Published : 04 Mar 2026, 10:46 PM
নিরুত্তাপ ম্যাচে হঠাৎই উত্তেজনা। নাহ, ম্যাচের ফল নিয়ে নয়, সেই সংশয় তো কেটে যায় অনেক আগেই। জয়ের জন্য তখন দরকার এক রান, সেঞ্চুরি থেকে চার রান দূরে ফিন অ্যালেন। মার্কো ইয়ানসেনের বল স্লটে পেয়ে মিড-অফ ফিল্ডারের ওপর দিয়ে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় পা রাখলেন ২৬ বছর বয়সী ওপেনার। নিউ জিল্যান্ড পৌঁছে গেল ফাইনালে।
আসরের একমাত্র অপরাজিত দল, সাত ম্যাচে সাত জয়, উড়তে থাকা সেই দক্ষিণ আফ্রিকা মুখ থুবড়ে পড়ল নকআউট পর্বে। ব্যাটে-বলে গতবারের রানার্স আপদের গুঁড়িয়ে দ্বিতীয়বারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল নিউ জিল্যান্ড।
প্রথম সেমি-ফাইনালে মিচেল স্যান্টনারের দলের জয় ৯ উইকেটে।
কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে বুধবার ২০ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকা তুলতে পারে ১৬৯ রান।
উইকেট ছিল ব্যাটিং সহায়ক, শিশিরের কারণে পরে ব্যাটিং করা আরও সহজ হয়ে ওঠে। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলাররা পারেনি লড়াই জমাতেই। নিউ জিল্যান্ড লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে ১২.৫ ওভারে!
গত আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছিল নিউ জিল্যান্ড। এবার গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তারা হেরেছিল বড় ব্যবধানে। সেমি-ফাইনালে উঠতে তাদের নির্ভর করতে হয়েছিল শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান ম্যাচের ওপর। সেই দলই এখন শিরোপা থেকে আর একটি জয় দূরে।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এই প্রথম জয়ের স্বাদ পেল নিউ জিল্যান্ড। দুই দলের আগের পাঁচ ম্যাচের সবকটি জিতেছিল প্রোটিয়ারা।
বিধ্বংসী সেঞ্চুরিতে নিউ জিল্যান্ডের নায়ক অ্যালেন। স্রেফ ৩৩ বলে সেঞ্চুরি করে ম্যাচ শেষ করেন তিনি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্রুততম সেঞ্চুরি এটি, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে যৌথভাবে তৃতীয় দ্রুততম।
আট ছক্কা ও ১০ চারে গড়া অপরাজিত ১০৩ রানের ইনিংসে ম্যাচ-সেরার স্বীকৃতি পান তিনিই।
অ্যালেনের সঙ্গে ১১৭ রানের বিস্ফোরক উদ্বোধনী জুটি গড়ার পথে ৩৩ বলে ৫৮ রান করেন টিম সাইফার্ট।
টস জিতে অনুমিতভাবে বোলিং নেন নিউ জিল্যান্ড অধিনায়ক স্যান্টনার। দ্বিতীয় ওভারে তিনি নতুন বল তুলে দেন অফ স্পিনিং অলরাউন্ডার কোল ম্যাককনকির হাতে। পরপর দুই বলে কুইন্টন ডি কক ও রায়ান রিকেলটনকে ফিরিয়ে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগান নিউ জিল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ১৮তম সদস্য ম্যাককনকি।
হ্যাটট্রিক ডেলিভারিতে চার মেরে শুরু করেন ডেওয়াল্ড ব্রেভিস। ৩ রানে এইডেন মার্করামের ক্যাচ ফেলেন রাচিন রাভিন্দ্রা।
সেই রাভিন্দ্রাই পরে নিজের পরপর দুই ওভারে ফিরিয়ে দেন মার্করাম (২০ বলে ১৮) ও ডেভিড মিলারকে। একবার জীবন পেয়েও ৬ রানে থামেন মিলার।
পরের ওভারে ব্রেভিসকে (২৭ বলে ৩৪) থামান জেমস নিশাম। তখন ৭৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বিপদে দক্ষিণ আফ্রিকা।
সেখান থেকে ইনিংস সর্বোচ্চ ৭৩ রানের জুটিতে দলের স্কোর দেড়শতে নিয়ে যান ট্রিস্টান স্টাবস ও ইয়ানসেন।

দুই চার ও এক ছক্কায় ২৪ বলে ২৯ রান করে শেষের আগের ওভারে ফেরেন স্টাবস। ওই ওভারে লকি ফার্গুসনকে পরপর দুই ছক্কায় ইয়ানসেন ফিফটি পূর্ণ করেন ২৭ বলে।
শেষ ওভারে স্রেফ ৬ রান দিয়ে কর্বিন বশ ও কাগিসো রাবাদার উইকেট নেন ম্যাট হেনরি, যার এই ম্যাচে খেলা নিয়েই ছিল অনিশ্চতা। সন্তান জন্মের সময় স্ত্রীর পাশে থাকতে ছুটিতে দেশে ছুটে গিয়ে আগের রাতে ভারতে ফেরেন এই ফাস্ট বোলার।
পাঁচ ছক্কা ও দুই চারে ৩০ বলে ৫৫ রানে অপরাজিত রয়ে যান ইয়ানসেন।
রান তাড়ায় অ্যালেন ও সাইফার্টের ব্যাটে উড়ন্ত শুরু পায় নিউ জিল্যান্ড। সাইফার্ট যদিও একটি সুযোগ দিয়েছিলেন দ্বিতীয় ওভারে বল আকাশে তুলে। কিন্তু কিপার ডি কক ও ব্রেভিসের ভুল বোঝাবুঝিতে বলের নিচেই যেতে পারেননি কেউ।
দুই ওপেনারের তাণ্ডবে প্রথম ছয় ওভারে নিউ জিল্যান্ড করে বিনা উইকেটে ৮৪। বিশ্বকাপে পাওয়ার প্লেতে এটি নিউ জিল্যান্ডের সর্বোচ্চ, নকআউট ম্যাচে যেকোনো দলের সর্বোচ্চ। ২০১৬ আসরের সেমি-ফাইনালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের বিনা উইকেটে ৬৭ ছিল আগের সর্বোচ্চ।
সাইফার্ট ফিফটি করেন ২৮ বলে। পঞ্চাশ ছুঁতে অ্যালেনের লাগে ১৯ বল। দশম ওভারে সাইফার্টকে বোল্ড করে বড় জুটি ভাঙেন রাবাদা।
এই বিশ্বকাপে সাইফার্ট ও অ্যালেনের জুটিতে এলো মোট ৪৬৩ রান, বিশ্বকাপের এক আসরে যা কোনো জুটির রেকর্ড। টি-টোয়েন্টিতে যেকোনো সিরিজ বা টুর্নামেন্টেও সর্বোচ্চ।
১২ ওভার শেষে অ্যালেনের রান ছিল ৭৬। জয়ের জন্য নিউ জিল্যান্ডের দরকার তখন ২১। ত্রয়োদশ ওভারে ইয়ানসেনের প্রথম দুই বলে চার ও পরের দুই বলে ছক্কা মেরে ৯৬ রানে পৌঁছে যান অ্যালেন। পরের বলে চার মেরে তার সেঞ্চুরি ও দলের জয়।
২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে কেন উইলিয়ামসনের নেতৃত্বে নিউ জিল্যান্ড হেরেছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। এবার শিরোপা লড়াইয়ে আগামী রোববার আহমেদাবাদে স্যান্টনারের দলের প্রতিপক্ষ হবে ভারত অথবা ইংল্যান্ড।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
দক্ষিণ আফ্রিকা: ২০ ওভারে ১৬৯/৮ (মার্করাম ১৮, ডি কক ১০, রিকেলটন ০, ব্রেভিস ৩৪, মিলার ৬, স্টাবস ২৯, ইয়ানসেন ৫৫*, বশ ২, রাবাদা ০, মহারাজ ১*; হেনরি ৪-০-৩৪-২, ম্যাককনকি ১-০-৯-২, ফার্গুসন ৪-০-২৯-১, নিশাম ৩-০-৪২-১, স্যান্টনার ৪-০-২৫-০, রাভিন্দ্রা ৪-০-২৯-২)
নিউ জিল্যান্ড: ১২.৫ ওভারে ১৭৩/১ (সাইফার্ট ৫৮, অ্যালেন ১০০*, রাভিন্দ্রা ১৩*; ইয়ানসেন ২.৫-০-৫৩-০, রাবাদা ৩-০-২৮-১, এনগিডি ২-০-২২-০, বশ ২-০-৩৫-০, মহারাজ ৩-০-৩৩-০)
ফল: নিউ জিল্যান্ড ৯ উইকেটে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: ফিন অ্যালেন
রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরিতে অ্যালেনের 'প্রথম'