Published : 07 Dec 2025, 10:27 PM
দিনভর ভুগিয়ে রাত সাড়ে ৮টার দিকে সড়ক ছেড়েছেন আন্দালনরত মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা।
দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজস্ব বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে— নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির কাছ থেকে এমন আশ্বাস পেয়ে সড়ক ছাড়েন আন্দোলনকারীরা।
এর আগে সকাল থেকে প্রায় ১০ ঘণ্টা আগারগাঁওয়ে সড়ক অবরোধ করে রাখেন তারা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, তাদের মজুত থাকা অবিক্রিত মোবাইল ফোনের বৈধতা নিশ্চিত করতে হবে, আমদানির ক্ষেত্রে কর কমাতে হবে এবং আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্ট্রার বা এনইআইআর কার্যকর হওয়ার পর দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে অবৈধ হ্যান্ডসেট ব্যবহার করা যাবে না।
অননুমোদিত মোবাইল ফোন বন্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রোববার সকাল ১০টার পর থেকে ঢাকার আগারগাঁও এলাকায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ভবনের সামনে সড়ক আটকে বিক্ষোভ শুরু করেন মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী ও তাদের কর্মচারীরা।
দুপুর থেকে তারা আগারগাঁও মোড় থেকে শুরু করে আশপাশের গলিপথগুলোও অবরোধ করেন। ফলে বিকাল ও সন্ধ্যার দিকে চরম ভোগান্তিতে পরে মানুষ। আশপাশের তিনটি বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগী আনা-নেওয়ায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের (এমবিসিবি) ব্যানারে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মোবাইল ব্যবসায়ীরা রোববারের বিক্ষোভে যোগ দেন। এসময় বিটিআরসি ভবন পাহারা দিতে সেনাবাহিনীকে ডাকা হয়। পুলিশও ছিল। তবে সড়ক থেকে ব্যবসায়ীদের সরিয়ে দিতে শক্তি প্রয়োগ করেনি কোনো বাহিনী।
প্রায় ১০ ঘণ্টা বিক্ষোভের পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে ব্যবসায়ীদের একটি প্রতিনিধিদল বিটিআরসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এসে কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করেন।
বিটিআরসির আশ্বাস অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিটিআরসি ভবনে এনবিআর, ডাক ও টেলিযোগাযোগ, অর্থ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠক হবে।
তবে বৈঠকের আগের দিন সোমবার সব মোবাইল ফোনের দোকান ‘শাটডাউন’ রাখার কর্মসূচি দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এমবিসিবির সহসভাপতি শামীম মোল্লা বিটিআরসির সঙ্গে বৈঠকের পর বলেন, “আমাদের প্রথম কথা হলো, আমাদের যে (স্টক) প্রডাক্টগুলো আছে, সেগুলো বিটিআরসি কীভাবে গ্রহণ করবে। তারা বলেছে, সমস্ত পণ্য নির্ধিদ্বায় তারা তালিকাভুক্ত করবে। তারপর আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, এনবিআরের ট্যাক্স কমাতে হবে। এজন্য বিটিআরসি চেয়ারম্যান ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলবে, অর্থ মন্ত্রণালয়ে কথা বলবে।
“আমাদের শেষ কথা হলো, বিটিআরসি আমাদের সঙ্গে মঙ্গলবার ১১টায় বসবে। কীভাবে আমরা আমদানি করার পথটি সহজ করতে পারি, সেটি নিয়ে উভয় পক্ষ কথা বলবে। এনওসি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এনওসি, বিল অব এন্ট্রি, মাদার অব এনওসি- এগুলো যেন একেবারে সহজে করা যায়, সেই জায়গায় আসতে পারে। মিটিংয়ে যদি কর কাঠামো আমাদের মনমতো হয়, তাহলে আমরা ঠিক আছি। আমাদের সঙ্গে ট্যাক্স নিয়ে সমঝোতা না হয়, তাহলে এই এনইআইআর সিস্টেমের সময় পেছাবে।”

এমবিসিবির সভাপতি মো. আসলাম বলেন, “আমরা ২৫ থেকে ৩০ বছর ব্যবসা করেছি একটা ট্যাগ নিয়ে। সেটা হচ্ছে অবৈধ ব্যবসায়ী আর অবৈধ মাল। আমরা অবৈধ থাকতে চাই না, সে কথাটা তাদের জানিয়েছি। বিটিআরসির চেয়ারম্যান আন্তরিকতা দেখিয়েছেন। তিনি আমাদের হয়ে মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে কথা বলে একটা মিটিংয়ের আয়োজন করছেন।
“আমাদের অর্থ উপদেষ্টা দেশের বাইরে আছেন। ভ্যাট-ট্যাক্সের বিষয়টা তার এখতিয়ারে। তিনি সোমবার দেশে আসবেন, মঙ্গলবার আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন। মঙ্গলবার আমরা এনবিআর, বিটিআরসি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও উপদেষ্টাসহ মিটিং করব। ঠিক এই জায়গায়। মিটিংয়ে যদি ফলপ্রসূ কোনো ফল না আসে, তাহলে আমরা যারা নেতৃবৃন্দ আছি, তখন আমরা আবার সিদ্ধান্ত নেব। কঠোর থেকে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেব।”
একজন ব্যবসায়ী জিজ্ঞেস করেন, এনইআইআর বাতিল বা সংস্কারের যে দাবি উঠেছিল, সেটা নিয়ে নেতাদের অবস্থান কী?
জবাবে মো. আসলাম বলেন, “আমরা শুরু থেকে বলেছি, এনইআইআরের বিপক্ষে আমরা না। আমাদের বাণিজ্য যদি ওপেন করে দেয়, এলসি করা যদি সহজ করে দেয়, বাধাগুলো দূর করে দেয়, উনারা কমিটমেন্ট করেছেন, বিটিআরসির হাতে যা আছে, সেসব প্রতিবন্ধকতা দূর করবেন। এই যে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) আছে, সেটা বিটিআরসির হাতে। কিন্তু ট্যাক্স নির্ধারণের কাজ এনবিআর এবং বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের। এজন্য মঙ্গলবার বিটিআরসি সব মন্ত্রণালয়কে নিয়ে আমাদেরসহ বসবে।
“উনারা বলেছেন, আমাদের সঙ্গে যদি ট্যাক্সে বেশি পার্থক্য হয়ে যায়, সেক্ষত্রে ১৬ ডিসেম্বর এনইআইআর সিস্টেম চালু হবে না।”

আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর কার্যকর হলে মোবাইল হ্যান্ডসেট নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। তখন সরকার অনুমোদিত বৈধ হ্যান্ডসেটই কেবল নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকতে পারবে। তবে বৈধ মোবাইল ফোনের গ্রাহককে নিবন্ধনের জন্য কোনো দৌড়-ঝাঁপ করতে হবে না। আর ১৬ ডিসেম্বরের আগে নেটওয়ার্কে সচল থাকা কোনো হ্যান্ডসেটই বন্ধ করা হবে না বলেও সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।
দেশের বর্তমান মোবাইল বাজারের বেশির ভাগটাই ‘আনঅফিসিয়াল’ ফোনের দখলে। সরকারের ভাষ্য, ব্যবসায়ীরা চোরাপথে ট্যাক্স-ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে এসব ফোন নিয়ে আসছে, অনেক ক্ষেত্রে এভাবে অন্যদেশ থেকে নিম্নমানের, ব্যবহৃত বা ‘রিফারবিশড’ হ্যান্ডসেট এনে দেশে বিক্রি করা হচ্ছে। এগুলোকে অবৈধ বলা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে।
যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক যুগের বেশি সময় ধরেই তারা এই ব্যবসা করেছেন প্রকাশ্যে। কখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোন বাধা আসেনি। গত অক্টোবরের শেষে হঠাৎ সরকারের পক্ষ থেকে এনইআইআর চালুর ঘোষণা আসায় ধাক্কা খেয়েছে এই বাজারের কয়েক হাজার ব্যবসায়ী।
আরও পড়ুন
বিটিআরসির সামনে সড়ক আটকে বিক্ষোভ মোবাইল ব্যবসায়ীদের
বিটিআরসি ঘেরাও: আগারগাঁওয়ে চরম দুর্ভোগ, নিস্তার পাচ্ছেন না রোগীরাও