Published : 24 Feb 2026, 12:28 AM
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নির্মাণাধীন ১৫০ শয্যার বার্ন ইউনিটের কাজ ২৬ শতাংশ শেষ হয়েছে, যেখানে চিকিৎসা শুরু হতে সময় লাগতে পারে আরও দেড় বছর।
নির্মাণ কাজ শেষ হলে এ অঞ্চলের আগুনে পোড়া রোগীরা আইসিইউ এবং এইচডিইউ সেবা পাবেন।
বর্তমানে আগুনে পোড়া গুরুতর রোগীদের জন্য এসব সুবিধা নেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। যদিও চট্টগ্রাম বিভাগে এটিই একমাত্র বার্ন ইউনিট।
সোমবার ভোরে নগরীর হালিশহরে একটি ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলার বিস্ফোরণের পর আগুন লেগে তিন শিশুসহ নয়জন দগ্ধ হন।
তাদের মধ্যে তিনজনের শরীরের শতভাগ দগ্ধ হয়েছে। অন্যদের শরীরের পুড়েছে ২০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত।
চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় গুরুতর দগ্ধদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে এভাবে আগুনে পোড়া গুরুতর রোগীদের ঢাকায় পাঠিয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সোমবারের ঘটনার পর আবারও বিষয়টি আলোচনায় আসে।
গত কয়েক বছরে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্প কারখানায় বিস্ফোরণসহ বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় সব দগ্ধ রোগীকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়েছে। পোড়া রোগীদের সড়ক পথে ঢাকায় পাঠাতেও নানা কারণে দেরি হয়। তাই অনেক সময় রোগীর মৃত্যু হয়।
গত বছরের শুরুতে চমেক হাসপাতালের গোঁয়াছি বাগান এলাকায় ‘চায়না এইড প্রজেক্ট অব বার্ন ইউনিট অব চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হসপিটাল ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।
প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে।

পরিচালক বলেন, “পুরো কাজ চীনা প্রকৌশলীরা করছেন। নির্মাণ কাজ শেষ হলে তারা আমাদের হস্তান্তর করবেন। আশাকরি আগামী বছরের মাঝামাঝি সব কাজ শেষ হবে।
“অর্থ বরাদ্দে কোনো সংকট নেই। বরাদ্দ সব হয়ে গেছে। এখানে আইসিইউ এবং এইচডিইউ সুবিধা থাকবে। পাশাপাশি হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপির মেশিন থাকবে, যা বর্তমানে আমাদের হাসপাতালে নেই, ঢাকায় আছে। বর্তমানে আইসিইউ না থাকায় গুরুতর রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে হয়।”
প্রকল্পের বিষয়ে চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক রফিক উদ্দিন আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রকল্পের অগ্রগতি ২৬ শতাংশ। চলতি বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। প্রকল্পের মেয়াদ আগামী বছরের জুন পর্যন্ত বাড়াতে আবেদন করেছি।”
বিদ্যমান বার্ন ইউনিটে পোড়া রোগীদের কতটুকু সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সীমিত সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। যেহেতু এখানে বার্ন আইসিইউ নেই, তাই রোগীর পরিস্থিতি খারাপ হলে ঢাকায় পাঠাতে হয়।
“বছরের বেশির ভাগ সময় আমাদের কোনো শয্যাই খালি থাকে না। দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী থাকেন। বছরে প্রায় ১৫ হাজার রোগীকে আমরা সেবা দিই।”
চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার মধ্যে চমেক হাসপাতালেই শুধু বার্ন ইউনিট আছে। ২০১২ সালে হাসপাতালের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে যাত্রা শুরু করা এই ইউনিটের শয্যা সংখ্যা ২৬।
এক যুগের অপেক্ষা
প্রায় এক যুগ আগে ২০১৪ সালে চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গ একটি বার্ন ইউনিট স্থাপনের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল।
তারপর ২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নয় সদস্যের একটি চীনা প্রতিনিধি দল পরিদর্শনে এসে হাসপাতালের গোঁয়াছি বাগান এলাকায় বার্ন ইউনিটের জন্য জমি পছন্দ করে।
পরে ২০১৮ সালের মার্চে বাংলাদেশে চীনা দূতাবাস সেখানে পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিট তৈরির আগ্রহ দেখায়।
এরপর প্রায় পাঁচ বছর কেটে যায়। ওই সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকবার চীনের প্রতিনিধিরা এখানে পরিদর্শনে আসেন।

২০২২ সালের জুনে সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর চমেক হাসপাতালে স্বতন্ত্র বার্ন ইউনিট স্থাপনের বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে।
সবশেষে ২০২৩ গোঁয়াছি বাগান এলাকাতেই বার্ন ইউনিটের জমি নির্ধারণ করা হয়। ওই বছরের ১৩ মার্চ ১৫০ শয্যার এই বার্ন ইউনিট স্থাপনে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চীন সরকারের চুক্তি হয়।
তারপর ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রকল্পটির কাজের গতি কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। সবশেষ গত বছরের শুরুতে জমি প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয় নির্মাণকাজ।
তসলিম উদ্দীন বলেন, “বার্ন ইউনিটের জন্য প্রশিক্ষণ, বিশেষায়িত অস্ত্রোপচার কক্ষসহ আধুনিক সব যন্ত্রপাতির ব্যবস্থাও করবে প্রকল্পের চীনা কর্তৃপক্ষ।”
গণপূর্ত বিভাগের চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মীর রাসেদুল করিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পুরো প্রকল্পটি চীনা প্রকৌশলীরা পরিচালনা করছেন। নির্মাণ কাজ শেষে তাদের চাহিদা থাকলে সীমানা প্রাচীর ও সংযোগ সড়ক আমরা তৈরি করে দিব।”
বার্ন ইউনিটটি চালু হলে পোড়া রোগীর চিকিৎসা সেবায় দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান হবে জানিয়ে চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, “কুমিল্লা থেকে টেকনাফ পর্যন্ত এলাকায় প্রায় চার কোটি মানুষের জন্য চমেক হাসপাতালেই একমাত্র বার্ন ইউনিট আছে।
“১৫০ শয্যার ইউনিটটি চালু হলে বিপুল চাহিদার কিছু অংশ পূরণ করা যাবে।”
নির্মাণাধীন ১৫০ শয্যার বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটটির জন্য ৩ হাজার ৬৩০ বর্গমিটার জমিতে ছয় তলা ভবন করা হচ্ছে। এতে আইসিইউ, এইচডিইউসহ সব ধরনের সুবিধা থাকবে।
বিশেষায়িত ইউনিটটিতে ১১৫টি সাধারণ শয্যার সঙ্গে ১০টি আইসিইউ, নারী-পুরুষ ও শিশু মিলিয়ে ২৫টি এইচডিইউ শয্যা থাকবে।
এর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮৫ কোটি টাকা, যেখানে চীন সরকার ১৮০ কোটি এবং বাংলাদেশ ১০৫ কোটি টাকা দিচ্ছে।
রিলেটেড লিংক-
চট্টগ্রামে বার্ন ইউনিট হবে, পাহাড়ও 'বাঁচবে'
একনেকের সায় পেল চট্টগ্রামের বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট প্রকল্প
চট্টগ্রামে বার্ন হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শুরু 'শিগগিরই'
চট্টগ্রামে বিশেষায়িত বার্ন হাসপাতাল নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি
চট্টগ্রামে বিশেষায়িত বার্ন হাসপাতাল নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি