Published : 23 Jun 2026, 12:23 AM
রাজধানীর ধানমণ্ডির ৯/এ সড়কের ১১ তলা একটি ভবনের নিচে শুক্রবার ভোরে পড়ে ছিল গৃহকর্মী ৯ বছর বয়সি ছোট্ট রিক্তা মণির নিথর দেহ। গৃহকর্তা-গৃহকত্রী বলছেন, ‘অসাবধনতায়’ পড়ে গিয়ে মৃত্যু; তবে বাবা-মায়ের দাবি, তাকে হত্যা করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, রিক্তা মণিকে কাজে রাখার বিনিময়ে গৃহকত্রীর কাছ থেকে নেওয়া মাত্র ১০ হাজার টাকার ‘বলি’ হয়েছে ফুটফুটে শিশুটি।
রিক্তা মণিকে ভবন থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগে তার বাবার করা মামলায় ওই বাসার গৃহকর্তা পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সবিবুর রহমান ও তার স্ত্রী ফারাহ নুসরাত বর্নিকে গ্রেপ্তার করে শনিবার দুই দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ।
সোমবার রিমান্ড শেষে তাদের ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে হাজির করা হলে বিচারক জামিন আবেদন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তবে এখনো রিক্তা মণির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কিছু জানায়নি পুলিশ।
রিক্তা মণি সুনামগঞ্জের সালনা থানার নিজগাঁও গ্রামের দিনমজুর শাহিন মিয়ার মেয়ে। পরিবারে চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে রিক্তা ছিল দ্বিতীয়।
মামলার অভিযোগে রিক্তার বাবা বলেছেন, দুই জনের মাধ্যমে মেয়েকে তিনি ওই বাসায় কাজে দিয়েছিলেন। প্রথমে গাজিবুর রহমান নামে তাদের এলাকার এক পরিচিত ব্যক্তি রিক্তা মণিকে নিয়ে আইয়ুব আলী নামে আরেক ব্যক্তির কাছে দেন। আইয়ুব আলী তাকে দিয়ে আসেন প্রকৌশলী সবিবুরের বাসায়। এর বিনিময়ে আইয়ুব ১০ হাজার টাকা নেন ওই দম্পতির কাছ থেকে।
এ বিষয়ে শাহিন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, অভাবের সংসার থেকে বেরিয়ে মেয়েটা একটু ভালো থাকবে এমন আশায় অন্যের বাসায় তাকে কাজে দিয়েছিলেন। মাসখানেক আগে চার হাজার টাকা মাসিক বেতনে ওই বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেয় রিক্তা মণি।
ওই বাসায় থাকাকালেই রিক্তা মণির সঙ্গে তার বাবা-মায়ের একাধিকবার ফোনে কথা হয়েছিল। মেয়ের কান্নাকাটিতে তারা শান্তি পাচ্ছিলেন না। এ জন্য গৃহকত্রী বর্নিকে বলেন, মেয়েকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা। কিন্তু নুসরাত তাদের বলেন, যেহেতু রিক্তাকে কাজে নিতে তাকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে, তাই মেয়েকে ফিরিয়ে নিতে হলে ওই টাকা ফেরত দিতে হবে।
শাহিন মিয়া সেটাতেও রাজি হয়েছিলেন। কথা ছিল, ১৯ জুন মেয়েকে নিয়ে আসতে যাবেন। কিন্তু তার আগেই ওইদিন ভোরে রিক্তা মণির লাশ পাওয়া যায়।
মেয়েকে হারানো এই বাবা বলেন, “এলাকার পরিচিত গাজিবুর রহমান বলেছিল ভালো বাসায় মেয়েটাকে কাজে দেবে। তার কথায় বিশ্বাস করে মেয়েকে দিয়েছিলাম। সে আবার তার পরিচিত আইয়ুব আলীর কাছে রিক্তাকে দেয়। আইয়ুব আলী ওই বাসায় রিক্তাকে নিয়ে যায়।
“একদিন মেয়েটার সঙ্গে ওর মা ভিডিও কলে কথা বলে। রিক্তা কান্নাকাটি করে বলছিল তাকে নিয়ে যেতে। আমি ম্যাডামের (গৃহকত্রী) সাথে কথা বলি। তিনি বলেন, মগের মুল্লুক পাইছ, চাইলেই নিয়ে যাবে? ওর জন্য আইয়ুব আলী ১০ হাজার টাকা নিছে। রিক্তাকে নিতে হলে ১০ হাজার টাকা নিয়ে যাবে। শুক্রবার মেয়েটাকে আনতে যাওয়ার কথা। তার আগে বৃহস্পতিবার আমার মেয়েটাকে ওরা মেরে ফেলেছে।
“আমরা গরীব মানুষ। আমি মেয়েকে হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
রিক্তা মনির মা মাজেদা বেগম বলেন, “আমার বুকটা খালি করছে ওরা। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই। মেয়ের সাথে দেখা করতে চাইলে, দিতো না। একদিন মেয়েকে ভিডিও কলে দেখি, কাঁদতেছে। বুঝেছি, মেয়েটা শান্তিতে নাই। শুক্রবার আমাদের ফোন করে বলে, রিক্তা মণি অসুস্থ। আমাশয়, পেটে ব্যথা। খবর পেয়ে আমরা ছুটে যাই। গিয়ে শুনি মেয়েটা মারা গেছে। নিষ্ঠুরভাবে ওরা আমার মেয়েটাকে মারছে। ওর হাত ভাঙা ছিল। আমি এর বিচার চাই।”
আসামিপক্ষের আইনজীবী আকতার আলী শেখ বলেন, “আসামিদের ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তারা বলেছে, ঘটনার সময় তারা ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল। সিসিটিভি ভিডিওতে দেখেছে, মেয়েটা রুম থেকে বালিশ নিয়েছে; এরপর বারান্দায় যায়। তারপর তো ওই ঘটনা। আগের দিন রাতে তাদের (দুই আসামি) একটা প্রোগ্রামে দাওয়াত ছিল। সেটা শেষ করে বাসায় আসতে দেরি হয়ে যায়। তারা ঘুমিয়ে ছিল।”
ওই আইনজীবী দাবি করেন, “আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। সরাসরি হত্যা মামলা হয়েছে, অথচ কোনো প্রমাণও নেই। যদি তারা ঘটনা ঘটাত, তাহলে তদন্তে বেরিয়ে আসত। কেন যে পুলিশ সরাসরি হত্যা মামলা নিল!”
শাহিন মিয়া বলছেন, সপ্তাহখানে আগে ভিডিও কলে রিক্তার সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। ওই সময় মেয়ের মুখ ফোলা দেখতে পেয়েছিলেন। শারীরিক নির্যাতনের কথা জিজ্ঞাসা করলে রিক্তার কাছ থেকে মোবাইল কেড়ে নেয় ফারাহ নুসরাত।
এরপর আইয়ুব আলীকে বলেছিলেন মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে। তবে আইয়ুব আগে ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে বলেছিলেন। সবশেষ শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে গাজিবুর ফোন করে বলেন, রিক্তা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে উত্তরা বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছে।
রিক্তার মা মাজেদা বেগম ও গাজিবুর রহমান দ্রুত ওই হাসপাতালে গিয়ে নুসরাতকে ফোন করেন। নুসরাত তাদের একটু অপেক্ষা করতে বলেন। কিছুক্ষণ পর মাজেদা বেগম আবার ফোন করলে নুসরাতের নম্বর বন্ধ পান। দুই ঘণ্টা পর আইয়ুব আলী ফোন করে গাজিবুরকে বলেন, রিক্তা ধানমন্ডি বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছে।
এরপর মাজেদা ও গাজিবুর বাংলাদেশ মেডিকেলে গিয়ে দেখেন, রিক্তা মণি মারা গেছে, লাশ অ্যাম্বুলেন্সে রাখা। এ সময় অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই মা মাজেদা মেয়ের লাশ উল্টো পাল্টে দেখেছিলেন। তিনি দেখেন, মেয়ের বাম হাত ভেঙে মাংসপেশী ছিঁড়ে হাড় বেরিয়ে গেছে। শরীরে ছিল অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন।
ঘটনার দিন ধানমন্ডি থানার বরাত দিয়ে ডিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও বলা হয়েছিল, শিশুটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল, বাঁ হাত ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল।
এ বিষয়ে কথা বলতে ধানমন্ডি মডেল থানার ওসি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শাহনেওয়াজকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা কেউ সাড়া দেননি।
আরও পড়ুন-
গৃহকর্মী হত্যা মামলায় স্ত্রীসহ পাউবোর প্রকৌশলী কারাগারে
'ভবন থেকে ফেলে' গৃহকর্মীকে হত্যা: স্ত্রীসহ পাউবোর প্রকৌশলী সবিবুর