Published : 05 Aug 2025, 12:49 AM
গত বছরের ৩ অগাস্ট, সে দিন নতুন এক বাংলাদেশ এবং রাজনীতিতে নতুন ‘বন্দোবস্ত’ প্রতিষ্ঠার আশা জাগানিয়া এক দফার আন্দোলেনের ঘোষণা এসেছিল; তার দুদিনের মাথায় পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের।
সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পথ ধরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ইতিহাস বদলে দেওয়া ৩৬ দিনের ওই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উদযাপন করছে বাংলাদেশ।
এই এক বছরে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ছিল বিচার, সংস্কার আর নির্বাচন। নজিরবিহীন সেই অভ্যুত্থান এক বছরে দেশকে কতটা বদলাতে পেরেছে, সেই প্রশ্নও জনপরিসরে রয়েছে।
অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা যে ‘দায় ও দরদের’ রাজনীতির কথা বলেছিলেন, সেটাই বা এগোলো কত দূর? বছর ঘুরে সে দিকটাতে নজর দিয়েছেন সাধারণ মানুষ।
দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকার যে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সাড়ে পাঁচ মাসের আলোচনার পর তার ফলাফল কী হতে যাচ্ছে, সেই প্রশ্ন থাকছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের দমন-পীড়নের বিচার ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি কত দূর?
বেকার তরুণের মধ্যে যে স্বপ্ন ও আশা জেগেছিল তাতে রাষ্ট্র কী করতে পারল? ব্যবসা-বাণিজ্যেই বা কী পরিবর্তন এল?
অন্তর্বর্তী সরকার অনেক পরিবর্তনের আভাস দিলেও বাস্তবে রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা কূটনৈতিক কর্মকৌশলে মৌলিক কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি—বিশ্লেষকদের এমনটাই মত।
আন্দোলনের গর্ভে জন্ম নেওয়া ছাত্রনেতাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি কি রাজনৈতিক খেলায় খেই হারিয়ে ফেলেছে?
আন্দোলনের ঝাণ্ডা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, নতুন ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ কেউ চাঁদাবাজির অভিযোগের বাইরে থাকতে পারছে না।
অভ্যুত্থানের এক বছর পরের পরিস্থিতির মূল্যায়ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলছেন, “খুব যে বড় কোনো পরিবর্তন আমরা পেয়েছি, তা বলব না।”
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পার্থক্যের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “একটাই পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু এটা একটা বিশাল পরিবর্তন। আমরা এখন কথা বলতে পারি, ‘ভয়হীনভাবে’ মতামত প্রকাশ করতে পারি—এটাই আমার মনে হয় সবচেয়ে বড় অর্জন। এটা এক বিশাল পার্থক্য।”

যদিও নতুন ‘বন্দোবস্ত’ এখনও ‘দৃশ্যমানভাবে শক্তিশালী’ হয়ে ওঠেনি বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন।
বরং মাইলস্টোন স্কুলে বিমানবাহিনীর বিমান দুর্ঘটনাসহ দেশের নানা সংকটে বর্তমানে মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের ‘লোক দেখানো’ রাজনীতি চলছে বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক নাসরীনের ভাষ্য, “এই যে আমাদের একের পর এক ঘটনাগুলো ঘটছে। যদি আমরা চাঁদার কথা বলি, আমরা যদি বিমান দুর্ঘটনার কথা বলি, সেখানে কিন্তু আমরা দায় এবং দরদ কোনোটাই দেখতে পাইনি।
“বরং আমরা দেখেছি রাজনীতিবিদরা একটা লোক দেখানো রাজনীতি করছেন এবং সেটা বিএনপি থেকে এনসিপি পর্যন্ত সবাই।
“জামায়াত, বিএনপি, এনসিপি সবাই বিষয়গুলো নিয়ে এক ধরনের ‘রাজনীতিকরণের’ চেষ্টা করছে। সুতরাং এটাকে যদি আমরা দায় ও দরদ বলি, এটাকে, সেই জায়গাতে, আমি মনে করি যে নতুন বন্দোবস্ত, আমার কাছে ‘অস্পষ্ট’।
“আসলে কোনো ধরনের নতুন বন্দোবস্ত এখনও পর্যন্ত আমাদের কাছে ‘দৃশ্যমানভাবে শক্তিশালী’ হয়ে ওঠেনি।”
ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনে ২০২৪ সালে ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনের ইতি ঘটে। দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী। তার সরকারের সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও আওয়ামী লীগের নেতাদের কেউ কেউ ধরা পড়েছেন। বিদেশে বা আত্মগোপনে চলে গেছেন বেশিরভাগ নেতা।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় হত্যার ঘ্টনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে এবং দুর্নীতির অভিযোগে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও নেতাকর্মীদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়া চলছে।
বিচার দৃশ্যমান করার বিষয়ে অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর দাবির মধ্যে শুধুমাত্র সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। প্লট দুর্নীতি মামলায় শেখ হাসিনা পরিবারের বিচার শুরুর আদেশ হয়েছে।
এছাড়া আওয়ামী লীগ, তার সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সকল প্রকার কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
রাজনীতির নতুন জমিনে আবির্ভাব ঘটেছে বহু নতুন দলের। ১৪৪টি দল নিবন্ধন পেতে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছে। নির্বাচন কমিশন ভোট প্রস্তুতির মধ্যে থাকলেও নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়নি।
বরং সংস্কার ও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যে ফাটল দেখা যাচ্ছে।

রাজনীতিতে কী পরিবর্তন এল?
অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে ‘রাষ্ট্র মেরামত’ সংক্রান্ত রাজনীতি চর্চায় একটা ‘ইতিবাচক’ পালাবদলের হাওয়া লেগেছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় তার জোট সঙ্গীরা একধরনের চাপে রয়েছে; আওয়ামী লীগ আমলের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি কিছু কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করলেও অন্যদের কোনোকিছু দেখা যায় না।
গতবছর ঢাকায় জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ‘মব’ সহিংসতার শিকার হয়। বরিশালে দলের কার্যালয়, রংপুরে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরর বাসায় হামলা হয় চলতি বছর।
আওয়ামী লীগের মত জাতীয় পার্টি ও জোট সঙ্গীদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার ও নিবন্ধন স্থগিত করার দাবি ওঠছে মাঝে মাঝে।
গোপালগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিতে ঘিরে হামলা-সংঘাত এবং গুলিতে পাঁচজনের মৃত্যুর ঘট্নায় ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ও রাষ্ট্রের ‘ব্যর্থতা’ দেখেছে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র।
অপরদিকে এ ঘটনার পর বিএনপি বলেছে, এনসিপি সরকারের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে প্রকৃত রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করবে বলে তারা আশা করে।
আত্মপ্রকাশের সময় থেকে এনসিপির ভূমিকা নিয়ে নানা সময়ই প্রশ্ন উঠেছে—তারা কতটা স্বাধীন, আর কতটা সরকারের ঘনিষ্ঠ। বির্তক এখনো পিছু ছাড়েনি। পদযাত্রা কর্মসূচিতে আপত্তিকর মন্তব্য করায় কক্সাবাজার ও নেত্রকোণায় বিএনপির বিক্ষোভের মুখে পড়েছে দলটি।
এনসিপি যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন রাজনৈতিক ধারায় পরিবর্তন না আসার কথা স্বীকার করেন। তাদের আশা পূরণ না হওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে ‘পেশিশক্তির’ রাজনৈতিক ধারা ধরে রাখার কথাও বলেন তিনি।
তার ভাষ্য, “আমরা খুবই আশাবাদী ছিলাম যে অভ্যুত্থানে যে রাজনৈতিক দলগুলো ছিল, তারা তো দীর্ঘদিনের নির্যাতিত। নিষ্পেষিত ছিল তারা। একসময় মজলুম ছিল এবং তারাই আমাদেরকে সব থেকে বেশি সহায়তা করবে।
“…কিন্তু আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি, মজলুম এখন জালিম হয়ে যাচ্ছে। আমরা সোহাগ হত্যাকাণ্ড দেখেছি বা ১৩০ জনের উপরে এখন পর্যন্ত নিজেরা নিজেরা (দলের ভেতর) তারা খুন করেছে। অথচ এগুলো থাকবে না নতুন বন্দোবস্তে। অর্থাৎ রাজনীতির ভিতরে থাকবে তর্ক-বিতর্ক। পেশিশক্তির রাজনীতি দূর করাটাই হল নতুন বন্দোবস্ত।”

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ এবং তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র জাতীয় পার্টির দলনিরপেক্ষ সমর্থকরা—যাদের কোনো আনুষ্ঠানিক দলীয় পরিচয় নেই—তাদের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে, সে প্রশ্নের এখনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
অধ্যাপক দিল রওশন মনে করেন, জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে এটি কোনো রাষ্ট্রীয় বাধা নয়, বরং নিজেদের নেতৃত্ব সংকটের ফল।
তার ভাষায়, “আগের সরকারের আমলে রাজনৈতিক দলের কোনো সভা-সমাবেশ করতে হলে অনুমতির জন্য ঘুরতে হত, এখন সেই পরিস্থিতি নেই। এখন অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে, অনুষ্ঠানও হচ্ছে।”
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, তাই তারা আপাতত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে পারছে না—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু জাতীয় পার্টির কার্যক্রম বন্ধের পেছনে সরকারের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং তাদের ভেতরে নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল রয়েছে—কে নেতা হবেন, কে কথা বলবেন, এ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এজন্যই হয়তো তারা এখনো প্রকাশ্যে আসতে পারছে না বা সক্রিয়ভাবে মাঠে নেই।”
তবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির জন্য নির্ধারিত স্থানে অনুমতি না পাওয়ার অভিযোগ তুলে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ আনেন।
১ জানুয়ারি ঢাকার সেগুনবাগিচায় দলীয় কার্যালয়ের সামনে শোভাযাত্রা শুরুর আগে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণ থেকেই এই বৈষম্যের প্রমাণ মেলে।
অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দিনে বঙ্গভবনে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় পার্টিও উপস্থিত ছিল।
সেই সূত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রথম দফার সংলাপে জাতীয় পার্টিকেও আমন্ত্রণ করেছিলেন।
তবে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায় যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এরপর থেকে সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনায় জাতীয় পার্টিকে আর ডাকা হয়নি।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন মেরুকরণও ঘনীভূত হচ্ছে, সেখানে জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামপন্থি দলগুলোকে এক কাতারে দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রশ্নে এনসিপির অবস্থান জামায়াতের কাছাকাছি থাকছে।

অভ্যুত্থানের এক বছরে রাজনীতিতে বিরোধী মত ও পথ দমনে ‘মব’ সহিংসতা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার নজিরবিহীন কাণ্ডও দেখেছে মানুষ। এ সময় থানায় গিয়ে অভিযুক্তকে ছাড়িয়ে আনা বা থানায় ধরে নিতে পুলিশকে বাধ্য করা হয়েছে। নৈতিক ‘পুলিশিং’ করতেও জায়গায় জায়গায় দেখা গেছে।
‘মব’ সৃষ্টি করে হামলা আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জুলাই মাসে ‘মব’ সহিংতা ও গণপিটুনিতে ১৬ জন হত্যা শিকার হওয়ার তথ্য দিয়েছে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরসারি সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। জুন মাসের যে প্রতিবেদন তারা দিয়েছে, সেখানে এমন ঘটনায় ১০ জন নিহত হওয়ার তথ্য ছিল।
‘মব সংস্কৃতি’ গড়ে ওঠার কথা মেনে নিলেও অধ্যাপক দিল রওশন মনে করেন, এখন সবাই আগের চেয়ে বেশি করে কথা বলার ‘সুযোগ’ পাচ্ছেন। আগে যেখানে ভয় কাজ করত, এখন শিক্ষক হিসেবে তিনি দেখছেন—মানুষ ‘নির্দ্বিধায়’ মত প্রকাশ করছে।
তার ভাষায়, “আসলে শিক্ষক হিসেবে আমার জায়গা থেকে আমি যতটুকু দেখি, মবের সংস্কৃতিটা ‘আলাদা’। কিন্তু কথা বলার ক্ষেত্রে আমরা সবাই নির্দ্বিধায় কথা বলি।”
রাজনীতিতে সহিংসতার ঘটনা রয়ে গেছে। এমএসএফের জুলাই মাসের প্রতিবেদন বলছে, এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ৪২টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বিএনপির অন্তঃদ্বন্দ্বে ২৭টি ঘটনা রয়েছে।
এছাড়া বিএনপি-আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের দুটি, এনসিপির অন্তঃদ্বন্দ্বের দুটি, বিএনপি-এনসিপি দ্বন্দ্বের ৩টি, বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষের একটি, এনসিপি-পুলিশ-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের একটি, বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের চারটি, আওয়ামী লীগ-জামায়াত সংঘর্ষের একটি ও উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার অনুসারী ও বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের একটি ঘটনা ঘটেছে।

সংস্থাটি জুলাই মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় নয়জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে। এর মধ্যে চারজন বিএনপির। আর পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে গোপালগঞ্জের সংঘাতে।
বিএনপির চারজনের মধ্যে তিনজনই দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে আর একজন জামায়াতের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন।
এমএসএফের তথ্য অনযায়ী, জুন ও তার আগের মাস মে’তে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৮ জন করে নিহত হয়েছিলেন।
নতুন ‘বন্দোবস্ত’ কী খোলসা হল?
নতুন রাজনৈতিক ‘বন্দোবস্ত’ প্রতিষ্ঠায় এখনো হাল না ছাড়ার বার্তা শোনা যায় এনসিপির সভা-সমাবেশে। তার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন বলেছেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তবে গত এক বছরে মানুষের কাছে এ বিষয়টি কতটা খোলসা করতে পেরেছেন তারা, সে মূল্যায়নও হচ্ছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন ‘বন্দোবস্ত’ নিয়ে জোর আলোচনার শুরু ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের রাতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ফেইসবুকে একটি মানচিত্র পোস্ট করলে।
এতে বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মণিপুরসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কয়েকটি রাজ্য যুক্ত ছিল। ১৯৪৭ সালে বাংলার বিভাজনের ধারাবাহিকতায় গঠিত বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ‘খণ্ডিত’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি লেখেন, ‘নতুন ভূ-খণ্ড ও বন্দোবস্ত লাগবে’।
তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ওই পোস্টটি মুছে দেওয়া হয়।
এরপর ২০ ডিসেম্বর ভারত সরকার ‘তীব্র প্রতিবাদ’ জানায়। নয়া দিল্লিতে সাপ্তাহিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “আমরা বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের সরকারের কাছে প্রতিবাদ করেছি। এই বিষয়ে আমাদের তীব্র প্রতিবাদ রয়েছে। আপনি যে পোস্টের কথা উল্লেখ করেছেন, তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।”
এরপর বিভিন্ন সময়ে ছাত্র নেতাদের তরফে নতুন ‘বন্দোবস্তের’ কথা শোনা যায়। ‘পুরোনো খেলা’ বন্ধ না হলে আরেক গণঅভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নেওয়ারও কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ছিলেন সম্মুখসারির নেতা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে সেখানেও যোগ দিয়েছিলেন তিনি। পরে পদত্যাগ করে তরুণদের নিয়ে গঠিত এনসিপির শীর্ষ পদ গ্রহণ করেন।

দলটির জুলাই মাসজুড়ে পদযাত্রা কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জে সমাবেশ করেন নাহিদ। সেখানে তিনি বলেন, “নতুন বন্দোবস্তের যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমরা গণঅভ্যুত্থানে লড়াই করেছিলাম, সেই বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে যেতে হবে। এই যুদ্ধ সেদিনই শেষ হবে যেদিন পুরোনো বন্দোবস্তের পরিবর্তন ঘটিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করব।”
নতুন বন্দোবস্ত বলতে এনসিপি কী বোঝাচ্ছে জানতে চাইলে দলটির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক তুহিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ। এর দ্বারা আমরা যেটা বলি যে মানুষ ফ্যাসিস্ট হইতে যে সহায়তা, যে বিধানটাকে করে সেই বিধানটা অর্থাৎ বাংলাদেশের ’৭১ এর ‘মুজিববাদী’ সংবিধানটা আছে সেটার ‘বিলুপ্ত’ করা।”
স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে বিভিন্নভাবে ‘ফ্যাসিবাদ’ কায়েম করেছে সে সময়কার সরকার, এমন দাবি করে তিনি বলেন, “এতদিন বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দিল্লি কেন্দ্রিক ছিল, পিন্ডি কেন্দ্রিক ছিল। সেই জায়গাগুলো থেকে জনগণ ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু, জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচন মানে যেটা গণতন্ত্র বলতে বোঝায়, সেই বন্দোবস্তের কথা বলছি। অর্থাৎ মানুষের জন্য রাষ্ট্র হবে।
“এবং পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধের যে তিনটা ‘মূলনীতি’ ছিল- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার-সেটা নিশ্চিত করা। এটাকেই আমরা নতুন বন্দোবস্ত বোঝাচ্ছি।”

একইভাবে বর্তমান সংবিধান বিলুপ্ত করে নতুন ‘গঠনতন্ত্র’ তৈরির পরামর্শ কলামনিস্ট ও চিন্তক ফরহাদ মজহারের। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বারবার তিনি এমন পরামর্শ দিয়ে এ গঠনতন্ত্র গ্রহণে গণপরিষদ নির্বাচনের কথা বলেন।
সেটি না হওয়ায় দেশে ‘রাজনৈতিক জটিলতা’ এবং ‘অস্থিরতা’ তৈরি হয়েছে বলে তার মত। এর মধ্য দিয়ে জনগণ একটা ‘অনিশ্চিত’ জায়গায় চলে গেছে বলেও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে তার মন্তব্য তুলে ধরেন।
মজহার বলেন, “আমরা তো সরকার পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করিনি। অভ্যুত্থান মানে হল রাষ্ট্র গঠন।”
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কীভাবে গঠিত হয় তার কিছু প্রক্রিয়া আছে তুলে ধরে ব্যাখ্যা করেন তিনি।
তার মতে, গণঅভ্যুত্থান হয়ে যাওয়ার পর নেতৃত্ব দেওয়া শক্তিকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণ করতে হয়। তারপর নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন এবং গণপরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা গ্রহণ করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়।
মজহার বলেন, “গণপরিষদ নির্বাচিত হলে যদি সেই খসড়া সকলে পাশ করেন তাহলে সেটা জনগণের কাছে যাবে। জনগণ তখন গণভোটে এটা গ্রহণ করবে বা গ্রহণ করবে না সে তর্ক করবে এবং যখন এটা গৃহীত হয়ে যাবে তখন গণপরিষদটা বিলুপ্ত হবে। তখন জাতীয় সরকার নির্বাচন হবে নতুন গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে।”
অভ্যুত্থানের এক বছরেও ছাত্রদের ‘নতুন বন্দোবস্ত’ এর ধারণা এখনও ‘খোলাসা’ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন। এর মাধ্যমে জনগণ কীভাবে উপকৃত হবে তাও তার কাছে ‘অজানা’।
তিনি বলেন, “নতুন বন্দোবস্ত তো আসলে (তারা) খোলাসা করেনি। আমরা, আমি জানি না, মানে খোলাসা করা হয়নি। এনসিপি থেকে বারবার এই শব্দগুলো উচ্চারিত হয়েছে। নতুন বন্দোবস্ত এবং যেটা আমরা শুনেছি দায় ও দরদের রাজনীতি। এখন দায় ও দরদের বন্দোবস্ত।
“এখন সেই দায় এবং দরদটা কার জন্য কী প্রক্রিয়ায় কীভাবে এবং সেটাতে জনগণ কীভাবে সম্পৃক্ত হবে সেটাতে জনগণ কতটা লাভবান হবে, জনগণের কতটা অংশীদারিত্ব থাকবে, সেগুলো কিন্তু খোলাসা হয়নি।”
আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কমানোর কী হল?
