Published : 19 Sep 2025, 10:29 PM
লেখক, গবেষক ও তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমরকে সম্মান আর খ্যাতির মোহ কখনো স্পর্শ করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, “আমরা জানি রাষ্ট্র পুরস্কার দেয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকেও পুরস্কার দেওয়া হয়। বদরুদ্দীন উমর কোনো পুরস্কারই কখনো গ্রহণ করেননি।
“আমরা এটাও দেখি। সংগ্রামের জীবন থেকে অনেকেই বিচ্যুত হন, কিন্তু বদরুদ্দীন বিচ্যুত হননি। তাকে আমরা কখনো হতাশ হতে দেখিনি। তিনি যে পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, সংস্কৃতি পত্রিকা।…সেখানে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলছেন, ‘আমরা একটা হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্যে আমরা বাস করছি’। আবার সেই হতাশায় নিজে ডুবে যাচ্ছেন না। তিনি সেই হতাশার বিপরীতে সংগ্রামের কথা বলছেন। এসব দিক থেকে তিনি অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন।”
৯৪ বছর বয়সে গত ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান বদরুদ্দীন উমর।
শুক্রবার বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে তাকে স্মরণে শোকসভায় কথা বলছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি বলেন, “উমর তার অর্জিত জ্ঞানকে ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ হিসেবে ব্যবহার করেননি। বরং সেই জ্ঞান সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। লেখার মধ্য দিয়ে, রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি তা করেছেন এবং এই কাজে তার কোনো বিরাম ছিল না। এই যে রাজনীতির সঙ্গে জ্ঞানের যে সম্পর্ক, তা বদরুদ্দীন উমরের কাজের মধ্যে আমরা দেখি।”
সাহিত্যিক, পণ্ডিতদের অনেকেই ‘রাজনীতিবিমুখ’ হলেও বদরুদ্দীন উমর তাদের মত ছিলেন না বলে মনে করেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “বদরুদ্দীন উমর একদিকে যেমন জ্ঞান অর্জন করেছেন, আরেকদিকে সেই জ্ঞান তিনি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। কারণ তিনি জানতেন কোনো কিছুই রাজনীতির বাইরে নয়।
“যে রাজনীতি মানুষের মুক্তির কথা বলে, তিনি সেই রাজনীতিই করেছেন। রাজনীতি তিনি উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছিলেন। রাজনৈতিক পরিবারেই তিনি জন্ম নিয়েছেন।”
বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যুতে ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হয়েছে মন্তব্য করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “আমরা এটাও জানি, তিনি সংস্কৃতিকে কত গুরুত্ব দিতেন। বিপ্লবের জন্য যে সংস্কৃতি চর্চার দরকার, সেটা বদরুদ্দীন উমর যেমনভাবে বুঝতেন, কম রাজনীতিবিদই সেভাবে বুঝেছিলেন। সেজন্য তিনি পত্রিকা বের করতেন। তিনি যখন ‘গণশক্তি’ পত্রিকা বের করলেন। সেখানে সংস্কৃতি ব্যাপারটাকেই গুরুত্ব দেওয়া হল।”
শোকসভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “বদরুদ্দীন উমরের যে সংগ্রাম, তা তিনি করে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। কখনো ‘কম্প্রোমাইজ’ করেননি। আজকের রাজনীতি যারা করছি আমরা, অত্যন্ত ছোট বোধ করি তার কাছে। আর যারা নতুন প্রজন্মের তারা বদরুদ্দীন উমর সাহেবের কাছ থেকে কতটুকু নিতে পারছে বা পেরেছে- সেটা আমার ঠিক জানা নেই।

“আজকে যারা বিপ্লব করতে চান, সমাজ বদলাতে চান। সাধারণ মানুষের অবস্থার পরিবর্তন করতে চান। তাদেরকে অবশ্যই সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে, আরো মজবুত করতে হবে এবং বদরুদ্দীন উমরের ভাষায়- ‘মানুষের কাছে চলে যেতে হবে’। তাহলেই সেটা সফল হবে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, “বদরুদ্দীন উমরের রচনার একটা দিক হল ‘ইতিহাস অনুসন্ধান’। সেজন্য ভাষা আন্দোলন থেকে চব্বিশের গণঅভ্যুথান পর্যন্ত, এর মধ্যে কৃষক আন্দোলন আছে, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুথান, মুক্তিযুদ্ধ আছে। এই ইতিহাসকে যদি বুঝতে হয়, তবে বদরুদ্দীন উমরকে পাঠ করতে হবে। এই সময়ে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে হলে বদরুদ্দীন উমরের কাছে যেতে হবে।”
উমরকে নিজের ‘শিক্ষক এবং সহযোদ্ধা’ হিসেবে মনে করেন আনু মুহাম্মদ। শোকসভায় উমরের সঙ্গে প্রথম পরিচয় এবং পরে একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তিনি।
আনু মুহাম্মদ বলেন, “বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থেকে তিনি একটা পর্যায়ে বিপ্লবী রাজনীতির মধ্যে প্রবেশ করেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সেটা থেকে বিচ্যুত হননি। আজকে আমার কাছে মনে হয়, জীবত অবস্থায় উমর যতটা শক্তিশালী ছিলেন। মৃত্যুর পর তার গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পাবে।
“প্রত্যেকটা সমাজে এরকম থাকতে হয়, যিনি দিশারী হিসেবে থাকেন। উমর তেমন একজন।”

