Published : 14 Mar 2026, 12:34 AM
ঈদের আগে শতাধিক পরিবারকে খাদ্যপণ্য সহায়তার অংশ হিসেবে বোতলবাজত সয়াবিন তেল কিনবেন আশিকুর রহমান সাজ্জাদ। এজন্য গত চার-পাঁচ দিন ঢাকার মৌলভীবাজারে এক পাইকারি দোকানে প্রতিদিন ঢুঁ দিচ্ছেন।
সবশেষ গত বুধবার গেলেও বিক্রেতা হারুন মিয়া তেল না থাকার কথা বলেছেন। কবে আসবে সেটিও বলতে পারেননি।
ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার পুরান ঢাকার এই মৌলভীবাজার। সেই বাজারে এখন সয়াবিন তেল মিলছে না চাহিদা অনুযায়ী।
ক্রেতা সাজ্জাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফের ডটকমকে বলেন, ‘‘দোকানদার টাকা ফেরত দিতে চায়। টাকা নিয়া কি করুম। এখন তেল যেদিন পামু, সেদিনই নিমু। বাকি চাল, ডাল, চিনি বিলায়া দিমু।’’
আগামী রোববার পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন দুই লিটার সয়াবিন তেলের বোতলের জন্য।
পাইকার হারুন মিয়া আশ্বস্থ করেছেন ঈদের আগ দিয়ে তেলের বাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে। তখন তেল পেলে আবার বিতরণ করে দেবেন বলে পরিকল্পনা করছেন সাজ্জাদ।
শুধু এ বাজার না রাজধানীর বেশির ভাগ বাজারেই বোতলজাত সয়াবিন তেল হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে বলে ক্রেতা-বিক্রেতারা তথ্য দিচ্ছেন।
চাহিদার চেয়ে ৪২ শতাংশ বেশি আমদানির তথ্য সরকারের তরফে দেওয়া হলেও রোজা শুরু হওয়ার আগ থেকে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট দেখা দিতে শুরু করে, যা এখনও কাটেনি।
সরবরাহে সংকট থাকলেও এখনও দামে এর প্রভাব পড়ার অভিযোগ কাউকে করতে শোনা যায়নি।

বর্তমানে সরকার নির্ধারিত বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৭৫ টাকা। খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৫৭ টাকা। পাঁচ লিটারের বোতলজাত তেলের দাম ৮৫২ টাকা।
পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে যে কয়জন বড় পাইকারি বিক্রেতা আছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ইমরোজ এন্টারপ্রাইজ।
রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় তেল সরবরাহ করা প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারি মোহাম্মদ হারুন মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘রোজা ও কোরবানির ঈদের সময়ে সয়াবিন তেল বেশি লাগে। ভাজা-পোড়া থেকে শুরু করে সব রান্নায় তেল লাগবেই।
‘‘এখন মৌলভীবাজারে দিনে এক হাজার টনের চাহিদা থাকলেও আসতেছে ৪০০ টনের মত। এত ঘাটতি দিয়ে বাজার চালানো যায় না।’’
রোজার সময়ে তেল পাওয়া নিশ্চিত করতে গত জানুয়ারির শেষ দিকে মিলগুলোর কাছে আগাম টাকা দিয়ে বরাদ্দ কিনে রেখেছেন হারুন মিয়া। সেই তেল এখনো আসেনি তার দোকানে। অন্যদিকে তেল কিনতে খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরাও টাকা দিয়ে রেখেছেন তার কাছে।
সেই টাকা কাগজে মুড়িয়ে নাম লিখে রাখা তার দোকানে। কোনো ক্রেতা এলে তেল সংকটের কথা জানিয়ে টাকা ফেরত নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। কিন্তু তেলের সন্ধানে আসা কেউ টাকা নিচ্ছেন না। তারা তেলই নিতে চান।
পাইকারি বাজারে টান পড়ার এ প্রভাব পড়েছে দেশের খুচরা বাজারেও।
সংকট কেন
রোজা ও ঈদকে ঘিরে বরাবরই দেশে ভোজ্যতেলের বাড়তি চাহিদা দেখা যায়।
মৌলভীবাজারের আরেক পাইকার আলিফ ট্রেডার্সের পরিচালক রাজিব হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘যুদ্ধের যে কারণ দেখাচ্ছে মিলগুলা তা সঠিক না। তারা বলছে, যুদ্ধে জাহাজে তেল আসছে না।
‘‘যুদ্ধের প্রভাব পড়বে তো আরো দুই মাস পরে। রোজার মাসে যে তেল লাগে তা অনেক আগেই আসছে। দুই মাস পরে যে সংকট হবে, তা দুই মাস আগেই হয়ে গেল। এইটা মানসিক সমস্যা, লোভের সমস্যা।’’
তেল না থাকায় মিলগুলোতে সরকারকে অভিযান চালানোর পরামর্শ তার।
একই অভিযোগ করে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়ে আমাদের সঙ্গে বৈঠক করে তেল নিয়ে। তখন সরকারের উপদেষ্টা বলেছিলেন, রোজায় যে পরিমাণ সয়াবিন তেল লাগবে তার চেয়ে ৪২ শতাংশ বেশি আমদানি করা হয়েছে। সমস্যা হবে না।

‘‘যদি মিলগুলো তেল আমদানি করেই থাকে, তখন আমলারা যে তথ্য দিল-সেটা এখন দেখা দরকার সরকারের। সরকারের উচিত মিলে মিলে গিয়ে দেখা-তেল গেলো কই।’’
রোজা উপলক্ষে দেশে যথেষ্ট পরিমাণে ভোজ্যতেল আমদানি করা হয়েছে তা স্বীকার করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পর্যন্ত দিয়েছিল ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন।
সংগঠনটি গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিল, ‘‘আসন্ন পবিত্র রমজান সামনে রেখে বাজারে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি ভোজ্যতেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তাই রমজানে বাজারে ভোজ্যতেল সরবরাহে কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই।”
বাজারে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহের পরিমাণের দিক থেকে সংকটের কোনো সুযোগ না থাকার কথা তুলে ধরে সংগঠনটি বলেছিল, ‘‘রমজানে বাড়তি চাহিদার কারণে কতিপয় ব্যবসায়ীর মজুদের প্রবণতা থেকে যদি সংকট হয়ে থাকে, সেটিও কেটে যাবে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। এ অবস্থায় কারও অস্বাভাবিক মুনাফার সুযোগ নেই।
‘‘দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, টি কে গ্রুপ এবং বাংলাদেশ এডিবল অয়েল চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি ভোজ্যতেল আমদানি করেছে।’’
ভোগ্যপণ্যসহ যেকেনো পণ্য আমাদানিতে দুই সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস লেগে যায়।
ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে রোজার সময়কাল হবে ধরে নিয়ে গত নভেম্বর থেকে সয়াবিন তেল আমদানি শুরু হয়।
জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সেই তেল বাজারে চলে আসার কথা। মিলগুলোর কাছে পরিশোধনের জন্য বর্তমানে যা মজুদ আছে তাও যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আমদানি করা।
মৌলভীবাজারে তীর ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল উৎপাদন ও বাজারজাতকারি সিটি গ্রুপের নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রের কর্মী আনিস আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘বেগম বাজারে আমাদের তেলের সরবরাহে কোনো সমস্যা নেই। চাহিদা মতই দেওয়া যাচ্ছে।’’
এ বিক্রয়কেন্দ্রে খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি করা হয়। ডিলারদের কোনো প্রকার সরবরাহ করা হয় না।
মৌলভীবাজার ঘুড়ে তীর ব্র্যান্ডের ১৬ লিটারের তেলের টিনের ড্রাম দেখা গেলেও বোতলজাত তেলের দেখা মিলেনি খুব একটা।
এ বাজারের মেসার্স জব্বার স্টোরের বিক্রয়কর্মী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘অল্প কিছু বোতল আছে- যা আছে, তা চোখের সামনে। এ কয়টা শেষ হয়ে গেলে আর কবে পাওয়া যাবে তার ঠিক নেই।’’
বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট একইভাবে দেখা গিয়েছে অবস্থা রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজার, কারওয়ান বাজার ও মহাখালী বাজারেও।
সয়াবিন তেলের এই সরবরাহের সমস্যার মধ্যে বাজারে অপ্রচিলত বিভিন্ন ব্রান্ডের সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে কিছু।
কারওয়ান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হানিফ সরদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘আমাদের কোনো সমস্যা নাই। তেল আসলে দিতে পারব। না পাইলে কীভাবে দিব। কারওয়ান বাজারে সব কোম্পানির তেলের ডিলার আছে। টাকা দিয়ে রাখছি, তেলের ট্রাক কবে আসবে তা জানি না। দুই-তিন দিন পর যাও আসে ৫ কার্টুন চাইলে এক কার্টুন দেয়।’’
অন্যদিকে চাহিদার তুলনায় তেলের সরবরাহ যে কম তা জানিয়ে যাত্রাবাড়ীতে ফ্রেশ গ্রুপের সয়াবিন তেলের ডিলার মোহাম্মদ রায়হান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘তেল যে নাই তা বলা যাবে না। এখন মিল যখন দেয় তখন আমরা বিক্রি করি। হয়ত আজকে এক গাড়ি চাইলাম, তিন দিন পরে এক গাড়ি দিল।’’