Published : 05 Mar 2026, 09:33 AM
টানা চার ইনিংসে ভালো শুরুর পরও ইনিংস বড় করতে পারেননি ফিন অ্যালেন। সব যেন পুষিয়ে দিলেন এক ইনিংসেই। মারকাটারি ব্যাটিংকে নতুন উচ্চতায় তুলে নিয়ে সেমি-ফাইনালে উপহার দিলেন বিধ্বংসী ইনিংস। নিউ জিল্যান্ডের ওপেনারে নাম খোদাই হয়ে গেল রেকর্ড বইয়ের নানা পাতায়।
কলকাতায় বুধবার দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১০ চার ও ৮ ছক্কায় ৩৩ বলে ১০০ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন অ্যালেন। ব্যাটি তাণ্ডবে তিনি নিজে যেমন একগাদা রেকর্ড গড়েছেন, তেমনি এই ম্যাচে রেকর্ড হয়েছে আরও কিছু।
বিশ্বকাপে দ্রুততম (১)
১৯ বলে ফিফটি ছোঁয়া অ্যালেন পরের পঞ্চাশ করেন স্রেফ ১৪ বলেই। ৩৩ বলের এই সেঞ্চুরি বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্রুততত। আগের রেকর্ড পেছনে ফেলেছেন তিনি ১৪ বলের ব্যবধানে!
২০১৬ আসরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মুম্বাইয়ে ক্রিস গেইলের ৪৭ বলের শতরান ছিল আগের দ্রুততম।
বিশ্বকাপে দ্রুততম (২)
ছেলে ও মেয়ে মিলিয়েই বিশ ওভারের বিশ্বকাপের দ্রুততম সেঞ্চুরি এখন অ্যালেনের। আগেরটি করেছিলেন ড্রিয়েন্ড্রা ডটিন। ২০১০ উইমেন’স টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৮ বলে তিন অঙ্ক ছুঁয়েছিলেন ক্যারিবিয়ান এই অলরাউন্ডার।
নিউ জিল্যান্ডের দ্রুততম
৩৩ বলে শতকে নিউ জিল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে দ্রুততম শতরানের রেকর্ডও অনেকটা ব্যবধানে পেছনে ফেলেছেন অ্যালেন।
৪৬ বলে সেঞ্চুরির আগের রেকর্ড ছিল গ্লেন ফিলিপসের, ২০২০ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে।
তৃতীয় দ্রুততম এবং দ্রুততম
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে অ্যালেনের চেয়ে কম বলে সেঞ্চুরি আছে স্রেফ দুটি। ২৭ বলে সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ড সাহিল চৌহানের। ২০২৪ সালে সাইপ্রাসের বিপক্ষে ১৮ ছক্কায় ৪১ বলে ১৪৪ রানের ইনিংসের পথে রেকর্ডটি গড়েছিলেন এস্তোনিয়ার ব্যাটসম্যান। গত বছর তুরস্কের মুহাম্মাদ ফাহাদ ২৯ বলে সেঞ্চুরি করেন বুলগেরিয়ার বিপক্ষে।
আইসিসির সব সহযোগী সদস্য দেশ টি-টোয়েন্টি মর্যাদা পাওয়ার পর নিত্য নতুন যে রেকর্ডের ছড়াছড়ি, সেসবের কাতারেই পড়েছে এসব কীর্তি। এই দুজনের পরই জায়গা করে নিয়েছেন অ্যালেন। যেটির মানে, আইসিসি পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দ্রুততম টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরির রেকর্ড নিউ জিল্যান্ডের ওপেনারেরই।
এখানে অবশ্য একজন সঙ্গী আছে তার। জিম্বাবুয়ের সিকান্দার রাজা ২০২৪ সালে ৩৩ বলে সেঞ্চুরি করেন গাম্বিয়ার বিপক্ষে।
আরও একটি দ্রুততম
আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশগুলির বিপক্ষে সবচেয়ে কম বলে সেঞ্চুরিও এখন অ্যালেনের।
বাংলাদেশের বিপক্ষে ২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডেভিড মিলারের ৩৫ বলের শতরান ছিল আগের রেকর্ড।
ট্রিপল সেঞ্চুরি স্ট্রাইক রেট
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তিনশ স্ট্রাইক রেটে তিন অঙ্ক ছোঁয়া ইনিংস খেলা চতুর্থ ব্যাটসম্যান অ্যালেন।
রেকর্ডের শীর্ষে এখানে মুহাম্মাদ ফাহাদ। বুলগেরিয়ার বিপক্ষে তুরস্কের ব্যাটসম্যানের ৩৪ বলে ১২০ রানের ইনিংসে স্ট্রাইক রেট ছিল ৩৫২.৯৪।
সাইপ্রাসের বিপক্ষে এস্তোনিয়ার সাহিল চৌহানের ৪১ বলে ১৪৪ রানের ইনিংসে স্ট্রাইক রেট ৩৫১.২১। গাম্বিায়ার বিপক্ষে সিকান্দার রাজা ৩০৯.৩০ স্ট্রাইক রেটে করেন অপরাজিত ১৩৩ রান (৪৩ বলে)।
অ্যালেনের ইনিংসের স্ট্রাইক রেট ৩০৩.০৩।
মানরোর পাশে
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে অ্যালেনের তৃতীয় শতরান এটি। নিউ জিল্যান্ডের হয়ে সবচেয়ে বেশি শতরানের কীর্তিতে তিনি স্পর্শ করলেন কলিন মানরোকে।
বিশ্বমঞ্চে তৃতীয়
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিউ জিল্যান্ডের হয়ে সেঞ্চুরি করা তৃতীয় ব্যাটসম্যান অ্যালেন। তার আগে করেছেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ২০১২ আসরে, ২০২২ আসরে গ্লেন ফিলিপস।
নকআউট পাঞ্চ (১)
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে সেঞ্চুরির স্বাদ পাওয়া প্রথম ব্যাটসম্যান অ্যালেন।
২০০৯ আসরের সেমি-ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শ্রীলঙ্কার তিলাকারাত্নে দিলশানের অপরাজিত ৯৬ ছিল আগের সেরা।
নকআউট পাঞ্চ (২)
অ্যালেনের ১৯ বলের ফিফটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচের ইতিহাসে দ্রুততম।
প্রথম বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারতের ইউভরাজ সিংয়ের ২০ বলের ফিফটি ছিল আগের রেকর্ড।
দেশের দ্রুততম
অ্যালেনের এই ১৯ বলের ফিফটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিউ জিল্যান্ডের হয়ে দ্রুততম অর্ধশত রানের রেকর্ড।
আগের রেকর্ডটি এবারের আসরেই করেছিলেন গ্লেন ফিলিপিস, কানাডার বিপক্ষে ২২ বলে।
বাউন্ডারির বন্যা (১)
১০টি চার ও ৮টি ছক্কা মেরেছেন অ্যালেন। এক ম্যাচে ১৮ বাউন্ডারি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যৌথভাবে রেকর্ড।
২০১২ সালে নিউ জিল্যান্ডেরই ব্রেন্ডন ম্যাককালাম বাংলাদেশের বিপক্ষে ৫৮ বলে ১২৩ রানের ইনিংসে মেরেছিলেন ১১ চার ও ৭ ছক্কা।
বাউন্ডারির বন্যা (২)
স্রেফ বাউন্ডারি থেকেই ৮৮ রান করেছেন অ্যালেন, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এক ম্যাচে যা যৌথভাবে সর্বোচ্চ।
প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ক্রিস গেইলের ১১৭ রানের ইনিংসেও বাউন্ডারি থেকে এসেছিল ৮৮ রান।
ছক্কার সুনামি
এই ম্যাচের ৮ ছক্কায় এবারের বিশ্বকাপে অ্যালেনের ছক্কা হলো মোট ২০টি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এই প্রথম এক আসরে ২০ ছক্কা মারতে পারলেন কোনো ব্যাটসম্যান। ফাইনালে রেকর্ডটি আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ থাকবে তার।
এবারের আসরেই ১৯ ছক্কা মেরে রেকর্ডের দুইয়ে জায়গা করে নিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের শিমরন হেটমায়ার। চলতি আসরেই ১৮ ছক্কা মেরেছেন পাকিস্তানের সাহিবজাদা ফারহান।
এবারের আগে রেকর্ডটি ছিল নিকোলাস পুরানের। গত বিশ্বকাপে ১৭টি ছক্কা মেরেছিলেন ক্যারিবিয়ান ব্যাটার।
জুটির কীর্তি
অ্যালেনের সঙ্গে বিধ্বংসী উদ্বোধনী জুটিতে টিম সাইফার্ট খেলেছেন ৩৩ বলে ৫৮ রানের ইনিংস। জুটি হয়েছে ১১৭ রানে। এবারের বিশ্বকাপে এই দুজনের জুটির মোট রান ৪৬৩। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে যে কোনো সিরিজ বা টুর্নামেন্টে যা সর্বোচ্চ।
গত বছর রোয়ান্ডায় ত্রিদেশীয় সিরিজে বাহরাইনের আসিফ আলি ও প্রাশান্ত কুরুপের ৪৫৯ ছিল আগের রেকর্ড।
গতিময় জুটি
এই ম্যাচেই উদ্বোধনী জুটিতে ১ হাজার রান পূর্ণ হয়েছে অ্যালেন-সাইফার্টের। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে হাজার রান পূর্ণ করা ৪২ জুটির মধ্যে এই দুজনের রান রেটই সেরা। কিউই জুটির রান রেট ১০.৯৫।
১০.৭৯ রান রেট নিয়ে রেকর্ডের দুইয়ে রোমানিয়ার রামেশ সাথিসান ও তারানজিৎ সিং জুটি।
ব্যাটিং গড়ের দিক থেকে হাজার রান করা জুটিগুলোর মধ্যে অ্যালেন-সাইফার্ট জুটির অবস্থান পঞ্চম (৪৪.১৩)।
৪৭.৮৯ গড় নিয়ে সবার ওপরে নিউ জিল্যান্ডেরই মার্টিন গাপটিল ও কেন উইলিয়ামসন জুটি। বাবর আজম ও মোহাম্মাদ রিজওয়ান জুটির গড় ৪৬.৪৭। এরপর আছেন রোহিত শার্মা ও লোকেশ রাহুণ (৪৬.২৬) এবং রাহমানউল্লাহ গুরবাজ ও ইব্রাহিম জাদরান (৪৪.৭১)।
রইল বাকি বাংলাদেশ
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ষষ্ঠবারের দেখায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে প্রথমবার হারাতে পারল নিউ জিল্যান্ড। কিউইদের এই জয়ে বাংলাদেশই এখন একমাত্র দল, বিশ্বকাপে কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে অন্তত পাঁচবারের দেখায় যারা একবারও জিততে পারেননি।
বাংলাদেশের এই জয়খরা আছে তিন দলের বিপক্ষে। অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের বিপক্ষে ছয়টি করে ম্যাচ খেলেও জয় নেই বাংলাদেশের, ভারতের বিপক্ষে তারা জয়বিহীন পাঁচ ম্যাচ খেলে।
নকআউটে রাজত্ব
আইসিসি আসরগুলোর নকআউট ম্যাচে চারবারের দেখায় প্রতিবারই দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাল নিউ জিল্যান্ড। এবারের আগের তিনটিই ছিল ওয়ানডে ক্রিকেটে- ২০১১ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১৫ বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনাল ও গত বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমি-ফাইনাল।
পাওয়ার প্লের পাওয়ার
অ্যালেন ও সাইফার্টের ঝড়ে এ দিন ৬ ওভারে ৮৪ রান তোলে নিউ জিল্যান্ড। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে যা সর্বোচ্চ। ২০১৬ আসরে ইংল্যান্ডের ৬৭ ছিল আগের সর্বোচ্চ।
নিউ জিল্যান্ডের জন্য এটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসেই সেরা পাওয়ার প্লে।
দক্ষিণ আফ্রিকার দুঃখ
এবার ও গতবার, দুটি টি-টোয়েন্ট বিশ্বকাপে স্রেফ দুটি ম্যাচ হেরেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। দুটিই শেষ করে দিয়েছে তাদের বড় কিছুর আশা।
গত আসরে অপরাজিত থেকে ফাইনালে উঠে তারা হেরে যায় ভারতের কাছে। এবার সেমি-ফাইনাল পর্যন্ত আসরের একমাত্র অপরাজিত দল ছিল তারা। কিন্তু পথচলার সমাপ্তি ফাইনালের আগেই।