Published : 17 Jun 2026, 06:59 PM
কোনো প্রকার ‘আইনি বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে’ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য থেকে বাংলাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ‘পুশ ইন’ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
আন্তর্জাতিক এ মানবাধিকার সংস্থা মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের এই পদক্ষেপ এবং ঠেলে দেওয়া মানুষদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির প্রতিরোধের কারণে দুই দেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী শূন্য রেখায় কয়েক ডজন পরিবার আটকা পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
বিজিবির বরাত দিয়ে এইচআরডব্লিউ বলছে, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে তারা শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশের সীমান্ত জেলাগুলোতে ‘পুশ-ইন’ করার অন্তত ২১টি প্রচেষ্টা নস্যাৎ করেছে।
গত মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ‘হিন্দু সংখ্যালঘুগরিষ্ঠ’ ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয়ী হওয়ার পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, তার সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির অধীনে বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ আটক করেছে। প্রায় ৫ হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ফেরত যেতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে এইচআরডব্লিউ এশিয়ার ডেপুটি ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “ভারত মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে পরিবারগুলোকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে কিংবা সীমান্তে আটকে রাখছে। ভারত সরকারের উচিত বেআইনিভাবে মানুষ বিতাড়ন অবিলম্বে বন্ধ করা এবং তাদের প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাদের উচিত নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুসলমানদের প্রতি এই হতাশাজনক বিদ্বেষের অবসান ঘটানো।”
বিবৃতিতে বলা হয়, এইচআরডব্লিউ এমন নয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে, যারা বিএসএফকে রাতের অন্ধকারে একদল মানুষকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করতে দেখেছেন। বেশ কয়েকটি ঘটনায় বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত বিএসএফ ওই মানুষদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা পঞ্চগড়ে গত ৫ জুন বিএসএফ শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ‘পুশ-ইন’ করার চেষ্টা করে। কিন্তু বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ তাদের গ্রহণ না করায় ওই ১০ জন টানা ৭৫ ঘণ্টা শূন্য রেখায় আটকে থাকেন।

রুবেল হোসেন নামে বাংলাদেশের এক গ্রামবাসী বলেন, “ঠেলে দেওয়া ১০ জনের দলটি বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে প্রায় ৫০ ফুট অগ্রসর হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বিজিবিকে সতর্ক করার পর তারা ঘটনাস্থলে গেলে ওই ১০ জন পিছু হটে নো-ম্যানস ল্যান্ডের একটি বাঁধের ওপর অবস্থান নেয়।
“প্রথম রাতে ওই ১০ জনের দলটিকে তীব্র বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হয়েছিল। দ্বিতীয় দিনে বিএসএফ তাদের কেবল কিছু শুকনো খাবার দিয়েছিল। তাদের ঘিরে বিপুল সংখ্যক বিজিবি ও বিএসএফ মোতায়েনের কারণে সেখানে যেন মনে হচ্ছিল যুদ্ধকালীন অচলাবস্থা চলছে। উত্তেজনা প্রশমনে দুই বাহিনীর মধ্যে বারবার পতাকা বৈঠকের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। অবশেষে বিএসএফ ওই দলটিকে ফেরত নিয়ে যায়।”
একইভাবে ৬ জুন ভোরে বিএসএফ নারী-শিশুসহ দুটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছয়জনকে বাংলাদেশের তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়। বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দিলে পরিবারগুলো সীমান্তে শূন্য রেখায় আটকে পড়ে। খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানোর পরদিন ভারতীয়রা তাদের ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়।
এরপর ৮ জুন বিজিবির পক্ষ থেকে বলা হয়, ঠাকুরগাঁও জেলার একটি সীমান্তে শূন্য রেখায় প্রায় ৪৮ ঘণ্টা আটকে থাকার পর এক গর্ভবতী মা ও শিশুসহ ১১ জনকে বিএসএফ ফেরত নিয়ে গেছে।
এইচআরডব্লিউ চলমান এই বিতাড়ন প্রক্রিয়ার জন্য ভারতের সমালোচিত ‘ভোটার তালিকা সংশোধন’ এবং নাগরিকত্ব বাতিলের রাজনৈতিক প্রভাবকে দায়ী করেছে।
সংস্থাটি বলছে, পশ্চিমবঙ্গে গত মার্চ মাসের নির্বাচনের ঠিক আগে, ভারতের নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে এবং বিতর্কিত উপায়ে ভোটার তালিকা সংশোধন করে। এর ফলে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। আর এটিই মূলত আটক এবং নির্বাসনের হুমকি সৃষ্টি করেছে।
এর আগে ২০১৯ সালে ভারতের আসাম রাজ্যে একটি ‘ত্রুটিপূর্ণ এবং বৈষম্যমূলক’ নাগরিকত্ব যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার (এনআরসি) ফলে ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে। সে সময় রাজ্যের হাজার হাজার বাংলাভাষীকে ডিটেনশন সেন্টারে (হোল্ডিং সেন্টার) বন্দি করা হয়।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা প্রায়ই রাজ্যের বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে কটাক্ষ করেন। সম্প্রতি তিনি স্বীকারও করেন, “আমরা তাদের সীমান্তের কাছাকাছি একটি সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে যাই এবং সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিই।”

বাংলাদেশের পঞ্চগড় সদরের একজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হাসিবুর রহমান এইচআরডব্লিউকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির একটি পরিবারের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, যাদের কাছে ভারতের বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র ‘আধার কার্ড’ ছিল। কিন্তু সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দেয় এবং বাংলাদেশে পুশ-ইন করার চেষ্টা করে।
হাসিবুর বলেন, “অথচ ওই পরিবারটির সবচেয়ে বয়জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি সেখানে চারবার ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এ বছর তাদের কেউ ভোট দিতে পারেননি। ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়। সীমান্তে তিন দিন আটকে থাকার পর পরিবারটিকে ভারতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।”
‘অবৈধ বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রচুর মানুষকে হোল্ডিং সেন্টার বা আটক শিবিরে আটকে রাখাকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে এইচআরডব্লিউ বলছে, সহায়তার মাধ্যমে সত্যিকারের স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। “কিন্তু ভারত যেভাবে মানুষদের জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন বাঠেলে দিচ্ছে তা উচিত নয়। এমনকি সাক্ষাৎকারে অনেকে অভিযোগ করেছেন, ভারতীয় রক্ষীরা তাদের কাগজপত্র, টাকা এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নিচ্ছে।”
ভারতের একজন সমাজকর্মী এইচআরডব্লিউকে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত এলাকার হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে আনুমানিক ৪০০ জন বন্দি আছে, যাদের অনেকেরই নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর তাদের আটক করা হয়েছে। এই তালিকা থেকে বাদ পড়াটাই এখন গ্রেপ্তার, আটক এবং বহিষ্কারের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি গোটা রাজ্যেই তীব্র ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।”
সার্বিক বিষয়ে মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “জাতীয়তা যাই হোক না কেন, সশস্ত্র সীমান্ত রক্ষীদের দুটি লাইনের মাঝখানে কাউকে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়। ভারতের উচিত এই নির্মম বহিষ্কার প্রক্রিয়া বন্ধ করা। তাছাড়া উভয় দেশের সরকারেরই নিশ্চিত করা উচিত যে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা যেন কোনোভাবেই মানুষের মৌলিক মানবিক মর্যাদার বিনিময়ে না হয়।”