Published : 09 Mar 2026, 02:48 AM
আগের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দলের সঙ্গে থাকলেও, কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি সাঞ্জু স্যামসন। এবার শুরুতেও তার জায়গা হয় ডাগআউটে। পরে দুটি ম্যাচে সুযোগ পেলেও খুব একটা ভালো করতে পারেননি। তবে দলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ শেষ তিন ম্যাচে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত তিনটি ইনিংস খেলে তিনিই শেষ পর্যন্ত ভারতের শিরোপা জয়ের নায়কদের একজন।
আহমেদাবাদের ফাইনালে রোববার নিউ জিল্যান্ডকে রানের জোয়ারে ভাসিয়ে প্রথম দল হিসেবে টানা দুইবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়ে ভারত। ২৫৫ পুঁজি গড়ে ৯৬ রানের বড় জয় পায় সুরিয়াকুমার ইয়াদাভের দল।
দলকে আড়াইশ ছাড়ানো পুঁজি এনে দিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন স্যামসন। পাঁচ চার ও আট ছক্কায় দলের সর্বোচ্চ ৪৬ বলে ৮৯ রানের ইনিংস খেলেন এই কিপার-ব্যাটসম্যান। ১৫ রানে ৪ উইকেট নিয়ে জাসপ্রিত বুমরাহ ফাইনালের সেরা হলেও, টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার জেতেন স্যামসন।
দলের ৯ ম্যাচের পাঁচটিতে খেলেই এই স্বীকৃতি পেলেন তিনি। ৮০.২৫ গড় আর ১৯৯.৩৭ স্ট্রাইক রেটে ৩২১ রান করে দলের সর্বোচ্চ ও আসরের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ৩১ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের এক আসরে ভারতের হয়ে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড এটি। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ২০১৪ আসরে ছয় ইনিংসে ৩১৯ রান করে আগের রেকর্ড ছিল ভিরাট কোহলির।
ভারতের তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ‘প্লেয়ার অব দা টুর্নামেন্ট’ হলেন স্যামসন। তার আগে হয়েছিলেন কোহলি (২০১৪ ও ২০১৬) ও বুমরাহ (২০২৪)।
অথচ কদিন আগেও ভারতের একাদশে জায়গা নড়বড়ে ছিল স্যামসনের। বিশ্বকাপের আগে ঘরের মাঠে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ খুব বাজে কাটে তার। পাঁচ ম্যাচের সবকটি খেলে একবারও ত্রিশ ছুঁতে পারেননি। ওই সিরিজ দিয়ে দুই বছরের বেশি সময় পর ভারতের হয়ে এই সংস্করণে ফিরে দুর্দান্ত পারফর্ম করেন ইশান কিষান। নিজে ফর্ম হারিয়ে আর কিষানের দারুণ ফর্ম মিলিয়ে একাদশে জায়গা হারিয়ে ফেলেন স্যামসন।

বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে বাইরে থাকার পর, দ্বিতীয় ম্যাচে স্যামসন একাদশে সুযোগ পান আভিশেক শার্মার অসুস্থতার কারণে। নামিবিয়ার বিপক্ষে ওই ম্যাচে ৮ বলে ২২ রান করে আউট হয়ে যান তিনি। আভিশেক ফেরার পর দলের পরের তিন ম্যাচে আর একাদশে সুযোগ মেলেনি স্যামসনের। পরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সুযোগ পেলেও, ১৫ বলে ২৪ রান করে বিদায় নেন তিনি।
এরপরই দেখা মেলে তার ভিন্ন রুপ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালে রূপ নেওয়া ম্যাচে রান তাড়ায় ১২ চার ও চার ছক্কায় ৫০ বলে অপরাজিত ৯৭ রানের ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়ে দেন স্যামসন। সেমি-ফাইনালে আবার উত্তাল হয়ে ওঠে তার ব্যাট। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আট চার ও সাত ছক্কায় ৪২ বলে ৮৯ রানের ইনিংস খেলে আবারও দলের জয়ের নায়ক তিনিই।
সেই ফর্ম ধরে রেখে শিরোপার মঞ্চেও তিনি খেললেন আরেকটি নজরকাড়া ইনিংস। টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার নেওয়ার পর স্যামসনের কণ্ঠে শোনা গেল স্বপ্ন পূরণের উচ্ছ্বাস।
“সত্যি বলতে স্বপ্নের মতো লাগছে। খুব, খুব খুশি, খুব কৃতজ্ঞ। ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। যা কিছুর মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, কিছুটা পরাবাস্তব মনে হচ্ছে।”
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে টানা তিন ম্যাচে ৮০ ছোঁয়া ইনিংস খেলা স্রেফ দ্বিতীয় ক্রিকেটার স্যামসন। ২০১০ আসরে এই কীর্তি গড়েন শ্রীলঙ্কান গ্রেট মাহেলা জায়াওয়ার্দেনে।
স্যামসনের এই সাফল্য হুট করে পাওয়া নয়। এর পেছনে রয়েছে অনেক ত্যাগ আর পরিশ্রমের গল্প।
“সত্যি বলতে, এটা (প্রক্রিয়া) এক থেকে দুই বছর আগে শুরু হয়েছিল। যখন আমি ২০২৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে বিশ্বকাপ জয়ী দলের সঙ্গে ছিলাম, কিন্তু তখন একটিও ম্যাচ খেলতে পারিনি। সেই থেকে আমি কেবল কল্পনা করেছি। স্বপ্ন দেখেছি। পরিশ্রম অব্যাহত রেখেছি। তখন ঠিক এটাই করতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আমার কাজ করতে হবে, আমার অনেক পরিশ্রম করা উচিত, ঠিক এটাই অর্জন করতে চেয়েছিলাম। ঈশ্বরের কৃপায়, আমার মনে হয় আজ সবকিছু বদলে গেছে।”
এখন হয়তো স্যামসনের জীবন বদলে গেছে। তবে কিছুদিন আগেও পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন তিনি।

“নিউ জিল্যান্ড সিরিজের পর আমি ভেঙে পড়েছিলাম। আমি পুরোপুরি মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমার স্বপ্ন ভেঙে গেছে। আমি আর কী করতে পারি? কিন্তু ঈশ্বরের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। হঠাৎ করেই আমি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ফিরে এলাম এবং আমার দেশের জন্য যা করতে পারি, তাই করলাম। আমি খুব গর্বিত এবং খুব খুশি যে, স্বপ্ন দেখার সাহস করেছিলাম।”
আইসিসির একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচের আগে স্যামসনকে অনুপ্রাণিত করতে ভারতের গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক রোহিত শার্মা বলছেন, “হতাশ হবে না। এটা দীর্ঘ টুর্নামেন্ট। তুমি সুযোগ পাবে। সুযোগ যেকোনো সময় আসতে পারে।”
কঠিন সময়ে পাশে পাওয়া আরও একজনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করলেন স্যামসন।
“সত্যি বলতে, ভারতীয় দলের সাবেক সিনিয়র খেলোয়াড়দের কাছ থেকে অনেক দিক নির্দেশনা ও পরামর্শ পেয়েছি এবং তারা আমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমার মনে হয় গত কয়েক মাস ধরে… আশা করি, বিষয়টি এখানে বলতে পারব, আমি সাচিন টেন্ডুলকার স্যারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছি।”
“যখন আমি অস্ট্রেলিয়ায় একাদশের বাইরে ছিলাম, তখন ভাবলাম, মানসিকতা ঠিক রাখতে এখন কী দরকার। তাই আমি স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং তার সঙ্গে আমার অনেক আলোচনা হয়। গতকালও তিনি আমাকে ফোন করেছিলেন, আমার কেমন লাগছে সেটা জানার জন্য। তাই আমার মনে হয়, তার মতো কারো কাছ থেকে দিক নির্দেশনা পেলে, আর কী চাইতে পারি?”
এই কদিনেই স্যামসন যা পেয়েছেন, এখন আর কী বা তিনি চাইতে পারেন!
ঘরের মাঠে ফাইনালের সেরা হওয়ার চেয়ে 'বড় কিছু নেই' বুমরাহ কাছে