Published : 04 Mar 2026, 10:39 PM
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা নিয়ে বাংলাদেশের বিবৃতির কোনো সমালোচনা না করে আক্রান্ত হিসেবে ‘সহানুভূতি ও সমর্থন’ চাওয়ার কথা বলেছেন ঢাকায় ইরানি রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমী জাহানাবাদী।
বুধবার ঢাকা দূতাবাসে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের বিবৃতির বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ যেহেতু মুসলিম দেশ, ওআইসিসহ জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) সদস্য দেশ, সে হিসাবে তারা একটি আগ্রাসী শক্তির সরাসরি নিন্দা জানাবে, প্রতিবাদ জানাবে, এরকমটা আমরা আশা করি।
“আমরা কোনো দেশের কাছ থেকে কোনো ‘লজিস্টিকস’ সাপোর্ট চাই না। আমরা শুধু চাই, একটা মুসলিম দেশ আক্রান্ত একটা মুসলিম দেশের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন প্রকাশ করবে।”
শনিবার ইরানজুড়ে হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, তার স্ত্রী-কন্যা, জামাতা ও নাতিও প্রাণ হারিয়েছেন।
ওই হামলার জেরে ইসরায়েলের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেণণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে ইরান।
ইরানি রেড ক্রিসেন্ট বলেছে, সেখানে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েক ডজন নেতা ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়েছেন।
ইরানে হামলা-পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপটে ঢাকা এবার দুই দফায় যে বিবৃতি দিয়েছে, সেটা আগের অবস্থানের বিপরীত।
এর আগে ইরানে প্রায় সব ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় বিবৃতি দিয়ে নিন্দা জানিয়েছিল বাংলাদেশ।
রোববার দেওয়া প্রথম বিবৃতিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত হামলার কোনো নিন্দা জানায়নি ঢাকা। হামলায় খামেনির মৃত্যুর কথাও ছিল না বিবৃতিতে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে যে নিন্দা ঢাকা জানিয়েছে, তাতে সাতটি দেশের নাম থাকলেও বাদ রাখা হয় ইরানকে।
বাংলাদেশ সরকারের ওই বিবৃতি যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্সসহ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের আক্রান্ত দেশগুলোর সঙ্গে মেলে।
সরকারের ওই বিবৃতি নিয়ে সমালোচনার মধ্যে পর দিন সোমবার আরেক বিবৃতিতে আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুতে ‘মর্মাহত’ হওয়ার কথা বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিবৃতিতে ‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে টার্গেটেড হামলায় এই হত্যাকাণ্ড’ ঘটানোর কথা বলা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নাম নেয়নি ঢাকা।
বাংলাদেশের এমন বিবৃতির বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ইরানের রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, “যখন জাতিসংঘ নিজে ইরানের উপরে হামলাকে নিন্দা জানিয়েছে, সে প্রেক্ষাপটে একটা মুসলিম দেশ হিসেবে সব মুসলিম দেশের কাছেও আমাদের প্রত্যাশা যে, তারা তাদের ভাইদের উপরে আক্রমণের বিরোধিতা করে নিন্দা জানাবে।”
জামায়াতে ইসলামীর আমির ছাড়া কোনো দল থেকে কেউ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি দাবি করে তিনি বলেন, “শফিকুর রহমান ছাড়া অন্য কোনো দল থেকে যোগাযোগ করে নাই। উনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং আমাকে উনি সমবেদনা জানিয়েছেন। আর অন্য কোনো পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগ হয় নাই।
“তো আমি এছাড়া বাংলাদেশের যে সমস্ত গ্রুপ, বিশেষ করে স্টুডেন্ট যারা মিছিল করেছে, বা তারা যে সমস্ত বক্তব্য দিয়েছে, এগুলো আমি দেখেছি, আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ তাদের প্রতি যে তারা আমাদের প্রতি সহমর্তিতা জানিয়েছেন।”
প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইরানের হামলার প্রশ্নে জাহানাবাদী বলেন, “প্রতিবেশী দেশগুলোর বিষয়ে আমরা আশা করব, তারা তাদের নীতি পুনরায় চিন্তাভাবনা করবেন এবং আশা করব, তারা তাদের ভূখণ্ড এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আরেকটি দেশে আক্রমণ করার জন্য আগ্রাসী শক্তিকে ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। কারণ এটা পুরা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যই অত্যন্ত জরুরি “
মধ্যপ্রাচ্যের ওই দেশগুলো ‘আগ্রাসী শক্তিকে’ সহায়তা অব্যাহত রাখলে ইরান প্রতিরোধ যুদ্ধ চালাতে বাধ্য হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আমেরিকা ও ইসরায়েল যতদিন যুদ্ধ চালাতে চায়, ততদিন পাল্টা আঘাত চালানোর সক্ষমতা ইরানের আছে দাবি করে রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমাদের সেই সামরিক শক্তি আছে, আমাদের যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন, সেই পরিকল্পনা নিয়েই এই প্রকল্প আমরা আগের থেকে গ্রহণ করেছি।”
খামেনিকে হত্যার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা ব্যর্থতা ছিল কিনা, এমন প্রশ্নে জাহানাবাদী বলেন, “আমাদের শীর্ষ নেতা, উনার অফিসে কাজ করছিলেন, যিনি কোনো ধরনের আশ্রয় কেন্দ্র বা কোনো ধরনের বিশেষ কোনো ব্যবস্থায় বিশ্বাসী ছিলেন না। উনি কাজ করছিলেন, হঠাৎ সেখানে আক্রমণ করে উনাকে শহীদ করে।
“এটা একটা কাপুরুষোচিত কাজ এবং এটা সবাই করবে না। তবে এটা আমি মনে করি না যে গোয়েন্দা ব্যর্থতার কোনো বিষয়।”
চীন-রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক চুক্তি থাকলেও তাদের সহায়তা না পাওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নে রাষ্ট্রদূত বলেন, “চীনের সঙ্গে এ ধরনের কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি নাই যে, আমাদের এ ধরনের সময় তারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। এই দুইটা দেশের সঙ্গে আমাদের সামরিক চুক্তি আছে অস্ত্র কেনাসহ বিভিন্ন সামরিক ক্ষেত্রে। কিন্তু প্রতিরক্ষা চুক্তি যেটাকে বলে, যুদ্ধের সময় তাদের পাশে আসা, এ ধরনের কোনো চুক্তি নাই।”
আমেরিকার পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের আশঙ্কা থাকলেও ইরানিরা সেটাকে ‘ভয় পায় না’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তারা দুইবার আগে এই বোমা ব্যবহার করেছে। এখন তৃতীয়বার করতেও পারে। তবে আমরা এটাতে কোনো ভয় পাই না, কারণ আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শাহাদাত।
“আমরা আমেরিকার কাছে নতি স্বীকার করার চেয়ে মাথা উঁচু করে লড়াই করাটাকে প্রাধান্য দিই। আমরা যদি পারমাণবিক বোমার মাধ্যমে মারাও যাই, তারপরও কোনোদিন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করব না।”
‘হতাশ আমেরিকা’
পরিকল্পনা ব্যর্থতায় যুক্তরাষ্ট্র হতাশ হয়েছে মন্তব্য করে রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমেরিকানরা প্রথমে আশা করছিল যে, তারা যুদ্ধ শুরু করলে, হামলা শুরু করলে ইরানের জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসবে। এ ব্যাপারে তারা হতাশ হয়েছে, জনগণ সেভাবে তাদের সাড়া দেয় নাই।
“এজন্য তারা এখন ইরানের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা, কেরমান বা অন্যান্য যে সীমান্ত এলাকাগুলো আছে, সেই সীমান্ত এলাকাগুলোতে তারা বোমাবর্ষণ করছে এবং চাচ্ছে যে, মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়ার জন্য। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, জনগণ আরও ঐক্যবদ্ধ এবং জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত আমেরিকার কোনো ফাঁদে সাড়া দিচ্ছে না। এতে বোঝা যায়, জনগণ সরকারের পক্ষে আছে।”
তিনি বলেন, “আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমেরিকানরা সিরিয়ার বিভিন্ন জেল থেকে প্রায় সাত হাজার আইএস কর্মীকে ইরাকের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে আসছে। এদেরকে অশুভ উদ্দেশ্যে নিয়ে আসছে। তবে ইরান তাদের ব্যাপারে জানে, যেকোনো সময় ইরান এগুলোর উপরও আক্রমণ করতে পারে। আমরা এখন আমেরিকা এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আছি। তারা যত ধরনের অপকৌশল আছে, সব অপকৌশলই কাজে লাগাচ্ছে।”
গত মাসে ইরান সরকাবিরোধী বিক্ষোভে দমনপীড়নের বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “প্রত্যেক দেশেই পক্ষে-বিপক্ষের একটা মত থাকে। কিন্তু সেখানে আমাদেরকে লক্ষ্য করতে হবে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিটা কোন দিকে।
“সব দেশে প্রতিবাদ হয়, এরকম প্রতিবাদ আছে। প্রতিবাদ যতদিন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ হয়, অরাজকতা সৃষ্টি না হয়, ততদিন পর্যন্ত আমাদের সরকার সে ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করে না।”
এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে ইরানের জনগণ কেউ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো স্লোগান নিয়ে রাস্তায় নামেনি দাবি করে তিনি বলেন, “আপনি হয়ত লক্ষ্য করেছেন যে, আয়াতুল্লাহ খামেনি আমাদের শীর্ষ নেতা, উনি শহীদ হওয়ার পরে লাখ লাখ ইরানি রাস্তায় নেমেছেন এবং এখনও তারা রাস্তায় আছেন।
“আমাদের প্রত্যেক দেশে যেরকম প্রতিবাদ হয়, সে প্রতিবাদ হয়। কিন্তু ইরানিদের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ইরানিরা খুব জাতীয়তাবাদী। তাদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে, নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকে, কিন্তু যখন কোনো বাইরের থেকে কোনো আগ্রাসন হয়, তখন সব ইরানি আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়।”