Published : 08 Jan 2026, 05:00 PM
রাজধানীসহ দেশজুড়ে দিনভর ভোগান্তির পর তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবসায়ীদের ডাকা ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সরকারের তরফে দাবি পূরণের আশ্বাসে বৃহস্পতিবার বিকালে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি সেলিম খান ধর্মঘট তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেন।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সঙ্গে বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বিইআরসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। আমাদের যেসব দাবি ছিল, সেগুলো তিনি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এ কারণে আমরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছি।”
দেশজুড়ে অভিযান ও জরিমানার প্রেক্ষাপটে বুধবার রাতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার থেকে তারা এ কর্মসূচি পালনের অংশ হিসেবে দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সব কোম্পানির প্লান্ট থেকে এলপিজি উত্তোলনও বন্ধ রাখার কথা বলেছিল।
সমিতির তরফে রাতের ঘোষণার পর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা বিক্রেতারা পুরোদমে বিক্রি বন্ধ করে দেন।
আগে থেকে চলতে থাকা সংকটের কারণে এমনিতেই এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছিল কম। কোথাও পাওয়া গেলেও দিতে হচ্ছিল অনেক বেশি দাম।
এর মধ্যে সকাল থেকে একেবারে বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলে যাদের গ্যাস শেষ হয়ে গেয়েছিল তারা পড়েন বিপাকে। ডিলার পয়েন্টগুলো খোলেনি। রাজধানীর অনেক বাসিন্দার বাসায় চুলা না জ্বলায় দোকান থেকে খাবার কিনে আনতে হয়।

ধর্মঘটের এ সুযোগও কোনো কোনো এলাকার খুচরা বিক্রেতাদের নিতে দেখা যায়। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম কেউ কেউ রাখেন দুই হাজার টাকার বেশি। রাজধানীর ডেমরার সারুলিয়া এলাকায় ২০৫০ টাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনে নিয়ে যেতে দেখা যায় দুই কিশোরকে।
এলপিজি ব্যবসায়ীদের দোকান বন্ধ রাখার মত কঠোর কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে সরকারও দিনের প্রথম ভাগে তৎপর হয়। এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আলোচনার জন্য সমিতির নেতাদের ডেকে পাঠায়।
আরেকদিকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানিতে ভ্যাট ১০ শতাংশ নির্ধারণ এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট-ট্যাক্স অব্যাহতির সুপারিশ করে।
এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দেওয়ার কথাও জানানো হয়।
সরবরাহ সংকট, কারসাজির অভিযোগ এবং বিভিন্ন স্থানে অভিযানের মধ্যে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো ‘এলপি গ্যাস আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও ট্যাক্স পুনর্নির্ধারণ’ শীর্ষক চিঠিতে বলা হয়, দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে আমদানি করা হয়, যা শিল্পখাত ও গৃহস্থালি–উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণত শীতকালে বিশ্ববাজারে ও দেশে এলপি গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বাড়ে।
এর আগে ধর্মঘট ডাকার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি সেলিম খান সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, ২৭টি কোম্পানি সাড়ে পাঁচ কোটি সিলিন্ডার বাজারজাত করছে। এর মধ্যে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল (পুনরায় গ্যাস ভরা) হচ্ছে। অবশিষ্ট ৪ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার খালি পড়ে আছে। এতে ডিলারদের খরচও বেড়ে গেছে। বিনিয়োগ আটকে আছে।
তার অভিযোগ, মূলত দুটো কোম্পানি বাজারে সিলিন্ডার না ছাড়াতে এই সংকট তৈরি হয়।
প্রতি মাসে এলপিজির মূল্য সমন্বয় করে বিইআরসি। গত ডিসেম্বরের পর সর্বশেষ ৪ জানুয়ারি নতুন মূল্য ঘোষণা করে কমিশন। তখন ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা, অটোগ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ২ টাকা ৪৮ পয়সা বাড়িয়ে ৫৯ টাকা ৮০ পয়সা ঠিক করা হয়।
এ দাম যথাযথ নয় বলে দাবি করে আসছেন সরবরাহকারী ও ডিলাররা। যেকারণে কখনই সরকার নির্ধারিত দরে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। আগে সবসময়ই ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হত। এবার সরবরাহ সংকটের অজুহাতে ১২ কেজির সেই সিলিন্ডারই বিক্রি করা হচ্ছে ২০০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত।

দিনভর দুর্ভোগ
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিজস্ব প্রতিবেদক শেখ আবু তালেব রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে এলপিজি সিলিন্ডারের দোকান ও সরবরাহ বন্ধ রাখায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গ্রাহকদের ভোগান্তি দেখতে পেয়েছেন।
রাজধানীর শনির আখাড়া এলাকার বাসিন্দা সুমন হাওলাদার সকাল থেকে হন্য হয়ে একটি সিলিন্ডার পেতে ঘুরছিলেন। গ্যাসের একটি সিলিন্ডার পেতে নিজ বাসা থেকে ৫ কিলিমিটার দূরে ডেমরার কোনাপাড়া গিয়েও ফেরত এসেছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘ভাই হঠাৎ কইরা বন্ধ করলে হইবো? আমাগো বাসায় তো কোনো গ্যাসের লাইন নাই। সিলিন্ডার দিয়া চলি। আইজকে না হয় কোনো মতে চললাম, কাইল-পরশু কি হইবো। হোটেলে কয়দিন খামু?
‘‘এলাকায় কারো কাছে সিলিন্ডার নাই। যারে চিনি তারা ফোন ধরে না। এভাবে চললে তো সংসারেও অশান্তি বাড়বে।’’
দীর্ঘদিন ধরে গৃহস্থালী পর্যায়ে গ্যাস সংযোগ না থাকায় রাঝধানীর অনেক বহুতল আবাসিক ভবনের বাসিন্দা পুরোপুরি সিলিন্ডার গ্যাস নির্ভর।
প্রতিদিন রাতে বা সকালে কোনো না কোনো বাসায় গ্যাসের সিলিন্ডার শূন্য হয়।
নিজ দায়িত্বে কোম্পানি ও সরবরাহকারীর প্রতিনিধিরা এসে রিফিল করা সিলিন্ডার দিয়ে শূন্যগুলো নিয়ে যায়।
এরকম গ্রাহকের কথা চিন্তা করেই রাজধানীতে এলাকাভেদে ছোট ছোট সরবরাহকারী তৈরি হয়। তারা বাসাবাড়িতে সিলিন্ডার পৌঁছে দিয়ে আসেন।
তাদের মতই যাত্রাবাড়ীর ধলপুড়ের শফিকুল আলম সকাল থেকে কোনো গ্যাস সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে না পারায় মোবাইলে আসা কোনো গ্রাহকের কলই ধরছেন না।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘কল আসলে দেহি, নম্বরটা কার। কাউরেই তো সিলিন্ডার দিতে পারুম না। দুইটা আছিল, সকালে এক বাসায় দিয়া দিলাম। আগে তো জানতাম না বন্ধ হইবো।’’
সকাল ১০টার দিকে লোকমুখে শুনেছেন বৃহস্পতিবার সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ। মূলত তখন থেকেই ফোন আসার পরিমাণ বেড়ে গেছে।
আশপাশের কয়েকজন ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে না পারার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘আগে জানলে বেশি করে আনতাম। এখন পাবলিকে কয় দাম সমস্যা না, সিলিন্ডার পাইলেই হয়।’’
আরও পড়ুন
এলপি গ্যাসে ভ্যাট কমানোর সুপারিশ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের