পদ্মা রেল সংযোগ সেতুর নিচে মাটি কাটা বন্ধ করেছে প্রশাসন
মাটি কেটে নেওয়া প্রকল্পের অংশ হিসেবে দাবি করা হলেও কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করার আগ পর্যন্ত তা আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জে পদ্মা রেল সংযোগ সেতুর পিলারের নিচে গর্ত করে মাটি কেটে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। কয়েকদিন ধরে এ কার্যক্রম চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তবে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, প্রকল্পের অংশ হিসেবেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাটি কাটা হচ্ছে।
মাটি কেটে নেওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের বাধা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ভাইরাল হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। জেলা প্রশাসন বলছে, মাটি কাটার বিষয়ে আগে তাদের অবগত করা হয়নি। যদিও যেকোনো প্রকল্পের কাজ করতে গেলে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
ফলে প্রকল্পের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করার আগ পর্যন্ত মাটি কাটার কার্যক্রম আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন।
শনিবার নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিনের নির্দেশে ফতুল্লা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান নূর ঘটনাস্থলে গিয়ে মাটি কাটার কাজ বন্ধ করে দেন।
ইউএনও ফয়েজ উদ্দিন মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে বিষয়টি দেখেই এসি ল্যান্ডকে পাঠাই এবং কাজটি বন্ধ দেই।”
যদিও স্থানীয়দের দাবি, সোমবার রাত ও মঙ্গলবার সকালেও পিলারের নিচে মাটি কাটা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলেছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “মাটি খুঁড়ে নেওয়া হয়েছে, বিষয়টা এ রকম না। ওখানে যখন ব্রিজ হয়েছে, কিছু প্রতিবন্ধকতা কিন্তু রাখা হয়, ছোট ছোট ব্যারিয়ার তৈরি করা হয়। সেখান থেকে প্রয়োজনে মাটি সরানো হয়েছিল।”
সেতুমন্ত্রী বলেন, “এটা কনস্ট্রাকশনের অংশ হিসেবে থাকে, কিন্তু দীর্ঘদিন সরানো হয়নি। ওটা দিয়ে একটু উঁচু হওয়ায় ওখান থেকে আবার মই দিয়ে কিছু কিছু জিনিস চুরি হয়েছে বা হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে সার্বিক বিবেচনা ওটা সরানো হয়েছিল। অতিরিক্ত মাটি ছিল, অবস্ট্রাকল তৈরি করার জন্য, কনস্ট্রাকশন কাজের সহায়ক হিসেবে।’
এদিকে মাটি কাটার সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সম্পৃক্ততা এবং মাটি ইটভাটায় বিক্রির অভিযোগ ওঠেছে।
তবে ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটু বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এ কাজ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনই করছেন। দলীয় লোকজনের এ কাজে কোনও সম্পৃক্ততা নেই।
সোম ও মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা রেল সংযোগ সেতুর ৮৪ থেকে ৯১ নম্বর পিলারের অংশে অন্তত ১৫ ফুট মাটি কেটে ফেলা হয়েছে। সেতুর আশপাশের জমি, পাশের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পঞ্চবটি-পোস্তগোলা) পুরাতন সড়কের সমান্তরালে থাকলেও মাটি কেটে নেওয়ায় সেতুর নিচের পিলারের অংশ নিচু হয়ে গেছে। এসব জায়গায় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় সেখানে বৃষ্টির পানিও জমে গেছে।
সেতুটির আরেক অংশ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কে পশ্চিম পাশে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে থাকলেও সেখানে মাটি কাটা হয়নি। ওই জায়গাটিও সড়কের সমান্তরাল উচ্চতায় রয়েছে। এ সেতুটির আশপাশে বেশকিছু নির্মাণ সামগ্রী বিক্রির মোকাম ও ইটভাটা রয়েছে।
দুদিনে স্থানীয় লোকজন, প্রশাসন ও পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
