Published : 13 Apr 2026, 11:50 PM
তিন দশক ধরে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেইট সংলগ্ন ফুটপাতে চশমা বিক্রি করছেন ফরিদপুরের আব্দুল মান্নান; ঢাকায় বৃদ্ধ বাবা-মা আর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সাতজনের সংসার চলে সে আয়েই।
প্রতিদিন নিশ্চিতে দোকান খুলে বেচাকেনা করলেও সোমবার তার চোখে-মুখে ছিল উৎকণ্ঠা। বললেন, ফুটপাতে সরকারের উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে তিনি টেনশনে। দোকান উঠিয়ে দিয়ে সংসার চলবে কীভাবে, মাথায় এখন সেই চিন্তা।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ৫০ বছর বয়সি মান্নান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এভাবে আমাদের যদি বারবার তুলে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা খেয়ে বাঁচব কী করে? আমার সন্তানদের পড়ালেখা, আমার বাবা-মায়ের চিকিৎসা খরচ; সব তো আমার এই উপার্জনের ওপরেই চলে।
“সরকার আমাদের ব্যবসা করতে না দিলে, এই মানুষগুলোকে নিয়ে আমরা কোথায় যাব? রোববারও তিনজন হকারকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এই মানুষগুলোর পরিবারের এখন কী হবে?”
বায়তুল মোকাররম মসজিদ ও আশপাশের ফুটপাতে সবসময় ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় আর হাঁকডাক থাকলেও সেই চিত্র দেখা গেল না সোমবার; দোকান খুলে বসেছেন আব্দুল মান্নানের মতো অল্প কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের চোখে-মুখেও উৎকণ্ঠা।
ফুটপাতে বিভিন্ন পণ্যের দোকান চালানো এসব বিক্রেতারা বলছেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করতে সরকারের চালানো উচ্ছেদ অভিযানের কারণে তারা বিপাকে। ফুটপাতে আয়ের অবলম্বন বন্ধ হলে সংসার চলবে কীভাবে, সেই দুশ্চিন্তা ভর করেছে।
এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার ডিএমপি কমিশনার ও রোববার ঢাকা দক্ষিণের প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কথা বলছে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন।
‘যে আসে সেই হকারদের মারে’
ফুটপাত থেকে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ ১ এপ্রিল থেকে রাজধানীজুড়ে দফায় দফায় অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ, যার প্রভাব পড়েছে হাজারো নিম্ন আয়ের হকারদের জীবন-জীবিকায়।
বায়তুল মোকাররম এলাকায় ফুটপাতের এক দোকান কর্মচারী সেলিম তার দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলেন, তিন মাস ধরে কাজ করছেন। উচ্ছেদ কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগে দিন হাজিরায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করতেন। সেই টাকায় ঢাকায় নিজের থাকা-খাওয়ার খরচ মিটিয়ে গ্রামে পরিবারের কাছেও কিছু টাকা পাঠাতে পারতেন।
সেলিমের ভাষ্য, অভিযানের কারণে দোকান বন্ধই বলা যায়। এখন মালিক দিনে শ-খানেক টাকা দেন, যা দিয়ে এই ‘দুর্মূল্যের’ বাজারে ঢাকায় টিকে থাকা ‘অসম্ভব হয়ে পড়েছে’।
সেলিমের কথায় সায় মেলাচ্ছিলেন তার মত অনেকে।
কাউসার নামে ফুটপাতের এক ব্যবসায়ী বলেন, “হকারদের কোনো মা-বাপ নাই; যে আসে, সেই আমাদের মারে।”
‘চোর-পুলিশ খেলা’
ফুটপাতে তিন দশকের ব্যবসায় এর আগেও অনেকবার উচ্ছেদ অভিযানের ভুক্তভোগী হয়েছেন ফরিদপুরের আব্দুল মান্নান।
তিনি বলেন, “এই চোর-পুলিশ খেলা আর ভালো লাগে না। ২০০৮ সালেও আমরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছিলাম। এভাবে চলতে থাকলে আমরা আবার বউ-ছেলেপুলেসহ থালা হাতে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব।”
আব্দুল মজিদ নামে ফুটপাতের এক বই বিক্রেতা বলেন, তিনি ৪০ বছর আগে তার বাবার শুরু করা ব্যবসার হাল ধরেছেন ২০০০ সাল থেকে।
তার ভাষ্য, “এখানে তো আমি কোনো পাপ করছি না। অরিজিনাল পুরনো বই অর্ধেকের কম দামে মানুষের কাছে বিক্রি করি। আমার কাস্টমারদের মধ্যে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে বড় অফিসাররা পর্যন্ত আছেন। এরকম একটা ব্যবসা করে আমি মনেও শান্তি পাই। তাহলে আমাদের কেন এখান থেকে উঠিয়ে দেওয়া হবে?”

‘পুনর্বাসনে হকারদের কিছুই হবে না’
হকারদের পুনর্বাসন করে উচ্ছেদ করা হলেও সেটি নিয়ে তাদের মনে রয়েছে সংশয়।
নব্বইয়ের দশক থেকে বাবার হাত ধরে ফুটপাতে ব্যবসায় নামা গিয়াস উদ্দিন বলেন, “সরকারি উদ্যোগে যদি এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়াও হয়, তাহলে সেখানে সরকারদলীয় লোকজনই জায়গা পাবে।
“যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, আমার মতো সাধারণ হকারদের তাতে লাভ-ক্ষতি কিছুই হবে না।”
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল হাসিম কবির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নতুন সরকার এসে আমাদের এভাবে উচ্ছেদ করবে তা কল্পনাও করতে পারিনি। আমাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে বিগত সরকারের আমলে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও ফল পাইনি।”
হকারদের জরিমানা নিয়ে তিনি বলেন, “৬ থেকে ৮ হাজার টাকা জরিমানার কথা জীবনেও শুনিনি। জরিমানা দিতে না পারলে এক-দুই মাস জেল খাটতে হয়, যা অত্যন্ত অমানবিক। হকার তো চুরি-বাটপারি করছে না, মাদকের ব্যবসাও করছে না। তাহলে এত জরিমানা কেন?”
এ অবস্থায় সিটি প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনারের কাছে স্মারকলিপির পাশাপাশি গোলটেবিল আলোচনার কথাও ভাবছেন হকাররা।
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি হাসিম বলেন, “আগামী বৃহস্পতিবার পুলিশ কমিশনার বরাবর এবং রোববার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করব। দেশে বিশিষ্টজনদের নিয়ে একটি রাউন্ড টেবিল বৈঠকের পরিকল্পনাও আছে।
“তবে এত কিছুর পরও যদি পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ অব্যাহত থাকে, তবে রাজপথে নামা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।”

‘যা বলছে নগর প্রশাসন’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিদ্যমান যেসব নিরিবিলি জায়গা আছে, আমরা সেগুলো খোঁজার চেষ্টা করছি। এরকম জায়গা যদি আমরা পাই, তাহলে একেবারে প্রান্তিক হকার যারা, তাদেরকে লাইসেন্সের আওতায় এনে কার্ড প্রদান করব।
“আমরা ঢাকায় জায়গাগুলো খোঁজার চেষ্টা করছি। এটা হলে আশা করি আমরা কিছুটা হলেও প্রোভাইড করতে পারব। আমাদের ট্রাফিক বিভাগ, পুলিশ বিভাগ এখন থেকেই বিভিন্ন জায়গায় তালিকা তৈরি করছে।”
হকারদের জন্য বিকল্প জায়গার পরিকল্পনা নিয়ে মাসখানেকের মধ্যে কাজ শুরুর আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, “এটা জায়গার ওপর নির্ভর করবে।”
তবে ঠিক কতজন হকারকে এই পরিকল্পনার আওতায় আনা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাই সংশয়ও প্রকাশ করেন।