Published : 20 Aug 2025, 01:38 AM
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের যে প্রতিশ্রুতি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস দিয়েছেন, সে আলোকে ‘আয়নার মতো’ স্বচ্ছ নির্বাচন করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
তবে, স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘চ্যালেঞ্জের’ দিকটিও সামনে আনছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর মধ্যে মোটাদাগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করা, সেই সাথে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ভোটারদের ‘নষ্ট হওয়া’ আস্থা ফিরিয়ে আনা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তারা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিরোধিতা করে নতুন সংবিধান লিখতে নতুন করে গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি সামনে এনেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি।
এর বাইরে জামায়াতে ইসলামী প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে নির্বাচন দাবি করেছে। যার ফলে কিছু বিড়ম্বনা তৈরি হতে পারে নির্বাচন আয়োজন নিয়ে।
এর আগে অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি না হলেও এক-এগারোর সেনা সমর্থিত সরকারের সময় জরুরি অবস্থায় প্রায় দুই বছর পর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল। তখন দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে দেনবার করাসহ নানা চ্যালেঞ্জ উৎরে নির্বাচন করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
এবার অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাচন আয়োজনের সময় নিয়ে ‘দোদুল্যামানতা’ ও উত্তাপ তৈরি হলেও লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বৈঠকের’ পর তা কেটে যায়।
জুলাই অভ্যুত্থান দিবসে গেল ৫ অগাস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা আাগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেন, যা লন্ডন বৈঠকের যৌথ ঘোষণায় এসেছিল।
রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান ভালো নির্বাচনের জন্য নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত সব পক্ষের মধ্যে বোঝাপাড়া ঠিক রাখায় জোর দিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে যে, আমাদের যে প্রার্থী, রাজনৈতিক দল, ভোটার, সরকার এসবকে কেন্দ্র করে একটা কিন্তু নির্বাচনকেন্দ্রিক সম্পর্ক আছে।
“এই সম্পর্কটা কতটা চমৎকারভাবে নির্বাচন কমিশন বোঝাপড়া তৈরি করতে পারবে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারও এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ। অনুষঙ্গগুলোর সঙ্গে সরকার ও নির্বাচন কমিশন কীভাবে এই বোঝাপড়া করবে সেটার ওপর নির্বাচনের সাফল্য নির্ভর করবে।”

‘আস্থা হারিয়েছে’ ভোটার, যা বললেন সিইসি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরইমধ্যে ‘হালনাগাদ খসড়া’ ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। সবশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৬১ লাখ ৭০ হাজার ৯০০।
গত বছরের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেড় দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন তখনকার সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। আন্দোলনে সরকারি হিসাবে আটশর বেশি মানুষ নিহত হন। আহত হন অনেকে।
এরপর ৮ অগাস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়; যাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে¬¬¬–একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা।
গেল ১০ মে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগ ও তার সকল সংগঠনের কার্যক্রমে নিষিধেজ্ঞা আসে। নৌকা প্রতীকের দলটির নিবন্ধনও স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে তিনটি নির্বাচন আয়োজন করে। সবগুলো নির্বাচনেই ব্যাপক কারচুপি ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে।
এবার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় না থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশে ও জনপরিসরে আলোচনায় আছে ক্ষমতাচ্যুত দলটি।
এমন প্রেক্ষাপটে আগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজা শুরুর আগে সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়।
আওয়ামী লীগের আমলে নির্বাচন কমিশন এবং ব্যবস্থার উপর মানুষের ‘আস্থা নষ্ট’ হয়ে গেছে মন্তব্য করে মানুষকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসাকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
গেল ৬ অগাস্ট ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন নম্বর ওয়ান চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে। আসলে ভোটারদের দোষ দিয়ে লাভ নাই। ভোটাররা নির্বাচন কমিশনের উপর আস্থা হারিয়েছে; নির্বাচন ব্যবস্থার উপর আস্থা হারিয়েছে।”
একই সাথে ‘আয়নার মতো স্বচ্ছ’ নির্বাচনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সিইসি বলেন, “একটা নির্বাচনের স্বচ্ছতার জন্য যা যা দরকার, তার মধ্যে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা হল-এক নম্বর। আমরা কিন্তু নির্বাচনটাকে স্বচ্ছ করতে চাই; আয়নার মত পরিষ্কার করতে চাই। মানুষ, বিশ্ববাসী দেখুক যে আমাদের আন্তরিকতার, আমাদের চেষ্টার কোনো ঘাটতি আছে কিনা। এটা দেখুক, আমরা সেটা চাই। লুকিয়ে কোনো কাজ করতে চাই না।”

আইনশৃঙ্খলার উন্নতি কীভাবে
‘মব’ সৃষ্টি করে হামলা-হত্যার পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সেই সাথে পুলিশকে পুরোপুরি সক্রিয় করতে না পারার আলোচনার মধ্যে ভোটের হিসেবে চ্যালেঞ্জ সামনে আছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।
গত এক বছরে সরকার যে পুরোপুরি শৃঙ্খলা না ফেরাতে পারেনি, সে আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো আছে।
বিএনপি বলছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ‘উদ্বেগ’ থাকলেও তারা ‘দুশ্চিন্তার’ কিছু দেখছে না।
রোববার নির্বাচন ভবনে গিয়ে সিইসির সঙ্গে বৈঠকের পর দলটি বলেছে, পুলিশ বাহিনীর ‘দুর্বলতার’ কারণে এ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তবে চার-পাঁচ মাসের মধ্যে তা কেটে যাবে।
প্রায় এক ঘণ্টা বৈঠক করার পর ব্রিফিংয়ে এসে বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেন, “আমরা আলোচনায় যতটুকু বুঝেছি যে তারা (ইসি) নির্বাচনের প্রস্তুতি যথাযথভাবে নিচ্ছে। এখনও তাদের কিছুটা উদ্বেগ আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে। তবে তারা মনে করে এবং আমরাও মনে করি, দেশে এখন পুলিশের যে ভূমিকা, সেই ভূমিকা অপেক্ষাকৃত দুর্বল।”
তার আগে ১০ অগাস্ট সিইসির সঙ্গে বৈঠকের পর জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সংস্কার নিশ্চিত করে নির্বাচন আয়োজনের দাবি তুলে ধরেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুকূল নয়। ভোটের পূর্বশর্ত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে হবে।
সে দিন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে ‘চ্যালেঞ্জ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
“আইনশৃঙ্খলা একটি চ্যালেঞ্জ। যে কোনো সময়ই চ্যালেঞ্জ। বর্তমানের চ্যালেঞ্জটা আমরা সবাই জানি।”
নির্বাচনে বাধা দেওয়া ও নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করার মত অপচেষ্টার আশঙ্কার কথাও বলেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও।

তবে, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আগামী নির্বাচনে পুলিশ ও আনসারের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর ৮০ হাজারেরও বেশি সদস্য মোতায়েন থাকবে বলেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
১১ অগাস্ট দুপুরে কেরানীগঞ্জে ঢাকা-৩ সংসদীয় আসনের ৩ নম্বর ভোটকেন্দ্র তেঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে পুলিশ, আনসার ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি ও নৌবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।”
আগের দিন ১০ অগাস্ট সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘প্রথমবারের মতো’ প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তায় ‘অস্ত্রসহ আনসার’ সদস্য রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, “অনেক সময় প্রিজাইডিং অফিসারের ওপর (লোকজন) হামলা করতে যায়। এজন্য ওনার জন্য হাতিয়ারসহ একটা গার্ডের ব্যবস্থা করছি। ওনাকে কেউ যেন কোনো কিছু না করতে পারে।”
আগামী নির্বাচনে সহিংসতার শঙ্কার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, “এটা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ নয়। মূল কাজ করবেন নির্বাচনে যারা অংশগ্রহণ করবেন, তারা। তারা নির্বাচনটা কীভাবে চাচ্ছে, নির্বাচন কমিশন কীভাবে চাচ্ছে।
“প্রশাসন রয়েছে, তারপরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারপরের বিষয়টি জনগণ, তাদেরতো ভোট কেন্দ্রে যেতে হবে।”
এছাড়া, ‘স্বচ্ছ নির্বাচনের স্বার্থে’ আগামী নির্বাচনের আগে সকল জেলার এসপি ও ওসিদের লটারির মাধ্যমে বদলির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
৬ অগাস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
সভা শেষে ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছিলেন, “নির্বাচনের সময় দেখা যায, প্রার্থীরা তাদের আসনে পছন্দের ডিসি, এসপি কিংবা ওসিকে পদায়ন করতে চান৷ কিন্তু আমরা এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি সাংবাদিক প্রতিনিধিদের সামনে লটারি করব।”
লটারি অনুযায়ী নির্বাচনের আগে বিশেষভাবে এসপি ও ওসিদের পদায়ন করা হবে–এমন পরিকল্পনার কথা বলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।

এ বিষয়ে আরেক নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেটি, আমাদের বিশ্বাস যখন আমরা সবাই নির্বাচনমুখী হব, তখন যারা নির্বাচনে অংশ নেবেন, তারাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
“তখন নির্বাচন একদিকে, আমরা সবাই একদিকে কীভাবে নির্বাচন সষ্ঠুভাবে শেষ করা যায়। তখন স্বাভাবিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি দৃশ্যমান হবে।”
‘শঙ্কা’ দেখছে না ইসি, ভাবনায় শুধু ভোট
ভোটের অনুকূল পরিবেশ নেই এবং ভোট নিয়ে শঙ্কার কথা বলছেন রাজনৈতিক দলের কেউ-কেউ। ফেব্রুয়ারিতে ভোট হবে না–এমন মন্তব্যও এসেছে এনসিপির একজন নেতার কথায়। ফলে, অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন করে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক দলের সেই ‘শঙ্কা’র বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের বক্তব্য হচ্ছে যেটা, রাজনীতিকরা তাদের মতামত প্রকাশ করতেই পারেন। তাদের বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজি আছে, বলতেই পারেন। তবে যেহেতু আমরা প্রধান উপদেষ্টা মহোদয়ের কাছ থেকে চিঠি পেয়েছি, এখন আমরা চিঠির ভিত্তিতেই কাজ করব। এটাই আমি মনে করি ইনশাল্লাহ।”
ওই ধরনের ‘শঙ্কার’ কথা এখন আর ইসির ভাবনার মধ্যেও নেই বললেন তিনি।
ভোটকে সামনে রেখে ‘বড় ধরনের’ কোনো চ্যালেঞ্জ দেখতে পাচ্ছে না ইসি। সে বিষয়ে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, “এখন আর ‘চ্যালেঞ্জকে’ আমরা আর চ্যালেঞ্জ মনে করতেছি না। আমরা মনে করতেছি যে, নির্বাচনের জন্য আমাদের যেহেতু একটা বার্তা আমরা পেয়ে গেছি, ওই বার্তা অনুযায়ী, আমাদের যা করণীয় ইনশল্লাহ আমাদের তরফ থেকে আমরা তাই করব।”
ফেব্রুয়ারির ভোটই ইসির সব ভাবনায় রয়েছে, প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে।
“বার্তা ওই একটাই। এখন আমরা ফেব্রুয়ারি ধরে কাজ করতেছি। আমাদের যত কাজগুলো, সেগুলো আমরা গুছিয়েছি,” বলেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।

‘কে কী বলল, শোনার দরকার নেই’
শনিবার ঢাকার মোহাম্মদপুরে এক অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা করা সময়েই নির্বাচন হবে।
“প্রধান উপদেষ্টা যেটা বলেছেন, ওটার উপরে কারও কোনো কথা নেই। উনি যে মাসের কথা বলেছেন, সে মাসে নির্বাচন হবে। কে কী বলল, ওটা শোনার আমাদের দরকার নেই।”
তার আগের দিন শুক্রবার একইরকম বক্তব্য দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। ফেব্রুয়ারির ভোট আটকানোর সাধ্য কারো নেই বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
ভোটপ্রস্তুতিতে ইসির রোডম্যাপের কথা তুলে ধরে মাগুরায় সাংবাদিকদের প্রেস সচিব বলেছেন, “বর্ষা শেষে সেপ্টেম্বরের পরে পাড়ায়-মহল্লায় ভোটের আমেজ শুরু হবে। আমরা নিশ্চিত যে, পুরো জাতি তখন কারো মনে যদি কোনো সন্দেহ থাকে সেই সন্দেহটুকু চলে যাবে। নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতেই হবে এবং রোজার আগেই হবে।”
তফসিল হতে পারে ডিসেম্বরে
জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় নির্বাচনের সময় জানিয়ে দেওয়ার পরের দিন সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন, “ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন করার জন্য বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও আমরা কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছি ইনশআল্লাহ। আমাদের কোন প্রস্তুতিতে ঘাটতি হবে না। ভোটের তারিখের দুই মাস আগে (ডিসেম্বরে) তফসিল ঘোষণা করা হবে।”
ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোটের তারিখ বিবেচনায় ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তফসিলের কথাও বলেছে ইসি। তফসিল থেকে ভোটের পরের ১৫ দিন পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি, নির্বাচনি পরিবেশ বজায়ে রাখায় নিজেদের কর্তৃত্ব থাকার কথাও বলেছে ইসি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে সিইসি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। নির্বাচনের আগে সবাই ভোট নিয়ে ব্যস্ত হয় এবং পারস্পরিক সহযোগিতায় তার উন্নতি হয়। আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জ হবে না।”
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে নির্বাচন কমিশনের প্রচেষ্টার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সহযোগিতা চান তিনি।

নির্বাচন বিশ্লেষক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, “এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি হচ্ছে এবং সরকারও এ বিষয়ে তৎপর রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পরই নির্বাচন কমিশনের চ্যালেঞ্জ বাড়বে। তখন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির বিষয়টিও সামনে আসবে। তফসিলের পর রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রার্থী-সবার জন্য সমান সুযোগের বিষয়টি ইসিকে নিশ্চিত করতে হবে।”
সরকার যেহেতু ভোটকেন্দ্রে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে জোর দেন তিনি।
আর, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, “সরকার না চাইলে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে না। আগামী নির্বাচন নিয়ে কোন অনিশ্চয়তা নেই। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সে সময়ের মধ্যে নির্বাচন হওয়া জরুরি। এবারের নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় থাকবে। সকল পক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে ভোটাররা এবার নিঃসংকোচে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেবে।
“তবে রাজনৈতিক দলসমূহ হুন্ডা—গুন্ডা, টাকার খেলায় মত্ত থাকলে ভালো নির্বাচন সম্ভব নয়। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা মুখ্য হলেও প্রার্থী, ভোটার, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমসহ সকল অংশীজনের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।”
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ সপ্তাহে রোডম্যাপ প্রকাশ করবেন এ এম এম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন।
বৃহস্পতিবার নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ।
তিনি বলেছেন, নির্বাচনি কাজের সময়ভিত্তিক বাস্তবায়নসূচি থাকবে এ রোডম্যাপে।
এনসিপি চায় গণপরিষদ নির্বাচন
নির্বাচন আয়োজনের সময় ঘোষণার করার আগে বিকালে জুলাই অভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ দিয়েছেন। এ ঘোষণাপত্র ‘অসম্পূর্ণ’ বলে মন্তব্য করলেও তা মেনে নেওয়ার কথা বলেছে এনসিপি।
যদিও সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সহমতে তৈরি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এর আইনি ভিত্তি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দলটি। এ ক্ষেত্রে ছাড় না দেওয়ার হুঁশিয়ারিও এসেছে এনসিপির কাছ থেকে।
জামায়াতও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দাবি করে মামলা করার হুমকি দিয়ে রেখেছে।
তবে এনসিপি বিদ্যমান সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি সামনে এনেছে। এ দাবিতে জনগণকে সংগঠিত করে মাঠে নামার কথাও বলেছেন দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

শনিবার দলের আলোচনা সভায় তিনি বলেছেন, “গণঅভ্যত্থানে যারা শহীদ হয়েছিল, যারা আহত হয়েছিল, তাদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য আমাদের একটি নতুন সংবিধান প্রয়োজন।
লন্ডনে মুহাম্মদ ইউনূস ও তারেক রহমানের বৈঠকের প্রতি ইঙ্গিত করে নাসীরুদ্দীন প্রধান উপদেষ্টার কঠোর সমালোচনা করেছেন।
প্রধান উপদেষ্টা ‘লন্ডনে গিয়ে সিজদা দিয়েছেন। সিজদা দিয়ে ওহির মাধ্যমে আদেশ পেয়েছেন’, এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তো আপনার সিজদাটা ঠিক হয় নাই। আপনার সিজদা দিতে হবে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি। কারণ, জনগণ আপনাকে বসিয়েছেন, সে সিজদার মাধ্যমে আপনি সঠিক দিকনির্দেশনা পাবেন।”
যা বলছেন বিশ্লেষকরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। এটা সবসময় আছে। পৃথিবীর সবদেশেই নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ থাকে, বাংলাদেশেও আছে। কিন্তু, আমরা তো এরকম পরিস্থিতি আরও অনেকবার মোকাবেলা করেছি। এবং সবসময় কিন্তু আমরা তিন মাস, চার মাসের মধ্যে এ চ্যালেঞ্জ উৎরানোর চেষ্টা করেছি। শুধু ২০০৭-০৮ বাদ দিলে।
“আমার কাছে মনে হয় না, সরকার যদি ইচ্ছা করে, নির্বাচন কমিশন যদি ইচ্ছা করে এগুলো কোনো চ্যালেঞ্জ না।”
তিনি বলেন, “সরকারের এখন যেসব চ্যালেঞ্জ আছে, সেটা হল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নয়ন করা। এটা তো উন্নতির শেষ নেই; সবসময় এটা আমাদের চালিয়ে যেতে হবে। ফলে, যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থাতেই কিন্তু আমাদের নির্বাচনটা করতে হবে।”
ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) সভাপতি মুনিরা খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি মনে করি, নির্বাচনটা যে সময়ে করার ঘোষণা এসেছে, সে সময়েই হওয়া উচিত। সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো দেশের কথা চিন্তা করে, ভোটারদের কথা চিন্তা করে এই নির্বাচনটা যাতে ঠিক সময়ে হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নির্বাচনটা বাধাগ্রস্ত না হতে যা যা করা দরকার, রাজনৈতিক দলগুলোর করা উচিত।
“আমি মনে করি, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই আসল দায়-দায়িত্ব নিতে পারে দেশের। এজন্য তাদের প্রথম উচিত হচ্ছে, নির্বাচনটা সবাই মিলে সহযোগিতা করে যেন ঠিক সময়ে করতে দেয়।”
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো ইচ্ছে করলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জটাকেও তারা মোকাবেলা করতে পারে। সংঘর্ষ যাতে না হয়, অন্তর্ঘাত যাতে না হয়, সেটা দেখতে পারে।
তাদের দেশের প্রতি যদি ভালোবাসা থাকে, গণতন্ত্রের প্রতি যদি ভালোবাসা থাকে, তারা যেন সবাই মিলে, ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনটা ঠিক সময়ে করতে সহযোগিতা করে।”
আরও পড়ুন:
আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে, মানুষকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসাই বড় চ্যালেঞ্জ: সিইসি
ভোটারের 'আস্থা' ফেরানোই মৌলিক 'চ্যালেঞ্জ': নির্বাচন কমিশন
কোনো ভোট হলে গণপরিষদ নির্বাচন 'আগে হতে হবে': নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
সিইসির সঙ্গে বৈঠক: আইনশৃঙ্খলা নিয়ে 'দুশ্চিন্তার' কিছু দেখছে না বিএনপি
ভোটের আগে লটারিতে এসপি-ওসিদের বদলি: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তায় ‘অস্ত্রসহ আনসার’ থাকবে: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা