Published : 09 Jul 2026, 09:38 PM
ময়নাতদন্তের ক্ষেত্রে নারী মরদেহ নারী চিকিৎসক দিয়ে পরীক্ষা করার সুযোগ রাখতে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনের বিল জাতীয় সংসদে তুলতে চেয়ে আইনমন্ত্রী আশ্বাস আর তোলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী।
কিছু দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারের আবেদনে ময়নাতদন্ত না করার সুযোগ রাখার বিষয়টিও ছিল চট্টগ্রাম-১৫ আসনের এই এমপির বিলে।
বৃহস্পতিবার সংসদে তার বিলটি উত্থাপনের কথা ছিল।
শাহজাহান চৌধুরীর প্রস্তাবিত বিলের নাম ছিল ‘দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’।
বিলের খসড়ায় ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারার ৩ উপধারার শেষে দুটি শর্তাংশ যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়।
প্রথম প্রস্তাবে বলা হয়, পুরুষের মরদেহের ময়নাতদন্ত পুরুষ চিকিৎসক এবং নারীর মরদেহের ময়নাতদন্ত নারী চিকিৎসক করবেন যদি মৃত্যুর ঘটনাস্থল যে জেলার সদর এলাকায়, সেখানকার সরকারি হাসপাতালে নারী চিকিৎসক পাওয়া যায়।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়, সড়ক, নৌপথ, রেলপথ বা অন্য কোনো পাবলিক প্লেসে যানবাহনের দুর্ঘটনাজনিত সংঘর্ষে মৃত্যু হলে মৃত ব্যক্তির বাবা, মা, ছেলে বা মেয়ে লিখিত ঘোষণা দিলে ময়নাতদন্ত করা হবে না। ওই ঘোষণায় বলতে হবে, মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত বলে তারা সন্তুষ্ট এবং পরিবারের সদস্যরা মরদেহ পরীক্ষার প্রয়োজন মনে করছেন না।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, মানবিক কারণে ময়নাতদন্তের পুরনো পদ্ধতি পরিহার করে আধুনিক ও শরিয়তসম্মত পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি নিহত হলে তার লাশের হেফাজত ও সম্মান করা সবার দায়িত্ব।
বিশেষ করে নারীর লাশের যত্ন, ইজ্জতের হেফাজত ও লাশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন একান্ত কর্তব্য বলে তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, আইন সংশোধন করে নারীদের ‘পর্দার ভিতর’ ময়নাতদন্ত করা জরুরি।
এ ছাড়া দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির অভিভাবক বা নিকটাত্মীয়ের অনুরোধে ময়নাতদন্ত ছাড়া নিজ নিজ ধর্ম অনুযায়ী দাফন বা সৎকারের অনুমতি দেওয়ার ব্যবস্থা করতেই বিলটি আনার কথা বলেছেন জামায়াতের এই সংসদ সদস্য।
সংসদে বিলটি উত্থাপনের অনুমতি চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধিতে ৫৬৫টি ধারা আছে, এর অনেক উপধারাও রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই আইনের ২৯টি ধারা সংশোধন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার আরও কিছু ধারা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। শাহজাহান চৌধুরীর বিল পাওয়ার পর গত ৩০ জুন সংসদকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে, তার প্রস্তাবসহ আরও কিছু ধারা সংশোধনের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার অচিরেই সংশোধনী আনবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, “যেটা এনেছেন নীতিগতভাবে এটার সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করব না। বাট আমরা যেহেতু এটা আনছি একই সাথে এটা কমপ্লিট করব।”
তিনি আপাতত বিলটি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান।
এরপর শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ২০০৪ সালেও তিনি একই ধরনের বিল সংসদে তুলেছিলেন। তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আশ্বাসে তিনি বিলটি প্রত্যাহার করেছিলেন।
তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু, নৌকাডুবি বা বিষপ্রয়োগের মতো ঘটনায় মৃত ব্যক্তির পরিবারকে ময়নাতদন্তের জন্য ‘কত যে জ্বালা, কত যে কষ্ট’ সহ্য করতে হয়।
বিরোধী দলের এই সদস্য বলেন, মৃত্যুর শোকের পাশাপাশি ময়নাতদন্ত ও দাফন-কাফনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া পরিবারকে আরো ভোগান্তিতে ফেলে। সেই কষ্ট কমাতেই তিনি বিলটি এনেছেন।
তিনি বলেন, তার প্রস্তাবে আটটি সংশোধনী রয়েছে। এগুলো সরকার যেন আসন্ন সংশোধনীতে যুক্ত করে, সে অনুরোধ জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী পরে আবার বলেন, শাহজাহান চৌধুরী ‘ভ্যালিড পয়েন্ট’ তুলেছেন। এ বিষয়ে সরকারের দ্বিমত নেই।
তিনি বলেন, নারী মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্মান রেখে এবং সম্ভব হলে নারী চিকিৎসক দিয়ে করার চর্চা প্রশাসনিকভাবে চালু আছে। হাজতখানায় নারীকে নারী পুলিশ দিয়ে দেখভালের বিষয়টিও এ চর্চার অংশ হয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার সময়ে এ বিষয়ে প্রশাসনিক আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে কোথাও কোথাও নারী চিকিৎসক না থাকায় বাস্তবায়নে সমস্যা হয়।
শাহজাহান চৌধুরীকে উদ্দেশ করে আইনমন্ত্রী বলেন, “আপনি ২২ বছর যখন অপেক্ষা করেছেন, আর কিছুদিন অপেক্ষা করেন।”
সরকার ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধনী আনবে এবং তার প্রস্তাব ‘হুবহু’ আনার চেষ্টা করা হবে, বলেন আইনমন্ত্রী।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান আলোচনায় বলেন, নারী মরদেহের ময়নাতদন্ত নারী চিকিৎসক দিয়ে করার বিষয়টি এখনো সারাদেশে কার্যকর হয়নি। এটি কার্যকর করা জরুরি।
আইনমন্ত্রীর আশ্বাসের পর শাহজাহান চৌধুরী বিলটি আর উত্থাপন করেননি।
পরে অধিবেশনের সভাপতিত্ব ডেপুটি স্পিকার বলেন, মন্ত্রীর অনুরোধে বিলটি উত্থাপন না করতে সম্মত হওয়ায় তা সংসদে আর উত্থাপিত হলো না।
এর আগে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ‘মদ ও জুয়া নিষিদ্ধকরণ বিল, ২০২৬’ উত্থাপনের অনুমতি চান।
আইনমন্ত্রী বলেন, জুয়া আইন ২০২৬ ইতোমধ্যে এ অধিবেশনেই পাস হয়েছে। আর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-তে মদসংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত আছে।
এরপর শাহজাহান চৌধুরী বলেন, বিলটি পাস হওয়ার আগেই তিনি বেসরকারি সদস্য বিল হিসেবে তার প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের পর তিনি ওই বিলও প্রত্যাহার করে নেন।
বেসরকারি বিল কী
জাতীয় সংসদে মন্ত্রী ছাড়া অন্য সদস্যরা বেসরকারি সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন।
সাধারণত সরকারের পক্ষ থেকে আইন প্রণয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা বিল আনেন। তবে মন্ত্রী ছাড়া অন্য যেকোনো সদস্যও আইন প্রণয়নের জন্য বিল আনতে পারেন।
মন্ত্রী ছাড়া জাতীয় সংসদের কোনো সাধারণ সদস্য বিল আনলে সেটিকে বেসরকারি বিল বলা হয়।