Published : 02 Nov 2025, 11:43 PM
আগামী জাতীয় নির্বাচনে ‘ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা’ নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা, সামাজিক স্থিতি এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ‘অভূতপূর্ব ঝুঁকি’ সৃষ্টি করেছে বলে সতর্কবার্তা এসেছে এক গবেষণায়।
দেশের অনলাইন তথ্যপরিবেশ এখন ‘ভীষণভাবে ভঙ্গুর ও বিভক্ত’ হয়ে পড়েছে বলেও পর্যবেক্ষণ এসেছে এই গবেষণা প্রতিবেদনে।
ডিজিটাল অধিকার ও তথ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিটালি রাইট’ নামে একটি সংগঠনের নতুন এক গবেষণায় এমন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
রোববার ঢাকার গুলশানে একটি হোটেলে এক অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয় বলে সংগঠনটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহায়তায় ‘ট্যাকলিং ইলেকশন ডিসইনফরমেশন ইন বাংলাদেশ: বিল্ডিং কালেকটিভ রেসপন্সেস ফর ইলেক্টোরাল ইন্টেগ্রিটি’ শিরোনামের এই গবেষণা প্রতিবেদন করেছে ডিজিটালি রাইট।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজনে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন যাবতীয় প্রস্তুতি গুছিয়ে আনছে।
এই নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) অর্থায়নে ‘প্রমোটিং ইফেকটিভ, রেসপনসিভ অ্যান্ড ইনক্লুসিভ গভর্ন্যান্স ইন বাংলাদেশ’ কর্মসূচির আওতায় ভুয়া তথ্য নিয়ে এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গোষ্ঠী, বিদেশি ও প্রবাসী প্রভাব বিস্তারকারী-সবাই যেন এক ধরনের ‘ডিজিটাল প্রতিযোগিতায়’ নেমেছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর কনটেন্ট, প্রোপাগান্ডা নেটওয়ার্ক এবং বাণিজ্যিক কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
গবেষণাটি বলছে, ভুয়া তথ্য কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার হাতিয়ার নয়, এটি এখন জনআস্থা হ্রাস, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও নারীর কণ্ঠরোধের অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
বিকৃত ছবি, মনগড়া ভিডিও ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি কনটেন্ট নারী প্রার্থী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নির্বাচনের আগে ভয়ভীতি, হয়রানি ও ভোটার দমন বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এই ঝুঁকির বিপরীতে প্রস্তুতি ‘এখনো আশঙ্কাজনকভাবে দুর্বল’ দাবি করে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ফ্যাক্টচেকারের সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ জন। বেশিরভাগ মূলধারার সংবাদমাধ্যমে ফ্যাক্টচেকার নেই। সাংবাদিক ও ফ্যাক্ট-চেকাররা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও পারস্পরিক সমন্বয়ের অভাবে ভুগছেন। নির্বাচনি পর্যবেক্ষক ও নাগরিক সংগঠনগুলো ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় প্রায় অনুপস্থিত। সামাজিক মাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো অন্য অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে না। নির্বাচন কমিশনেরও এই ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত নীতি-কাঠামো. দক্ষতা ও সক্ষমতা নেই।
অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করে ডিজিটালি রাইটের গবেষণা প্রধান তিতির আব্দুল্লাহ বলেন, “নির্বাচনকে সামনে রেখে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বেশ কিছু বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে, যেগুলোতে বিভিন্ন সংজ্ঞা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়নি বা এর অপব্যবহার রোধের জন্য কোনো সুরক্ষাব্যবস্থাও রাখা হয়নি।
“এ থেকে বোঝা যায় যে, অংশীজনদের সাথে যথেষ্ট আলোচনা করা হয়নি, যা আইনগুলোর যথেচ্ছ প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
“এ ধরনের বিধিমালা ব্যবহার করে বৈধ সমালোচনা ও ভিন্নমতকে দমন করা হচ্ছে, যেমনটা আমরা অতীতের আইনগুলোর ক্ষেত্রেও দেখেছি। মানবাধিকারের ওপর এর প্রভাব যাচাই করতে এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ব্যবস্থা করার জন্য, যেকোনো বিধিমালা গ্রহণের আগে অংশীজনদের সাথে প্রয়োজনীয় আলোচনা করা উচিত।”
পরে আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা নির্বাচনি অপতথ্য মোকাবিলায় গণমাধ্যম, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রথম আলো অনলাইনের প্রধান শওকত হোসেন বলেন, “প্রচলিত গণমাধ্যমের তথ্য যাচাই করার গতানুগতিক পদ্ধতি আর কাজ করবে না। এই গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে তাদের ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের ওপর নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের দরকার আছে।
“এআই এর দ্রুত অগ্রগতির কারণে আমাদের সামনে একটা বড় চ্যালেঞ্জ আছে এবং সম্ভবত ফ্যাক্ট-চেকারদের পক্ষে এই অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়বে।”
ইউল্যাবের মিডিয়া স্টাডিজ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুমন রহমান বলেন, “ভুল তথ্য মোকাবেলা করার জন্য ফেসবুক এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। সরকারকে প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে আলোচনা করতে হবে এবং তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
“দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সরকারের প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর প্রভাব খাটানোর মতো অবস্থা নেই এবং আগের সরকারের এই সংক্রান্ত ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে তারা আলোচনার সব ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে।”
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ‘আই'সোশ্যাল’ এর চেয়ারপার্সন অনন্য রায়হান, এফসিডিও এর গভর্নেন্স অ্যাডভাইজার এমা উইন্ড, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ ও ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী।