Published : 26 Sep 2025, 08:19 AM
গত এক বছরে ১০ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারির পদক্ষেপ নিতে পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এই তালিকায় জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামও রয়েছে।
হাসিনা, জয় ও পুতুলের বিরুদ্ধে দায়ের করা প্লট জালিয়াতি মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা পুলিশ মহাপরিদর্শককে গত সেপ্টেম্বরে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠায়।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার স্ত্রী রুকমিলা জামান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী জীশান মীর্জার বিরুদ্ধেও রেড নোটিস জারির পদক্ষেপ নিতে পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক।
এদের বাইরে আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) এবং তার দুই ভাই গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ ও পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ হাসানের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার রেড নোটিস জারির আদেশ দেয় আদালত।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারির চিঠিতে দুদক বলছে, “মামলার তদন্তকালে জানা যায়, এজাহারনামীয় আসামি শেখ হাসিনা বিদেশে অবস্থান করছেন। ন্যায়বিচারের স্বার্থে তার অবস্থান শনাক্ত করে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করার জন্য বিজ্ঞ আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
“এমন অবস্থায় বিজ্ঞ আদালতের আদেশ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এজাহারের কপি, অভিযোগপত্রের কপি এবং পূরণকৃত রেড নোটিস ফরম সংযুক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হলো।”

জয় ও পুতুলের বিষয়ে পাঠানো চিঠিতেও প্রায় একই কথা বলা হয়েছে। চিঠিতে তিনজনের নাম নাম, এনআইডি নম্বর, বাবা ও মায়ের নাম, পাসপোর্ট নম্বর ও ঠিকানাও দেওয়া হয়েছে।
দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ''অন্যদের রেড নোটিস জারির চিঠিতেও একই ধরনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।''
দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ''প্রথমে পুলিশ রেড নোটিস জারির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাবে। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিস জারির জন্য অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠাবে।”
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। তার ছেলে জয় আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তাদের পরিবারের অন্যরাও দেশের বাইরে রয়েছেন।
তাদের নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠা করে ছয়টি প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে গত ডিসেম্বরে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এরপর ১২ জানুয়ারি প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের’ অভিযোগে ছয়টি মামলা করা হয়।
জয় ও পুতুলের পাশাপাশি এসব মামলায় শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তীকে আসামি করা হয়েছে।
ছয় মামলাতেই শেখ হাসিনাকে আসামি করেছে দুদক। অন্যদেরও কেউ কেউ একাধিক মামলার আসামি। সব মিলিয়ে ছয় মামলার আসামির সংখ্যা ২৩।
এসব মামলায় দুদক অভিযোগ করেছে, সরকারের সর্বোচ্চ পদে থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। অযোগ্য হলেও তারা পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরে ১০ কাঠা করে প্লট বরাদ্দ নেন।

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ৬ প্লট দুর্নীতির মামলায় গত ৩১ জুলাই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার সঙ্গে তাদের সন্তানসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ঢাকার দুই বিশেষ জজ আদালত।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ জাকির হোসেন গালিব বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী জীশান মীর্জার বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারির অনুমোদন দেয়। এর পরেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের পরিচালক হাফিজুল ইসলাম এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি পাঠান।
প্রায় ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে গত ১৫ ডিসেম্বর সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করে দুদক।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, বেনজীর আহমেদ নিজে ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। তার স্ত্রী জীশান মীর্জা ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার তথ্য গোপন করেন।
এ দম্পতির বড় মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, আর মেজ মেয়ে তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।

এর আগে গত বছরের ১২ জুন আদালত বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে থাকা আটটি ফ্ল্যাট এবং ২৫ একর ২৭ কাঠা জমি জব্দের আদেশ দেয়। ফ্ল্যাটগুলো ঢাকার বাড্ডা ও আদাবরে, আর জমিগুলো নারায়ণগঞ্জ, বান্দরবান ও উত্তরায় অবস্থিত। এছাড়া দুই দফায় আদালত তাদের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার, গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং শেয়ার ব্যবসার তিনটি বিও হিসাব (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) অবরুদ্ধের নির্দেশ দেয়।
গত ২১ সেপ্টেম্বর সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার স্ত্রী রুকমিলা জামানের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে ‘রেড নোটিস’ জারির জন্য দুদকের আবেদনে অনুমোদন দেন চট্টগ্রাম মহানগর স্পেশাল জজ।
এর আগে চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল ২০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে দুদক তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলার পর আদালত তাদের বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৮টি, যুক্তরাষ্ট্রে ৯টি এবং অন্য দেশে আরও কিছু স্থাবর সম্পদ রয়েছে।
এছাড়া গত ৫ মার্চ আদালত তাদের নামে থাকা ৩৯টি ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেয়। এসব হিসাবে ৫ কোটি ২৬ লাখ টাকার বেশি জমা পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে আদালত তাদের নামে থাকা ১০২ কোটি টাকার শেয়ার এবং ৯৫৭ বিঘা জমি জব্দেরও আদেশ দেয়।
এরপর ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর আদালত সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও রুকমিলা জামানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) এবং তার দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে বুধবার রেড নোটিস জারির আদেশ অনুমোদন দেয় আদালত। অনুমোদন পাওয়ার পরের দিনই পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়।
ঋণ জালিয়াতির এক মামলায় দুদকের আবেদনের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ সাব্বির ফয়েজ এ আদেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক তাহাসিন মুনাবীল হক গত ১৬ সেপ্টেম্বর তিনজনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির আবেদন করেছিলেন।
আবেদনে বলা হয়, অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তারা ইতোমধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তাই ইন্টারপোলের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় মো. সাইফুল আলম, আব্দুস সামাদ ও মোহাম্মদ আবদুল্লাহ হাসানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির অনুরোধ জানানো হয়।
এস আলমের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া কয়েক ডজন মামলার মধ্যে এ মামলা করা হয় গত ২ জুলাই।
অভিযোগে বলা হয়, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেড (বর্তমানে আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেড) থেকে মেসার্স এ এম ট্রেডিংয়ের নামে ১০৪ কোটি ২০ লাখ ৭৭ হাজার টাকার ঋণ নেওয়া হয়। পরে জালিয়াতির মাধ্যমে এই টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেডের হিসাবে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিং করা হয়।
চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তিনি আরও আটটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেন। এরপর এসব ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে এক লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।