২৫ কোটি টাকা ‘আত্মসাৎ’: ইউনূসের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র অনুমোদন

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একটি অডিট প্রতিবেদন পাওয়ার পর গতবছর এ বিষয়ে তদন্তে নামে দুদক।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 Jan 2024, 01:46 PM
Updated : 29 Jan 2024, 01:46 PM

শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।

সোমবার দুদকের প্রধান কার্যালয়ে কমিশন বৈঠকে এ অভিযোগপত্র অনুমোদন দেওয়া হয় জানিয়ে কমিশন সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী তা আদালতে দাখিল করা হবে।”

ইউনূস ছাড়া অপর আসামিরা হলেন– গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজমুল ইসলাম, পরিচালক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশরাফুল হাসান, পরিচালক পারভীন মাহমুদ, নাজনীন সুলতানা, মো. শাহজাহান, নূরজাহান বেগম, এস এম হাজ্জাতুল ইসলাম লতিফী, অ্যাডভোকেট মো. ইউসুফ আলী, অ্যাডভোকেট জাফরুল হাসান শরীফ, গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসান,  প্রতিনিধি মো. মাইনুল ইসলাম এবং গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক কামরুল হাসান।

দুদকের উপ পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ২০২৩ সালের শুরুতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একটি অডিট প্রতিবেদন পাওয়া যায়, যা অনুসন্ধানের জন্য দুদককে অনুরোধ করা হয়।

অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় গুলশান আনোয়ার প্রধান বাদী হয়ে ২০২৩ সালের ৩০ মে ইউনূসসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের করেন। এরপর সাত মাসের বেশি সময় তদন্ত চালিয়ে আরো একজনের নাম যুক্ত করে ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র তৈরি করেন তিনি।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “আমরা অনুসন্ধান করে চার্জশিট দেওয়ার মত তথ্য উপাত্ত পাই। চার্জশিট সোমবার আদালতে জমা দেওয়া হবে।”

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ইউনূস ও নাজমুল ইসলামসহ গ্রামীণ টেলিকম বোর্ড সদস্যদের উপস্থিতিতে ২০২২ সালের ৯ মে ১০৮তম বোর্ডে ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখায় একটি হিসাব খোলার সিদ্ধান্ত হয়। তবে ব্যাংকে হিসাব খোলা হয় এক দিন আগেই।

গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের পাওনা লভ্যাংশ বিতরণের জন্য গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন এবং গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে সেটেলমেন্ট এগ্রিমেন্ট চুক্তি হয় ওই বছরের ২৭ এপ্রিল।

এজাহারে বলা হয়, সেটেলমেন্ট এগ্রিমেন্টেও ৮ মে খেলা ব্যাংক হিসাব দেখানো আছে, যা বাস্তবে অসম্ভব। ‘ভুয়া’ সেটেলমেন্ট এগ্রিমেন্টের শর্ত অনুযায়ী ও ১০৮তম বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক গ্রামীণ টেলিকমের ৪৩৭ কোটি ১ লাখ ১২ হাজার ৬২১ টাকা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মিরপুর শাখা থেকে ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখায় স্থানান্তর করা হয় ২০২২ সালের ১০ মে।

পরে ২২ জুন অনুষ্ঠিত ১০৯তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অ্যাডভোকেট ফি হিসাবে অতিরিক্ত ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯১ হাজার ৩৮৯ টাকা প্রদানের বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়।

অন্যদিকে ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখার হিসাব থেকে গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের নামে ডাচ বাংলা ব্যাংকের লোকাল অফিসের হিসাব থেকে তিন দফায় মোট ২৬ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা স্থানান্তর করা হয়।

দুদক বলছে, কর্মচারীদের লভ্যাংশ বিতরণের আগেই তাদের না জানিয়ে ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ ২০২২ সালের মে ও জুন মাসের বিভিন্ন সময়ে সিবিএ নেতা মো. কামরুজ্জামান, মাইনুল ইসলাম ও ফিরোজ মাহমুদ হাসানের ডাচ বাংলা ব্যাংকের মিরপুর শাখার হিসাবে ৩ কোটি টাকা করে স্থানান্তর করা হয়।

একইভাবে আইনজীবী মো. ইউসুফ আলীর কমার্শিয়াল ব্যাংক অফ সিলনের ধানমন্ডি শাখার হিসাবে ৪ কোটি টাকা ও দি সিটি ব্যাংকের গুলশান শাখার হিসাবে ৫ কোটি টাকা এবং আইনজীবী জাফরুল হাসান শরীফ ও আইনজীবী মো. ইউসুফ আলীর স্ট্যান্ডার্ড টাচার্ড ব্যাংকের গুলশান নর্থ শাখায় যৌথ হিসাবে ৬ কোটি স্থানান্তর করা হয়, যা তাদের ‘প্রাপ্য ছিল না’ বলে দুদকের ভাষ্য।

দুদকের রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, অ্যাডভোকেট ফি হিসেবে প্রকৃতপক্ষে হস্তান্তরিত হয়েছে মাত্র ১ কোটি টাকা। বাকি ২৫ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বোর্ড সদস্যদের সহায়তায় গ্রামীণ টেলিকমের সিবিএ নেতা এবং আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেটেলমেন্ট এগ্রিমেন্টের শর্ত লঙ্ঘন করে ‘অসৎ উদ্দেশে জালিয়াতির আশ্রয়ে গ্রামীণ টেলিকম থেকে উক্ত অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।’

এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২)(৩) ধারায় অভিযোগ এনেছে দুদক।

গ্রামীণ টেলিকমের ১০১ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে স্থায়ী না করা, গণছুটি নগদায়ন না করা, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ জমা না দেওয়ার অভিযোগে এক মামলায় এর আগে ইউনূসসহ চারজনকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে শ্রম আদালত।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের দায়ের করা ওই মামলার রায়ের বিরুদ্ধে ইউনূসসহ দণ্ডিত আসামিরা ইতোমধ্যে আপিল করেছেন।

পুরনো খবর-