অন্তর্বর্তী সরকারের একবছরে সবচেয়ে আলোচিত আমলাতন্ত্র, যা সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ এবং মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনার খোরাক; সেটিকে বাগে আনতে আইন করা হয়েছে।
অনানুগত্য, কাজে বাধা দেওয়া, একক বা সমবেতভাবে কাজে অনুপস্থিত থাকা, কাউকে উসকানি দেওয়া বা কাজে বাধা দেওয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ করা হয়।
অধ্যাদেশটিকে কালো আইন আখ্যায়িত করার পাশাপাশি প্রশাসনের ভেতর থেকে অভিযোগ ওঠে, এটি ক্ষমতাকে ‘কেন্দ্রীভূত করার হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
সচিবালয়ে টানা কয়েকদিনের বিক্ষোভের মুখে অধ্যাদেশটি সংশোধন করতে বাধ্য হয় সরকার।
জনমত ও আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত ‘অনানুগত্য’ শব্দটি তুলে দিয়ে নতুনভাবে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে।
তবে সংশোধিত অধ্যাদেশেও ‘সরকারের বৈধ আদেশ’ অমান্য করাকে ‘সরকারি কর্মে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অসদাচরণ’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে, যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কমানোর প্রশ্নে কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি দেখেন না সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান। তার মতে, ‘বড় মাপের’ কিছুই বদলায়নি।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গেল জুলাই আন্দোলনের সময় বহু সরকারি কর্মকর্তা যখন ফেইসবুকে আন্দোলনের পক্ষে প্রকাশ্যে মত দিয়েও চাকরিতে বহাল ছিলেন, সেখানে এবার সংশোধিত সরকারি চাকরি অধ্যাদেশে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ ও ‘স্থায়ী বরখাস্ত’ করার মত বিধান যুক্ত করে যে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, তা ১৯৬৯ সালের জরুরি আইনের এক ধরনের পুনরাবৃত্তি বলেই মনে করেন সাবেক এই সচিব।
তার ভাষ্য, “২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনটা তো অনেক ভাবনা চিন্তা করে করা। ওই আইনের সাথে এখন নতুন করে আপনি ১৯৬৯ সালের একটা মার্শাল অর্ডিন্যান্সের (সামরিক আইন) যা যা ছিল চাকরি খাওয়ার ব্যাপারে, কারণ ছাড়া এবং সময় এত কমের মধ্যে তাও, এখন সেইসব জরুরি আইনের ‘প্রত্যাবর্তন’ দেখেছি।”
সাবেক এই সচিব বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দলীয় নয় বলে তারা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে পারত।” সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নাগরিক হিসেবে হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শুরুতেই মাঠ প্রশাসনে ডিসি পদে রদবদলের সময় দেখা যায়, আগের মেয়াদে ‘বঞ্চিত’ উপসচিবরা সচিবালয়ে জড়ো হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দিনভর আলোচনার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের আশ্বাসে ফিরে যান।
যদিও এ ঘটনায় অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার ঘোষণা দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।
অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস ও কর ক্যাডারের ১৫ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে একটি বদলি আদেশ অমান্য করার অভিযোগে। আন্দোলনে যুক্ত অনেককে সাময়িক বরখাস্ত, দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত, বাধ্যতামূলক বরখাস্ত ও একের পর এক বদলি করা হয়।
সরকারি চাকরি অধ্যাদেশের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান স্বীকার করেন, এই অধ্যাদেশ প্রণয়নে ‘চতুরতার আশ্রয়’ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “যারা এই অধ্যাদেশ তৈরি করেছেন, তারা নিজেরাই সেই কৌশল অবলম্বন করেছেন।”
তবে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মসূচিকে সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করে সাবেক এই আমলা বলেন, “শুরুতে এটা নিরীহ আন্দোলন ছিল, পরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।”
এ আন্দোলনে চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা ছাড়া সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর অংশগ্রহণ ছিল।
মত প্রকাশের ক্ষেত্রে সরকারের কঠোরতার কারণ হিসেবে আমলাদের ওপর সরকারের ‘আস্থা’ না থাকাকে চিহ্নিত করেন সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান।
সরকারি কর্মীদের আন্দোলন বা মতপ্রকাশের পক্ষে তার ভাষ্য, “জুলাই আন্দোলনের সময় অনেক সরকারি কর্মচারী সক্রিয় ছিলেন। ফেইসবুকে তারা তাদের প্রোফাইলে লিখতে দেখেছিলাম। অনেক সরকারি কর্মচারী আমাদের এ আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন।”
তিনি বলেন, “সরকার একটু, মানে কোনো কারণে আস্তে আস্তে সকলের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। তারা যেকোনো বিষয়কে একধরনের চ্যালেঞ্জ মনে করছেন এবং তারা ভয় পাচ্ছেন।”

অর্থনীতি ‘আটকেই’ থাকল?
দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতি মিলিয়ে যতধরনের সূচক আছে তার বিশ্লেষণে কেবল ব্যাংকিং খাতের কিছু ইতিবাচক তথ্য মেলে। ডলারের উচ্চ মূল্যের জন্য রেমিটেন্স প্রবাহ তার অন্যতম। এর ফলে রিজার্ভ, দেশের আমদানি ও রপ্তানির ‘ব্যালেন্স অফ পেমেন্টে’ ইতিবাচকতা দেখা গেছে। এর বাইরে রপ্তানিতে সুখবর মিললেও শঙ্কা কাটেনি।
অন্তর্বর্তী সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনেকেই অর্থনীতির শিক্ষক ও গবেষক, যারা আবার জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন বিগত সরকারগুলোর সমালোচনায়।
কিন্তু রাজস্ব আদায় এবং উন্নয়ন কর্মসূচিতে ধীরগতি, দেশি-বিনিয়োগে স্থবিরতা, স্লথ জিডিপি, সরকারি কর্মীদের মধ্যে আন্দোলন ও অস্থিরতায় অর্থনীতি আশা দেখাতে পারছে না।
সরকারের পরিসংখ্যান বলছে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে ধীরগতির জেরে বিদায়ী অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে দুই দশকের সবচেয়ে কম।
২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এডিপির অর্থ ব্যয়ের হার ছিল ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে বলতে গিয়ে দেশের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে আজাদ বলেন, “আমাদের প্রধানত জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু কাস্টমারদের প্রাইস বা পণ্যের খুচরা মূল্য তো কমে গেছে, কমছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে তিনি উদ্বেগের কথা জানালেও সেই সম্পূরক শুল্ক ১৫ শতাংশ কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমানোয় আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। ভবিষ্যতেও এ ধরনের বিপদ আসতে পারে।
অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিষয়ে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলছেন, “ব্যবসায় জ্বালানি সংকট আগের মতোই তীব্র রয়েছে, তাতে নতুন করে বাড়তি সুদের হার এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে।”
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা তো আসলে তেমন ইতিবাচক পরিবর্তন দেখি না। ব্যাংকিং খাতে কিছুটা হয়েছে। এছাড়া আপনার, রেমিটেন্স বাড়াতে এবং বিনিময় হারের স্থিতিশীলতার কারণে এলসিগুলো করতে পারতেছি।
“কিন্তু সুদের হার বেড়ে যাওয়াতে আবার আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে গেছে। ব্যবসা আরও কমেছে সবখানে। তাই সংকট এখনো আমাদের যায় নাই, যার জন্য।”
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এক বছরে তো অর্থনীতির কিছু কিছু সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। আমরা দেখি বিশেষত বৈদেশিক খাতের বেলায়। রিজার্ভ, বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা, আমদানি সক্ষমতা এবং আমাদের ঋণ পরিসেবার সক্ষমতা, রেমিটেন্স ও রপ্তানি। তাই বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আমরা দেখি।
“কিন্তু এটা ঠিকই যে আমাদের আন্দোলনের বড় একটা কার্যকারণ ছিল যে শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগে চাঞ্চল্য আনা। এসব জায়গাগুলোতে তো অবশ্যই বা মূল্যস্ফীতিকে আরো দ্রুত হারে নিচের দিকে নিয়ে নামিয়ে নিয়ে আসা। এসব জায়গাগুলোতে তো অনেক কিছুই ‘মোটামুটিভাবে অপরিবর্তনই’ রয়ে গেছে।”
তিনি বলেন, দারিদ্র সীমার নিচে যারা আছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে আবার নতুন দরিদ্র হয়েছে। পুষ্টির ক্ষেত্রে অবনমন হয়েছে।
“সুতরাং ছবিটা যেরকম হবে প্রত্যাশা করা গিয়েছিল, সেইরকম ‘হয় নাই’।”
সরকার রাজস্ব আদায়েও ‘সুবিধা’ করতে পারেনি মন্তব্য করেন তিনি বলেন, “এনবিআরের মাধ্যমে আমাদের যে আরো বেশি অর্থ আদায় করা, বিশেষত প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে- এইসব জায়গাগুলোতে সংস্কারের বেশ কিছু জায়গায় ‘সুবিধা করতে পারে নাই’।”

ক্ষমতার ভারসাম্যের সম্ভাবনা কতটা?
রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে তিন ডজন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মতৈক্যে পৌঁছতে আরেক জুলাইয়ের শেষ দিন পর্যন্ত আলোচনা চলল।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাড়ে পাঁচ মাসের এ আলোচনায় ৮১টির মত প্রস্তাবে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তার সবগুলো বাস্তবায়ন করা যাবে কিনা, বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কতটা সংস্কার হবে, যেসব কারণে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে, তার সমাধান মিলবে কি না––এসব প্রশ্ন থেকেই গেল।
কারণ রাষ্ট্র সংস্কারের ১৯টি মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য পৌঁছানোর কথা বলা হলেও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার হিসেবে জুলাই সনদ বা জাতীয় সনদে সই নেওয়া নিয়ে নতুন জটিলতায় পড়েছে ঐক্যমত্য কমিশন।
জামায়াত ও এনসিপি জুলাই সনদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি তুলেছে। এ স্বীকৃতি ছাড়া জুলাই সনদে সই না করার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে তারা। এমনকি সরকার ও কমিশনের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকিও এসেছে জামায়াতের পক্ষ থেকে।
বিএনপি এ সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পক্ষে বললেও সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিরোধিতা করছে।
আর শেষ দিনের বৈঠকে সিপিবি, বাসদসহ চার দল জাতীয় চার নীতি বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে বৈঠক বর্জন করে বলেছে, জুলাই সনদে সই করার সম্ভাবনা নেই।
বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠাকে ‘সাফল্য’ হিসেবেই দেখতে চান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা।
তবে অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীনের মতে, রাষ্ট্র সংস্কার বলতে যেসব মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন বোঝায়, এত দল নিয়ে আলোচনা করে সেসব জায়গায় ঐকমত্যে পৌঁছানোর সুযোগই ছিল না। ফলে সংলাপে ‘আড়ম্বর’ যতটা হয়েছে, সাফল্য ‘ততটা আসেনি’।
আরও পড়ুন:
আর নয় ৯ দফা, এখন সরকার পতনের 'এক দফা': সমাবেশে ঘোষণা
ঘোষণাপত্র: 'সেকেন্ড রিপাবলিক' প্রতিষ্ঠায় যা যা করতে চায় এনসিপি
পুরোনো খেলা বন্ধ না হলে আরেক গণঅভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নিতে হবে: নাহিদ
উপদেষ্টা মাহফুজের ফেইসবুক পোস্টে ভারতের 'তীব্র প্রতিবাদ'
সংস্কার: ঐকমত্যের বিপুল যজ্ঞ কী প্রসব করল
ছাত্রদের দেখানো পথেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ: ইউনূস