Published : 06 Apr 2026, 11:08 PM
নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন এনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন, ভোটার তালিকা সংশোধনসহ সাতটি বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। আগের দিনের মত এদিনও এগুলো আলোচনা ছাড়াই পাস হয়েছে।
সোমবার এসব বিল পাস হওয়ার দিনে বিল উত্থাপন ও পাসের কার্যক্রমে একাধিকবার তালগোল লেগে যায়।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল তিনবার তোলা হলেও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল উত্থাপন করা হয়নি। বিলের কপি সময়মতো না দেওয়ার অভিযোগ তুলে এতে আপত্তি তুলেছে বিরোধী দল।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলগুলো উত্থাপন ও পাসের প্রস্তাব করেন।
পাস হওয়া বিলগুলোর ওপর কোনো সংশোধনী না থাকায় সেগুলো দফাওয়ারি কণ্ঠভোটে গৃহীত হয় এবং পরে সংসদে উত্থাপিত আকারেই পাস হয়। বিলগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
সোমবার পাস হওয়া এই সাত বিল হল- রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬; ভোটার তালিকা সংশোধন বিল, ২০২৬; নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সংশোধন বিল, ২০২৬; নির্বাচন কর্মকর্তা বিশেষ বিধান সংশোধন বিল, ২০২৬; জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ সংশোধন বিল, ২০২৬; বাংলাদেশ ল’ অফিসার্স অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬; এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয় অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান রহিতকরণ বিল, ২০২৬।
এর মধ্যে ছয়টি বিলের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলোকে অনুমোদন দেওয়া হয়।
অপরদিকে জাতীয় সংসদ সচিবালয় অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান অধ্যাদেশ, ২০২৪ রহিত করতে আলাদা বিল পাস হয়।
একই দিনে আইনমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন বিল সংসদে উত্থাপন করেন।
তবে এগুলো পাসের জন্য তোলা হয়নি। আইনমন্ত্রী বলেন, বিশেষ কমিটিতে এসব বিলের ওপর নোট অব ডিসেন্ট থাকায় পরে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কপি না পেয়ে আপত্তি
ভোটার তালিকা সংশোধন বিল পাসের সময় পয়েন্ট অব অর্ডারে জামায়াতে ইসলামীর সাইফুল আলম খান বলেন, কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সদস্যদের ব্যবহারের জন্য বিলের কপি আগে পৌঁছানোর কথা থাকলেও তা হয়নি।
তিনি বলেন, “আমরাতো পাই নাই। ৪৯ পৃষ্ঠার একটা দলিল আমাদেরকে এইমাত্র পেশ করা হলো। হাউ ক্যান আমরা এটা পারব?”
এর জবাবে ডেপুটি স্পিকার বলেন, কার্যপ্রণালী বিধিতে তিন দিনের কথা থাকলেও স্পিকারের বিশেষ ক্ষমতা আছে এবং সেই ক্ষমতাবলে বিধান শিথিল করা হয়েছে।
পরে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম সংসদকে জানান, ১৩৩টি অধ্যাদেশ ৯ এপ্রিলের মধ্যে বিল আকারে পাস করতে হবে, না হলে সেগুলো ল্যাপস করবে।
তিনি বলেন, “আমাদের সময়ের স্বল্পতার কারণে আজকে আমরা অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
“আগামী ৯ তারিখের মধ্যে সকল বিল পাস করতে হবে।”
চিফ হুইপ বলেন, প্রতিটি বিলের ৯০০ কপি ছাপাতে হচ্ছে এবং বিজি প্রেসকে ২৪ ঘণ্টা স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে। যেসব বিলে বিশেষ কমিটিতে সবাই একমত হয়েছেন, সেগুলো আগে পাস করা হচ্ছে। যেসব বিলে নোট অব ডিসেন্ট আছে বা সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলো পরে আলোচনার জন্য রাখা হবে।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার থেকে সকাল ১০টা ও বিকাল ৩টায় দুটি অধিবেশন বসবে। প্রয়োজনে বৃহস্পতিবার বেসরকারি সদস্যদের দিনেও সরকারি কার্যক্রম চলবে, এমনকি শুক্রবারও অধিবেশন হতে পারে।
পরে আরেক সদস্য বলেন, কার্যউপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত সবাই মেনে নিলেও সদস্যদের হাতে কিছু সময় থাকা দরকার, যাতে শাব্দিক ভুল বা ত্রুটি ধরা যায়।
তার ভাষায়, “একটু এক মিনিট হলে ওই আমার চোখে যেটা অশুদ্ধ হয়েছে সেটা শুদ্ধ হয়ে যেত।”
ভোটার তালিকা ও ইসি সচিবালয় বিলের ব্যাখ্যা
ভোটার তালিকা সংশোধন বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে আইনমন্ত্রী বলেন, “সার্বজনীন ভোটাধিকার নীতি বাস্তবায়নের জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার যৌক্তিক সময় পূর্ব পর্যন্ত যাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয় তাদেরকেও ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ প্রদানের নিমিত্ত ভোটার তালিকা আইন ২০০৯ সংশোধনের লক্ষ্যে ভোটার তালিকা অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন ও জারি করা হয়।”
কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক কাঠামোর স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশের আলোকে নির্বাচন কমিশন সার্ভিস প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কার্যাবলী অধিকতর সুনির্দিষ্ট করে জবাবদিহিতা কার্যকারিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে” আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন বিলের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের সুবিধার্থে ২০২৫ সালে দুটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, যেগুলোর বিধান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রয়োগ করা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা রাখতে সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিল আকারে তা পাস করা প্রয়োজন।
‘উত্থাপিত আকারে’ শব্দ জুড়ে দেওয়া
নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সংশোধন বিল পাসের সময় চিফ হুইপ দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, বিল পাসের প্রশ্ন তোলার সময় ‘উত্থাপিত আকারে’ শব্দবন্ধটি থাকতে হবে।
পরে সভাপতির আসন থেকে জানানো হয়, এ পর্যন্ত যেসব বিল পাস হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও ‘উত্থাপিত আকারে’ শব্দটি বাদ পড়েছিল; তা সংযোজন করা হল।
সুপ্রিম কোর্টের বিল তুলতেই জটলা
দিনের শেষভাগে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল উত্থাপনের জন্য ডেপুটি স্পিকার আইনমন্ত্রীকে আহ্বান জানান। কিন্তু আইনমন্ত্রী অন্য বিলের নাম বলতে শুরু করেন।
একপর্যায়ে তিনি বলেন, বিশেষ কমিটিতে এসব বিলে নোট অব ডিসেন্ট আছে। তাই সেদিন শুধু উত্থাপন করা হবে, পরে বিতর্কের জন্য রাখা হবে।
তিনি বলেন, “এই বিলটি আমি আজকে উত্থাপন করবো এবং সবার শেষে এই বিল দুটি আলোচনা করার জন্য আমি প্রস্তাব রাখছি।”
এরপর তিনি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২৬ রহিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল উত্থাপনের অনুমতি চান এবং বিলটি তোলেন। কিন্তু সভাপতির আসন থেকে সেটিকে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এতে সংসদে কানাঘুষা শুরু হলে ডেপুটি স্পিকার আইনমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, “আমরা সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ বিলে আছি।”
পরে আইনমন্ত্রী বলেন, ভুল হয়েছে, “আমরা একটি বিল স্কিপ করে গেছি।”
কিন্তু বিভ্রান্তি সেখানেই থামেনি। পরে একই বিল আবার উত্থাপিত হয়। বাংলাদেশ ল’ অফিসার্স অ্যামেন্ডমেন্ট বিল পাসের পর ডেপুটি স্পিকার আবার আইনমন্ত্রীকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল উত্থাপনের আহ্বান জানান এবং বিলটি আবারও ওঠে।
ফলে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল একদিনেই একাধিকবার উত্থাপিত হয়। অন্যদিকে কার্যসূচিতে থাকা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল আলাদা করে আর ওঠেনি।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলও পরে
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন বিল উত্থাপনের সময়ও আইনমন্ত্রী বলেন, এ বিলের ওপর বিশেষ কমিটিতে নোট অব ডিসেন্ট আছে। তাই সেদিন শুধু উত্থাপন করা হচ্ছে, পরে আলোচনার জন্য রাখা হবে।
ভূমি বিলে বাদ গেল তামাক চাষ নিষেধের ধারা
অধিবেশনের শুরুতে ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা বিল, ২০২৬ সংসদে উত্থাপন করের ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান। তবে সেটি পাস হয়নি।
এই বিলে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের একটি আলোচিত ধারা বাদ দেওয়া হয়েছে। আগের অধ্যাদেশের ৭(৫) ধারায় বলা ছিল, “তিন বা ততোধিক ফসলি কৃষিভূমিতে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নকারী তামাক চাষ করা যাইবে না এবং এক ও দুই ফসলি কৃষিভূমিতেও পর্যায়ক্রমে তামাক চাষ সীমিত করিতে হইবে।”
উত্থাপিত বিলে এই ধারাটি রাখা হয়নি।
তবে বিলে অনুমোদন ছাড়া ভূমির জোন পরিবর্তন, কৃষিজমি অকৃষি কাজে ব্যবহার, কৃষিভূমি, জলাধার বা জলাভূমিতে বাণিজ্যিক আবাসন, রিসোর্ট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কারখানা বা অনুরূপ অবকাঠামো নির্মাণ, এবং কৃষিভূমির উপরিভাগের মাটি কেনাবেচা, অপসারণ, পরিবহন বা ব্যবহারের মতো কাজকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা
এদিন সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনাও হয়। এতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা অংশ নেন। আলোচনার শেষে ডেপুটি স্পিকার বৈঠক মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন।
নেত্রকোণা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়েও যেন কেউ একক কৃতিত্ব দাবি না করে।
তিনি বলেন, “আমি কখনোই বলব না জুলাই আন্দোলনের একমাত্র ধারক-বাহক শুধু বিএনপি। ... একক দাবিদার কেউ যেন সেই চেষ্টা না করে।”
বাগেরহাট-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সদস্য শেখ মনজুরুল হক রাহাদ রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানাতে না পারার কথা বলেন। তিনি বলেন, “যে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদের সময়ে সারা বাংলাদেশের মানুষ অত্যাচার নির্যাতন জেল জুলুম হুলিয়ার মধ্যে তাদের জীবন কাটিয়েছে, ঠিক সেই সময় ফ্যাসিবাদের পক্ষে রাষ্ট্রপতি ভূমিকা পালন করেছে। সেজন্য তাকে ধন্যবাদ দিতে পারলাম না।”
আরও বক্তব্য দেন মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে সরকারদলীয় সদস্য শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, সিরাজগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির সদস্য সেলিম রেজা, পাবনা-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য আবু তালেব মণ্ডল, চট্টগ্রাম-১৩ আসনে বিএনপির সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম।