Published : 05 Jan 2026, 01:48 AM
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিদেশি কূটনীতিক, বিশেষ করে ভারতের যে উদ্যোগী ভূমিকা দেখা গেল, তাতে নতুন সরকারের জন্য একটি বার্তা দেখতে পাচ্ছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোচনা অনুষ্ঠান ইনসাইড আউটে অংশ নিয়ে তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের সাথে ভারত সুসম্পর্ক গড়তে চায়। সুষ্ঠু, সুস্থ, সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় এবং সেটা মূলত তারা ধরে নিচ্ছে যে আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। সেই জন্য বিএনপির প্রতি বা ভবিষ্যৎ যে নেতৃত্ব আসবে তাদের প্রতি বিশেষভাবে এই বার্তাটা দেওয়া হচ্ছে।”
রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ফেইসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেলে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। আর শোক জানাতে দিল্লির বাংলাদেশ হাই কমিশনে গেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং।
সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকায় এসে খালেদা জিয়ার ছেলে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর চিঠি হস্তান্তর করেন জয়শঙ্কর। সেই চিঠিতে ‘নতুন সূচনার’ প্রত্যাশার কথা বলেছেন মোদী।
চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে আপনার (তারেক রহমান) দক্ষ নেতৃত্বে তার (খালেদা জিয়া) আদর্শ এগিয়ে নেওয়া হবে এবং ভারত ও বাংলাদেশের গভীর ও ঐতিহাসিক অংশীদারত্বকে আরও সমৃদ্ধ করতে তা পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে—নতুন সূচনা নিশ্চিত করবে।”
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের বেশি সময়ে ভারতের উচ্চ পর্যায়ের কোনো প্রতিনিধি ঢাকায় এলেও প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেননি জয়শঙ্কর। যেই সাক্ষাৎ করেছিলেন একইদিন খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসা অন্যান্য দেশের কয়েকজন সরকারি প্রতিনিধি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সাবেক প্রধান মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, “এটা মূলত হচ্ছে যে একটা সৌজন্য, সহমর্মিতা, সমবেদনা জানানো আর সাথে সাথে একটা বার্তা দেওয়া, যেটা ঠিক ওইভাবে রাজনৈতিক বার্তা না। ওটা হচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা হাত আগায়ে দেওয়া।
“কিন্তু সেটাও বর্তমানের যে হাতগুলো আছে, তাদের সাথে না, ভবিষ্যতের হাতের সাথে হাত আগিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা আমি দেখতে পাচ্ছি।”

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরকে ‘আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ক কিংবা কূটনীতির’ দৃষ্টিতে না দেখে খালেদা জিয়ার প্রতি শোক প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হিসাবে দেখার কথা বলেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
সেই প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে মুন্সী ফয়েজ বলেন, “এটা হালকা করে দেখাতে চেষ্টা করছে কিনা… কিন্তু একটা বাস্তবতার স্বীকারোক্তি বলা যায় আর কি। কারণ জয়শঙ্কর যে আসলেন, তিনি কিন্তু বর্তমান সরকারের সাথে খুব বেশি যোগাযোগ করলেন না। মানে প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করার কথা আমরা শুনতে পাইনি সেরকম কিছু, অন্য অনেকে যারা এসেছিলেন, তাদের অনেকেরই প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে।
“তো, সরকারের সাথে সরকারের যে সম্পর্ক, সেইখানে একটু আমরা গ্যাপ দেখতে পাচ্ছি। তো দুই পক্ষ থেকেই যথেষ্ট আগ্রহ হয়ত ছিল না এবং সেটারই বহিঃপ্রকাশ হয়েছে পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার বক্তব্যে।”
তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যের সঙ্গে কিছুটা একমত পোষণ করে তার সাবেক সহকর্মী মুন্সী ফয়েজ বলেন, “এটার মধ্যে তো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো বক্তব্য ওইভাবে নাই।”
এমন উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার বার্তা দিয়েছে বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ।
তিনি বলেন, “এখন দুদেশের সম্পর্ক তেমন ভালো নয়। এ অবস্থায় এই কাজগুলো না করলেও মানুষ খুব হয়ত আশ্চর্য হত না। বা আরো নিচের লেভেলের কোনো প্রতিনিধি পাঠালেও আশ্চর্য হত না। মনে করত যে, এখন সম্পর্ক খারাপ সেজন্য এরকম করেছে।”
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের এমন সহমর্মিতা জানানো ‘স্বাভাবিক’ বলেই মনে করছেন মুন্সী ফয়েজ।
তিনি বলেন, “একটা সাধারণ সৌজন্য, সহমর্মিতা একজন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীর জন্য শোক প্রকাশ করা, এটা তো স্বাভাবিক। এমনি সবাই করে। কিন্তু তার চেয়েও একটা জিনিস হল যে, এর আগে খালেদা জিয়া দুইবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং সেই সময় বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক কিন্তু খারাপ ছিল না। বরং বেশ ভালো ছিল।
“এবং খালি ভারতের সাথে না, বিভিন্ন দেশের সাথে তখন সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, ভালো ছিল। সেগুলোর পেছনে খালেদা জিয়ার বড় অবদান ছিল। সুতরাং বিভিন্ন দেশ থেকে যে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং সেটা একটা যেমন করা হচ্ছে, সাথে সাথে ভবিষ্যতের যে নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে, তাকেও একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে আমি মনে করি।”
ভারত সরকার আগামীতে ঢাকার শাসন ক্ষমতায় বিএনপিকে দেখতে চাচ্ছে কি-না, সেই প্রশ্ন রাখা হয় মুন্সী ফয়েজের কাছে।
উত্তরে ভিন্নমত দিয়ে এই বিশ্লেষক বলেন, “এইখানে আমি একটু পার্থক্য করব, আপনার বক্তব্যের সাথে। তারা দেখতে চাচ্ছে এটা নয়। তারা দেখতে পারছে বা তারা মনে করছে। খালি ভারত না, আমরা নিজেরাও মনে করছি, আমাদের দেশেও মনে হয় যে, সাধারণ মানুষ মনে করছে, পৃথিবীব্যাপী অন্যরা যারা বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে, সবাই মনে করছে যে আগামীতে যে নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচন যদি ঠিকভাবে হয়, তাহলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে।
“এটাই সাধারণভাবে মানুষ ধরে নিচ্ছে। মানুষ ধরে নিচ্ছে বলেই যে সেটাই হবে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু সবাই তো একটা ভবিষ্যৎ চিন্তা করে রাখে, সেরকম। ভবিষ্যৎ চিন্তায় সবাই আমরা বেশিরভাগই মনে করছি যে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে।”
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশের মানুষের শোক প্রকাশেও ভারতের সেই ধারণা তৈরির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন এই সাবেক কূটনীতিক।
তিনি বলেন, “আসার পরে তো জয়শঙ্কর দেখেছেন যে, কীভাবে বাংলাদেশের মানুষ সাড়া দিয়েছে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে, তাকে শোক জানাতে সবাই কীভাবে দলে দলে এসে জড়ো হয়েছে ঢাকায়।
“তো সেইগুলো থেকে সবাই ইঙ্গিত পাচ্ছে যে, আগামীতে সম্ভবত প্রায়ই আসবে এবং এদের সাথে সম্পর্কটা গড়ে তোলা সহজ হবে। এইভাবে নানান ইকুয়েশন থেকে চিন্তা করলে আমি মনে করি যে, এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা পদক্ষেপ তাদের পক্ষে, যে তারা ধরে নিচ্ছে আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। সুতরাং তাদের সেই ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কাছে একটা বার্তা পৌঁছাল।”
এর মধ্য দিয়ে ভারত জনগণকেও একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে মন্তব্য করে মুন্সী ফয়েজ বলেন, “তারা জনগণকে বার্তা দিল এবং এটা বুঝে নিতে হবে যে, ঠিক আছে, যেই আসুক বাংলাদেশের সরকারে, যদি কোনোভাবে আমরা যা চিন্তা করছি সেটা হবে না, অন্য কেউ আসে তাহলেও তাদের সাথেও কাজ করবে ভারত।
“খালি ভারত না, সব অন্যান্য সমস্ত দেশ, সেটাই স্বাভাবিক। সুতরাং ওইটা মানে, যদিও বার্তাটা বিশেষ দিকে দিচ্ছে, কিন্তু বার্তাটা সবার জন্য।”
কূটনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে ভারতে বাংলাদেশের মিশন ঘিরে বিক্ষোভ এবং পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে চাপে রাখার কৌশল কিনা, এমন প্রশ্ন করা হয় মুন্সী ফয়েজের সামনে।
জবাবে সীমান্তের দুপারেই মিশনগুলো ঘিরে বিক্ষোভ হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “মূলত হচ্ছে যে, এই ঘটনাগুলো ঘটছে রাজপথে বা মাঠে। সরকার এটা করছে না। দুই পক্ষের কোনো সরকারই এটার সাথেই ওইভাবে সরাসরিভাবে যুক্ত না। সুতরাং সরকার চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছে, এই কথাটা বলাটা ঠিক না।
“তবে যেটুকু আমার কাছে মনে হয়েছে, যে এই ঘটনাগুলো যখন ঘটছে, সরকার পুরোপুরি তাদেরকে বাধাও দিচ্ছে না। একটা পর্যায় পর্যন্ত আসতে দিচ্ছে, যেতে দিচ্ছে, তারপরে সেখানে বাধা দিচ্ছে, ঠেকাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “সম্পর্ক যে ভালো না সেটার বহিঃপ্রকাশ মাঠে-ময়দানে হচ্ছে, আর দুই পক্ষের কোনো সরকারই সেটাকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে না।
“সেটা লোকে দেখুক, সেইভাবেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু এর পিছনে সরকারের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে, ভারত সরকারের বা বাংলাদেশ সরকারের, এটা আমার কাছে মনে হয় না। যে পরস্পরের উপরে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা, আমি মনে করি না সেরকম কোনো চেষ্টা আছে।”

আগামী সরকারের ৩ চ্যালেঞ্জ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ‘উল্টোযাত্রার’ কারণে আগামীর সরকারকে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলে মনে করছেন মুন্সী ফয়েজ আহমদ।
তার মতে, আইনৃশঙ্খলা বাহিনী ও আমলাতন্ত্রের মনোবল ফিরিয়ে এনে পুনরায় উদ্যমী করা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের স্থবিরতা কাটিয়ে গতিশীল করার বিষয়গুলো থাকবে চ্যালেঞ্জের খাতায়।
ইনসাইড আউটে তিনি বলেন, “একটা জিনিস তো আমরা সবাই বুঝতে পারছি যে, গত দেড় বছর, মানে এই অন্তবর্তী সরকার শুরু থেকে এ পর্যন্ত একটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
“বরং খালি স্থবির না, অনেক কিছু নিচের দিকে চলে গেছে, অধঃগতি ঘটেছে অনেক কিছুর। সুতরাং সেখান থেকে ফেরত নিয়ে আসা, নতুন করে শুরু করা এটাই হলো চ্যালেঞ্জ, বড় চ্যালেঞ্জ, যদি মোদ্দা কথায় বলি।”
বর্তমান সরকারের ‘কিছুই না করতে পারার’ পেছনে দুটি কারণ আছে বলে মনে করেন মুন্সী ফয়েজ।
তিনি বলেন, সরকারের যা করা উচিত ছিল, সেটা না করে ‘উল্টো কাজ করেছে’। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অনেক কিছু বলা হয়েছে।
“যখন আমরা অভ্যুত্থানের কথা বলি, তখন তো তারা উল্টোপাশে ছিল। তাই না? তো সেইসব কারণে তাদেরকে অনেক মন্দ কথা বলা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অনেক কিছু বিষোদগার করা হয়েছে। তার ফলে তারা ডিমোরালাইজড।”
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে পুনরায় উদ্বুদ্ধ করার ‘চেষ্টা করেনি’ মন্তব্য করে মুন্সী ফয়েজ বলেন, “সরকারের নতুন যে ধ্যানধারণা আছে, সেগুলোর দিকে কাজ করার জন্য, সেই চেষ্টা করে নাই সরকার।
“তার ফলে সেখানে আমাদের যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো, সেগুলো এখনো হতোদ্যম হয়ে আছে। তাদেরকে পুনরায় উদ্যমী করা, তাদেরকে সঠিকভাবে মোটিভেট করা, এটা খুব জরুরি একটা ব্যাপার থাকবে নতুন সরকারের কাছে।”
একইভাবে আমলাতন্ত্রের মনোবল ফেরানোর কাজ না করায় সাধারণ মানুষের কাজে ‘গাফিলতি’ দেখার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “যেহেতু আগে আমলাতন্ত্রকে আমরা গালাগালি করেছি যে, তারা স্বৈরাচারের আমলাতন্ত্র ইত্যাদি ইত্যাদি করে। তার ফলে তারাও ডিমোরালাইজড।
“তাদেরও মনোবল হারিয়ে গেছে। তাদেরকে মনোবল ফিরিয়ে আনতে, তাদেরকে পুনরায় মোটিভেট করবার জন্য সরকার কোনো উদ্যোগ সত্যিকারভাবে নেয় নাই। তার ফলে সেখানেও যে একটা ঘাটতি রয়ে গেছে, সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা। এই দুটোই যদি না ঠিক করতে পারে, আগামী যে সরকার আসবে, তাহলে কিন্তু সরকারের জন্য কঠিন সময় যাবে।”
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কে ‘ভাটা’ কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ আগামী সরকারকে নিতে হবে মন্তব্য করে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, “ভারতের সাথে সম্পর্ক তলানিতে গেছে কিন্তু অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্ক, সেখানেও কোনো অগ্রগতি নাই। সবাই যখন বিভিন্ন ভিজিট হয়েছে, তখন সবাই ভালো ভালো কথা বলেছে। কিন্তু কোনো রকমের উদ্যোগ কোনোখান থেকে দেখা যায় নাই নতুন করে সম্পর্কটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার।
“সেই কাজটিও একটা গুরুত্বপূর্ণ নতুন চ্যালেঞ্জ হবে সরকারের জন্য, যে ওখান থেকে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। একটা বড় রকমের ভাটা পড়ে গেছে, বড় রকমের ছেদ পড়েছে আমাদের বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্কে।”
কোনো দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক খুব ভালো অবস্থায় আছে–‘এমনটা বলা যায় না’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “শুধুমাত্র হয়ত পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কটা একটা জায়গা থেকে উপরে উঠেছে. কিন্তু সেখানেও একটা ছেদ আছে।
