Published : 23 Mar 2026, 10:33 PM
সরবরাহ সংকটে রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে দিন-রাত গাড়ির দীর্ঘ সারি আরও দীর্ঘ হচ্ছে। তেল না পেয়ে ফিরেও যেতে হচ্ছে অনেক গাড়ি চালককে। পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্পের কর্মীরা। তেল নিতে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে শোরগোল, কথা কাটাকাটির মত ঘটনা ঘটছে প্রায়ই।
ঈদের দুদিন পর সোমবারও দিনের বেলা ও সন্ধ্যায় রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে ছিল দীর্ঘ লাইন। মোটরসাইকেল ও গাড়ি চালকদের লাইন ধরে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। আগের দিন গভীর রাতেও ছিল একই চিত্র।
অকটেন ও পেট্রোল না থাকায় কয়েকটি ফিলিং স্টেশন বন্ধও থাকতে দেখা গেছে। এরমধ্যে বঙ্গভবনের পাশের পূর্নিমা ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। দৈনিক বাংলা মোড়ের কাছে নাভানা সিএনজি স্টেশনে শুধু ডিজেল দেওয়া হচ্ছিল।
ঈদের আগে জ্বালানি তেল দেওয়ার ক্ষেত্রে রেশনিং তুলে দেওয়ার পর পরিস্থিতির একটু উন্নতি হলেও ঈদের দিন রাতে থেকেই তা আরও নাজুক হয়ে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতির কারণ হিসেবে পেট্রোল পাম্পগুলোর তরফে চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সংকট আরও বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় ক্রেতারাও অতিরিক্ত তেল কিনছেন। এতে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ফারাক তৈরি হচ্ছে।
বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পের ব্যবস্থাপকরা বলছেন, ঈদের ছুটিতে দুদিন ডিপো বন্ধ থাকায় তেল সরবরাহে টান পড়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে তেল নিতে আসায় চালকদের সঙ্গে নিয়মিত হট্টগোল হওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।
সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান রতন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘আমার পাম্পের ট্যাংকির ধারণক্ষমতা সাড়ে ৪ হাজার লিটার করে। পেট্টোল ও অকটেন দুটোই ডিলার দিচ্ছে ৩ হাজার লিটার করে। এতে করেতো লোকসান। পুরোটা দিলেতো আমিও দিতে পারতাম।’’
তেল নিতে আসা চালকদের সামলাতে হিমশিম খাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘অনেকেই সিরিয়াল মানছে না। সেখানেই তর্কাতর্কি থেকে হাতাহাতি পর্যন্ত হচ্ছে। তেল না থাকলে ট্যাংকি খুলে দেখাতে হচ্ছে। এজন্য প্রতিটি পাম্পে নিরাপত্তা দিতে সরকারকে পুলিশ ও আনসার দিতে হবে। নইলে কর্মচারিরা পাম্প চালাতে পারবে না।’’

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে এমন প্রস্তুতিতে সরকার রেশনিং শুরু করে। পরে সেই রেশনিংও তুলে নেওয়া হয়।
তবে পাম্প মালিকরা বলছেন, এখন সরবরাহকারী সরকারি কোম্পানি থেকেই বরাদ্দের চেয়ে ১০ শতাংশ কম দেওয়া হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর শঙ্কা থেকে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলেও পেট্রোল ও অকটেনের সিংহভাগ দেশে উৎপাদিত হওয়ায় সামনে সংকট দেখছে না সরকার। বাড়তি এ চাহিদা বজায় থাকলে উৎপাদন বাড়িয়ে তা মেটানোর সক্ষমতা থাকার কথাও বলছে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা দেখভাল করা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
গাড়ির সারি সড়ক ছেড়ে গলিতে
পাম্পের কর্মকর্তরা বলেন, গ্রাহকরা সুযোগ পেলে দিন কয়েক ধরে আগের চেয়ে অনেক বেশি কিনছেন। তার ওপর চাহিদা অনুযায়ী পাম্পে মিলছে না তেল। সঙ্গে যোগ হয়েছে ঈদের ছুটিতে ডিপো বন্ধ থাকার বিষয়টি। এ কারণে ঘণ্টার ঘণ্টার পর দাঁড়িয়ে থেকেও তেল মিলছে না।
রাজধানীর মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, সাতরাস্তা ও মহাখালীর পাম্পগুলোতে দিন কয়েক ধরে দিন-রাত সব সময়ই মোটরসাইকেল ও যানবাহনের দীর্ঘ সারি লেগে থাকতে দেখা গেছে।
কখনও কখনও এ সারি প্রধান সড়ক থেকে গলিপথে ঢুকে পড়ছে। মহাখালীর আমতলী-গুলশান লিংক সড়কে থাকা ক্রিসেন্ট পেট্রোল পাম্প থেকে গাড়ির সারি প্রায় ৫০০ গজ দূরে তিতুমীর কলেজ পর্যন্ত চলে গেছে।
এ পাম্পে তেল নিতে আসা মোটরসাইকেলগুলোর সারি ফুটপাত থেকে ভেতরের গলিতে ঢুকে পড়েছে।
তাদেরই একজন মোহাম্মদ জাবেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘ঈদের সময়ে রাইড শেয়ার বেশি হয়। তেল বেশি লাগে। কিন্তু আয় করার সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।’’
গুলশান থেকে মাইক্রোবাস নিয়ে আসা চালক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘‘এখন তেল সব সময় ট্যাংকি ফুল করে রাখার নির্দেশ। মালিককে নামিয়ে দিলাম গুলশানে। সেখানে বসে না থেকে পাম্পে আসলাম ট্যাংকি ফুল করে রাখতে।’’
আগে তেল শেষের দিকে গেলে পাম্পে আসতেন চালকরা। এখন অর্ধেক হতেই পাম্পে চলে আসছেন।
একই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স পেট্রোল পাম্পে। সেখানে আব্দুল মালেক মৃধা নামের এক চালক বলেন, প্রতিদিন ৫০-৭০ কিলোমিটার চালাতে হয়। আগে একবার ট্যাংকি ফুল নিলে ৭-১০ দিন চলে যেত। এখন ভরসা না থাকায় সুযোগ পেলেই তেল নেন তিনি।
রাতে করিম অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী আব্দুস সালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিকাল ৪টায় তাদের অকটেন শেষ। এখন শুধু ডিজেল দিচ্ছেন তারা।
দিন-রাত চালু থাকা এ স্টেশনে দৈনিক ৩০-৩৫ হাজার লিটার অকটেন চাহিদার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, এখন সেখানে পাচ্ছেন ১৫ থেকে ২০ হাজার লিটার। সোমবার তা কমে ৯ হাজার লিটারে নেমেছে। পরের চালান পেতে পেতে মঙ্গলবার বেলা ১২টা বেজে যেতে পারে।

“সে পর্যন্ত কর্মচারী বসে থাকবে। আমারতো লস, কর্মচারী বসায়া বসায়া বেতন দিতে হচ্ছে।”
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্ট, পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি আবু তৈয়ব পাটোয়ারি বলেন, আগে পাম্প মালিকরা লম্বা ছুটি ও শুক্র-শনিবারের আগে তেল মজুদ করে রাখতেন। কিন্তু ডিপো থেকে রেশনিং করে দেওয়ায় তা করা যাচ্ছে না।
তার ভাষ্য, প্রতিবছর তেলের চাহিদা ১০ শতাংশ করে বাড়ে। কিন্তু এবার পাম্পের চাহিদার বিপরীতে ১০ শতাংশ করে তেল কম দেয়া হচ্ছে ডিপো থেকে।
তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে ট্রাক, কভার্ড ভ্যান, লরি চলাচল কম থাকায় ডিজেলের সংকট সৃষ্টি হয়নি। সামনের সপ্তাহ থেকে পুরোদমে সব চালু হলে তখন বোঝা যাবে কী অবস্থা হয়।
কী করছে বিপিসি
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য জানতে বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘পেট্রোল ও অকটেনের সরবরাহ স্বাভাবিকই ছিল। যুদ্ধ শুরু হলে সতর্কতা হিসেবে আমাদের একটি পরিকল্পনা ঊর্ধ্বতন বিভাগে (মন্ত্রণালয়ে) জানানো হয়। কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। হঠাৎ করেই চাহিদা বেড়ে যায় সবখানে।
‘‘ছোট-বড় যত গাড়ি আছে-সবাই ট্যাংকি ফুল করে তেল নিচ্ছে। হয়ত কোনো গাড়ি রাস্তায় চলে কম, সেও ফুল করে নিয়েছে। এতে চাহিদা বেড়ে গেছে। এই কৃত্রিম চাহিদা না বাড়লে কোনো সমস্যা হত না। হঠাৎ করে চাহিদা বাড়তে পারে, কিন্তু যোগান তো বাড়ানো যায় না। পুরোটা একটা সিস্টেম, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। পরিবহন সক্ষমতাও দেখতে হবে।’’
এখনকার এ চাহিদা কতদিন থাকবে তাও বোঝা যাচ্ছে না তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘‘এখন উৎপাদন বাড়ালাম- এই বাড়তি তেল রাখারতো কোনো জায়গা নেই। ডিপোগুলোও বাড়তি তেল রাখতে পারবে না। আবার এমন না যে, তেল উৎপাদন কমিয়ে দিলাম। কারণ, পেট্টোল ও অকটেনতো বাই প্রডাক্ট।”
চাহিদা এমন থাকলে বাজারে বর্ধিত তেল যোগান দেওয়ার ব্যবস্থা সাজাতে এক মাসের মত সময় লাগার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এজন্য সরকারের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
পাম্পগুলোতে নিয়মিত বরাদ্দের চেয়ে ১০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘‘এটা এক ধরনের ব্যবস্থাপনা। সরকারি অফিস খুললে যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখে নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। কিন্তু তেলের উৎপাদন ও সরবরাহে কোনো সমস্যা এখনো নেই।’’