Published : 17 Apr 2026, 12:49 AM
ইন্টারনেটে নানা বিষয়ে অবাধ তথ্যপ্রবাহ যখন সারাবিশ্বে মানুষের জ্ঞান প্রবাহে প্রভাব ফেলছে, তখন বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীরা অনলাইনে সবচেয়ে বেশি খোঁজ করছেন সরকারি চাকরির।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ৬৪ দশমিক ২ শতাংশ সরকারি চাকরির খোঁজ বেশি করেছেন। এর পরেই তাদের পছন্দের তালিকায় আছে ক্রীড়া বিষয়ক তথ্য, ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ সেই তথ্য বেশি খোঁজেন।
তরুণ-তরুণীদের আগ্রহের তালিকায় আরো রয়েছে, পাসপোর্ট সেবা, সরকারি সেবা ও অনলাইন কেনাকাটা। গত তিন মাসে সারাদেশে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ অনলাইনে পণ্য বা সেবা কিনেছেন। গত একবছরে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ অনলাইনে সরকারি সেবা নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার বিবিএস অডিটোরিয়ামে এক অনুষ্ঠানে ‘তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ এবং ব্যক্তি ও খানা পর্যায়ে ব্যবহার ২০২৪-২৫’ শীর্ষক জরিপের ফলে এসব তথ্য উঠে আসে।
জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন ‘ব্যক্তি ও খানা পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ’ প্রকল্পের পরিচালক সৈয়দা মারুফা শাকি। প্রকাশিত জরিপ ফলাফলের মোড়ক উন্মোচন করেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার।
জরিপের ফলে দেশের মানুষের ডিজিটাল দক্ষতা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত জ্ঞানের চিত্রও উঠে এসেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ডিজিটাল দক্ষতা নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের ডিজিটাল দক্ষতা ‘কপি-পেস্ট’-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
কম্পিউটার বা ডিভাইস থেকে কিংবা কোন অ্যাপ থেকে ডিভাইসে ‘ফাইল ট্রান্সফার’ করতে পারেন ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ।
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি মানুষের অনলাইন ‘নিরাপত্তার’ প্রশিক্ষণও নেই। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারী ‘ডিজিটাল ঝুঁকির’ মধ্যে রয়েছে। এই ঝুঁকির মধ্যে ‘ভাইরাস বা ম্যালওয়্যার’ সংক্রমণকেই চিহ্নিত করেছে বিবিএস।
জরিপে দেখা গেছে, দেশে ব্যক্তি পর্যায়ে মোট ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তবে এই ব্যবহারে শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় ব্যবধান আছে।
শহর এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ, গ্রামে ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ দুই অঞ্চলরে মধ্যে ব্যবধান ৩২ দশমকি ১ শতাংশ। তবে প্রতিদিন ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ একবার হলেও ইন্টারনেট ব্যবহার করছে।
জেলাগুলোর মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা, সেখানে ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার ইন্টারনেট ব্যবহার করে। আর ময়মনসিংহে সর্বনিম্ন ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার ইন্টারনেট ব্যবহার করে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই জরিপে ২ লাখ ৬৪ হাজার খানা (পরিবার) থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তথ্য নেওয়া হয়েছে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সের নাগরিকদের থেকে।
এর আগে ২০১৩ সালে ‘মডিউলার সার্ভে’ হিসেবে এই জরিপ পরিচালিত হয়েছিল। পরে ব্যক্তি এবং খানা পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ প্রকল্পের আওতায় এ জরিপ পরিচালিত হয়ে আসছে।
নতুন জরিপে দেখা গেছে, ব্যক্তি পর্যায়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ। ইন্টারনেট ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং কম্পিউটার ব্যবহার করছে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।
মোবাইল ফোন ব্যবহারের দিক থেকে নারীরা পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে। পুরুষের ক্ষেত্রে এই হার ৭০ শতাংশ আর নারীদের হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
জরিপের ফলাফলে বলা হয়, দেশে সাড়ে ৯৮ শতাংশ পরিবারে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে এবং ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবারে অন্তত একটি স্মার্টফোন আছে। যে কোন ধরনের একটি ফোন রয়েছে ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারে। অর্থাৎ মোবাইল ফোন একেবারেই ব্যবহার করছে না এমন পরিবারের সংখ্যা হাতে গোনা।
পরিবার পর্যায়ে স্মার্টফোন ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে ফেনী। এরপর আছে যথাক্রমে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, চাঁদপুর ও শরীয়তপুর।
পরিবার পর্যায়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে যথাক্রমে- গাইবান্ধা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, শেরপুর, ঝালকাঠি, কুড়িগ্রাম ও পঞ্চগড়।
স্মার্টফোনে পিছিয়ে থাকলেও ব্যক্তিপর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারে এগিয়ে আছে ঢাকা বিভাগ। ঢাকায় এই হার ৬৬ শতাংশ ও চট্টগ্রামে ৬৫ শতাংশ। জাতীয় পর্যায়ে ৫৫ শতাংশ পরিবারে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে।
জরিপে খানাপর্যায়ে কম্পিউটার, টেলিভিশন, রেডিও ব্যবহারের তথ্যও উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, দেশে কম্পিউটার রয়েছে ৯ শতাংশ পরিবারে; ধীরে ধীরে এর ব্যবহার বাড়ছে। এছাড়া টেলিভিশন আছে ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারে। তবে বিগত দুই বছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ বছরে টিভির ব্যবহার কমছে।
অন্যদিকে রেডিও ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে। জরিপ বলছে, ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবারে রেডিও ব্যবহার হচ্ছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে এই হার ছিল ১২ দশমিক ৮ শতাংশ ও ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
টেলিভিশনের তুলনায় রেডিও ব্যবহার কেন বাড়ছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে বিবিএস কম্পিউটার উইং এর পরিচালক কবির উদ্দীন আহমেদ বলেন, “আমরা রেডিও বলতে একটি নির্দিষ্ট যন্ত্র বুঝি। কিন্তু এখন মোবাইল, টেবিল ফ্যান, চার্জারসহ বিভিন্ন ডিভাইসে রেডিও সংযুক্ত থাকে। ফলে রেডিও শোনা সহজ হয়েছে।
“এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে এখনও রেডিও জনপ্রিয়। যেখানে ইন্টারনেট পাওয়া যায় না।”