Published : 14 Jan 2026, 12:13 AM
রাজধানীর কাজীপাড়ার বাসিন্দা সাইমুন নাহার পারুমা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসে (এলপিজি) রান্না করেন। সাধারণত সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হলে ডিলারের লোক এসেই দিয়ে যায়। সেদিন শেষ হল রাতের বেলা। সঙ্গে সঙ্গেই যোগাযোগ করলেন। সেই রাতে আর মিলল না। অন্য সময় ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার চলে আসে বাসায়।
পারুমা শনিবার রাতের ওই ঘটনা তুলে ধরে বলেন, স্থানীয় সেই ডিলারের কাছ থেকে গ্যাস না পেয়ে তারা সকালে খোঁজ নিলেন আশপাশের এলাকাতে। কোথাও এলপিজি সিলিন্ডার না পেয়ে অবশেষে গেলেন ক্রোকারিজের দোকানে; কিনলেন ইনডাকশন চুলা।
গ্যাসের চুলা জ্বালাতে না পেরে বিকল্প হিসেবে রোববার থেকে বৈদ্যুতিক চুলাই হয়ে উঠল এ গৃহকর্ত্রীর ভরসা। বলছিলেন, বাসায় তার দুই শিশু সন্তান রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্করা রান্না না হলে প্রয়োজনে বাইরে খেয়ে নিতে পারলেও বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তেমন সুযোগ নেই।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “সিলিন্ডার শেষ হয়ে যাওয়ায় আমরা আশপাশের এলাকা থেকে বাড়তি দামেও নিতে চেয়েছি। কিন্তু না পেয়ে ইনডাকশন কিনে নিয়েছি। সেখানে গিয়েও দেখি বাড়তি দাম। ৩৫০০-৩৬০০ টাকার ইনডাকশন ৪২০০ টাকা দিয়ে কিনেছি। দোকানদারই বলেছে, প্রায় সবগুলোর দামই অন্তত ৫০০ টাকা করে বেড়েছে।”
সরবরাহ কমের কারণে রান্নার কাজে ব্যবহার হওয়া এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে সংকট চলছে এক মাসের বেশি সময় ধরে। পরিমাণভেদে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৩৫০ থেকে হাজার টাকারও বেশি বেড়েছে।
সংকটের বিষয়টি সামনে আসার পর শুল্কে ছাড়, আমদানি সহজ করতে বাকিতে আমদানির সুযোগ, আমদানির কোটা বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। তবে খুব শিগগির সংকট কাটার আভাস মিলছে না।

সরকার এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও সেই দরে বাজারে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। এখন বাড়তি দামেও চাহিদার সময় পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এলপিজিনির্ভর রেস্তোরাঁ ও ছোট খাবারের দোকানগুলোও ব্যাপক সঙ্কটের মুখে পড়েছে।
মাসখানেক ধরে শুরু হওয়া সরবরাহ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে গত কয়েকদিনে। সঙ্গে যোগ হয়েছে তিতাস গ্যাসের পাইপলাইনে ফাটলের কারণে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে রাজধানীর একটি বড় অংশে গ্যাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা। রান্নার বিকল্প মাধ্যমের চাহিদা আরও যায় বেড়ে।
এলপিজি না পেয়ে সেই চাপ গিয়ে তখন পড়ে বৈদ্যুতিক চুলার ওপরে। দৈনন্দিন রান্নাবান্নাসহ গৃহস্থলীর কাজ সারতে রাজধানীবাসীর বৈদ্যুতিক চুলা ছাড়া আর তেমন উপায় থাকে না।
পারুমার মত গ্যাসবিহীন নাকাল অবস্থার মুখোমুখি হন রাজধানীর আরেক অংশ মগবাজারের গুলবাগের বাসিন্দা খাদিজা বেগম। তার বাসায় পাইপলাইনের গ্যাস। তবে শীত আসার পর থেকে চাপ কম থাকার পাশাপাশি সপ্তাহ দুয়েক ধরে গ্যাস না থাকার মত অবস্থা তৈরি হলে ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে।
তার ভাষ্য, রাত দেড়টার দিকে কিছুটা গ্যাস পাওয়া যায়, সাড়ে ৩টার মধ্যে আবার পুরোপুরি চলে যায়।

এই গৃহকর্মী বলেন, “দিনের পর দিন এভাবে চলতে না পেরে ৫ হাজার টাকায় একটা ইলেকট্রিক চুলা কিনেছি। কিন্তু এটাতে ঠিকঠাক রান্না করা যায় না, অনেক সময় লাগছে। কিন্তু এছাড়া কোনো উপায়ও নেই।”
তাদের মত নতুন করে বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে থাকা গৃহিণীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় চাহিদা বেড়েছে। এ সুযোগে দামও চড়েছে এমন সব চুলার।
রাজধানীর ক্রোকারিজের দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তাদের বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ। আর হঠাৎ করেই চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিক্রেতারা চুলাপ্রতি দামও বাড়িয়েছেন প্রায় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত।
মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটে ‘জাপান ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক্সের’ স্বত্ত্বাধিকারী সিয়াম বলছিলেন, তার দোকানে বৈদ্যুতিক চুলার বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ। স্বাভাবিক সময়ে মাসে যেখানে দুয়েকটি চুলা বিক্রি হত, সেখানে গত কয়েক সপ্তাহে গড়ে দিনপ্রতি ২-৩টি বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, “গ্যাস নাই, তাই অনেকে ইলেকট্রিক চুলা কিনতেছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আমাদেরকেও কিছু কিছু ব্র্যান্ডের প্রোডাক্ট বাড়তি দামে আনতে হচ্ছে। সেজন্য দামও কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু ৩৫০০-৪৫০০ টাকার মধ্যেই চুলা পাওয়া যাচ্ছে।”
বাজারে ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড, এই দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। এর মধ্যে সব ধরনের হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহারের সুবিধা থাকায় ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা বেশি, দামও একটু বেশি বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
এর বিপরীতে ইনডাকশন চুলায় সব ধরনের হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করা যায় না, শুধুমাত্র চুম্বকীয় তলযুক্ত পাত্র (যেমন-কাস্ট আয়রন, নির্দিষ্ট স্টেইনলেস স্টিল) প্রয়োজন পড়ে। তবে এ ধরনের চুলায় তাপের অপচয় কম হয় বলে সেটি বেশি বিদ্যুৎসাশ্রয়ী।
ইনডাকশন চুলা সরাসরি তাপ তৈরি করে না; এটি তড়িৎ চুম্বকীয় আবেশ নীতিতে কাজ করে। চুলার ভেতরের তামার কয়েল বিদ্যুৎ প্রবাহে পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করে। এতে পাত্রের তলদেশে ঘূর্ণিয়মান তড়িৎ প্রবাহ তৈরি হয়। ফলে তাপ সরাসরি পাত্রেই তৈরি হয় এবং চুলার কাচের উপরিভাগ তুলনামূলকভাবে গরম হয় না।

অন্যদিকে ইনফ্রারেড চুলায় হ্যালোজেন বা ইনফ্রারেড হিটারের মত শক্তিশালী হিটিং উপকরণ সরাসরি তাপ উৎপন্ন করে। এই উপকরণ গরম হয়ে ইনফ্রারেড বিকিরণ ছড়ায়, যা পাত্রকে গরম করে। এটি মূলত পুরোনো ইলেকট্রিক কয়েল চুলার আধুনিক রূপ, যেখানে তাপ সরাসরি স্থানান্তরিত হয়। ফলে চুলা চালু হলে উপরিভাগের কাঁচের প্লেট লাল হয়ে যায় এবং সেখান থেকেই তাপ বিকিরণ ঘটে।
কৃষি মার্কেটের লুবনা ক্রোকারিজের কর্মী তানভীর বলেন, “ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড দুই ধরনের চুলাই চলছে, যে যেটা পছন্দ করছে। তবে যেকোন ধরনের পাত্র ব্যবহার করা যায় বলে ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা একটু বেশি। ইনডাকশন চুলায় পাতিল দিলে চালু হয় আবার সরিয়ে ফেললে অটো বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে এটাতে বিদ্যুৎ খরচ সাধারণত কম হয়।”
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ালটন, ভিশন, ভিগো, কিয়াম, গাজী, মিয়াকো, ফিলিপস বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা বেশি বিক্রি হচ্ছে। এর বাইরে নোভা, প্রেস্টিজসহ বেশ কিছু অপরিচিত ও নন-ব্র্যান্ডের চাইনিজ বৈদ্যুতিক চুলাও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
নন-ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা রাজধানীর গুলিস্তানে স্টেডিয়াম মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকার মার্কেটগুলোতে পাওয়া যায়। ব্র্যান্ডের চুলাও সেসব দোকানে মিললেও এক্ষেত্রে বিশেষ করে চেইনশপগুলোই গ্রাহকদের কাছে তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য।
বিক্রেতারা বলছেন, ইনফ্রারেড চুলার দাম কিছুটা বেশি। তবে দুটোই মোটামুটি সাড়ে তিন হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা দামে কেনা যাচ্ছে। এখন চাহিদা বেশি থাকায় পরিচিত ব্র্যান্ডের চুলার কাছাকাছি দামেই নন-ব্র্যান্ডের চুলাগুলো বিক্রি করছেন বিক্রেতারা।

পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন দোকানে চুলার দাম কিছুটা বাড়লেও চেইনশপগুলোতে তাদের পণ্য আগের দামেই পাওয়া যাচ্ছে।
‘ওয়েলবার্গ’ নামে একটি হোম অ্যাপ্লায়েন্সের চেইন শপের কর্মী ফাহাদ বলেন, “আমাদের সবগুলো শো-রুম সেন্ট্রালি এক জায়গা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয় বলে আমাদের সবখানে একই দাম বা আগের দামই রয়েছে।”
তবে বর্তমান যোগান শেষ হলে নতুন পণ্য এলে দাম কিছুটা বেড়ে যাওয়ার আভাস দিলেন ফাহাদ। বলেন, “এখন যেই ইনডাকশন ৩৫০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে, কোম্পানি বলেছে নতুন চালানে সেটির দাম ৪২৯০ টাকা হবে।”
বিভিন্ন বাজার ও চেইনশপগুলোর পাশাপাশি বিক্রি বাড়ার কথা বলেছে কোম্পানিগুলোও। দেশে ভিশন ও ভিগো ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা প্রস্তুত ও বাজারজাত করে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।
গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তৌহিদুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে বলেছেন, সম্প্রতি তাদের বৈদ্যুতিক চুলার বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ ভাগ বেড়েছে।
বিক্রি বাড়লেও দাম বাড়েনি দাবি করে তিনি বলেন, “গ্যাসের ক্রাইসিসের কারণে আমাদের চুলার চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু আমাদের ক্যাপাসিটি থাকায় বাজারে আমাদের পণ্যের যোগান স্বাভাবিক আছে। দাম আগের মতোই সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার হাজারের মধ্যে আছে।”