তরুণদের ব্যাপারে আনু মুহাম্মদ বলেন, “আজকের দিনে তরুণদের মধ্যে কারো কারো কথায় একটা সুর পাওয়া যায় ‘আগে কিছুই হয়নি। আমরাই নতুন করে সব করব। এর চেয়ে বিপদজনক চিন্তা আর কিছু হতে পারে না।
“আগে যারা কাজ করেছেন, তাদের ব্যাপারে যদি পর্যালোচনা করা না হয়, তাহলে একই ধরনের ভুল আবারো হতে পারে। এজন্য বদরুদ্দীন উমরকে পাঠ করতে হবে। সময়, রাজনীতি, বিশ্ব পরিস্থিতি বুঝতে হলে উমর হল অনিবার্য।”
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “বদরুদ্দীন উমরকে আমি যখন পড়া শুরু করেছি, তখনই আমার কাছে মনে হয়েছে তিনি পণ্ডিত মানুষ। বদরুদ্দীন উমর যে ঘরানা থেকে বড় হয়েছেন, আমি সেই ঘরানার মানুষ নয়। আমার চারপাশের পরিবেশই ছিল বিপ্লবের বিরুদ্ধে কথা বলাটাই রেওয়াজ। যতই বয়স হয়েছে বুঝতে শিখেছি- জ্ঞানবর্জিত রাজনীতি সমাজের কল্যাণ করতে পারে না।”
বদরুদ্দীন উমরকে ‘উজ্জ্বল বাতির’ সঙ্গে তুলনা করে মান্না বলেন, “তিনি সবাইকে বোঝাতে চেয়েছেন, লেখাপড়া করা ছাড়া রাজনীতি করা যাবে না। আমার বেড়ে ওঠার পেছনে বদরুদ্দীন উমরের একটা বড় অবদান আছে। উনার মৃত্যুর পর আমার মনে হয়েছে, সত্যিই অনেক বড় কিছু হারালাম। যিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে সংগঠন করেছেন। একশর বেশি বই লিখেছেন। তিনি লেখক হিসেবে, বুদ্ধিজীবী হিসেবে অসাধারণ সফল।”
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের তরুণ সমাজের মানসিকতা বদলে বদরুদ্দীন উমরের চিন্তা প্রভাব ফেলেছে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন।

শোকসভায় তিনি বলেন, “আমার ধারণা এই প্রভাবটা অনেক দিন থাকবে। উমরের সান্নিধ্যে যারা এসেছেন, তারা অত্যন্ত মেধাবী এবং তীক্ষ্ণ চিন্তার অধিকারী। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন চিন্তা এবং মানসিকতার বদলে আমরা আরো অনেক দিন বদরুদ্দীন উমরের চিন্তা দেখতে পাব।”
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) উপদেষ্টা খালিকুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, “কমরেড বদরুদ্দীন উমর সুবিধাবাদের পথে হাঁটেননি। তিনি আজীবন বিপ্লবের পথে হেঁটেছেন।”
সভায় সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, “পাণ্ডিত্য এবং ব্যক্তিত্বের অপূর্ব সমন্বয়ের এক উজ্জ্বল উদাহরণ বদরুদ্দীন উমর। তিনি কাজের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকবেন।”
শোকসভায় পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন বদরুদ্দীন উমরের মেয়ে সারা আখতার বানু।
তিনি বলেন, “বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন, তার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করে গেছেন। ৯৩ বছর বয়সেও সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে তিনি বিশ্লেষণের ক্ষমতা রাখতেন। শেষের বছরগুলোতে তার শ্রবণশক্তির সমস্যা হচ্ছিল। আমাদের দেশের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানদের তিনি সমালোচনা করেছেন। তিনি কখনোই লুটেরা, ফ্যাসিস্ট কাঠামোকে সমর্থন করেননি।”
সভায় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কমরেড সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের রাশেদ খানও বক্তব্য দেন।
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফয়জুল হাকিম লালার সঞ্চালনায় শোকসভায় বাংলাদেশ কৃষক ও গ্রামীণ মজুর ফেডারেশনসহ একাধিক সংগঠনের নেতারাও কথা বলেন।