“চীনের সাথে সম্পর্কেও সেরকম একটা ছেদ তৈরি হয়েছে। চীনও আগায় আসে নাই, একটা অনেক ভালো ভালো কথা বলেছে কিন্তু তারাও একখানে থেমে আছে। সেখান থেকে আবার নতুন করে সেই সম্পর্কটাকে সচল করা, সহযোগিতাগুলোকে নতুন করে তৈরি শুরু করা। যেগুলো অলরেডি চালু আছে, সেগুলোকে নতুন উদ্যম দেওয়া, গতি দেওয়া এবং নতুন নতুন সহযোগিতার প্রকল্প এগুলোকে তুলে আনা। এই জিনিসগুলো হবে অত্যন্ত কঠিন কাজ, কিন্তু সরকারে গেলে তো এগুলো করতেই হবে।”

মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়া ‘অনভিপ্রেত’
উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর দাবির মুখে আইপিএল থেকে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়াকে অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত হিসাবে বর্ণনা করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটা অত্যন্ত দুঃখজনক একটা ঘটনা, একেবারে অনভিপ্রেত। এটা হওয়া উচিত না। রাজনীতি-কূটনীতি যাই কিছু হোক, সেটা আন্তর্জাতিক খেলাধুলার অঙ্গনে যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সেটা আমরা সবাই চাই। এটা খেলাধুলাটাকে খেলাধুলার মতন রাখতে হবে।
“সেখানে কোনো রাজনীতি-কূটনীতি যাতে না জড়ায়, সেটাই আমরা সবাই চাই। তারপরেও এরকম অনভিপ্রেত ঘটনা এই প্রথম না, আগেও ঘটেছে। কিন্তু সেটা আমরা কেউ চাই না।”
দুই দেশের সরকার স্বাভাবিক সম্পর্কে থাকলে এমন নেতিবাচক বিষয়কে কমানোর চেষ্টা করত মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কিন্তু বর্তমানে আমি কোনো পক্ষ থেকেই এ ধরনের কোনো চেষ্টা দেখছি না—ভারত সরকার বা বাংলাদেশ সরকার কেউই সেরকম কিছু করছে না।
“এই যে এখন একটা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, একটা নেতিবাচক, ন্যক্কারজনক একটা ঘটনা ঘটছে, সেটাকে থামানোর বা সেটাকে প্রশমিত করার কোনো চেষ্টা দুই দেশের সরকার কেউই করছে না। সেটা আমি মনে করি যে, অত্যন্ত দুঃখজনক। ঘটনাটা যেমন দুঃখজনক এবং আমাদের দুই দেশের সরকার এই অবস্থায় যা করছে, তাদের কিছু করা বা না করা, তারা যে নিষ্ক্রিয়ভাবে দেখছে এটাই আমি মনে করি যে অত্যন্ত দুঃখজনক।”

‘আশ্চর্য হওয়ার কিছু নাই’
জামায়াতে ইসলামের আমির শফিকুর রহমান সম্প্রতি বলেছেন, ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে গতবছর তার দেখা হয়েছিল। তবে বিষয়টি গোপন রাখতে বলা হয়েছিল কূটনীতিকের তরফে।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নে মুন্সী ফয়েজ বলেন, “এটা গোপন রাখতে বলেছেন মানে তারা চান না যে, এটা নিয়ে বেশি কথাবার্তা হোক। তার মানে এই না যে, এই ধরনের ঘটনা আর ঘটে না। এটা যেহেতু প্রকাশ পেয়েছে, সুতরাং এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে।
“কিন্তু আমার ধারণা যে এরকম জামায়াতে ইসলামের ডেলিগেশন যে চীনে গেছে, আমরা তো সবাই জানি। ভারতের সাথে তাদের যোগাযোগ হচ্ছে না, এটা মনে করার কোনো কারণ নাই। ভারতের সাথে তাদের যোগাযোগ হচ্ছে, ভারতের কূটনীতিকরা জামায়াতে ইসলামের লোকজনের সাথে কথাবার্তা বলছে, ঢাকায় যে দূতাবাস আছে তারা যে কথা বলছে না, এটা মনে করার কোনো কারণ নাই।”
জামায়াতের ইসলামীর প্রতিনিধিদের ভারতে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলামের লোকজন ভারতে যেয়ে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে দেখা করে নাই, এটা মনে করার কোনো কারণ নাই। এখন কোন লেভেলে কার সাথে দেখা করছে, সেটা আলাদা কথা। হয়ত এমন জায়গায় কথাবার্তা বলছে, যেখানে সহজে কারও চোখ যায় না।”
সবার এমন যোগাযোগ চলার কথা তুলে ধরে মুন্সী ফয়েজ বলেন, “তার কারণ কী? হ্যাঁ, খুব সাধারণভাবে আমরা মনে করি যে, জামায়াত খুব ভারতবিরোধী, হেনতেন। কিন্তু জামায়াতের যদি কোনো রকমের চিন্তা থাকে যে, কখনও তারা ক্ষমতায় আসবে, তারা ভারতবিরোধিতা করতে পারে না। কোনো দেশের বিরোধিতা করেই সরকার চালানো যায় না।
“একেবারে যুদ্ধ বেঁধে গেলে সেটা আলাদা কথা। ততক্ষণ সবার সাথে সম্পর্ক রাখতে হয়, সুসম্পর্ক রাখতে হয়, সম্পর্ক কোনো খারাপ হলে সেই সম্পর্কটাকে কীভাবে ভালো জায়গায় আবার ফেরত আনা যায়, সেই চেষ্টা করতে হয়।”
তিনি বলেন, “জামায়াত যদি ক্ষমতায় যায়, জামায়াতকেও ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে হবে, গড়তে হবে। সুতরাং সেটা তারা জানে, তারা বোঝে। যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে তাদের, বিভিন্ন ধরনের। সুতরাং তারা এগুলো বোঝে এবং সেটা করতে পারবে।
“এবং তারা পিছপা হবে না কারো সাথে যোগাযোগ রাখতে। এখনও তারা হচ্ছে না পিছপা, আমরা হয়ত সমস্ত খবর পাই না। সুতরাং এটাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নাই।”
জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা ১১ দল ভোটে জিতে গেলে বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে কেমন প্রভাব পড়বে, এমন প্রশ্নে মুন্সী ফয়েজ বলেন, “আমি মনে করি যে, যেই আমাদের ইলেকশনে জিতুক, সেটা জামায়াত হবে কিনা আমি জানি না।
“বিএনপি হোক, জামায়াত হোক বা অন্য কোনো দল–সম্ভাবনা আপাতত একেবারেই দেখা যাচ্ছে না অন্য কারও–যেই আসুক পররাষ্ট্রনীতিতে বড় রকমের পরিবর্তন হবে না। এটা হয় না। বেশিরভাগ দেশের ক্ষেত্রেই এটা হয় না। অন্য কোনো দেশেও যদি এক রাজনৈতিক পরিবর্তন হয় তাতেও যে তাদের অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক সব খারাপ হয়ে যায় তা না, দুয়েকটা ক্ষেত্র ছাড়া।”

খালেদা সরকারের ভারত নীতি
বিএনপির শাসনামলে বাংলাদেশের ভারত নীতি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে মুন্সী ফয়েজ বলেন, কোনো দল যখন সরকারে থাকে, তারা কোনো দেশের সাথে বৈরী সম্পর্ক চায় না, সবার সাথে ভালো সম্পর্কই চায়।
“সাধারণভাবে মানুষের ধারণা যে, বিএনপি হল ভারতবিরোধী আর চীনপন্থি; আর আওয়ামী লীগ হচ্ছে ভারতপন্থি, চীনবিরোধী। এই কথাগুলোর আসলে কোনো গুরুত্ব নেই। বিশেষ করে যে সরকারে যায়, সবার সাথেই ভালো সম্পর্ক করার চেষ্টা করে।”
খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময় হংকং ও ঢাকায় চাকরির পর লন্ডন মিশনের দায়িত্বে যান মুন্সী ফয়েজ। ২০০১ সালের সরকারের শুরুতে ছিলেন নিউ ইয়র্ক মিশনে কনসাল জেনারেল এবং পরে সিঙ্গাপুরে হাই কমিশনার।
একানব্বইয়ের খালেদা সরকারের উদ্যোগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “প্রথমবার উনি যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন সাইফুর রহমান সাহেব ছিলেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী। সেই সময় ভারতকে যত বাণিজ্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তাদের উৎপাদিত জিনিসপত্রের প্রবেশাধিকার বাংলাদেশের বাজারে যত দেওয়া হয়েছে, এটা এরপরে একসাথে আর কখনও এত দেওয়া হয় নাই।
“তো সেইজন্য বলতে হবে যে, যতই আমরা রাস্তাঘাটে ভারত বিরোধিতার কথা বলি, কিন্তু সম্পর্ক করার সময় কিন্তু ভারতকে বাদ দিয়ে নয়, বরং ভারতের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক। কারণ সেটা তো আমাদের স্বার্থেও আসে, ভারতের সাথে আমাদের বাণিজ্য সম্পর্ক ভালো থাকলে, ভারতকে সুবিধা দিলে আমরাও সুবিধা পাই।”
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে জোরালো সম্পর্ক না থাকায় খালেদা জিয়া প্রথমবার সরকারে এসে সেই দিকে বেশি জোর দিয়েছিল বলে মন্তব্য করে মুন্সী ফয়েজ।
তিনি বলেন, “কিন্তু যাদের সাথে সম্পর্ক ভালো আছে, তাদের সাথে সম্পর্ক খারাপ করে নয়। তাদের সাথেও সম্পর্ক আরও ভালো করার চেষ্টা করেছেন।”
২০০১ সালে খালেদা জিয়ার ‘লুক ইস্ট পলিসি’ বা পুবের দিকে তাকাও নীতি নেওয়ার কথা তুলে ধরে মুন্সী ফয়েজ বলেন, “ভারত কিন্তু সেই পুবের মধ্যে পড়ে যায়, তাই না? ভারতের সাথে সম্পর্ক আরও ভালো করার চেষ্টা করার একটা সেই ইয়ের মধ্যে নিশ্চয়ই ছিল।”
সেই সময়ের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমি দেখেছি যে সবখানেই উনি এই পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলাদেশের কোনো প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সিঙ্গাপুর সফরও ওই সময় হয়।
“তো এইগুলো থেকে আমি জাস্ট এটা কেন বলছি? উনি খালি ভারত না, বিভিন্ন দেশের সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক গড়ে তোলার অনেক ক্ষেত্রে পথিকৃত ছিলেন। তো সেইজন্যে তাকে যে স্মরণ করছে খালি ভারত না, অন্যান্য দেশেরও লোকজন যারা এসছে, তারা ওই কারণেই তাকে সম্মান করে এসেছে মূলত। ভারতের থেকেও সেই জন্য যে, ওই সময় ভারতের সাথেও অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক ছিল যখন উনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।”

হাসিনার ভারতে অবস্থানের কী প্রভাব?
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাণদণ্ড নিয়ে দিল্লিতে অবস্থান করার বাস্তবতা মেনে নিয়েই আগামীর সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “এখন কিন্তু আমি মনে করি যে আমাদের দুই দেশের যে সম্পর্ক খুব খারাপ, সেটার পিছনে এটা একটা বড় কাজ করছে। কিন্তু আমি মনে করি যে, ইলেকশন হয়ে যাওয়ার পরে এটা নিয়ে অত বেশি চিন্তা করবে না, দুই পক্ষই চেষ্টা করবে সম্পর্কটাকে…।
“এটা একটা যে সমস্যা নয় তা নয়, এটা সমস্যা হিসেবে থাকবে। আমাদের দুই দেশের মধ্যে একটা সমস্যা হিসেবে থাকবে যতদিন না এটার একটা সমাধান হচ্ছে, উভয়পক্ষে মিলে কোনো সমাধান। কিন্তু তার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক যে স্থবির হয়ে থাকবে, সেটা আমি বিশ্বাস করি না।”
মুন্সী ফয়েজ বলেন, “আমি মনে করি, দুই দেশের সম্পর্ক এটা সত্ত্বেও এগিয়ে যেতে পারে এবং দুই পক্ষেরই স্বার্থ সেখানে জড়িত; দুই পক্ষেরই উচিত সেদিকে চেষ্টা করা কীভাবে এই সমস্যা থাকা সত্ত্বেও সম্পর্কটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক করা যায়।
“কারণ সম্পর্ক তো খালি একটা দলের বা একটা ইয়ের ব্যাপার নয়। এটা হলো পুরো জনগোষ্ঠীর, এক দেশের জনগণের সাথে আরেক দেশের জনগণের। কারণ দুই দেশের সম্পর্ক তখনই গড়ে উঠতে পারে ভালো করে, যদি এটা দুই দেশের জনগণকেই লাভবান করে।”
যেই ক্ষমতায় আসুক, এই শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু নিয়ে ‘বসে থাকবে না’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সম্পর্কটা এগিয়ে যাবে। হয়ত এই সমস্যার কারণে একটা পর্যায়ের পরে আর হয়তো যাবে না, সেটা হতে পারে। কিন্তু সম্পর্ক এক জায়গায় বসে থাকবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নাই।”