Published : 19 Dec 2024, 08:41 PM
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের ‘দুর্নীতি’ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে নামবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বৃহস্পতিবার তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন।
ক্ষমতাচ্যূত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী এ দুইজন ছাড়াও এদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব ও সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান এবং সাবেক সড়ক পরিবহন সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নুরীম সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদসহ আরও আটজনের ‘দুর্নীতির’ বিষয়েও তদন্ত চালাবে সংস্থাটি।
দুদকের মহাপরিচালক আক্তার বলেন, ওবায়দুল কাদের ও সালমান রহমানের অনিয়ম ও কারসাজির মাধ্যমে ‘অবৈধ সম্পদ অর্জনের’ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, একটি প্রকল্পের আওতায় ১৩৭ বাস কেনা নিয়ে কারসাজির অভিযোগে সাবেক সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং তৎকালীন সড়ক পরিবহন সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করা হবে।
সরকার পতনের পর থেকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাদেরকে। সাবেক মন্ত্রী ও পাঁচবারের এই সংসদ সদস্য বিদেশে চলে গিয়েছেন বলে সম্প্রতি খবরে এসেছে। তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার অভিযোগ আনাসহ দেশজুড়ে কয়েকডজন হত্যা মামলা করা হয়েছে।
অপরদিকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলমের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরুর কথা জানিয়েছেন দুদক কর্মকর্তা আক্তার হোসেন।
তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ যথাযথ ঋণ প্রদান প্রক্রিয়া এবং ঋণ নিয়মাচার না মেনে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে আইএফআইসি ব্যাংকের এক হাজার ৯০৭ কোটি টাকা আত্মসাতেরি অভিযোগ থাকার কথা তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, ব্যাংকটির গুলশান শাখার গ্রাহক ব্লুমুন ট্রেডিং লি., এক্সিস বিজনেজ লি. এবং প্রিন্সিপাল শাখার গ্রাহক এভারেস্ট এন্টারপ্রাইজ, গ্লোয়িং কন্সট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লি:, ভিস্তা ইন্টারন্যাশনাল লি: ও স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লি: এর অনুকূলে ১ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণ দেখিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ এসেছে। প্রাথমিকভাবে তথ্য প্রমাণ পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করবে দুদক।
প্রবল গণ আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের এক সপ্তাহ পর ১৩ আগস্ট নৌপথে পালানোর সময় ঢাকার সদরঘাট থেকে সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে গ্রেপ্তারে তথ্য দেয় পুলিশ।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে ১৬ জুলাই ঢাকা কলেজের সামনে হতাহতের ঘটনায় নিউ মার্কেট থানার এক মামলায় ‘ইন্ধনদাতা’ হিসেবে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে আরও ডজন খানেকের বেশি মামলায় সালমান রহমানকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।

এদিন দুদক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ও সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমানের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।
গত ৬ অক্টোবর রাতে নজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
২০১৫ সালে পরিবেশ ও বন সচিব থেকে নজিবুর রহমানকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
তাদের পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রায় ৫৪২ কোটি টাকা অর্জন ও পাচারের অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পুলিশপ্রধানের দায়িত্বে থাকা নূর মোহাম্মদ ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে কিশোরগঞ্জ ২ আসন থেকে
সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে ২০২৪ সালে দ্বাদ্শ সংসদে তিনি দলের মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচনে অংশ নেননি।
ছাড়া সাময়িক বরখাস্ত অতিরিক্ত কর কমিশনার সাইফুল আলম, যুগ্ম কর কমিশনার কে এম শামসুজ্জামান ও সহকারী কর কমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।
গত অক্টোবরে ভুয়া পে অর্ডারে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের দুই ছেলে আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলমের অপ্রদর্শিত ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ অবৈধভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে ৭৫ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তার অভিযোগে ওই তিন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
অপরদিকে এদিন ঢাকা ১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ'র বিরুদ্ধে মিরপুরের ৭০০ একর সরকারি খাস জমি দখলসহ অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে নিজ নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।
ইলিয়াস মোল্লার পৈতৃক বাড়ি ঢাকার পল্লবীর হারুনাবাদ এলাকায়। তার বাবা, হারুন আল রশীদ মোল্লা পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তবে ইলিয়াস মোল্লা পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। পরে নৌকার টিকেটে ঢাকা-১৬ আসন থেকে ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে টানা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ৫ অগাস্ট সরকার পতনের পর থেকে তিনি পলাতক আছেন। তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন মামলা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সহিংসতা ও প্রাণহানির অভিযোগে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা দায়ের করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের বিভিন্ন অভিযোগ পেয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।
আরও পড়ুন:
হাসিনা, রেহানা, জয়, টিউলিপের 'দুর্নীতি' অনুসন্ধানে দুদকের ৫ কর্মকর্তা
হাসিনা, রেহানা, জয়, টিউলিপের 'দুর্নীতি' অনুসন্ধান করবে দুদক