহন চলাচল এবং দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়।