তাদের ভাষ্য, এক বছর আগেও এই সংযোগ সেতুর পিলারের মাটি কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই সময় স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে ওই কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। মাসখানেক আগে মাটি কাটার কাজ পুনরায় শুরু হয়। এ সময়ও স্থানীয়রা বাধা হয়ে দাঁড়ান। পরে কার্যক্রম আবার শুরু হয়।
রেল সেতুটির পাশে একটি সিমেন্ট কারখানায় কাজ করেন বগুড়া জেলার বাসিন্দা মো. আমিনুর। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে রেল সংযোগ সেতুর নিচে পিলার ঘেঁষে মাটি কাটতে দেখছেন তিনি।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “এই সেতুটির নিচে মাটি কাটা হলে পিলার দুর্বল হয়ে পড়বে। এই কারণে লোকজন বাধা দিয়েছিল।”
আলীগঞ্জের বাসিন্দা মোসলেহ উদ্দিন সজল বলেন, “কোনো ব্রিজের পিলারের নিচে এমনে মাটি কাটতে আমরা কখনো দেখিনি। এত বড় ট্রেন রানিং অবস্থায় এই সেতুর উপর দিয়ে যাবে, পিলারের নিচে মাটি কাটলে তো ঝুঁকি তৈরি হবেই।
“ভয়াবহ দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। এইটা তো যেকোনো সাধারণ মানুষও জানে। এখন সরকারি লোকজনই এই কাজ করলে তো আমাদের কিছু বলার থাকে না।”
পিলারের নিচে এইভাবে মাটি কেটে ঝুঁকি তৈরি না করে সেতুর নিচে বাইপাস সড়ক নির্মাণ করারও প্রস্তাব দেন স্থানীয়দের অনেকে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হয় রেল সংযোগ প্রকল্পের কর্মকর্তা রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক অ্যান্ড ওয়ার্কস) আবু ইউসুফ মোহাম্মদ শামীমের সঙ্গে। তিনি বলেন, “এ প্রকল্প এলাকাটিতে নিচু জমি এবং জলাশয় ছিল। প্রকল্পের কাজের সময় নিজ উদ্যোগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাটি-বালু ফেলে ভরাট করেছিল।
“এজন্য তাকে কোনো পেমেন্টও করা হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী বলা আছে, প্রকল্প সাইটটিকে রেস্টোরেশন করতে হবে। মানে, আগে যেমন ছিল এলাকাটি তেমনই রাখতে হবে। তারই অংশ হিসেবে মাটি কাটা হচ্ছে। অবশ্যই সেফটি নিশ্চিত করেই এ কাজটি করতে হয়।”
তিনি বলেন, “আমাদের কনসালটেন্ট হচ্ছে বাংলাদেশ আর্মি। তাদের তত্ত্বাবধানেই ওদিকের সাইটটি আগের মত করা হচ্ছে। আগে কেমন ছিল তার ডেটা আমাদের কাছে আছে। ওইটা অনুসারেই কাজ করার কথা। ওইটা অনুসারে কাজটা যাতে করে, মানে ঠিকাদার যাতে বেশি কিছু না করে সেজন্যই আর্মি সেটার তত্ত্বাবধানে আছে।”
এ প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড’।
রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম বলেন, “কাজটি পেয়েছে চায়নার প্রতিষ্ঠান, কিন্তু তারা হয়তো মাটি কাটার কাজটি অন্য কাউকে দিয়ে করাচ্ছে।”
২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত এ প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, “রেল সেতুর পিলারের নিচে মাটি কাটার বিষয়টি নজরে আসার পরই ইউএনও ও এসিল্যান্ডকে সেখানে পাঠানো হয়। স্থানীয়ভাবে যেকোনো প্রকল্পের কাজ করার সময় স্থানীয় প্রশাসনকে অবগত করাটাই নিয়ম।
“কিন্তু এক্ষেত্রে তা তারা করেননি। আমরা জেনেছি, এটি তাদের প্রকল্পের অংশ। আমরা তাদের কাছে প্রোপার কাগজপত্র চেয়েছি। আপাতত কাজটি বন্ধ রয়েছে।”
মঙ্গলবার দুপুরে আবারও প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান ইউএনও ফয়েজ উদ্দিন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “কাজটি বন্ধ। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন কিছু কাগজপত্র দেখান, কিন্তু তাতে আমরা স্থানীয় প্রশাসন সন্তুষ্ট হইনি। আমরা বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি, শিগগির এ নিয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।”
এ ব্যাপারে ‘চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড’ এবং সেনাবাহিনীর বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
