Published : 09 Apr 2026, 01:29 AM
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আব্দুল খালেকের পরিবার রান্নার জন্য এখন তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ওপর নির্ভরশীল। নিয়মিত এই গ্যাস সংগ্রহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ‘নানা সংকট’ ভোগ করে ত্যাক্ত-বিরক্ত তিনি। এবার তিনি ক্ষিপ্ত সরকারি দরে উল্লম্ফনের পরও বাড়তি দাম দিতে বাধ্য হওয়ায়।
এক লাফে ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ৩৮৭ টাকা বাড়ানোর পরও সরকার নির্ধারিত এ দরে গ্যাস পাচ্ছেন না তিনি। এমনিতেই একবারে এত দাম বাড়ানোতে ক্ষুব্ধ; এর সঙ্গে বিক্রেতাদের একের পর এক অজুহাতে ‘গ্যাস আছে-গ্যাস নেই’ এমন লুকোচুরিতে অসন্তুষ্টির মাত্রা চরমে উঠেছে তার।
বাড়তি দাম নিয়েও ক্ষোভ ঝাড়লেন খালেক। বললেন, এখন তারা যুদ্ধের কারণে সংকটের দোহাই দিচ্ছে। কিন্তু এর অনেক আগে থেকেইতো গ্যাস মিলছিল না। তখন দোকানদার যেমন খুশি তেমন দাম রেখেছে।
“এখন সরকার দাম বাড়ানোর পরও সেই দামে গ্যাস পাচ্ছি না। ১২ কেজির সিলিন্ডার ২১০০-২২০০ টাকার নিচে কোথাও নাই।”
১৭০০ টাকায় ১২ কেজির যে সিলিন্ডার মিলছিল তা সরকার দর বাড়ানোতে আরও বেড়েছে ৪০০-৫০০ টাকা। তাহলে সরকার দাম বাড়াতে গেল কেন প্রশ্ন তার মত আরও অনেকের।
সরবরাহ সংকটের অজুহাতে দাম চড়তে থাকলে সরকার গত ডিসেম্বরে অভিযানে নামলে এলপিজি সিলিন্ডার বাজার থেকে হাওয়া হয়ে যায়, ধর্মঘটেও নামেন বিক্রেতারা। বাধ্য হয়ে অন্তর্বর্তী সরকার অভিযানে ক্ষান্ত দেয়। এ সুযোগে এলপিজির দাম দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যায়। তখন সংকটও তীব্র হয়।
এরপর বাকিতে আমদানির সুযোগ, আমদানির কোটা বাড়ানোসহ সরকারের নানাবিধ প্রণোদনা প্রদান ও পদক্ষেপের পরও এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। তখনও সরকার নির্ধারিত দামে মিলছিল না।
এরমধ্যেই জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বাড়ানো হয় দাম। বাসাবাড়ি ও দোকান-রেস্তোরাঁয় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহও সময় গড়িয়ে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ ভোক্তাপর্যায়ে ছিলই।

সবশেষ গেল বৃহস্পতিবার ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা থেকে এক লাফে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
একই হারে সব সিলিন্ডারের দাম বাড়ার ঘোষণায় মোটাদাগে এক ধাক্কায় প্রতি কেজিতে বাড়ানো হয় ৩২ টাকা ৩০ পয়সা।
তবুও সরকার নির্ধারিত বাড়তি দামের সঙ্গে আরও বাড়তি অর্থ দেওয়ার বোঝা থেকে মুক্তি মেলেনি ভোক্তার। সিলিন্ডারপ্রতি গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত আরো ৪০০-৫০০ টাকা।
এ নিয়ে একেবারে খুচরা বিক্রেতা, খুচরা পর্যায়ে সরবরাহকারী, ডিলার ও কোম্পানিগুলোর ব্ক্তব্যে একদমই মিল নেই। একপক্ষ দায় চাপাচ্ছে আরেক পক্ষের উপর। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসিও যেন উপায়হীন; ভোক্তাদের অভিযোগ ও ক্ষোভের মুখে সব কিছু জেনেও চুপচাপ।
এসব বিষয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বর্তমানে পেট্রোল পাম্পগুলোই সামলানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় এলপিজির বাজার মনিটরিং করাটা তাদের জন্য ‘চ্যালেঞ্জিং’।
তবে আমদানিকারক ও সরবরাহ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে তারা সামনের দিনে পরিস্থিতি ‘সমন্বয় করার চেষ্টা করবেন।’
নতুন দর ১৭২৮ টাকা নির্ধারণের পরও আগে যা পাওয়া যেত ১৭০০ টাকায় সেই সিলিন্ডার ২১০০-২২০০ টাকায় কিনতে হওয়ায় ক্ষুব্ধ মোহাম্মদপুরের ওই বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী খালেক বলেন, “সরকার বলতেছে সংকট নাই, কিনতে গেলে বাড়তির ওপরে আরো বাড়তি দাম। এসব কী সরকার দেখে না? এই দেশটা আসলে চালাচ্ছে কে?”
