Published : 29 Aug 2025, 02:30 PM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ‘ইতিহাসের সেরা ভোট’ উপহার দেওয়ার প্রত্যয় রাখলেও এবারই ‘সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি’ দেখছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
শুক্রবার নির্বাচনি কর্মকর্তাদের এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন, এতে কোনো সন্দেহ নেই।”
আর নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ‘বিতর্কিত ভোটের’ জন্য ওই সময়ের দুই সিইসির জেলে যাওয়া এবং ‘জুতার মালা’ পাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে বলেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের ‘নৈতিকতা, পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার’ সঙ্গে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন।
এদিন আগারগাঁওয়ের নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটে (ইটিআই) ‘ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী কোর প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন তিনি।
চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিব ও ইটিআই মহাপরিচারলকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
‘জুতার মালার অংশীদার আপনিও’
এবারের নির্বাচনের ঝুঁকির বিষয়গুলো মনে করিয়ে দিয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম কর্মশালায় বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা। এর বিকল্প কোনো নেই।
বর্তমান কমিশনকে ‘গণঅভ্যুত্থানের ফসল’ হিসেবে বর্ণনা করে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করার জন্য সবার দায়িত্বের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “ভালো নির্বাচন আমাদের কমিটমেন্ট হবে। এই যে এত রক্ত গেল, এত প্রাণ গেল, এত বছর মানুষের দুঃখ কষ্ট; যদি সঠিক নির্বাচন হত এগুলো কিন্তু হত না। আজকের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের গলায় যদি জুতার মালা হয়, এটার অংশীদার কিন্তু আপনিও; মনে করবেন না যে আপনিও না।”
নির্বাচনি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “সুতরাং আবারো বলছি, আবারো অনুরোধ করছি, এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেন, যে প্রশিক্ষণের মধ্যে থাকবে কমিটমেন্ট, যে প্রশিক্ষণের মধ্যে থাকবে যে সুন্দর সঠিক নির্বাচনের কোনো বিকল্প নাই। এই তেজি ভাবটা, এই জিহাদি ভাবটা আমাদের মধ্যে যাতে কাজ করে, সেই প্রত্যাশা রেখে এগোতে হবে।”
নির্বাচনে কোনো ‘ধানাই-পানাই’ হবে না মন্তব্য করে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, “জীবন চলে যেতে পারে। কিন্তু নির্বাচনে ফাঁকিবাজি, ধোঁকাবাজি করা যাবে না। কমিশন ও মাঠপর্যায়ের সবাইকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে।”
প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের নির্বাচনি ব্যবস্থার ‘নিউক্লিয়াস’ হিসেবে বর্ণনা করে আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, প্রায় ৫০ হাজার প্রিজাইডিং অফিসার সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করলে নির্বাচন ভালো হবে।
“মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য সব সমস্যার একটি তালিকা তৈরি করে সমাধানের পথ নির্ধারণ করতে হবে। যদি একজন প্রিজাইডিং অফিসার সাহসী ও সৎভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে একটি ভোটকেন্দ্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।”
এই নির্বাচন কমিশনারের ভাষায়, কমিশনের ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি বা ইনস্টিটিউশনাল মেমোরি দুর্বল’ হয়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে কমিশন হোঁচট খাচ্ছে।
কর্মকর্তাদের ‘গোপনীয়তা রক্ষা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে’ কমিশনের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার তাগিদ দেন তিনি।
‘আজকে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তারা কী করব?’
পরে বক্তব্য দিতে এসে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমার সহকর্মী বলে গেলেন নির্বাচনটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এরমধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জুতার মালা পরানো হয়েছে। আরেকটু যোগ করে যদি বলি, আরেকজন প্রধান নির্বাচন কমিশনারও বর্তমানে কারা অন্তরে রয়েছেন। দুঃখজনক।
“এ পরিস্থিতির জন্য কে দায়ী–গভীর বিশ্লেষণের দরকার। আশা করি, একসময় বিশ্লেষণ হয়েও যাবে, গবেষণাও হয়ে যাবে। আমরা যারা আজকে দাঁড়িয়ে আছি, আজকে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তারা কী করব? মেকানিজমটা কী?”
সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রে ইসির ভূমিকা কর্মশালায় তুলে ধরেন এ নির্বাচন কমিশনার।
নির্বাচনি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “নিজের দায়িতত্বটাকে আইনানুগভাবে করতে হবে। কারো দিকে না তাকিয়ে আইন মেনে কাজ করতে হবে। সংবিধান ও আইন মেনে কাজ করলেই সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হবে। কে কী করলে, কী ভাবল, চিন্তা করল–সে দিকে ভ্রুক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই।
“প্রিজাইডিং অফিসার হচ্ছে মেইন পার্সন, সেই একমাত্র লোক যে ফেয়ার ইলেকশন কনডাক্ট করবে। তার দায়িত্ব ঝূকিপূর্ণ হবে। সঠিক দায়িত্ব পালন করতে হবে।… তা না হলে প্রশ্ন আসবে, কোনো কোয়ারাটার থেকে, কোনো দপ্তর, বিভাগ থেকে প্ররোচিত হয়েছেন কি না। আমরা ফ্রি, ফেয়ার ইলেকশন চাই।”
‘নিউট্রালিটি, নিউট্রালিটি, নিউট্রালিটি’
সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন ভোটগ্রহণে সম্পৃক্ত নির্বাচন কর্মকর্তাদের আইন, বিধি সম্পর্কে জ্ঞান রাখার পাশাপাশি নৈতিকতা, সততার সঙ্গে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কাজ করার নির্দেশনা দেন।
কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে যেন সঠিকভাবে প্রশিক্ষণের প্রতিফলন ঘটে, সে বিষয়ে নজর রাখার তাগিদ দেন তিনি। পাশাপাশি এআই এর অপব্যবহার রোধে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন।
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সিইসি বলেন, “আমাদের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে অপতথ্য, মিথ্যা তথ্য নিয়ে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এটা যাতে প্রপারলি অ্যাড্রেস করা হয়, সে বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। আইন কানুনের বিষয়ে জানতে হবে। যে কোনো ধরনের নতুন চ্যালেঞ্জ এলে তা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
“ট্রেনিংকে সিরিয়াসলি নিতে হবে। প্রশিক্ষণের উপর আমাদের সফলতা নির্ভর করছে। প্রশিক্ষণের বটম লাইন হচ্ছে-প্রফেশনালিজম, প্রফেশনালিজম, প্রফেশনালিজ অ্যান্ড নিউট্রালিটি, নিউট্রালিটি, নিউট্রালিটি।”

‘দাদাগিরি করুন ইতিবাচকভাবে’
নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ বলেন, প্রশিক্ষকদের শুধু ভালো ট্রেইনার হলে হবে না, বরং 'দাদাগিরি' করতে হবে, সেটা ইতিবাচক অর্থে।
‘কোর ট্রেনিং’কে প্রশিক্ষণের ‘দাদা’ হিসেবে বর্ণনা করে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, "দাদাগিরি মানে কাউকে মারধর বা ভয় দেখানো নয়; বরং এমনভাবে বোঝানো, যাতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের নির্দেশনা ছাড়া আর কিছু ভাবতেই না পারেন।"
আইএফইএস কর্মকর্তাসহ সহকর্মী ও সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আজকের এই প্রশিক্ষণটা হল মূল প্রশিক্ষণ। এখানে আপনারা দাদা হবেন, পরবর্তী প্রজন্ম হবে বাবা, তারও পরের প্রজন্ম হবে সন্তান। কাজেই আপনাদের দায়িত্ব কতটা গুরুদায়িত্বপূর্ণ, তা সহজেই বোঝা যায়।”
তাহমিদা আহমদ বলেন, সারাদেশে ধাপে ধাপে প্রায় ১০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শুরু হচ্ছে ৪০ জন দিয়ে, যা পরবর্তী পর্যায়ে কয়েক হাজারে পৌঁছাবে।
“নির্বাচন ভালো হলে সফলতা আপনাদের কাছে যাবে, আর ব্যর্থ হলে দায়ও কিন্তু আপনাদের ঘাড়েই আসবে।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “তাদেরও আইন বুঝিয়ে দিতে হবে। কেবল বললেই হবে না, আইনগত ভিত্তি দেখাতে হবে। না হলে তারা দায়িত্ব নিতে চাইবে না।”
বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, “আমি শুধু আশাবাদী নই, বিশ্বাস করি আপনারা পারবেন। কারণ এত বছর ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতা আপনাদের রয়েছে। এবার সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগাতে হবে।”
বুথের সংখ্যা বদলে সাশ্রয় ‘শত কোটি টাকা’
প্রবাসীদের ভোট পদ্ধতি ও আইন কানুন বিষয়ে ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়ার জোর দাবি জানান নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
আদালতের আদেশে এক যুগ পর চাকরি ফিরে পেয়ে নির্বাচন কমিশনে যোগ দেওয়া ৬০ জন নির্বাচন কর্মকর্তাকে শুধু পোস্টাল ব্যালটের জন্য প্রবাসীদের ভোটাধিকারের কাজে সম্পৃক্ত রাখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ইসির কৃচ্ছ্রতা সাধনের প্রসঙ্গ টেনে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্বাচন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে বুথের সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ করার মাধ্যমে কমিশন ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে। আগে পুরুষদের জন্য একটি বুথে ভোটার সংখ্যা ছিল ৫০০ এবং নারীদের জন্য ৪০০। এখন তা যথাক্রমে ৬০০ ও ৫০০ করা হয়েছে।
“এর ফলে প্রায় ৪৯ হাজার বুথ কমানো সম্ভব হয়েছে। সাথে সাথে প্রায় দেড় লক্ষ নির্বাচন কর্মকর্তার প্রয়োজনও কমেছে। শুধু একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এত বড় অংকের ব্যয় সাশ্রয় করা গেছে। ভবিষ্যতেও প্রতিটি ধাপে এই মিতব্যয়িতা নিশ্চিত করতে হবে।”
এ নির্বাচন কমিশনার আশা প্রকাশ করেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ‘দৃষ্টান্ত’। সেজন্য সবাইকে সৎভাবে ও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
ইসি সচিব আখতার আহমেদের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠান শুরু হয়। ইইটিআই মহাপরিচালক এসএম আসাদুজ্জামান জানান, আগামী চার মাসে ভোটগ্রহণ সম্পৃক্ত ১০ লাখের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও লোকবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।