Published : 08 Mar 2026, 11:39 PM
গ্যালারি যেন আকাশী-নীলের সমুদ্র। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শক ধারণ ক্ষমতার ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ভারতের জার্সি গায়ে লাখো দর্শকের জোয়ার। সেই উন্মাদনার ঢেউয়ে ভেসে মাঝের ২২ গজে যেন রানের সুনামি বইয়ে দিলেন তাদের নায়কেরা। সাঞ্জু স্যামসন, আভিশেক শার্মা, ইশান কিষানদের উত্তাল ব্যাটে ভেসে গেল নিউ জিল্যান্ডের আশা। প্রত্যাশার তরী বেয়ে ভারত পৌঁছে গেল ইতিহাসের ঠিকানায়।
আড়াই বছর আগে এই মাঠে ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনালেও ছিল এমন আবহ। কিন্তু সেবার শেষ পর্যন্ত সব মিইয়ে গিয়েছিল বিষাদের নীল থাবায়। এবার সেখানে উৎসবের রঙ। নিউ জিল্যান্ডকে ৯৬ রানে উড়িয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আবার চ্যাম্পিয়ন ভারত।
এই জয়ে সুরিয়াকুমার ইয়াদাভের দল খুলে ফেলল ইতিহাসের বেশ কটি দুয়ার। দেশের মাঠে শিরোপাজয়ী প্রথম দল তারা। টানা দুটি বিশ্বকাপজয়ী প্রথম দলও। সব মিলিয়ে তিনবার শিরোপা জিতে পৌঁছে গেল তারা রেকর্ডের উচ্চতায়।
ও হ্যাঁ, নিউ জ্যিান্ডের সঙ্গে বোঝাপড়াও হয়ে গেল। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আগে দুই দলের তিন লড়াইয়ের সবকটিই জিতেছিল কিউইরা। ভারত প্রথমবার জিতল সবচেয়ে বড় মঞ্চেই।
আহমেদাবাদে রোববার ফাইনালের ফয়সালা একরকম হয়ে যায় ম্যাচের প্রথম ভাগেই। ২০ ওভারে ভারত তুলে ফেলে ২৫৫ রান, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে যা রেকর্ড। এরপর আর ম্যাচে বাকি থাকে কী! নিউ জিল্যান্ড পারেনি সেভাবে লড়াই জমাতেই। এক ওভার বাকি থাকতে গুটিয়ে যায় তারা ১৫৯ রানে।
এই মঞ্চে দলকে নিয়ে আসার নায়ক সাঞ্জু স্যামসন ফাইনালেও দলের ধ্রুবতারা। আগের দুই ম্যাচে ৯৭ ও ৮৯ রান করা ব্যাটসম্যান এবার উপহার দেন ৮ ছক্কায় ৪৬ বলে ৮৯ রানের ইনিংস। দারুণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিও পেয়ে যান। ৫ ম্যাচ খেলেই ম্যান অব দা টুর্নামেন্ট!
আসরজুড়ে যার ফর্ম নিয়ে ছিল তুমুল আলোচনা, সেই আভিশেক শার্মা ফাইনালে জ্বলে উঠে ২১ বলে করেন ৫২। ইশান কিষানের ব্যাট থেকে আসে ২৫ বলে ৫৪।
ওই রান তাড়া করার উপায় এমনিতেই ছিল না নিউ জিল্যান্ডের। সম্ভাবনা যদি একটু থেকেও থাকে, তা শেষ করে দেন জাসপ্রিত বুমরাহ। আরেকটি বোলিং মাস্টারক্লাস মেলে ধরে ৪ ওভারে ১৫ রান দিয়ে উইকেট নেন ৪টি।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ৪ উইকেট শিকারি প্রথম পেসার তিনিই। গত আসরে ভারতের জয়ে টুর্নামেন্ট-সেরা হওয়া পেসার এবার ফাইনালের ম্যান অব দা ম্যাচ।
নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে রোববার টস হেরে আগে ব্যাটিং পেয়ে খুশিই হন সুরিয়াকুমার ইয়াদাভ। সেমি-ফাইনালেও টস হেরে ব্যাটিং পেয়ে ২৫৩ করেছিল তার দল। এবারও তাদের চাওয়া ছিল আগে ব্যাটিংই।
বিস্ময়করভাবে নিউ জিল্যান্ডের একাদশে জায়গা পাননি কোল ম্যাককনকি, সেমি-ফাইনালে যিনি নতুন বলে এক ওভারেই দক্ষিণ আফ্রিকার দুই ওপেনারকে ফিরিয়ে সুর বেঁধে দিয়েছিলেন দলের জয়ের। এই অফ স্পিনিং অলরাউন্ডারের বদলে সুযোগ পান পেসার জেকব ডাফি।
আরেক অফ স্পিনিং অলরাউন্ডার গ্লেন ফিলিপস নতুন বলে একটি ওভার বোলিং করে মাত্র ৫ রান দেওয়ার পরও আর বোলিং পাননি।
প্রথম ওভারে ম্যাট হেনরির বলে সাঞ্জু স্যামসনের ছক্কার পরও প্রথম দুই ওভারে রান আসে ১২। তৃতীয় ওভারে ডাফিকে তিনটি বাউন্ডারি মেরে শুরু হয় আভিশেক-স্যামসনের তাণ্ডব। লকি ফার্গুসনের করা পরের ওভারে দুজন মিলে নেন ২৪ রান।
চার ওভারে পঞ্চাশ পেরিয়ে যায় ভারত।
এরপর থামাথামি নেই। পাওয়ার প্লেতে ভারত তোলে ৯২ রান।
পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে ডাফিকে বাউন্ডারি মেরে আভিশেক ফিফটি করেন ১৮ বলে। এবারের বিশ্বকাপের দ্রুততম ফিফটি এটি।
অষ্টম ওভারে আক্রমণে এসে প্রথম বলেই জুটি ভাঙেন রাচিন রাভিন্দ্রা। প্রায় ওয়াইড বল তাড়া করে কিপারের হাতে ধরা পড়েন আভিশেক।

নিউ জিল্যান্ডের স্বস্তি তাতে ফেরেনি। বরং শুরু হয় আরও বেশি যন্ত্রণা। ইশান কিষান ক্রিজে গিয়েই ছুটেতে শুরু করেন ফেরারির গতিতে। স্যামসনের ব্যাট ক্রমে হয়ে ওঠে উত্তাল।
৩৩ বলে ফিফটির পর ফার্গুসনকে টানা দুটি ছক্কা মারেন স্যামসন, রাভিন্দ্রাকে মারেন টানা তিনটি। সেঞ্চুরি মনে হচ্ছিল স্রেফ সময়ের ব্যাপার।
অন্য প্রান্তে ২৩ বলে ফিফটি করেন কিষান, ওই শটেই জুটির শতরান আসে ৪৫ বলে।
১৫ ওভারে ২০০ ছাড়িয়ে যায় ভারত।
সেই উত্তুঙ্গ স্রোতে অভাবনীয়ভাবেই একটু উল্টো স্রোত বয়ে যায় এরপরই। জিমি নিশামের এক ওভারেই এই দুই ব্যাসম্যানসহ বিদায় নেন তিনজন।
একটু উঁচু ফুল টসে সোজা ব্যাটে ছক্কার চেষ্টায় সীমানায় ধরা পড়েন স্যামসন। লো ফুল টসে লং অনেই ক্যাচ দেন কিষান। সুরিয়াকমার ইয়াদাভ গিয়ে প্রথম বলেই তার মতো করে শট খেলেন হাওয়ায় ভাসিয়ে। স্কয়ার লেগ সীমানায় দারুণ ক্যাচ নেন রাভিন্দ্রা।
সেই ধাক্কায় রান রেট একটু দমে যায়। অবিশ্বাস্যভাবে টানা ১৬ বলে আসেনি বাউন্ডারি। হার্দিক পান্ডিয়া ১৩ বল খেলে ১৮ রানে আউট হয়ে যান।
মনে হচ্ছিল আড়াইশ বুঝি আর হলো না। শেষ ওভারে সব পুষিয়ে দেন শিভাম দুবে। শেষ ওভারে নিশামকে তুলাধুনা করে দুই ছক্কা তিন চারে রান নেন ২৪।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সব আসর মিলিয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ স্কোর এই ২৫৫। সর্বোচ্চ পাঁচ স্কোরের তিনটিই ভারতের।
নাগালের বাইরের রান তাড়ায় যেমনটি অনুমিত ছিল, হয়েছে তেমনই। কিউই ব্যাটসম্যানরা একের পর এক শট খেলেছেন। কিছু কাজে লেগেছে, উইকেটও পড়েছে নিয়মিত।
সেমি-ফাইনালে বিস্ফোরক সেঞ্চুরি করা ফিন অ্যালেন শূন্য রানে জীবন পেয়ে আউট হয়ে গেছেন ৭ বলে ৯ রান করে। কিষানের দারুণ ক্যাচে রাভিন্দ্রা ফিরেছেন ১ রানে। সেমি-ফাইনালের মতোই প্রথম বলে উইকেট নিয়েছেন জাসপ্রিত বুমরাহ। আকসার প্যাটেলের দারুণ ডেলিভারিতে গ্লেন ফিলিপস বোল্ড ৫ রানেই। হার্দিক পান্ডিয়ার বল স্টাম্পে টেনে এনেছেন মার্ক চ্যাপম্যান (৮ বলে ৩)।
অন্য প্রান্তে টিম সাইফার্ট স্বভাবসুলভ ব্যাটিংয়ে ফিফটি করেছেন ২৩ বলে। কিন্তু থেমে গেছেন পরপরই (৫ ছক্কায় ২৬ বলে ৫২)।
এরপর ড্যারিল মিচেল আউট হয়ে যান দুই ছক্কায় ১৭ রান করে। মিচেল স্যান্টনার কিছুক্ষণ টিকে থেকে ৩৫ বলে করেন ৪৩ রান।
দুর্দান্ত দুটি স্লোয়ারে জিমি নিশাম ও ম্যাট হেনরিকে বোল্ড করেন বুমরাহ। পরে আরেকটি অসাধারণ স্লোয়ারে স্যান্টনারকে ফিরিয়ে তিনি পূর্ণ করেন চার উইকেট।
শেষ ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে ম্যাচের শেষটা করেন আভিশেক শার্মা। ‘ভান্দে মাতরাম’ গানের তালে উত্তাল হয়ে ওঠে গ্যালারি। স্টেডিয়ামের বক্সে দেখা যায় প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক মাহেন্দ্রা সিং ধোনি ও গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক রোহিত শার্মা পরস্পরকে জড়াচ্ছেন আলিঙ্গনে, সঙ্গী সেখানে আইসিসি সভাপতি জয় শাহও।
মাঠে দেশের পতাকা হাতে ভারতীয় ক্রিকেটাররা মেতে উঠেছেন গোটা বিশ্ব পেয়ে যাওয়ার আনন্দে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ভারত: ২০ ওভারে ২৫৫/৫ (স্যামসন ৮৯, আভিশেক ৫২, কিষান ৫৪, পান্ডিয়া ১৮, সুরিয়াকুমার ০, তিলাক ৮*, দুবে ২৬*; হেনরি ৪-০-৪৯-০, ফিলিপস ১-০-৫-০, ডাফি ৩-০-৪২-০, ফার্গুসন ২-০-৪৮-০, স্যান্টনার ৪-০-৩৩-০, রাভিন্দ্রা ২-০-৩২-১, নিশাম ৪-০-৪৬-৩)।
নিউ জিল্যান্ড: ১৯ ওভারে ১৫৯ (সাইফার্ট ৫২, অ্যালেন ৯, রাভিন্দ্রা ১, ফিলিপস ৫, চ্যাপম্যান ৩, মিচেল ১৭, স্যান্টনার ৪৩, নিশাম ৮, হেনরি ০, ফার্গুসন ৬*, ডাফি ৩; আর্শদিপ ৪-০-৩২-০, পান্ডিয়া ৪-০-৩৬-১, আকসার ৩-০-২৭-৩, বুমরাহ ৪-০-১৫-৪, ভারুন ৩-০-৩৯-১, আভিশেক ১-০-৫-১)।
ফল: ভারত ৯৬ রানে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: জাসপ্রিত বুমরাহ
ম্যান অব দা সিরিজ: সাঞ্জু স্যামসন
স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়ে রেকর্ডের ভেলায় স্বপ্নের ঠিকানায় স্যামসন
ঘরের মাঠে ফাইনালের সেরা হওয়ার চেয়ে 'বড় কিছু নেই' বুমরাহ কাছে