Published : 22 Jul 2025, 12:10 AM
প্রশিক্ষণের সব ধাপ শেষে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম একাকী আকাশে উড়েছিলেন ‘এফ-সেভেন বিজিআই’ জঙ্গিবিমান নিয়ে। তার সেই প্রশিক্ষণ আর শেষ হল না; বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় এক বিমান দুর্ঘটনায় ঝরে গেল অন্তত ২০ প্রাণ, যাদের অধিকাংশই স্কুল শিক্ষার্থী।
আন্তঃবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর বলেছে, যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেওয়ায় সোমবার দুপুরে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে উত্তরা দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী, স্কুলে মাঠে বিধ্বস্ত হওয়ার পর বিমানটি ছেঁচড়ে গিয়ে ধাক্কা খায় দোতলা একটি অ্যাকাডেমিক ভবনে। অগ্নিগোলকে পরিণত হওয়া সেই বিমানের শিখা স্কুল ভবনটিকেও গ্রাস করে নেয়।
তখন স্কুল ছুটির সময়, অনেক অভিভাবকও ভিড় করেছিলেন ভবনটির কাছে। দুর্ঘটনার পর ভবনের প্রবেশ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বের হতে পারছিলেন না কেউ।
পরের কয়েক ঘণ্টায় যে ১৭১ জনকে ওই ভবন থেকে উদ্ধার করা হয়, তাদের অধিকাংশই মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়েছে। আর তাদের বেশিরভাগই শিশু।
আহতদের একটি বড় অংশের চিকিৎসা চলছে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। এ চিকিৎসাকেন্দ্রের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দগ্ধদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। তাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।”

এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ।
এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার দেশের সকল সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। পাশাপাশি সকল সরকারি, বেসরকারি ভবন ও বিদেশে বাংলাদেশি মিশনেও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। হতাহতদের জন্য দেশের সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এক শোকবার্তায় নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আলাদা শোকবার্তায় বলেছেন, “এই দুর্ঘটনায় বিমানসেনা ও মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক-কর্মচারিসহ অন্যান্যদের যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। জাতির জন্য এটি একটি গভীর বেদনার ক্ষণ।''
তিনি বলেন, "সরকার দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এবং সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করবে।”
কি ঘটেছিল
আন্তঃবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর জানিয়েছে, বিমান বাহিনীর ‘এফ-৭ বিজিআই’ফাইটার জেটটি সোমবার দুপুর ১টা ৬ মিনিটে উড্ডয়নের ১২ মিনিটের মাথায় বিধ্বস্ত হয়।
বিধ্বস্ত হওয়ার পরপরই উড়োজাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। অনেক দূর থেকেও সেখানে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। জ্বলন্ত উড়োজাহাজটির আগুন নেভাতে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিসের নয়টি ইউনিট। পরে বিজিবি সদস্যরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওই ভবনে বাচ্চাদের ক্লাস চলছিল। আগুনে ভবন থেকে কেউ বের হতে পারেনি। অনেকেই সেখানে দগ্ধ হয়েছে।”
দুর্ঘটনাস্থল থেকে আহত ও দগ্ধদের রিকশা, ঠেলাগাড়িসহ বিভিন্ন বাহনে করে সরিয়ে নিতে দেখা যায়। এক ডজনের বেশি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের পাঠানো হয় হাসপাতালে।
তাদের একটি অংশকে প্রাথমিকভাবে ঢাকা সিএমএইচ, উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতাল, উত্তরা আধুনিক হাসপাতাল, কুর্মিটোলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, লুবনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে নেওয়া হয়। দগ্ধদের অধিকাংশকে পরে পাঠানো হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ঘটনাস্থালে সাংবাদিকদের বলেন, তাদের কর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৯ জনের লাশ উদ্ধার করেছে।
আইএসপিআরও পরে জানায়, বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামসহ মোট ২০ জন সেখানে মারা গেছেন।
তবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান রাতে বার্ন ইনস্টিটিউটে এক সংবাদ সম্মেলনে ১৭ শিশুর মৃত্যুর তথ্য দেন। সংখ্যায় কিছুটা তারতম্যের কারণ হিসেবে তার ভাষ্য, 'সমন্বয়' করতে কিছুটা সময় লাগছে।
ওই ১৭ জনের মধ্যে আটজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এরা হলেন– ফাতেমা আক্তার (৯), সামিউল করিম (৯), মেহনাজ আফরিন হুরায়রা (৯), শারিয়া আক্তার (১৩), নুসরাত জাহান আনিকা (১০), সাদ সালাউদ্দিন (৯) সায়মা আক্তার (৯) এবং রজনী ইসলাম (৩৭)।
তুরাগ থানার পরিদর্শক নুরুজ্জামান বলেন, বিধ্বস্ত মিানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামসহ নয়জনের মরদেহ এখন সিএমএইচে আছে।
“পাইলট ছাড়া অন্যদের মরদেহ পুড়ে যাওয়ায় শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এরা শিক্ষার্থী না অন্য কেউ ডিএনএন ছাড়া পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন।”
মোট ২০ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও বাকি তিনজনের মরদেহ কোথায় আছে সে ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য দিতে পারেননি পুলিশ কর্মকর্তা নুরুজ্জামান।
এদিকে দগ্ধ এবং আহত আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এই পাঁচজন হলেন– শিক্ষার্থী তানভীর (১৪), আফনান ফাইয়াজ (১৪), জুনায়েদ (১০), এবি শামীম (১৪) এবং স্কুলের শিক্ষক মাহরীন (৪৬)।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক শাওন বিন রহমান জানিয়েছেন, আহতদের হাসপাতালে আনার পর সোমবার সন্ধ্যা থেকে চারজনের মৃত্যু হয়।
বাকি একজনকে সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত অবস্থায় আনা হয় বলে সেখানকার চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

‘দুর্ভাগ্যবশত’
দুর্ঘটনার কবলে পড়া সেই জঙ্গি বিমানের পাইলট ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ‘সর্বাত্মক চেষ্টা’ করেছিলেন বলে আইএসপিআরের ভাষ্য।
এক বিবৃতিতে আইএসপিআর বলছে, নিয়মিত প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সোমবার দুপুর ১টা ৬ মিনিটে কুর্মিটোলার এ কে খন্দকার বিমান বাহিনী ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে এফ-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমান। এরপর যানটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়।
দুর্ঘটনা মোকাবেলায় ও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম যুদ্ধবিমানটিকে ঘনবসতি এলাকা থেকে জনবিরল এলাকায় নেওয়ার ‘সর্বাত্মক চেষ্টা’ করেন। তবে ‘দুর্ভাগ্যবশত’ যানটি ঢাকার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দোতলা একটি ভবনে দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়।
ঘটনার পর দিনভর ওই এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলে; সন্ধ্যায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ রাতে কয়েকটি পিআপ ভ্যান ও কভার্ডভ্যানে করে সরিয়ে নিতে দেখা যায় সেনাবাহিনীর সদস্যদের।
যা বলছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজ ভেঙে পড়ার পর আশপাশ থেকে ছুটে এসেছিলেন অনেকে। তারা বলছেন, ঘটনার পর তারা স্কুল মাঠে একজনকে প্যারাসুট দিয়ে নামতে দেখেছেন। ভয়াল আগুনের জন্য তারা শুরুতে কাউকে উদ্ধার করতে পারেননি।
ঘটনাস্থল লাগোয়া মসজিদে সেসময় নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গাড়িচালক মো. বেলায়েত।
তিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১টা ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে বিমানটি এখানে ধ্বংস হয়। আমি তখন মসজিদে নামাজ পড়ছি। এমন বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হলে মসজিদের মাটিসহ কেঁপে উঠল। দৌঁড়ে এসে দেখি দাউদাউ করে আগুন জ্বলছিল।
“এরপর ফায়ার সার্ভিস আর্মি, ফায়ার সার্ভিস এসে দেওয়ালের একাংশ ভেঙে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। আমি নিজেই অনেককে কুয়েত-মৈত্রী, উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করেছি।”
ঘটনাস্থলে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা হাজী আলমাস বলেন, “এখানে আসার পরেই দেখলাম বিমানটা কয়েকটা পল্টি খেল। তার পরই এমন সাউন্ড হল, বলার মতো না। আগুন লেগে দুই থেকে তিন সেকেন্ডের মধ্যেই এখানে পড়ল। পাইলটকে তখনো বের হতে দেখিনি।”
শিরান আহমেদ ফাহিম নামের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “আমার বাসা পাশেই। আমি ঘটনা শুনেই দৌঁড়ে আসি। তখন শুধু আর্মি সদস্যরা আসে এখানে। কয়েকজন আহতকে তখন বের করা হয়, যাদের শরীরের অনেকাংশই পুড়ে গিয়েছিল। অন্তত ১০ জন আহতকে বের করতে দেখেছি, যাদের বাঁচার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।”

এই কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদমান তানভীর বলেন, “আমরা যখন ক্লাসে ছিলাম, তখন বিস্ফোরণের মতো একটা শব্দ হইছে। আমরা কেউ বুঝতে পারিনি প্রথমে। তারপর হঠাৎ যখন সবাই দৌড়াদৌড়ি, ছোটাছুটি করল- তারপর স্যার আসলেন।
“১ নম্বর বিল্ডিংয়ে বিমানের কিছু অংশ হয়তো ব্লাস্ট হইছে। বিল্ডিংয়ের সামনে পড়ছে, যার কারণে পুরো বিল্ডিংয়ে আগুন ধরায়ে গেছে। তারপর আমরা বের হইছি। তারপর দেখি ফায়ার সার্ভিস।
“পাশেই ফায়ার সার্ভিস আর পাশেই আর্মি ক্যাম্পও ছিল। যার কারণে সবাই দ্রুত চলে আসছে। আগুন নিভাইতে বেশি সময় লাগেনি, কিন্তু ভেতরে অনেক মানুষ ছিল। ছোট বাচ্চারা ছিল। ওদেরকে বের করতে অনেক সময় লাগে।”
স্কুলের পাশেই বাসা লতিফা বেগমের। তিনি বলেন, তার ভাতিজি ক্লাস সিক্সে পড়ে।
“ক্লাসে শেষে সবে সে বাসায় ফেরে। আর অন্য বাচ্চারা কোচিংয়ের জন্য ওই ভবনের সামনে অপেক্ষা করছিল। আর তখনই ঘটনা ঘটে।”
স্কুল ভবন থেকে ১০০ গজের মধ্যে মোহাম্মদ জইমত আলীর এক্সক্যাভেটর মেরামতের গ্যারেজ। চালক আপন আহমেদ কাজ করছিলেন। উড়োজাহাজ খুব নিচু দিয়ে উঠতে দেখে তারা দুজনে কিছুটা অবাক হয়েছিলেন।
কয়েক মুহূর্ত পরেই বিকট শব্দ শুনে তারা প্রথমে ছুটে যান পাশের মেট্রোরেলের ডিপোর দিকে। পরে তারা দেখেন, স্কুল থেকে আগুন বের হচ্ছে।
জইমত আলী বলেন, “আমরা গিয়ে দেখি, একজন প্যারাসুট নিয়া নামছে। আর বহু বাচ্চা আর তাদের গার্ডিয়ানরা আগুনে পুড়ছে। সবাই ধরাধরি করে তাদের সেখান থেকে সরায়ে আনার চেষ্টা করে।
“কিন্তু আগুনের তাপ ছিল সাংঘাতিক। স্কুলের ওই বিল্ডিংটার ভেতরে ঢোকার কোনো উপায় ছিল না। ওটার ভেতরে যারা ছিল, তাদের কী অবস্থা তা জানি না।”
ভেকু চালক আপন আহমেদ বলেন, “এক জায়গায় দেখি ১০-১৫ টা বাচ্চা ডলা হয়ে পইড়ে রইছে। তাদের উদ্ধার করার কোনো উপায় আমাদের ছিল না।
“এসব বাচ্চাদের বের করা হয়েছে, তারাও সব পুড়ে গেছে। জামা-কাপড় ব্যাগ সব পোড়া।”
আশপাশে পোড়া গন্ধ, স্বজন হারানোর হাহাকার
যে ভবনে গিয়ে বিমানটি পড়ে সেটি ছিল দ্বিতল; নাম হায়দার আলী ভবন। ভবনের ওই অংশে তখন প্রতিষ্ঠানটির ইংরেজি মধ্যমের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস চলছিল। সেখানে তখন ১৫০ জনের মত শিক্ষার্থী কোচিং ক্লাস করছিলেন বলে জানিয়েছেন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শান্ত।
ওই ভবনে দুটি তলা মিলিয়ে মোট ১৬টি ক্লাসরুম আছে। আর ৪টি শিক্ষকদের রুম ছিল বলেও জানান শান্ত।
দুর্ঘটনার পর কেউ-কেউ ছুটে যাচ্ছিলেন নিজের বাচ্চার খোঁজে। কেউ প্রিয় বন্ধুর খোঁজ পেতে ছুটছিলেন। ঘটনাস্থলে থাকা র্যাব, সেনাবাহিনী, পুলিশ, এপিবিএন এবং বিমানবাহিনীর সদস্যরা ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন।
পঞ্চম শ্রেণির আরিফা নামের একজনকে খুঁজতে এসেছিলেন তার বন্ধু হৃদয় ইসলাম। কিন্তু, বিকাল পাঁচটা পর্যন্তও বন্ধুর খোঁজ মেলেনি।
তিনি বলেন, “ওর মাইয়ের কাছে আমি প্রথম খবর পাই। আমি তাকে ফেরত চাই। আহত হলেও অন্তত ফেরত পেলেই চলবে। ভেতর থেকে এখন পর্যন্ত যতজনকে উদ্ধার করা হয়েছে, সবার শরীর পুড়ে গেছে বলে জেনেছি।”
নিজের মেয়ের জন্য বিলাপ করতে করতে ছোটাছুটি করছিলেন তানিয়া আহমেদ নামের একজন। মেয়ে রাইসা আহমেদ নিখোঁজ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তিনি বার বার অনুরোধ করছিলেন ভেতরে যেতে দিতে।

একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স ছুটে যাচ্ছিল সাইরেন বাজিয়ে, সেগুলোকে পাহারা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সামরিক যান। বাশি ফুঁয়ে ভিড় সামাল দেয়ার চেষ্টা করছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা।
এর মাঝেই এক নারী চিৎকার করতে করতে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। ফোনের ওপাশে ব্যক্তিকে কাঁদতে কাঁদতে বার বার জিজ্ঞেস করছেন ‘মিস আমার বাচ্চা কই’।
তিনি যখন চিৎকার করে কাঁদছিলেন তখন স্কুল ফটকে জড়ো হওয়া স্থানীয়রা তার সন্তানের এবং ক্লাসের নাম জানতে চান। তিনি বলেছেন তার ছেলের নাম সাজ্জাদ সাদী, ছেলেটি দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
সেখানে উপস্থিত একজন এই অভিভাবককে আশ্বস্ত করে বলেন, “আপা একদম চিন্তা করবেন না। ক্লাস টেনের বাচ্চাদের কিছুই হয়নি। আমরা ভেতরে গিয়েছিলাম। ক্লাস ফোর আর ক্লাস ফাইভের বাচ্চারাই মূলত বেশি হতাহত হয়েছে।”
ওই অভিভাবক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার ছেলের প্রিটেস্ট পরীক্ষা চলছে। ওর কাছে ফোন নেই, এতটা সময় হয়ে গেল কিন্তু ও কোনো খবরও দেয়নি। আমি কোনোরকমে এসেছি। ওর ক্লাস টিচারকে ফোন করেছি তিনি কিছু জানেন না। ওর মিসরাও কোন খবর দিতে পারেননি।”
যে ভবনে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়, তার পেছনের অংশে বিমানটির অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করে জড়ো করেছিলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। সেখানে আংশিক পুড়ে যাওয়া চেয়ার, টেবিল, স্কুলব্যাগের উচ্ছিষ্টাংশ দেখা যায়।
প্রতিষ্ঠানটির একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশরাক ইসলাম ইমন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা আমাদের আরেকটা ক্যাম্পাসে ক্লাস করছিলাম। পরে আমাদের ক্লাস টিচার জানানোর পর আমরা এখানে ছুটে আসি। এসে দেখি এখানে আগুন জ্বলছে।”
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরও সেখানে পোড়া গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। পুড়ে যাওয়া মানুষ আর জ্বালানির গন্ধ আশপাশের কিছুদূর পর্যন্তও পাওয়া যাচ্ছিল।
উদ্ধার অভিযানে নিয়োজিত নিক্সন নামের একজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিমানটি ভবনে এমনভাবে পড়েছে, যে সেখানের সব কিছু পুড়ে গেছে। রুমের সিলিং ফ্যানটি পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আমরা একটি ব্যাগ উদ্ধার করেছিলাম, সেটি পুড়ে কয়লা হয়ে গেছিল।”ে
এদিকে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার পর আতঙ্কে পড়েছেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবকরা। চারটি হোস্টেলে থাকা আবাসিক শিক্ষার্থীদের তারা সরিয়ে নিচ্ছেন। যাদের পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় থাকে না, তারাও আত্মীয়স্বজনের বাসায় চলে যাচ্ছে।
আহতদের অধিকাংশই শিশু
বিমান বাহিনীর উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় দগ্ধ হওয়া ৩৯ জনের একটি তালিকা দিয়েছে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। দেখা গেছে, দগ্ধদের বেশির ভাগের বয়সই ১০ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ১১ জন।
এরিকসন ও মেহরিনের শরীরের শতভাগ দগ্ধ হয়েছে। দুজনের দগ্ধ হয়েছে ৮০ শতাংশ করে। তারা হলেন ১৩ বছর বয়সী নাজিয়া ও মাহতাব।
৬২ শতাংশ দগ্ধ হয় ১৫ বছর বয়সী মাকিনের। ৬০ শতাংশ করে দগ্ধ হন আয়ান (১৪) ও মাসুমা।
অন্যদের মধ্যে তাসনিয়ার ৩৫ শতাংশ, ১১ বছর বয়সী আরিয়ানের ৫৫ শতাংশ, আশরাফুল ইসলামের ১৫ শতাংশ, রোহানের ৫০ শতাংশ, শ্রেয়ার ৫ শতাংশ, কাব্য ২০ শতাংশ, ইউশা ৬ শতাংশ ও রূপী বড়ুয়ার ৬ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
এছাড়া তাসমিয়া ৫ শতাংশ, জায়ানা ৮ শতাংশ, সাইবা ৮ শতাংশ, পায়েল ১০ শতাংশ, আবির ২০ শতাংশ, কাফি আহমেদ ১০ শতাংশ, মুনতাহা ৫ শতাংশ, আলবিনা ৫ শতাংশ ও নিলয়ের শরীরের ১৮ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
বার্ন ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের বাইরে অপেক্ষায় আছেন এসব শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা। যাদের আহাজারিতে ভারি ওঠে সেখানকার পরিবেশ।
সারা শরীর পুড়ে যাওয়া ১১ বছর বয়সী আরিয়ানের যখন জরুরি বিভাগের ভেতরে চিকিৎসা চলছিল, বাইরে বসে তার মা মনিকা আক্তার আঁখি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, "আল্লাহ আমার সন্তানরে আমার কাছে ফিরাইয়া দেও।"
“সকাল পৌনে আটটায় স্কুলে গেছে। দেড়টায় ছুটি হওয়ার কথা ছিল, এরপর দেড়টা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত কোচিং। সকালে ছেলেরে খাবার দিয়া দিছি, এরমধ্যে এই ঘটনা ঘটল।"

স্কুলের কাছেই তাদের বাসা, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ছেলের খোঁজে স্কুলে ছুটে যান বলে জানিয়েছেন আঁখি; এরপর গিয়ে ওই মা ছেলেকে দগ্ধ অবস্থায় পান।
সেখান থেকে তাকে প্রথমে বাংলাদেশ মেডিকেলে নেওয়া হয়। ওই হাসপাতাল থেকে আরিয়ানকে বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠিয়ে দেয় উন্নত চিকিৎসার জন্য।
সপ্তম শ্রেণির শায়ানের শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন তার ফুপু রুবিনা আক্তার।
উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের এই বাসিন্দা বলেন, "সকাল বেলা সুস্থ ছেলেটা বাসা থেকে বের হইল, আর এখন হাসপাতালে।"
তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া জুনায়েদ হাসানের মা ঝর্না আক্তারও জরুরি বিভাগের সামনে কাঁদছিলেন। নয়া নগরের এই বাসিন্দা জানিয়েছেন, তার ছেলেকে আইসিউতে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, "আর একটু পরেই ছুটি হইলে ছেলে বাসায় চলে যেত। আর এখন ছেলে আমার আইসিইউতে।"
একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাইয়ুম খান বলেন, জুনিয়রদের শিফটটা সকাল থেকে শুরু হয়।
“ঘটনার সময় ক্লাসে ছিলাম। তারপর বিকট শব্দ শুনে দেখি আগুন, অবস্থা খারাপ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে উদ্ধার কাজ শুরু করে। তারপর ফায়ার সার্ভিস আসে।
“এক আন্টি বলেন বাবা আমার মেয়েকে একটু ধরো, তার দুই হাত পুড়ে গেছে। পরে তাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি।"
এর আগেও তিনবার দুর্ঘটনায় এফ-৭
এফ-৭ বিজিআই মূলত চীনের তৈরি চেংদু জে-৭ সিরিজের একটি মাল্টি-রোল জেট ফাইটার। সোভিয়েত আমলের মিগ ২১ এর উন্নত এই চীনা সংস্করণ তৈরি করেছে চেংদু এয়ারক্র্যাফ্ট করপোরেশন।
বাংলদেশ বিমান বাহিনীর মোট ৩৬টি এফ-৭ যুদ্ধবিমান রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই এফ-৭ বিজিআই। এছাড়া এফটি-৭এমবি ও এফ-৭বিজি ভ্যারিয়েন্টও রয়েছে।
এফ-৭ বিজিআই (যেখানে আই বলতে ইমপ্রুভড বা আগের ভার্সনের চেয়ে উন্নত বোঝানো হয়) যুদ্ধবিমানটি মূলত এফ-৭ বিজি-এর উন্নত রূপ, যার মূল ভার্সন জে-৭ জি। এই এফ-৭ বিজিআই মূলত বাংলাদেশের জন্যই আলাদাভাবে তৈরি করা হয়েছিল।
২০১১ সালে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে ১৬টি জেট ফাইটার কেনার চুক্তি করে এবং ২০১৩ সালে সেগুলো বিমান বাহিনীর বহরে যুক্ত হয়। ওই বছরই চেংদু এয়ারক্র্যাফ্ট করপোরেশন এই মডেলের উড়োজাহাজের উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।
এফ-৭ বিজির তুলনায় এফ-৭ বিজিআইয়ের বেশ কিছু চোখে পড়ার মতো আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন এফ-৭ বিজিআইয়ে তিনটি মাল্টি ফাংশনাল ডিসপ্লে এবং আরও শক্তিশালী ফায়ার কন্ট্রোল রেডার রয়েছে।
এক ইঞ্জিনের এ বিমানের সর্বোচ্চ গতি মাক ২.২ (শব্দের গতির ২.২ গুণ)। আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, লেজার গাইডেড বোমা ও জিপিএস গাইডেড বোমা, বাড়তি জ্বালানি ট্যাংকসহ দেড় হাজার কেজি ওজন বইতে পারে এসব জঙ্গি বিমান।
এ বিমানের ককপিটে একজন বৈমানিক বসতে পারেন। কেএলজে-৬ এফ রেডার ব্যবহার করা হয় এফ-৭ বিজিআই বিমানে। এই যুদ্ধবিমান ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৭ হাজার ৫০০ মিটার বা ৫৭ হাজার ৪২০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় উড়তে সক্ষম।

বাংলাদেশে এই মডেলের বিমানের তৃতীয় দুর্ঘটনা এটি। এর আগে ২০১৮ সালের নভেম্বরে টাঙ্গাইলের মধুপুরের রসুলপুরে ফায়ারিং রেঞ্জে মহড়ার সময় বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। এতে উইং কমান্ডার আরিফ আহমেদ দিপু নিহত হন।
এরপর ২০২১ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামের জহুরুল হক ঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের পর বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত হয় এফ-৭ এমবি। এতে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহমিদ নিহত হন।
গত সাড়ে তিন দশকে রে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ৩২টি বিমান দুর্ঘটনায় পড়েছে। তবে সেসব ঘটনায় এত বেশি প্রাণহানি ঘটেনি।
১৯৮৪ সালের ৫ অগাস্ট খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে ঢাকায় নামতে গিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফকার এফ২৭-৬০০ বিমানবন্দরের কাছে জলাভূমির মধ্যে বিধ্বস্ত হয়। ৪৯ জনের মৃত্যু ঘটানো ওই ঘটনাই বাংলাদেশের মাটিতে ঘটা সবচেয়ে প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনা।
এরপর সোমবার দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন কলেজ ক্যাম্পাসে বিমান বাহিনীর উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণহানি ঘটল।
কি কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু জানাতে পারেনি আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর।
আইএসপিআর বলছে, দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটনে বিমান বাহিনী একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত শেষে দুর্ঘটনার বিস্তারিত জানানো হবে।