Published : 14 Jul 2026, 09:50 AM
ঢাকার দোহারের মৈনট ঘাটে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে বুয়েট শিক্ষার্থী তারিকুজ্জামান সানির মৃত্যুর চার বছর পেরোলেও এখনো তদন্তই শেষ হয়নি। কবে নাগাদ তদন্ত সম্পন্ন হবে তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না কেউই।
এর মধ্যে পাঁচজনের হাত ঘুরে তদন্তভার বর্তমানে রয়েছে দোহারের কুতুবপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মশিউর রহমানের ওপর।
কবে নাগাদ তদন্ত শেষ হতে পারে, এমন প্রশ্নের উত্তরে জবাবে মশিউর রহমান বলেন, “এটা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার চেষ্টা করব।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটা দুর্ঘটনা না হত্যা তদন্ত শেষে জানা যাবে। সবকিছু বলা যাচ্ছে না।”
২০২২ সালের ১৪ জুলাই ঢাকা থেকে ১৬ জনের একটি দল আটটি মোটরসাইকেলে করে দর্শনীয় স্থান মৈনট ঘাটে ঘুরতে যায়। রাতে ঘাটের তীরে পদ্মা নদীতে পড়ে নিখোঁজ হয় সানি। পরদিন দুপুরে ঘটনাস্থলের পাশ থেকে সানির মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস।
ওই দিন রাতে সানির সফরসঙ্গী ১৫ জনের বিরুদ্ধে তাকে নদীতে ফেলে হত্যার অভিযোগে মামলা করেন মৃতের বড় ভাই হাসানুজ্জামান। পরে আসামিদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে তারা জামিনে আছেন।

আসামিরা হলেন—শরীফুল হোসেন, শাকিল আহম্মেদ, সেজান আহম্মেদ, রুবেল, সজীব, নুরজামান, নাসির, মারুফ, আশরাফুল আলম, জাহাঙ্গীর হোসেন লিটন, নোমান, জাহিদ, এটিএম শাহরিয়ার মোমিন, মারুফুল হক মারুফ ও রোকনুজ্জামান ওরফে জিতু।
শুরু থেকেই মামলাটি তদন্ত করছে কুতুবপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তারা। দীর্ঘ সময়েও তারা প্রতিবেদন দিতে না পারায় সানির পরিবার চাইছে, অন্য কোনো সংস্থা মামলার তদন্ত করুক। এজন্য গত ২৭ এপ্রিল ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুর রহমানের আদালতে তদন্তভার সিআইডি অধবা পিবিআইকে ন্যস্ত করার আবেদন করেন সানির ভাই হাসানুজ্জামান।
তবে আদালত সেই আবেদন নাকচ করে নৌ পুলিশকে প্রতিবেদন জমা দিতে তাগাদা দেয়। প্রতিবেদন জমা দিতে বিচারক ২ জুন দিন ঠিক করে দেন। তবে ওইদিন প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। এজন্য আদালত তদন্ত কর্মকর্তার কাছে ব্যাখ্যা চান।
সেদিন লিখিত ব্যাখ্যায় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মশিউর রহমান, এর আগে পাঁচজন কর্মকর্তা মামলা তদন্ত করেছেন। তিনি ষষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে মামলাটি তদন্ত করছেন।
“বহুল আলোচিত স্পর্শকাতর ও আলোচিত ঘটনার মামলা এটি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ক্লোজ মনিটরিংয়ে মামলার তদন্ত অব্যাহত আছে। দ্রততম সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। পুলিশ প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব হওয়ার বিষয়টি অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি।”
আদালত আগামী ৩ অগাস্ট প্রতিবেদন জমার পরবর্তী দিন রেখেছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মো. শাহরিয়ার।
তিনি জানান, প্রতিবেদন জমা দিতে এখন পর্যন্ত ৪১ বার সময় নিয়েছে তদন্ত সংস্থা।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মশিউর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মামলাটা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেখছেন। তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেব।”
যোগাযোগ করা হলে বাদী হাসানুজ্জামান বলেন, “ঘটনার চার বছর হয়ে গেছে। এখনো মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। চার বছরের ঘটনা, আর এখন পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তা চেঞ্জ হয়েছে পাঁচজন, ষষ্ঠজন তদন্ত করছেন।
“তারা নৌ পুলিশ; যথেষ্ট ইকুইপমেন্ট না থাকার কারণে তারা হয়তো তদন্ত শেষ করতে পারছে না। নৌকা, মাঝি, অভিযান নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এজন্য আমরা অন্য সংস্থাকে দিয়ে মামলা তদন্তের আবেদন করেছিলাম। আর তারাও বলছে না যে, তারা মামলা ছেড়ে দেবে। এটা বললে তো সহজ হয়ে যায়।”
সানির বড় ভাই বলেন, “যারা আসছেন (তদন্ত কর্মকর্তা) সবই চেষ্টা করছেন। কিন্তু ক্লু খুঁজে পাচ্ছেন না। পাবে কেমনে, সেখানে তো আমার ভাই আর ১৫ জন ছাড়া কেউ ছিল না।
“আর তখন সন্ধ্যা। সন্ধ্যার পর কেউ সেখানে থাকে না। তারা কেন সন্ধ্যার পর সেখানে রইল? প্রত্যক্ষদর্শীও কেউ ছিল না। ১৫ জন ফেরত আসল, আমার ভাই আসল না!”
দুই প্রশ্নের উত্তর মেলাতে পারছেন না বাদী হাসানুজ্জামান।
তার ভাষায়, “১৬ জন একসাথে গেল, আর একজন মারা গেল! তারা বলছে, স্রোতে ভেসে গেছে। আচ্ছা আমার ভাই যদি স্রোতে ভেসে যাবে, তাহলে তার লাশ আবার সেখানে (যেখানে পড়ে গিয়েছিল) পাওয়া গেল কেন? আর পানিও কিন্তু খুব বেশি ছিল না। আর তারা সবাই এক সাথে ছিল।
“আমার ভাইটা ডুবে গেল, তারা কেউ দেখল না? তার পরও সত্য উঠে আসুক। আমার কথা, আমার ভাই বাদে যদি ওই ১৫ জনের একজনের সাথে এমন ঘটনা ঘটতো, তাহলে তারা কী করত? তারা সবকিছু জানে, কিন্তু চাইলেই হয়তো সত্য বলতে পারছে না।”

ঘটনার সময় সানি বুয়েটের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাদের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার ডাঙ্গুর বেপারীকান্দি গ্রামে।
সানির মৃত্যুর দুই বছর আগে বাবা হারুন অর রশিদ গত হন। এখন মাকে নিয়ে হাজারীবাগ এলাকায় থাকছেন সিটি ব্যাংক কর্মকর্তা হাসানুজ্জামান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার মা এমনিতে সহজ-সরল টাইপের; সানি মারা যাওয়ার পর মর্মাহত। আল্লাহ কোনোরকম বাঁচায় রাখছে। সানি সেদিন দুপুরে বাসা থেকে বের হয়, আম্মা তাকে দুপুরে ভাত খেয়ে বের হতে বলেছিল।
“কিন্তু সে না খেয়ে বের হয়। এরপর থেকে মা আর ভাত খান না। আর ওইদিন ছিল শুক্রবার। আম্মা প্রতি শুক্রবার রোজা রাখেন। আগে মা আর ভাই ছিল। এখন মা ছাড়া আর কেউ নাই। যাই হোক, আমরা আশায় আছি। সত্যটা বের হয়ে আসুক। ভাইকে যেন আখিরাতে বলতে পারি, তার বিচারের জন্য ট্রাই করেছি।”
আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রণব কুমার দে বলেন, “চার বছর পরও মামলাটি তদন্তাধীন। আসামিরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। কারণ তারা তো এ ঘটনার সাথে জড়িত না। আসামিরা প্রতি ধার্য তারিখে আদালত আসছে, যাচ্ছে। টাকা-পয়সাও খরচ হচ্ছে। তারা গরিব মানুষ। কাজকর্ম করে খায়।”
তিনি বলেন, “শুধু আসামিরা হয়রানির শিকার হচ্ছে, এমনটা না; সবাই হয়রানি হচ্ছে। ল’ইয়ার কিছু টাকা-পয়সা পাচ্ছে। কিন্তু আমরা ওই টাকা চাই না। আমরাও চাই মামলার তদন্তটা দ্রুত শেষ হোক। প্রতিবেদন যেটায় আসুক, সবাই বেনিফিশারি হবে।”