Published : 01 Jan 2026, 01:57 AM
সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চির বিদায়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি দেখল পঁচিশ।
যে পুরনো ছকে দেশ চলছিল, তা ভেঙে চব্বিশ সবকিছু ঢেলে সাজানোর সুযোগ এনে দিলেও রূপান্তরের যাত্রাপথে পঁচিশের প্রায় পুরোটা সময়জুড়ে সঙ্গী ছিল হতাশা।

ভোটের ফয়সালা হলেও পিছু নিয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, হামলা-সংঘর্ষ ও খুনের নানা ঘটনার মধ্যে শঙ্কা বাড়িয়েছে ইনকিবাল মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ড, আর ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ হয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের অভিযাত্রা। ছাব্বিশ কী পারবে দেশকে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তরের বাধাহীন পথে ফেরাতে?
সেই পথে চ্যালেঞ্জ দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, রাজনীতিবিদ, সাধারণ মানুষের কেউ কেউ। কারো কারো মতে, কেবলমাত্র একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনই এই সংকটের ‘উত্তরণ’ ঘটাতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটকে ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করে ‘ভোট রক্ষা করার, দেশকে রক্ষা করার’ আহ্বান জানিয়েছেন।
আবার কারো কারো মতে, নির্বাচনই ‘যথেষ্ট’ নয়, গণতান্ত্রিক উত্তরণে সংস্কার বাস্তবায়নও গুরুত্বপূর্ণ, যা নিয়ে ‘অনিশ্চয়তা’ থাকছে।
‘মব’ সংসহিতায় বহুমতের চর্চা পথ হারিয়েছে, সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা বড় ধরনের আঘাত হয়ে এসেছে স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তির ওপর।
বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ভবন ও উদীচী কার্যালয়ে হামলার মধ্য দিয়ে উগ্রপন্থা নতুন চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে।
বছরের শেষ দিনে দাঁড়িয়ে এটিকে একটি রূপান্তরের বছর বললেও শেষ তক ‘টানাপোড়েন আর অনিশ্চয়তার বছর’ হিসেবে দেখছেন রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান।
তিনি বলেন, “আমাদের তিনটা বছরকে পাশাপাশি রেখে দেখতে হবে। চব্বিশ হচ্ছে আমাদের জন্য ‘আশার বছর’। পঁচিশ হচ্ছে ‘টানাপোড়েন আর অনিশ্চয়তার বছর’, যেসময় একটা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
“আর ছাব্বিশ হচ্ছে, এই টানাপোড়েনটা কোন দিকে যায়, সেটার ওপর। হয়ত গণতন্ত্রে উত্তরণের বছর অথবা হতাশার বছর, এখন এই দুটোর যেকোনো একটা।”
চব্বিশ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে; আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিরপ্রস্থানে রাজনীতিতে ‘দুই বেগমের’ দ্বৈরথ ফুরিয়েছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার অবস্থা যখন সংকটাপণ্ন, তখন ১৭ বছরের নির্বাসন ভেঙে লন্ডন থেকে দেশে ফিরেছেন তার বড় ছেলে তারেক রহমান। মায়ের ব্যাটন এখন তারই হাতে।
ছাব্বিশের নির্বাচনে বিএনপিকে জয় এনে দিয়ে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কিনা, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সামনে এখন সেই চ্যালেঞ্জ।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে উদ্দীপ্ত বিএনপির সামনে ১১ দলীয় জোটের শক্তি নিয়ে হাজির হয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
কিন্তু সংকটে পড়েছে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। রাজনীতিতে নতুন বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ধরে যে দলটি পঁচিশে আত্মপ্রকাশ করেছে, বছর না ঘুরতেই নির্বাচনি সমঝোতায় তারাই জামায়াতের ডানপন্থি রাজনীতির চক্রে ঢুকে পড়েছে।
রাজনীতির মাঠ গরমের চেষ্টা করলেও কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকা আওয়ামী লীগকে ছাড়াই নির্বাচনের ট্রেন গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। রাজনীতির মাঠে কোণঠাসা তাদের মিত্র ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো ও জাতীয় পার্টি।
সরকারি চাকরির কোট সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় চব্বিশের ৫ অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনচক্র চূর্ণ করে দেওয়ার পর দেশের হাল ধরে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতির উদ্দেশে অধ্যাপক ইউনূস বলেছিলেন, “আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের মানবাধিকার থাকবে পুরোপুরি সুরক্ষিত।
“আমাদের লক্ষ্য একটাই—উদার, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। আমরা এক পরিবার; আমাদের এক লক্ষ্য।”
কিন্তু ক্ষমতায় ১৬ মাস পার করা অন্তর্বর্তী সরকারের মানবাধিকার, আইনশৃঙ্খলাসহ নানা ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান দেখাতে না পারায় সমালোচনার মুখে পড়েছে।

অর্থনীতিতে যে সংস্কারের বার্তা দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার, তাতে অস্থিরতা কমলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
মূল্যস্ফীতির পারদ কিছুটা নিম্নমুখী হলেও বছরের শেষ দিকে এসে খাদ্য পণ্যের বাজারদর উর্ধ্বমুখী হওয়ায় আশাবাদী হওয়ার বদলে উল্টো ভোক্তাকে সংকটে ফেলেছে।
রাজধানীর সূত্রাপুরের পান-সিগারেট বিক্রেতা সবুর মিয়া বলছেন, ক্ষমতায় যাওয়ার আগে অনেক ‘বড় বড় কথা’ বলে, পরে দেখা যায় কোনো আশাই পূরণ হয় না।
“এই যে নতুন নির্বাচন হবে, আমরা গরীব মানুষরা, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তাদের কাছে যদি প্রশ্ন করেন দেখবেন, তারা একটাই কথা কইব।
“আমরা চাই বাজারের জিনিসপত্রের দাম কম থাকুক আর নিশ্চিন্তে যাতে আমরা ঘুমাতে পারি, চোর-ডাকাইত যাতে আমাগো ক্ষতি না করে। আমাগো বিশ্বাস, আগামীতে ভোটে যে সরকার আসছে, তারা এটা করতে পারব।”
সবুর মিয়াদের অপেক্ষার সেই নির্বাচন হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। একইদিন গণতান্ত্রিক উত্তরণে সংস্কার প্রশ্নে হবে গণভোট।
সংস্কার সংলাপ, বিভাজনের সূচনা পর্ব
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রায় দেড় বছরের সময়কালে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র অন্যতম, তাতে এনসিপি হতাশা গোপন করেনি।
আরেকটি আলোচিত বিষয় রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ, যা গড়িয়েছে ভোটের মাঠে।
সংস্কার যাত্রায় ১৭টি বিষয়ে ৩২টি রাজনৈতিক দল ও জোটের পূর্ণ ঐকমত্যের ভিত্তিতে ৮৪ দফার জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করেছে ঐকমত্য কমিশন; বাকি ৬৭টি বিষয়ে দলগুলোর কেউ কেউ বিরোধিতা করেছে এবং দিয়েছে ‘নোট অব ডিসেন্ট’।
দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ এই সনদ সাক্ষর হয় ১৭ অক্টোবর। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেননি এনসিপির নেতারা। এ দলটিসহ পাঁচ দল সনদে স্বাক্ষর করেনি।
জুলাই সনদ কীভাবে বাস্তবায়নেরে উপায় ও গণভোট নিয়েও বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মতবিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে।

শেষ পর্যন্ত ঐকমত্য কমিশনকেই সরকারের কাছে সুপারিশ করতে হয়। তবে সরকারপ্রধানের কাছে ২৮ অক্টোবর হস্তান্তর করা সুপারিশে গণভোটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত ছিল না। সুপারিশে বলা হয়, সেটা সংসদ নির্বাচনের দিনেও হতে পারে, নির্বাচেনের আগেও হতে পারে।
নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিসহ পাঁচ দাবিতে সাতটি সমমনা দল নিয়ে মাঠে নামে জামায়াত।
অপরদিকে ঐকমত্য কমিশনের তৈরি করা বাস্তবায়ন আদেশের খসড়ায় স্বাক্ষরিত জুলাই সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ না থাকায় তীব্র আপত্তি জানায় বিএনপি।
৩০ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন ডেকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “আমরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ্য করেছি যে, এই সকল সুপারিশ কেবল জাতিকে বিভক্ত করবে, ঐক্যের বদলে অনৈক্য সৃষ্টি করবে। মনগড়া যে কোনো সংস্কার প্রস্তাব গ্রহণ করলে জাতীয় জীবনে দীর্ঘ মেয়াদে অকল্যাণ ডেকে নিয়ে আসতে পারে।”
রাজনৈতিক মতভিন্নতার মধ্যে ১৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জুলাই জাতীয় সনদ (বাস্তবায়ন) আদেশ চূড়ান্তের ঘোষণা দেন। ওই ভাষণে জাতীয় নির্বাচনের দিনে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত জানান তিনি।
গণভোট নিয়ে দলগুলোর মতবিরোধ তখনকার মতো মিটে গেলেও জুলাই সনদ ঘিরে জামায়াতের এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত দলটির নেতৃত্বে আট দলীয় ভোটের জোটে পরিণত হয়। ফলে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বে রাজনীতির ভিন্ন এক পটভূমি তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কানিজ ফাতেমা বলেন,
আগামীতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক তাদেরকে ‘বদলে যাওয়ার’ অঙ্গীকার ঘোষণা করতে হবে।
তিনি বলেন, “মানুষ পরিবর্তন চায়। যে নির্বাচনটি আসছে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে, ‘বদলে যেতে হবে, বদলে দিতে হবে’। অবশ্যই জনগণের শক্তিকে সামনে আনতে হবে।”

ভোটের মাঠে রাজনীতির নতুন মঞ্চ
জাতীয় নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের অবর্তমানে ক্ষমতার লড়াই রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের পথ করে দিয়েছে। বিএনপির ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী বলয়ে উদার রাজনীতির নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে, যেখানে ইসলামি ধারার, মধ্যপন্থার ও বাম দলের উপস্থিতিও রয়েছে।
বিএনপির জন্য বড় স্বস্তি ও শক্তির জায়গা হল-তাদের নেতা তারেক রহমানের দেশে ফেরা।
২০০৮ সাল থেকে লন্ডনে নির্বাসনে থাকা তারেক কবে দেশে ফিরছেন, বছরজুড়ে সেই আলোচনা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু তার ফেরা হচ্ছিল না।
এর মধ্যে জুন মাসে লন্ডন সফরে যান প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচনের সময় নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে বিএনপির অনেকটা মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যে ১৩ জুন তারেক রহমানের সঙ্গে তার বৈঠক হয়।
পরে যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, নির্বাচন হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, রোজার আগে। সেই ঘোষণার পথ ধরে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন রেখে ইতোমধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।
২৩ নভেম্বর ফের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এ অবস্থায় তার ছেলে তারেক কেন ফিরছেন না, সেই প্রশ্ন আবার সামনে আসে।
শেষ পর্যন্ত ২৫ ডিসেম্বর বড় দিনে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে দেশে ফেরেন তারেক। সারাদেশ থেকে আসা নেতাকর্মীদের বিপুল সংবর্ধনার মধ্যে তিনি বলেন, “আই হ্যাভ আ প্ল্যান।” তার হাতে রয়েছে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা।
বিএনপি বলছে, তারা রাষ্ট্র কাঠামো বদলাবে, দেশ নতুনভাবে তৈরি করতে পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এক কোটি বেকারের কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য কার্ড, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড প্রভৃতি তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে।
অপরদিকে জামায়াতকে কেন্দ্র করে ইসলামপন্থিদের বড় মেরুকরণ ঘটেছে, সেখানে যোগ হয়েছে বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র অলি আহমদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি, তরুণদের দল এনসিপি ও জামায়াত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নেতাদের এবি পার্টি। আগে থেকে থাকা আট দল পরিণত হয়েছে ১১ দলীয় জোটে।
এ জোটও রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলছে। তবে কী করবে, কীভাবে করবে, তা এখনো খোলসা করেনি।
এনসিপি জামায়াত জোটে যোগ দেওয়ার আগে আপত্তি জানিয়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছে ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা।

জামায়াতের জোটে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষের কথা জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন।
তার আগে পদত্যাগ করেছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা।
তবে যোগ হয়েছেন ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব ছেড়ে আসা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান মনে করেন, আগামীর রাজনীতিতে ইসলামির দলগুলোর মেরুকরণ দেখা যাবে।
তিনি বলেন, “বিএনপির নেতৃত্বে বাকি যে দলগুলো লড়াইয়ে ছিল, তারা বিএনপির আরও কাছাকাছি আসবে। এভাবে দেশের রাজনীতিতে একটা ইসলামী মোর্চা, আরেকটা জাতীয়তাবাদী ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ধরনের মোর্চা হবে। আগামী নির্বাচনে এ দুটো মোর্চার মধ্যে লড়াইটা হবে।”
হাদি হত্যাকাণ্ড, ভোটের আগে নিরাপত্তা শঙ্কা
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ঠিক পরদিন, ১২ ডিসেম্বর ভোটের প্রচারে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান হাদি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে মারা যান হাদি।
২০২৪ সালে জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা হাদি সেই আন্দালনের অনুপ্রেরণায় গড়ে তোলেন সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চ।
হাদি হত্যার পর রাজনীতিকসহ ৫০ জনের ‘হিট লিস্টের’ গুঞ্জন ছড়িয়েছে, এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “যারা ঝুঁকিপূর্ণ, তাদের ইতোমধ্যে একজন করে গানম্যান দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের যে ডিজিএফআই, এনএসআই, এসবি আছে; তারা নিজেরা বসে কারা কারা ঝুঁকির মধ্যে আছে—এরকম একটা লিস্ট করা হয়েছে।
“তাদের অনেককেই গানম্যান দেওয়া হয়েছে, আবার অনেকে গানম্যান চাননি।”

‘মব’ সহিংসতা, নিষ্কৃতি কী মিলবে?
হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
ডেইলি স্টার কার্যালয়ের নিচে আগুন দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের ছাদে আটকা পড়া প্রতিষ্ঠানের ২৮ কর্মীকে উদ্ধার করতে গিয়ে আক্রান্ত হন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নিউজ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর।
সে রাতেই বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ভবনে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়, দেওয়া হয় আগুন।
ছায়ানটে এই তাণ্ডবের পরদিন সন্ধ্যায় তোপখানা রোডে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে সারাদেশে বছরজুড়ে একের পর এক ‘মব’ সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে।
‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর’ অভিহিত করে ‘মব’ তৈরি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতে অনেককে পদত্যাগ করানোর ঘটনাও ঘটেছে।
শরিয়তবিরোধী কবর দেওয়ার অভিযোগ তুলে ৫ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর রাজবাড়ীতে নুরাল পাগলার দরবারে হামলা চালায় কথিত তৌহিদি জনতা।
হামলাকারীরা একপর্যায়ে নুরাল পাগলার কবর খুঁড়ে লাশ তুলে মহাসড়কের উপর এনে পুড়িয়ে দেয়।
এ সময় সংঘর্ষে রাসেল মোল্লা নামে নুরুল পাগলের এক ভক্ত নিহত হন।
সর্বশেষ গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ভালুকার জামিরদিয়া এলাকায় ‘পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কোম্পানির’ শ্রমিক ২৮ বছর বয়সী দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
এরপর তার লাশ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজারে হামলা, ভাঙচুরের ঘটনার মধ্যে মানিকগঞ্জের বাউল আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার ও বাউলদের ওপর হামলা হতাশ করেছে সাধারণ মানুষকে।
দুইটি সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলার ঘটনাকে ‘গণমাধ্যমের জন্য কালো দিন’ আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ ও নিন্দা জানায় দেশি-বেশি বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।
২২ ডিসেম্বর সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ ও মালিকদের সংগঠন নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (নোয়াব) যৌথ প্রতিবাদ সভায় সরকারের সমালোচনা করেছেন জাতিসংঘের মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক ‘স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার’ আইরিন খান।
তিনি বলেছেন, সরকারের ব্যর্থতার কারণেই ওই হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত কয়েক মাস মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। যারাই মতপ্রকাশের চেষ্টা করেছেন, তারা আক্রোশের শিকার হয়েছেন।

হাদির মৃত্যুকে ঘিরে হামলা-ভাঙচুরকে নিছক ‘মব’ হিসেবে দেখতে চান না সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “না, এটা শুধু ওইরকমের একটা অল্প সময়ের জন্য অ্যাক্টিভ হওয়া, একটা উন্মত্ত জনতা তো না। মব তো উন্মত্ত জনতাই, শুধু উন্মত্ত জনতা হলে এভাবে বেছে বেছে যে সমস্ত সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা আছে, যাদের রাজনৈতিক আদর্শ একরকম…তা সেটা হতো না আমার মনে হয়।
“তাদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে অ্যাক্টিভ কিছু লোক থাকতে পারে, যারা আদর্শগতভাবে ওইরকম ধ্বংসাত্মক কাজে বিশ্বাসী এবং মনে করে যে অন্য যাদের আদর্শ আছে বা ধর্ম, সেগুলো আমরা এখানে পালন করতে দেব না। এরকম একটা টেন্ডেন্সি বা দৃষ্টিভঙ্গির কিছু লোক থাকবে।”
রাজনীতি বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক শাহান বলেন, “আমরা যেই ‘মবক্রেসির’ উত্থানটা দেখেছি বিভিন্ন সময়ে, আমরা লক্ষ্য করেছি, সেটার একটা ‘পিক লেভেলে’ আমরা ১৮ ডিসেম্বর ও ১৯ ডিসেম্বর দেখলাম (সংবাদমাধ্যম, সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ)।
“সুতরাং এই ‘মবক্রেসির’ ভবিষ্যৎ কী, এটাকে কীভাবে দমন করা হবে যে ‘বার্ডেন’টা এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী বছরের ওপর রেখে যাচ্ছে, সেই অনিশ্চয়তা থাকল।”
আওয়ামী লীগ কোন পথে?