তার প্রশ্ন, এই যার ‘যেমন খুশি তেমন দাম আদায়ের অরাজকতা’ বন্ধ করতে না পারলে সরকারের দাম নির্ধারণ করারই দরকার কী?
এ নিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, তারা সরকার নির্ধারিত দামে সরবরাহকারীদের থেকে গ্যাস পাচ্ছেন না। বাড়তি দামে কিনতে হওয়ায় ‘বাধ্য হয়েই’ বাড়তিতে বিক্রি করছেন।
এর জবাবে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, কোনো কোম্পানিই নির্ধারিত দামের বাইরে গ্যাস বিক্রি করছে না।
বরাবরের মত তাদের অভিযোগ মধ্যসত্ত্বভোগী তথা ‘ডিলারদের কারসাজিতে’ বাজারের অস্থিরতা কাটছে না।
ডিলারদের কেউ কেউ বাড়তি দাম নেওয়ার কথা অস্বীকার করলেও কেউ কেউ স্বীকার করেছেন এখানে ‘কিছুটা গ্যাপ’ আছে।
‘যেমন খুশি তেমন দাম’
রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়া এলাকার মনিরুল ইসলাম বললেন, ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে বাড়তি দাম দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল না। এখন বাড়তি দাম হলেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
“আমাদের যাদের লাইনের গ্যাস নেই, তাদেরতো এই ঢাকা শহরে এছাড়া কোনো উপায় নাই। দাম দিয়ে হলেও আমাদের গ্যাস নিতেই হচ্ছে। রান্নাবান্না না করেতো আর দিনের পর দিন থাকা যায় না!”
তিনি বলেন, “আমরা একরকম জিম্মি হয়ে পড়েছি। যখন যেমন দাম চাওয়া হচ্ছে সেটিই দিতে বাধ্য হচ্ছি। গত মাসে ১২ কেজির যে সিলিন্ডার ১৫০০-১৬০০ টাকায় নিতে পেরেছি, সেটি এখন ২১০০-২২০০ টাকা। আগেও নির্ধারিত দামের বাইরে বাড়তি টাকা দিতে হয়েছে। এবার দাম বাড়ার সাথে সাথে এক্সট্রা টাকাও বেড়ে গেল।”
একই এলাকার খুচরা পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহকারী ‘আলিফ লাম ট্রেডার্সের’ স্বত্ত্বাধিকারী সাইফুল আলম বললেন, তিনি এখন শুধু পেট্রোম্যাক্সের সিলিন্ডার রিফিল করে দিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে ১২ কেজির দাম পড়বে ২১০০ টাকা।
সরকার নির্ধারিত দামের বাইরে এত টাকা বেশি নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরাই ১৭৭৪-৭৫ টাকা দিয়ে কিনে আনছি। এরসাথে আনার ভাড়াসহ যোগ করলে আমরা এই দাম না রাখলে পোষাইতে পারতেছি না।”
মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডে মমতাজ বেগমের চায়ের দোকানে একটি সিলিন্ডারে চুলা জ্বলছিল, আরেকটি আগেই এনে রেখে দেওয়া হয়েছে।
১২ কেজির সিলিন্ডার কত করে কিনেছেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “২১০০ করে নিছি। তাও বাকিতে দিব না। খাড়ায়া থাইকা নগদ টাকা লইয়া যায়।”
কৃষিমার্কেট এলাকার খুচরা গ্যাস বিক্রেতা ‘এনাম এন্টারপ্রাইজের’ মালিক এনামুল হক বলেন, তিনি বসুন্ধরার ১২ কেজির সিলিন্ডার ২২০০ করে বিক্রি করছেন। অন্যগুলো ২০০০ করে দিচ্ছেন।
বাড়তি দামের কারণ হিসেবে তারও একই কথা। বললেন, “সরকার যে দাম দিছে সেই দামেতো আমরাই কিনতে পারি না। এখন আমি যেমন দামে কিনমু, তেমনইতো বেচমু।”
শ্যামলী এলাকার ‘মেসার্স বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজের’ স্বত্ত্বাধিকারী জহিরুল ইসলাম দামের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে উল্টো সরকারের ওপর ক্ষোভ ঝাড়লেন।
“সরকার কতো কথাই কয়। সরকারকে বলেন, ‘আমারে কম দামে দিতে’। আমি চ্যালেঞ্জ করলাম, আমার কাছে সব ভাউচার আছে। আইসা দেখুক আমি কতো দামে কিনছি, কতো দামে বিক্রি করতেছি।”
ফোন করলেই বাসায় সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া এই দোকানি ‘টোটাল গ্যাসের’ ১২ কেজির সিলিন্ডার সরবরাহ করেন ২১০০ টাকায়।
এসব বিক্রেতা বাড়তি দামে কেনার যে যুক্তি দিচ্ছেন, সেটির প্রমাণ মিলল ডিলার পর্যায়েও।

যমুনা গ্যাসের ঢাকার ডেমরা এলাকার এক ডিলার দাম নিয়ে জানতে চাইলেই কিছুটা চুপ হয়ে যান। পরক্ষণে তিনি বলেন, “এভাবে দাম বলতে গেলেতো সমস্যা, এখন সিচ্যুয়েশনটা খারাপ।”
বাড়তি দাম রাখার বিষয়ে প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে চাননি তিনি, নামও প্রকাশ করতে চাননি। পরে একপর্যায়ে এই ডিলার বলেন, “সরকারি রেটই আমাদের রেট।”
বিএম এলপিজি গ্যাসের মুন্সীগঞ্জ এলাকার প্রতিনিধি অসীম রায় বললেন, তারা সরকার নির্ধারিত দামই রাখছেন। তবে এরসঙ্গে পরিবহন খরচ মিলে খুচরা বিক্রেতারা কিছুটা বাড়তি দাম রাখছেন।
ডিলার পর্যায়ের দামতো খুচরার চেয়ে কম হওয়ার কথা- সেই প্রশ্নে তিনি স্বীকার করেন, “এখানে একটু গ্যাপ আছে।
“আমরাতো রুট লেভেলে কাজ করছি। কোম্পানির সাথে ডিস্ট্রিবিউটরদের একটা গ্যাপ আছে সে কারণে আমরা সরকার নির্ধারিত দামেই দিচ্ছি। কিন্তু তারা আবার খরচ যোগ করে গ্রাহকের কাছে সরবারহ করতে গিয়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে।”
বাড়তি দামের কারণ এবং বাজারের এই অসামঞ্জস্যতার বিষয়ে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক এককথায় বলেন, “কোনো কোম্পানি এক টাকাও বাড়তি দাম নিচ্ছে না।
“১৭টা কারখানায় সরকার গিয়ে দেখুক কেউ বাড়তি নিচ্ছে কি না। কেউ বেআইনি কাজ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক। কিন্তু কোনো কোম্পানিই বাড়তি দাম নিচ্ছে না।”
এমনকি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও কমে ডিলারদের জন্য ‘ইনবিল্ট কমিশন’ রেখেই কোম্পানিগুলো গ্যাস সরবারহ করছে বলে দাবি করেন তিনি; যাতে সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করলেও ডিলারদে লাভ থাকে।
ডেল্টা এলপিজি লিমিটেডের এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাঠপর্যায়ে মনিটরিংয়ের অভাবে এমন অবস্থা হয়েছে মন্তব্য করে বলেন, “ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর আছে। একেবারে রুট লেভেলে ইউএনও আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোথায়? যে ডিলার বলছে, বাড়তি দামে নিচ্ছে, তাদের কাছেতো ইনভয়েজ থাকবে। তারা সেটি দেখুক। ৫ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক, তাহলেই দেখবেন বাকিরা ঠিক হয়ে যাচ্ছে।”
সারাদেশে এলপিজি গ্যাস বিক্রির অন্তত ১৫-১৬ হাজার খুচরা দোকানি এবং দুই শতাধিক ডিলার থাকার তথ্য দেন তিনি।
যতদিন বাজারে এই ডিলার তথা মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, ততদিন বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
তিনি বলেন, “সংকটের সুযোগ যারা নিচ্ছে, তাদের জন্য অ্যাকশন নেই। যারা মজুদ করতেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। একটু অ্যাকশান নিক, ঠিক হয়ে যাবে।”
বিইআরসির তথ্য বলছে, এলপিজির জন্য বাংলাদেশকে প্রায় শতভাগ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশে বর্তমানে মাসপ্রতি ১ লাখ ২০-৩০ হাজার টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। গত বছর ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন আমদানি হয়েছিল।
বসুন্ধরা এলপিজি গ্যাসের অর্ডার পয়েন্টের নম্বরে যোগাযোগ করলে কোম্পানিটির একজন প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করে জানান, তারা ১২ কেজির এলপিজি গ্যাস ১৮২০ টাকায় দিচ্ছেন।
সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি কেন রাখা হচ্ছে জানতে চাইলে তার ভাষ্য, বাকিটা তাদের ‘ডেলিভারি চার্জ’। তবে তাদের এই ‘হোম ডেলিভারি’ শুধু বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
অন্যান্য এলাকায় খুচরা দোকানীদের কাছ থেকে বাড়তি দাম নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “রিটেইলারদের কাছ থেকে কিনে তারা খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করেন, সেজন্য দাম বেশি রাখে।”
ইউনিভার্সাল এলপি গ্যাসের হেড অব সেলস জসীম উদ্দীন বাহারের দাবি কোম্পানি থেকে বাড়তি দাম রাখা হচ্ছে না।
খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামের বিষয়ে তার ভাষ্য, “এটা আমরা জানি না, রিটেইলাররা বলতে পারবে।
“সরকারের নির্ধারিত দামটা আমরা মেনটেইন করি। মার্কেটে কমপিটিশনের কারণে অনেক সময় আমরা নির্ধারিত দামের চেয়ে কমও রাখি। এরপরে খুচরা পর্যায়ে কেন দাম বেশি রাখা হচ্ছে সেটার কারণ জানতে গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করতে হবে- আমরা বলতে পারব না।”
কোম্পানি থেকেই যদি সরকার নির্ধারিত দাম রাখা হয় তাহলে খুচরা পর্যায়ে লাভ এবং খরচ যোগ করে দামটা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায় কিনা- এমন প্রশ্নে এই কর্মকর্তা এক শ্রেণির সিন্ডিকেটের দিকে আঙ্গুল তোলেন।
তিনি বলেন, “সরকার থেকে সব পর্যায়ে সঠিকভাবে মনিটরিংটা করতে হবে, তাহলেই বাজারটা অস্থিতিশীল হয় না।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, গণশুনানির মাধ্যমে দাম নির্ধারণ করার কথা থাকলেও সেটি করছে না বিইআরসি। গণশুনানি বাদেই নিয়মিত দাম নির্ধারণ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থাই নিজেই অপরাধ করছে। আবার বিইআরসির ‘নিষ্ক্রিয়তায়’ লাইসেন্সিরা অপরাধ করছে।
তার প্রশ্ন, “যে আইনে বিইআরসির জন্ম হইছে, যে আইনে তার পরিচালিত হওয়ার কথা, সেই আইন নিজেই যদি লঙ্ঘন করে তাহলে এই খাত চলে?”
২০২১ সালে আদালত বিইআরসিকে গণশুনানি করে এলপিজির দাম নির্ধারণের আদেশ দিয়েছিল। সেই প্রসঙ্গ টেনে শামসুল আলম বলেন, “গণশুনানি করে দাম নির্ধারণের কথা ছিল বিইআরসির, এটা তারা করে না। প্রতিমাসেই তারা বেআইনিভাবে করে যাচ্ছে, এবারও গণশুনানির মাধ্যমে করেনি। যদি আইনই না মানে তাহলে এই দাম যৌক্তিক হবে কীভাবে? দাম যদি ৩০০ টাকা কমও হতো, তাতেও ন্যায্যতা থাকে না।

“বেআইনি জিনিস যদি আপনালে লাভবানও করে, সে আল্টিমেটলি তার কারণে আপনাকে ক্ষতিগ্রস্থই হতে হবে। যেভাবে মূল্য নির্ধারণ হচ্ছে এটা কোনভাবে ন্যায্য বা যৌক্তিক হতে পারে না।”
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইনের ৪২ ধারা অনুযায়ী আইন না মানলে অনধিক ৩ বছরের জেল বা অন্যুন ৫ হাজার টাকার অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আর ৪৩ ধারায় বিইআরসির কোন আদেশ বা নির্দেশ পালন করিতে অস্বীকার করলে বা ব্যর্থ হলে অনধিক ৩ মাসের কারাদণ্ড বা অন্যূন ২ হাজার টাকার অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে কথা বলা আছে।
আইনের কথা মনে করিয়ে এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, “বিইআরসির আদেশ না মানা, আইন বা বিধান না মানা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইন না মেনে বিইআরসি নিজেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে। আবার বিইআরসির আদেশ না মেনে লাইসেন্সিরা অপরাধ করছে।
“রিটেইলার, পাইকারি বিক্রেতা, স্টোরেজ যারা করে এই তিন ধরনের লাইসেন্সি রয়েছে। আমদানির জন্য আলাদা লাইসেন্স আছে। অন্যদেরকে এমন কোনো কাজ করার জন্য বিইআরসি লাইসেন্স ইস্যু করেনি। এখন যারা আইন মানতেছে না, লাইসেন্সবিহীন লোকদের দিয়ে বিক্রি করাচ্ছে, তাহলে সবই বেআইনি হচ্ছে। আবার নির্ধারিত দামের বেশি নিচ্ছে সেটাও বেআইনি।”
শামসুল আলমের ভাষ্য, এত অপরাধের পরেও বিইআরসির তরফে শাস্তি দেওয়ার কোন উদ্যোগ নাই। বিআরসির নিস্ক্রিয়তা এভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে লাইসেন্সিদের এবং ব্যবসায়ীদের। এ কারণে বাজারের অস্থির অবস্থা।
তার মতে, বিইআরসি লাইসেন্স বাতিল করে দণ্ড দিলে এমনটা হত না।
উল্টো তাদের প্রশ্রয়-আশ্রয় দিচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে এলপিজিকে অসাধু ব্যবসায় পরিণত করেছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদও স্বীকার করেছেন, বাজারের এই নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থার কথা।
বলেন, “আমদানিকারকরা বলতেছে তাদের ট্রেড বেড়ে গেছে। ডিলাররা বলতেছে বেশি দাম নিচ্ছে। এরপরে ট্রান্সপোর্টেশনের পরে বাড়তি দাম নেওয়া ছাড়া তাদের উপায় নেই।”
সরবরাহকারী বা ডিলারদের অভিযোগের বিষয়ে উৎপাদন বা বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আগামীতে বসার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, চলতি এপ্রিল মাসটা তাদের কিছুটা ‘সংকট যাবে’, সামনে সবপক্ষের সঙ্গে বসে তারা বিষয়টি সমন্বয় করার ‘চেষ্টা করবেন’।
নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করার অনুরোধ অপারেটরদের
এলপিজির দামে লাফ, ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ৩৮৭ টাকা
১২ কেজি এলপিজির দাম কমল ১৫ টাকা
অভিযানের মুখে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা
বেশি দামে এলপিজি বিক্রি, ফের প্রশাসনকে মাঠে নামাতে চান বাণিজ্যমন্ত্রী
এলপিজির শুল্ক-ভ্যাট কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি