Published : 25 Sep 2025, 08:13 PM
‘পতিত কর্তৃত্ববাদী সরকারের চর্চা অনুসরণ’ করে অন্তর্বর্তী সরকারও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশাল সংখ্যক প্রতিনিধি পাঠানো ‘ব্যতিক্রমী দেশের তালিকাভুক্ত হওয়ার বিব্রতকর রেকর্ড’ অব্যাহত রাখায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “শতাধিক প্রতিনিধিসহ চলতি অধিবেশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কী বার্তা দিল?
“এর বিনিময়ে দেশ ও জনগণ তথা করদাতাগণের কোনো সুফল পাওয়ার সম্ভাবনাই বা কতটুকু? এই প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার সাধারণ মানুষের রয়েছে।”
বিবৃতিতে তিনি বলেন, “পতিত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বিশাল আকারের প্রতিনিধিদল প্রেরণ স্বাভাবিকতায় পরিণত করা হয়, যা সংখ্যার বিচারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই শতাধিক পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
“আমরা আশা করেছিলাম ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিনির্ভর সুশাসনসহ রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠিত সরকার এ ধরনের চর্চা পরিহার করবে। দুঃখজনকভাবে অন্তর্বর্তী সরকার একই পথ অনুসরণ করল।”
দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘অহেতুক’ বিদেশ সফরের মাধ্যমে জনগণের অর্থের অপচায় বন্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশনাসহ পরিপত্র জারি করলেও এখন শতাধিক প্রতিনিধি নিয়ে নিউ ইয়র্কে যাওয়াকে ‘পরিতাপের বিষয়’ হিসাবে বর্ণনা করেন ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, “শতাধিক প্রতিনিধির ৮০তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণের স্ববিরোধী এ ঘটনার মাধ্যমে সরকার নিজেই তার অবস্থান সম্পর্কে আস্থাহীনতা তৈরি করল।”
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যোগ দিতে শনিবার রাতে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। এবার তিনি তার প্রতিনিধি দলে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয় নেতাকে যুক্ত করেছেন, যা রাজনৈতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
তবে আর কারা এবং মোট কতজন সেই প্রতিনিধি দলে আছে, সেই সংখ্যা সরকারের তফর থেকে প্রকাশ করা হয়নি।
এর মধ্যে বুধবার এক ফেইসবুক পোস্টে জাতিসংঘ সফরে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের ১০৪ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করেন প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের।
ওই পোস্টে তিনি লেখেন, “এর মধ্যে আছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস, তার দুই কন্যা, ৭ জন উপদেষ্টা, ৬ জন রাজনৈতিক নেতা, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের বিভিন্ন পদবির কর্মকর্তা, ৫ জন প্রেস সেক্রেটারি (বিভিন্ন পদবীর), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নিরাপত্তা দলের কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা, স্থানীয় বাংলাদেশ দূতাবাস ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের কয়েকজন সদস্য ও কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক। জনস্বার্থে সম্পূর্ণ তালিকাটি প্রকাশ করা হল।”
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মত পরাশক্তির দেশগুলো জাতিসংঘে তাদের বহুমাত্রিক প্রভাববলয় বজায় রাখার কূটনৈতিক ভূমিকা নিশ্চিতে তুলনামূলক বড় দল পাঠায়, তাও শতাধিক হওয়ার দৃষ্টান্ত ‘বিরল’।
“অন্যদিকে নাইজেরিয়ার মত কিছু সুশাসনবর্জিত দেশের বড় প্রতিনিধিদল পাঠানোর প্রবণতার পেছনে কূটনীতির নামে ভ্রমণবিলাস ছাড়া অন্য কোনো যুক্তি পাওয়া যায় না।”
তিনি বলেন, “গতবছর সাধারণ অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকার ৫৭ জনের প্রতিনিধি প্রেরণের মাধ্যমে জনগণের অর্থের অপচয় পরিহারের সম্ভাবনার সূচনা করেছিল ভেবে আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম যে, এ বছর হয়ত সংখ্যাটি আরও কমতে পারে।
“অথচ এবার পশ্চাদমুখী হয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের বিব্রতকর চর্চার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। জনগণের করের টাকায় বিশালসংখ্যক প্রতিনিধি প্রেরণের খরচের পাশাপাশি বর্হিবিশ্বের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার মূল্য বিবেচনায় প্রতিনিধিদের কার কী ভূমিকা তা নির্ধারণ সাপেক্ষে দলটি গঠিত হয়েছে কি?”
ইফতেখারুজ্জামান সরকারের কাছে জানতে চাইছেন, “অধিবেশনের আলোচ্য বিষয়বস্তুর সাথে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অর্থবহ অংশগ্রহণ এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রতিনিধিদলের সম্মানিত সদস্যগণ কোন পরিমণ্ডলে, কী ভূমিকা পালন করবেন, এসব কতটুকু বিবেচিত হয়েছে?
“এ ধরনের প্রশ্নের জবাব জনগণ পাবে কি? এ ব্যাপারে রাষ্ট্রসংস্কারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা উচিত।”
গণঅভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এ জাতীয় প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টান্তকে বিব্রতকর ও হতাশাজনক বলে মনে করছে টিআইবি।