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট ও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার ছয় মাস পূর্তির দিন, ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘বুলডোজার মিছিল’ কর্মসূচি থেকে ৩২ নম্বরের বাড়িটি ভাঙা হয়। ভারতে থেকে শেখ হাসিনার ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্যকে ভাঙার কারণ হিসেবে দেখানো হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনের চেষ্টায় গণহত্যার অপরাধে ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে শেখ হাসিনা চলে যান ভারতে। তাকে ফেরত চেয়ে দিল্লির কাছে দুই দফায় আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হলেও সাড়া মেলেনি।
পূর্বাচলে রাজউকের প্লট দুর্নীতির ছয় মামলার চারটিতে শেখ হাসিনার মোট ২৬ বছর, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড হয়েছে। এছাড়া শেখ রেহানার সাত বছরের কারাদণ্ড, তার মেয়ে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপের দুই বছরের কারাদণ্ড হয়েছে।

ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দলের কার্যালয় বেহাত হয়ে গেছে, নেতাকর্মীদের কেউ কেউ ধরা পড়েছেন, বেশির ভাগই চলে গেছেন আত্মগোপনে।
এ অবস্থায় গেল ১২ মে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার।
দল হিসেবে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা থাকছে।
নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করায় ভোটের পথও রুদ্ধ।
তার আগেই আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে করে সরকার।
নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার রায় ঘোষণার দিন ঘিরে ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামে দলটি। তাদের কর্মসূচির মধ্যে কয়েক দিন ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত বোমাবাজি এবং যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
বিদায়ী বছরের বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ ঝটিকা মিছিলের পাশাপাশি নানান কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামার চেষ্টা করলেও সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে পিছু হটে। দলটি আবার রাজনীতি ও ক্ষমতায় ফিরতে পারবে কিনা, তা নিয়ে আলোচনা আছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন কীভাবে?
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দলের শরিকদের পাশাপাশি ‘একতরফা ও বিতর্কিত’ নির্বাচনে বিরোধীদলের আসনে বসা জাতীয় পার্টিও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এর মধ্যে সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গড়া দলে আবারও ভাঙন ধরে।
এরশাদের ভাই জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি থেকে বেরিয়ে এই নামেই আরেকটা দল গঠন করেছেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদরা। তারা ১৮টি দল নিয়ে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ে ভোটের মাঠে নেমেছেন। পৃথকভাবে ভোটে নেমেছে জিএম কাদেরের জাতীয় পার্টিও।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক দলগুলো রাজনীতির মাঠ থেকে নির্বাসিত। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কার্যালয়ে হামলার পর তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। দলটি নির্বাচন থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছে। জোটের আরেক শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদও ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচনে না আসার।
আর আওয়ামী লীগকে নির্বাচন করতে না দেওয়ার কথা বলেছে সরকার।

সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন করার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠি দিয়েছেন পাঁচ মার্কিন আইনপ্রণেতা।
নির্বাচনের আগে একটি রাজনৈতিক দলকে ‘নিষিদ্ধ’ করায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা লিখেছেন, একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করলে ভোটারদের একটি বড় অংশ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
২৩ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে এ চিঠি দেন মার্কিন কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস, বিল হুইজেঙ্গা ও সিডনি কামলাগার-ডোভ। চিঠিতে আরও সই করেন কংগ্রেসম্যান জুলি জনসন ও টম আর সুওজি।
চিঠিতে কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের নাম না নিয়ে এসব আইনপ্রণেতা বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংকটের সময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনের ভূমিকার প্রতি তারা সমর্থন জানালেও, একটি বড় রাজনৈতিক দলকে বাদ দেওয়া মৌলিক মানবাধিকার এবং ব্যক্তিগত অপরাধের দায়বদ্ধতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো কতদূর?
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতেই গণআন্দোলনের কারণে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যা কোভিড মহামারীর দুঃসময়ের পর সবচেয়ে কম।
আন্দোলন-সংঘাতের ধাক্কা সামলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলে তৃতীয় প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি একটু বেড়ে ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ হয়। কিন্তু চতুর্থ প্রান্তিক, অর্থাৎ এপ্রিল-জুন সময়ে অর্থনীতির চাকা ফের গতি হারায়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশে।
তবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক।
গত বছরের শেষভাগ থেকে রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা, রেমিটেন্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি, আর্থিক হিসাব ইতিবাচক ও বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকায় এ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে বলছে সংস্থাটি।
তবে বছরের শেষভাগে এসে এক্ষেত্রেও নেতিবাচক ধারার দেখা মিলেছে।
চব্বিশে জুলাই আন্দোলনের ধাক্কায় সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার রেকর্ড ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠেছিল।
সরকার নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানার চেষ্টা করে, যার ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের অক্টোবর মাসে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসে, যা ৩৯ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম।

তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়ার তথ্য মিলেছে। এক মাসের ব্যবধানে কেবল খাদ্য মূল্যস্ফীতিই বেড়েছে দশমিক ২৮ শতাংশ পয়েন্ট।
১৮ ডিসেম্বরের বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার, যা গতবছরের অগাস্টেও ছিল ২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
এর মূলে রয়েছে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোয় উল্লম্ফন প্রবণতা ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা। এর ফলে সরকার আমদানির ক্ষেত্রে যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল তাও তুলে দিয়েছে।
রিজার্ভ বাড়ায় বছরের শেষ দিকে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবণতাও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের আমদানিতে জুলাই-নভেম্বর সময়ে ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে; গত অর্থবছরের একই সময়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক ঝড়ে বিশ্বব্যাপী যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশও তার শিকার হয়। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়িয়ে ট্রাম্পের সম্পূরক শুল্কের খড়্গ থেকে কিছুটা হলেও রেহাই মিলেছে। ৩৭ শতাংশ বাড়তি শুল্ক ধরে মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছিল ৫২ শতাংশ। আলোচনার পর তা কমে এখন ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তবে চলতি অর্থবছরের শেষ চার মাসে রপ্তানি আয়ে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখে দেশের অর্থনীতি। সবশেষ নভেম্বরে রপ্তানি আয় ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য দিয়েছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে গতি ফেরেনি; চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে খরচ হয়েছে বরাদ্দের পৌনে ১২ শতাংশ অর্থ। এই হার রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্য দিয়ে যাওয়া গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে কম। এটি যেমন শতাংশের বিচারে, তেমনি অর্থ খরচের দিক থেকেও।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যেমন চাঞ্চল্য নেই তেমনি রাজস্ব আদায়েও ভাটা দেখা গেছে। এ সময় বড় অঙ্কের প্রবৃদ্ধির দেখা মিললেও চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ঘাটতি প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ১ লাখ কোটি রাজস্ব ঘাটতির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, “২০২৫ এর অর্থনীতি যেভাবে শুরু হয়েছিল জানুয়ারিতে, সেভাবে বললে এটার মধ্যে বেশ কিছু ইতিবাচক প্রবণতাও আছে। আবার কিছু কিছু যে পুঞ্জীভূত সমস্যা ছিল, সে সমস্যাগুলো এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।”

ভোটেই কী স্বস্তি?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলছেন, গেল ১২টি নির্বাচনের মধ্যে অনেকগুলো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ছিল। নির্বাচন ব্যবস্থাকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির’ উপর দাঁড় করানো যায়নি। ১৯৯১ সাল দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে বড় একটা ‘টার্নিং পয়েন্ট’ ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আগের জায়গায় ফিরে গেছে নির্বাচন ব্যবস্থা।
আগামী সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা একটা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পাবে, এমন প্রত্যাশা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এটার তাৎপর্যটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসবে, তাদের ওপরেই নির্ভর করছে অনেক কিছুর গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যাবে।”
অভ্যুত্থানের পরের সময়ের রাজনীতির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন না কমায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
“আমরা যা দেখলাম, আমি ব্যক্তিগতভাবে আশাহত। যে লক্ষ্য, ‘গোল’ নিয়ে জুলাই আন্দোলন হয়েছিল, আন্দোলন হয়েছিল যে উদ্দেশ্যে, সেটা আমরা এখন পর্যন্ত ধরতে পারিনি। শুধুমাত্র আমাদের সংস্কার কমিশন হয়েছে, ঐকমত্য কমিশন হয়েছে, সুপারিশ হয়েছে-এটা মাত্র একটা ভিত্তি স্থাপন হয়েছে। শুধু ভিত্তি স্থাপন করেই পরিবর্তন সম্ভব নয়। তার জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।”
রাজনৈতিক সদিচ্ছার জন্য ঐক্য প্রয়োজন, সে কথাও মনে করিয়ে দিলেন তিনি।
আগামী নির্বাচনে যে সরকার গঠন করবে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করার কথা বললেও ‘শঙ্কাও’ দেখছেন আব্দুল আলীম।
তিনি বলছেন, “অতীতে ভালো নির্বাচন যেগুলো হয়েছে, তফসিলের আগে এক ধরনের পরিবেশ ছিল। তফসিলের পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো ছিল, নিয়ন্ত্রণে ছিল; সবারই ফোকাস ছিল নির্বাচন।
“এবার যেটা দেখলাম, সহিংসতা হচ্ছে; এবারের পরিস্থিতি আগের মতো না, ভালো না। তার মানে, এগুলো চলতে থাকলে নিসন্দেহে একটা শঙ্কা মানুষের মধ্যে, ভোটারের মধ্যে থাকবে।”

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “এবারের নির্বাচন যেকোনো দিক থেকে দেশের জন্য, জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”
বিগত সরকারের সময় মানুষ ভোট দিতে পারেনি দাবি করে তিনি বলেন, “এরকম একটা পরিস্থিতি কাটিয়ে আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অপেক্ষায় আছি।”
জামায়াতে ইসলামের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “নতুন বছর শুরু হওয়ার সাথে সাথে নির্বাচনও পুরোদমে শুরু হয়ে যাবে। তখন রাজনৈতিক পরিবেশ আরও সহনশীল হয়ে উঠবে, রাজনৈতিক পরিবেশ সুন্দর হবে। এতে করে নির্বাচন হয়ে নতুন সরকার গঠনের পরে দেখবেন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও সুন্দর হয়ে গেছে।”
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, “ভোটকে কেন্দ্র করে যে আলোর দিশা দেখার কথা ছিল, আমরা আরো অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছি।”
এর ব্যাখায় শামীম হায়ার বলেন, “‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নাই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মধ্যে কোনো সমন্বয় নাই, রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, সরকার ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় আমরা মনে করি, এভাবে সুষ্ঠু কোন নির্বাচনের ও রাজনৈতিক পরিবেশ সামনে আমরা দেখতে পাচ্ছি না। সরকার উদাসীন, দেশের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সরকার উদাসীন, আন্তরিক না।”
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, “নির্বাচনকে বানচাল করার জন্য, দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি ও ধর্মান্ধ শক্তি যে ষড়যন্ত্র করছে। সেই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে, সংগ্রাম করেই নতুন বছরের রাজনৈতিক পরিবেশকে একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশে আমাদের পরিণত করতে হবে।”

‘অনিশ্চয়তার ছায়া’ থাকছে?
সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের তফসিল ঘোষণার পর ১৬ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন মুহাম্মদ ইউনূস।
এবারের নির্বাচন আর গণভোটই যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা কোন ধরনের রাষ্ট্র প্রত্যাশা করি, তা নির্ভর করবে গণভোটের ফলাফলের ওপর। এই ভোটের মাধ্যমে ঠিক হবে নতুন বাংলাদেশের চরিত্র, কাঠামো ও অগ্রযাত্রার গতিপথ।”
কিন্তু বিদায়ী বছরে যা যা হল তার মূল্যায়ন এবং ছাব্বিশে কী অপেক্ষা করছে সে বিষয়ে নিজের অনুমান তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক ও নাগরিক কোয়ালিশনের সদস্য অধ্যাপক শাহান বলেন, “পঁচিশে অনেক কিছু হয়েছে, তবে বেশ কিছু অনিশ্চয়তা আছে। সংস্কার নিয়ে আমরা অন্তত একটা জায়গায় এসে পৌঁছেছি। কিন্তু সেই সংস্কারটা কতখানি জনগণ বুঝতে পেরেছে, জনগণের কতখানি অংশগ্রহণ, সেটা নিয়ে নিশ্চিত হয়েছে বা রাজনৈতিক দলগুলো শেষ পর্যন্ত কতখানি অঙ্গীকারাবদ্ধ এটার প্রতি থাকবে, সেসব প্রশ্ন রয়ে গেছে।
“একই সঙ্গে এই জুলাই সনদে অনেকগুলো প্রশ্ন আছে, যেই প্রশ্নগুলোর উত্তর পরবর্তী সংসদ দেবে। তার ফলশ্রুতিতে আসলে এই সংস্কারের ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে, সেটা নিয়ে অনিশ্চয়তা (আছে)। তাই, একদিকে হচ্ছে আমরা একটা রূপান্তর করতে যাচ্ছি, আরেকদিকে হচ্ছে আমরা একটা অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছি।”
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে গণঅভ্যুত্থানের গর্ভে জন্ম নেওয়া এনসিপির রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে উত্থান ঘটার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও বছর শেষে তাদের রাজনীতির গতিপথ নিয়ে শঙ্কা থাকার কথা বলেছেন এই বিশ্লেষক।
“এখন এই দুইটা (বিএনপি ও জামায়াত) রাজনৈতিক দল শেষ পর্যন্ত কি তাদের নিজ নিজ আইডিয়া নিয়ে রাজনীতিতে আসবে বা ভোটের ময়দানে কী তারা এইটা নিয়ে রাজনীতি করবে যে এইটা হচ্ছে আমার পলিসি, এইটা হচ্ছে ওদের পলিসির দুর্বলতা। রাজনীতিটা এইদিকে যাবে নাকি হচ্ছে, রাজনীতিটা আবারও হচ্ছে কে জুলাইকে বেশি ধারণ করে-‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’, আবারও সেই ‘বাইনারি ডিভিশনের’ দিকে যাবে-সেই অনিশ্চয়তা থাকল।
“সব কিছু মিলিয়ে ২০২৫ হচ্ছে রূপান্তরের চেষ্টা। কিন্তু সেই রূপান্তরের চেষ্টার পেছনে এই অনিশ্চয়তার একটা ছায়া থেকে যাচ্ছে।”

নতুন বছরে গণতন্ত্রে উত্তরণ প্রশ্নে তিনি বলেন, “নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া এবং সেটাতে জনগণের একটা বড় অংশের অংশগ্রহণ যেন থাকে। মানুষজন যেন ঠিকঠাক মতো ভোট দিতে যায়। ‘দ্যাট ইজ সিম্পলি দ্য ফার্স্ট স্টেপ’।
“দ্বিতীয় ধাপে যে জিনিসটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হচ্ছে একটা গণভোট হচ্ছে। গণভোটটা যদি গৃহীত হয়, তাহলে পরবর্তী চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে আমরা রাষ্ট্র ক্ষমতার-সংস্কারের যে ব্যাপারটা দেখেছিলাম, সেটা আসলে কতখানি বাস্তবায়িত হয়।
“…একই সাথে একটা গোষ্ঠী বা একজন মানুষ চাইলেই আরেকজন মানুষের কোনো অধিকার কেড়ে নিতে পারে না-এইটা থামানো। যেখানে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এটি যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব বা সরকারের দায়িত্ব, এই বোধটা আবার নাগরিকদের মধ্যে ফেরত আনা হচ্ছে চ্যালেঞ্জ। এই তিনটা জিনিস গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”