Published : 13 Apr 2026, 10:23 AM
ঢাকার শ্যামলীতে আলোচিত কিডনি চিকিৎসক কামরুল ইসলামের হাসপাতালে চাঁদাবাজির মামলায় অভিযুক্ত যুবদল নেতা মঈন উদ্দিনসহ সাত জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব।
র্যাব সোমবার সকালে এ তথ্য জানিয়েছে।
গ্রেপ্তাররা হলেন-মঈন উদ্দিন মঈন, মো. লিটন মিয়া, মো. সুমন, মো. শাওন, স্বপন কাজী, মো ফালান ও রুবেল।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, মঈনকে নড়াইলের কালিয়ার দাদনতলা গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তিনি বলেন, “ওই গ্রামে মঈন তার ফুপুর বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন। তাকে ঢাকায় আনা হচ্ছে। পরে শেরেবাংলা নগর থানায় হস্তান্তর করা হবে।”
এছাড়া লিটন ও সুমনকে ঢাকার শেরেবাংলা গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-২। এছাড়া শাওন, স্বপন, ফালান ও রুবেলকে পৃথক অভিযান চালিয় গেপ্তার করেছে র্যাব-৪।
স্বল্প খরচে কিডনি চিকিৎসা ও প্রতিস্থাপনের জন্য অধ্যাপক কামরুলের পরিচিতি রয়েছে। গত শুক্রবার তা সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালে যুবদল পরিচয়ে চাঁদা দাবির বিষয়টি গণমাধ্যমে আসে। পর যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়নসহ একটি প্রতিনিধি দল রাত দেড়টার দিকে শ্যামলীর ওই হাসপাতালে যান।
তারা অধ্যাপক কামরুল ইসলামের কাছে ঘটনা জানতে চান, তাকে বিষয়টি সুরাহার বিষয়ে আশ্বস্ত করেন।
এ ঘটনায় হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের ইনচার্জ আবু হানিফ মামলা করেন।
মামলায় ওই এলাকার যুবদল নেতা মঈন উদ্দিনসহ (৪২) আরও ৭ থেকে ৮ জনকে আসামি করা হয়।

র্যাব বলছে, চাঁদাবাজির ঘটনা সামনে আসার পর র্যাবের একটি দল সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতাল পরিদর্শন করে এবং চিকিৎসক কামরুলের সঙ্গে কথাও বলেছে। হাসপাতালের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও এবং যুবদল নেতা মঈন উদ্দিনের ফোন নম্বরও সংগ্রহ করে র্যাবের ওই দলটি। পরবর্তীতে র্যাবের বিভিন্ন ব্যাটেলিয়ান সম্মিলিতভাবে আসামিদের গ্রেপ্তারে কাজ করে।
যা ঘটেছিল
অধ্যাপক কামরুল ইসলাম বলেছিলেন, ৫ অগাস্টের পর শ্যামলীর চার নম্বর রোডের বাসিন্দা মঈন নামে এক ব্যক্তি হাসপাতালে খাবার সরবরাহের ঠিকাদারির কাজ নেয়। কিন্তু মঈন খাদ্যপণ্যের অনেক বেশি দাম ধরছিলেন দেখে তাকে সম্প্রতি বাদ দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “আমি আমার রোগীদের খাবারের কোনো বিল ধরি না। এখানকার স্টাফরাও হাসপাতালে খাবার খায়। একটা মিনিমাম মার্জিনে আমরা হাসপাতালটা চালাই। ও খাবারদাবারের অনেক বেশি টাকা দাম ধরছিল বলে তাকে বাদ দেওয়া হয়।
“আমি নিজে কৃষি মার্কেটে গিয়ে তদারকি করে জিনিসপত্র কিনে আনি। এরপর সে লোকজন নিয়ে এসে হাসপাতালের স্টাফদের সঙ্গে উচ্চবাচ্য শুরু করে, টাকা চায়।”
এই চিকিৎসকের ভাষ্য, “আমাদের রোগীদের বেশিরভাগই গ্রাম থেকে আসা, তাদের যে খাবারটা দিতে আমার হয়তো ২০০ টাকা খরচ হয়, সে খাবারটা বাইরে কিনে খেতে গেলে তাদের হাজার টাকা খরচ হতো। সেই চিন্তা থেকেই এটা করা। হাসপাতালের একটা ক্রয় কমিটি আছে, যারা সবচেয়ে কম দরে যার কাছে পান- তার কাছ থেকে কেনাকাটা করেন।
“কিন্তু এই ছেলেটা এসে ৬৬ টাকা কেজি যে চালের, তার বিল করছিল ৭৭ টাকা করে। ১০০০ ডিমের দাম নিচ্ছিল সাড়ে নয় হাজার টাকা, যেটা আমি নিজে গিয়ে ৮১০০ টাকায় ওই দোকান থেকেই নিয়ে এসেছি। এভাবে না কিনলে তো আমার পক্ষে চালানো সম্ভব না।”
অধ্যাপক কামরুল বলেন, “আমার স্টাফরা যখন তার কাছ থেকে কেনাকাটা বন্ধ করে দিতে গেল, তখন শুরু হলো হুমকি। তাকে তুলে নিয়ে যাবে, এই করবে, সেই করবে। হঠাৎ করে একদিন বলা শুরু করল, একজনের কাছে সে পাঁচ লাখ টাকা পায়- সে টাকা দিতে হবে।
“আমার হাসপাতালে তাকে ভয় পেত। সে বেশ লম্বাচড়া, সাথে কয়েকজনকে নিয়ে আসতো, আবার বলত যুবদল কর্মী; যার কারণে তাকে তো কিছু বলাও যায় না। হাসপাতালের সিকিউরিটির লোকেরাও তাকে ভয় পেত।”

তিনি বলেন, “তো আজকে সে যেটা করেছে, আমার একটা স্টাফের বাসায় গিয়ে ভোর বেলায় তাকে টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছে। আমার স্টাফ একটা ঘরে লুকিয়ে ছিল। আমি পুলিশকে ফোন করেছি, সেনাবাহিনীকে ফোন করেছি। শুধু পুলিশ এসেছিল।
“ওর নামে আগেও জিডি করা ছিল। কিন্তু পুলিশ যে তাকে ধরবে বা নিয়ে যাবে- এরকম কোনো তৎপরতা ছিল না। তারা কী তাকে ভয় পায় কি না, জানি না।”
অধ্যাপক কামরুল ইসলাম বলেন, “হাসপাতালের যে স্টাফ এর সঙ্গে এরকম করা হচ্ছিল, সে এখানে ৩০ বছর ধরে কাজ করে। অপারেশন থিয়েটারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্টাফ সে।
“এখন তার দাবি হচ্ছে হয় ওই স্টাফকে বের করে দিতে হবে; আর না হয় তাকে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। আর নাহলে তাকে আবার ঠিকাদারির কাজ ফিরিয়ে দিতে হবে।”
চিকিৎসক কামরুল বলেন, “যুবদল পরিচয় দেওয়া ছেলেটা ৫ অগাস্টের পর থেকে এখানে সাপ্লাই করতেছিল। তবে তখন সে এত অ্যাগ্রেসিভ ছিল না। এই গত একমাস হবে, সে হঠাৎ করে খুব অ্যাগ্রেসিভ হয়ে ওঠে।
“দেখেন আমি কতজনকে বলছি। আমি এখানকার ওসি সাহেবকে বলছি, এসপি সাহেবকে বলছি, একজন ডিআইজি সাহেবকে বলছি, একজন অতিরিক্ত আইজি সাহেবকেও বলছি। কিন্তু সে নাকি কথা শোনে না।”
জানতে চাইলে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম শনিবার সকালে বলেন, "এ বিষয়ে তাদের একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে অভিযোগ না পেলেও আমরা অভিযুক্ত মঈন উদ্দিনক গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
আরও পড়ুন-
কিডনি চিকিৎসক কামরুলের হাসপাতালে চাঁদাবাজির মামলায় যুবদল নেতাসহ