Published : 06 Jul 2026, 12:13 PM
চামড়া খাতে রপ্তানির তথ্যে আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন রপ্তানিকারক ও বাজার বিশ্লেষকরা, যদিও সাভার চামড়াশিল্প নগরীর পুরনো সমস্যা এখনো রয়েই গেছে।
গেল ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাত থেকে ১২২ কোটি ৬২ লাখ ডলার আয় হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ এবং আগের অর্থবছরের চেয়ে ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ বেশি।
তৈরি পোশাক বাদ দিলে বাংলাদেশ এক বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয় পায় কেবল চামড়া খাত থেকে। কিন্তু এ খাতের অগ্রগতি থামকে আছে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে।
হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সাভারে স্থানান্তরিত হয়েছে ১০ বছর হতে চলল; সেখানে গড়ে উঠেছে চামড়াশিল্প নগরী। কিন্তু তার কোনো সুফল এখনও মিলছে না।
এই চামড়াশিল্প নগরী পূর্ণাঙ্গভাবে প্রস্তুত না হওয়ায় কারখানাগুলোকে মানসনদ দিচ্ছে না আন্তর্জাতিক সংস্থগুলো। সে কারণে এই শিল্পনগরীর কারখানাগুলোতে প্রক্রিয়াজাত করা চমড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করতে গিয়ে জটিলতায় পড়ছেন ব্যবসায়ীরা।
তারা বলছেন, সরকারের যথাযথ নীতি সহায়তা পাওয়া গেলে সাভার শিল্পনগরী পুরোদমে চালু হলে এই খাত থেকে রপ্তানি আয় আরও বাড়ানো সম্ভব।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে রেকর্ড ১২৪ কোটি ৫২ লাখ ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু পরের দুই অর্থ বছরে সেই আয় কমে যায়।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১৭ কোটি ৫৫ লাখ ডলার আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০৩ কোটি ৯১ লাখ আসে।
অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চামড়া খাত কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। সেবার ১১৪ কোটি ৫১ লাখ ডলার আয় হয়; প্রবৃদ্ধি হয় ১০ দশমিক ২০ শতাংশ।
৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও সেই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত ছিল। সবশেষ জুন মাসে চামড়া খাতে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এই মাসে ১২ কোটি ৮৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার আয় হয়েছে। গত বছরের জুনে আয়ের অংক ছিল ৮ কোটি ৭২ লাখ ৫০ হাজার ডলার।

পুরো অর্থবছরে যে ১২২ কোটি ৬২ লাখ ডলার আয় হয়েছে, তার মধ্যে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে ৪০ কোটি ৪ লাখ ১ হাজার ডলার এসেছে, তাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ১৩ শতাংশ।
আর লেদার ফুটওয়্যার বা চামড়ার জুতো রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৬৯ কোটি ১৭ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৩ শতাংশ বেশি।
এছাড়া ১৩ কোটি ৪১ লাখ ৪০ হাজার ডলার এসেছে চামড়া রপ্তানি থেকে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চেয়ে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি।
‘সুযোগ কাজে লাগাতে হবে’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, মূলত তিনটি কারণে চামড়া খাত থেকে আয় বাড়ছে।
প্রথমত, এর পেছনে কাজ করেছে বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের ভূরাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্রে ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর চীনের ওপর পাল্টা শুল্ক বসানোয় মার্কিন আমদানিকারকেরা বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেন। চীন থেকে সরে আসা অর্ডারের একাংশ বাংলাদেশে ঢুকছে। আর এখানেই বাংলাদেশের চামড়া ও জুতাশিল্পের জন্য সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ইউরোপ ও আমেরিকা মূল্যস্ফীতির ধাক্কা কাটিয়ে আমদানি বাড়িয়েছে। আর তৃতীয়ত, রপ্তানির আকার তুলনামূলক ছোট হওয়ায় সামান্য অগ্রগতিও শতাংশের হিসাবে বড় হয়ে ধরা দিচ্ছে।
“এই ইতিবাচক ধারা টেকসই করতে হলে অবকাঠামো ও বন্দর সুবিধা বাড়াতে হবে, দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থা করতে হবে এবং পরিবেশ সনদ অর্জনে মনোযোগ দিতে হবে,” বলেন আব্দুর রাজ্জাক।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, বাংলাদেশের তৈরি চামড়ার জুতা ও চামড়াজাত পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার এখন যুক্তরাষ্ট্র। এখন চামড়া খাত থেকে যে বেশি আয় দেশে আসছে, সেটা মূলত ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণেই।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, “কোভিডের মধ্যেও চীন থেকে অনেক অর্ডার বাংলাদেশে এসেছিল। সবকিছু মিলিয়ে চামড়া খাতে আমরা আশার আলো দেখেছিলাম। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ সব তছনছ করে দিয়েছিল। এখন আবার সেই আলো দেখা দিয়েছে।
“আমাদের চামড়াজাত পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাজার ইউরোপ। যুদ্ধের প্রভাব ইউরোপের দেশগুলোতেই বেশি পড়েছিল। এসব দেশের মানুষকে খাদ্যের পেছনেই অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছিল। সে কারণে তারা জুতাসহ অন্যান্য পণ্য কেনা কমিয়ে দিয়েছিল। তাতে মাঝে দুই বছর আমাদের এ খাতে রপ্তানি কমে গিয়েছিল।”
তিনি বলেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এখন ভারত, ভিয়েতনাম কিংবা ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বাংলাদেশের চামড়া পণ্য কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
“এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আমাদের এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছে। বিশেষ করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসতে পারে।”
তবে সাভারের চামড়াশিল্প নগরীর পরিবেশ নিয়ে ক্রেতারা যে খুশি নন, সে কথাও বলেন শাহীন আহমেদ।
তিনি বলেন, “ওখানকার চামড়া দিয়ে কোনো পণ্য উৎপাদন করলে ক্রেতারা কেনেন না। তাই বাধ্য হয়ে শিল্পনগরীর বাইরে তৃতীয় কোনো কোম্পানি থেকে কাঁচামাল কিনে পণ্য উৎপাদন করেন রপ্তানিকারকরা।”
চামড়া রপ্তানিতে নতুন করে যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সেটা ধরে রাখতে সাভার শিল্পনগরীর পরিবেশ উন্নয়নে সরকার ও ট্যানারি শিল্পমালিকদের জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান এই শিল্পোদ্যোক্তা।
প্রতি বছর চামড়া খাত থেকে যে বিদেশি মুদ্রা দেশে আসে, তার প্রায় ১৫ শতাংশ রপ্তানি করে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার। জার্মানি, ইতালিসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে জুতা রপ্তানি করে তারা। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতেও জুতা রপ্তানি শুরু করছে অ্যাপেক্স।

অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, “সবকিছু মিলিয়ে চামড়া খাতে আমরা আবার আশার আলো দেখছি। নতুন সরকার এসেছে, এখন যদি সাভার শিল্প নগরী পুরোপুরি প্রস্তুত করা হয়; এখানকার কারখানার চামড়া ব্যবহার করে তৈরি করা পণ্য যাতে সব বাজারে রপ্তানি করা যায, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে আমাদের রপ্তানি আরও বাড়বে।”
তিনি বলেন, “আবার একটা সুযোগ এসেছে। সরকার ও বেসরকারি খাত মিলে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।”
বাধা কোথায়?
লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে জুতার বাজারের ৫৫ শতাংশ চীনের দখলে। ভারত ও ভিয়েতনামও ভালো অবস্থানে আছে। আর বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টাদশ। বিশ্বে এ খাতে বাংলাদেশের দখল মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ।
চামড়া খাতকে একসময় সম্ভাবনাময় মনে করা হলেও এটি ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছিল।দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ এই রপ্তানি খাত চতুর্থ-পঞ্চম স্থানে নেমে গিয়েছিল। তবে ২০২১-২২ অর্থ বছরে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছিল।
ঢাকার হাজারীবাগ থেকে চামড়াশিল্প নগরী সাভারে স্থানান্তর নিয়ে দীর্ঘ জটিলতার কারণেই এ শিল্পের এই হাল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে ২০০৩ সালে হাজারীবাগ থেকে চামড়াশিল্প নগরী সাভারে স্থানান্তরে প্রকল্প গ্রহণ করে তৎকালীন সরকার। তিন বছরের মধ্যে প্রকল্প শেষের কথা ছিল। তবে দেড় যুগ শেষ হতে চললেও এই শিল্পনগরী এখনও পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব হয়ে ওঠেনি।
প্রকল্প শেষ না হলেও ২০১৭ সালে উচ্চ আদালত হাজারীবাগের চামড়া কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেয়। ফলে সব কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে বেশ কিছু কারখানার বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ ছিল। এ সনদের সুবাদে তারা জাপান, কোরিয়াসহ ইউরোপ-আমেরিকায় চামড়া রপ্তানি করতে পারত। হাজারীবাগে কারখানা বন্ধ হওয়ায় সেই সনদ ও বিদেশি ক্রেতা হারায় চামড়াশিল্প কারখানাগুলো।

দীর্ঘ সময়েও সাভারের চামড়াশিল্প নগরী পূর্ণাঙ্গভাবে প্রস্তুত না হওয়ায় কারখানাগুলো এখনও এলডব্লিউজির সনদ ফিরে পায়নি। একইসঙ্গে নতুন বাজার সৃষ্টি হয়নি। সনদ না থাকায় জাপান, কোরিয়া বা ইউরোপ-আমেরিকায় এলডব্লিউজির আওতায় চামড়া রপ্তানি করতে পারছে না কারখানাগুলো।
আর এ বিধিনিষেধের কারণে এসব কারখানা থেকে কাঁচামাল নিয়ে পণ্য উৎপাদন করে সে পণ্যও রপ্তানি করতে পারছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো।
বিসিক ও বিডার এক গবেষণায় দেখা গেছে, এলডব্লিউজি সনদ পেতে হলে চামড়াশিল্পের পরিবেশগত মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ১৭টি বিষয়ে ১ হাজার ৭১০ নম্বর পেতে হয়। যার মধ্যে ৩০০ নম্বর রয়েছে সিইটিপিসংক্রান্ত। বাকি ১ হাজার ৪১০ নম্বর রয়েছে জ্বালানি খরচ, পানির ব্যবহার, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, চামড়ার উৎস শনাক্তকরণ, দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার মান ইত্যাদি বিষয়ে। এসব মানদণ্ড পূরণের দায়িত্ব ট্যানারি মালিকদের।
বর্তমানে ১৫ থেকে ২০টি ট্যানারির এলডব্লিউজি সনদের শর্ত পূরণ করার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু তারা অন্যান্য মানদণ্ডে ভালো নম্বর পেলেও সিইটিপিসংক্রান্ত নম্বরে পিছিয়ে রয়েছে, ফলে সনদও মিলছে না। কারণ সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে তরল বর্জ্য, রাসায়নিক ঠিকমত পরিশোধন হচ্ছে না, যা দূষিত করছে আশপাশের নদী ও পরিবেশ।
দেশে এখন পর্যন্ত এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে মাত্র সাতটি কোম্পানি। সেগুলো হল অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, রিফ লেদার, এবিসি লেদার, সুপারেক্স লেদার, সাফ লেদার, সিমোনা ট্যানিং এবং অস্টান লিমিটেড। এগুলোর মধ্যে তিনটি কোম্পানি ফিনিশড লেদার উৎপাদন করে।
তবে সাভারের ট্যানারি পল্লিতে এই সনদ পেয়েছে একমাত্র সিমোনা ট্যানিং। এ কোম্পানি ক্রাস্ট ও ফিনিশড লেদার উৎপাদন করে।