Published : 04 Sep 2025, 10:27 AM
ঢাকার সাবেক বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ২১ বছর আগে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলার বহুল আলোচিত মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ সব আসামির খালাসের রায় বহাল রেখেছে সর্বোচ্চ আদালত।
আসামিদের খালাস দিয়ে হাই কোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল খারিজ করে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারকের আপিল বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এ রায় দেয়।
খালাসের রায় বহাল রাখলেও হাই কোর্টের রায়ের একটি অংশ সংশোধন করে দিয়েছে আপিল বিভাগ। হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, ২১ অগাস্টের হত্যাকাণ্ডের সঠিক ও স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ওই অংশটি বাদ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যার ওই ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোড়ন তুলেছিল।
সে সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তখন বিরোধী দলীয় নেতা।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে ২০১২ সালে এ মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্রে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২১ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ওই হামলা চালানো হয়। হামলায় অংশ নেয় হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি) জঙ্গিরা। তারা সহযোগিতা নেয় বিদেশি জঙ্গিদের। আর এই ষড়যন্ত্রের পেছনে ছিল তখনকার চারদলীয় জোট সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ‘ইন্ধন’। হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড আনা হয় পাকিস্তান থেকে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জজ আদালত এ মামলায় বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১১ পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছিল।
২০১৮ সালে ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায়’ ওই হামলা ছিল আওয়ামী লীগকে ‘নেতৃত্বশূন্য করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা’।
তিনি বলেন, “রাজনীতিতে অবশ্যম্ভাবীভাবে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে? এটা কাম্য নয়।”
দণ্ডিত আসামিদের মধ্যে কারাগারে যারা ছিলেন, তারা সেই রায়ের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে আপিল করেছিলেন। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আবেদন ‘ডেথ রেফারেন্স’ আকারে হাই কোর্টের বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়েছিল।
এ বিষয়ে হাই কোর্টের রায় আসে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর, ততদিনে চব্বিশের অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছে।
বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের হাই কোর্ট বেঞ্চ আসামিদের করা আপিল মঞ্জুর করার পাশাপাশি মৃত্যদণ্ড কার্যকরের আবেদন খারিজ করে দেয়।
যারা আপিল করেছেন, তাদের পাশাপাশি যারা করেননি, সবাইকে এ মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয় হাই কোর্টের রায়ে।
আসামিদের খালাস দিয়ে হাই কোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, যেভাবে এ মামলায় পুনঃতদন্তের আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল ‘আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত’। যে সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে এ মামলার বিচার শুরু হয়েছিল, সেই অভিযোগপত্রই ছিল ‘অবৈধ’।
হাই কোর্ট বলে, “সামগ্রিক বিবেচনায় আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, এ মামলায় যেভাবে আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হয়েছে, তা অবৈধ এবং আইনের বিচারে তা টেকে না।”
আসামিদের সবাই খালাস পাওয়ায় ১ ডিসেম্বর রায়ের দিন অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। তাদের প্রশ্ন ছিল, গ্রেনেড হামলায় নিহত ২৪ জনের পরিবার কি তাহলে সুবিচার পাবে না?
সেই প্রশ্নের উত্তর আসে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত ৭৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে।
সেখানে বলা হয়, ২১ অগাস্টের গ্রেনেড হামলা ছিল দেশের ইতিহাসে ‘একটি জঘন্য ও মর্মান্তিক’ ঘটনা, যেখানে অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা আইভী রহমানও ছিলেন।
“নিহতদের আত্মার প্রতি সুবিচার নিশ্চিত করতে এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক ও স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যা এ পর্যন্ত এই মামলায় সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত রয়েছে।
“এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মনে করি, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এই মামলাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো উচিত, যাতে সঠিক এবং দক্ষ তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে পুনরায় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়।”
আদালতের রায়ের এই পর্যবেক্ষণের আলোকে যথাযথ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এই আদেশের অনুলিপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়।
হাই কোর্টের রায়ের এই অংশটি বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত বিচারে বাদ দিয়েছে আপিল বিভাগ।
রাষ্ট্রপক্ষ জজ আদালতের দেওয়া সাজার রায় বহাল রাখার এবং আসামিপক্ষ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ ও হাই কোর্টের রায় বহাল রাখার আর্জি জানিয়েছিল। তা নাকচ হয়ে গেছে।
রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, জয়নুল আবেদীন, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, কায়সার কামাল, মোহাম্মদ শিশির মনিরসহ আরও কয়েকজন।

খালাসের রায় কেন বহাল
এদিন সকাল ১০টা ৫ মিনিটে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ছয় বিচারক এজলাসে ওঠেন।
এ বেঞ্চের বাকি সদস্যরা হলেন– বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
প্রধান বিচারপতি বলেন, “এ মামলায় হাই কোর্ট বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে সব আসামিকে খালাস দিয়ে যে রায় দিয়েছে, তা অবজারভেশন, এক্সপানশন ও মোডিফিকেশনসহ বহাল রাখা হল।
“যারা আপিল করতে পারেননি তাদেরও খালাস দিয়ে হাই কোর্টের রায় বহাল রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে এই মামলায় যদি কেউ কারাগারে থাকেন, তার অন্য কোনো মামলা না থাকলে এখনই যেন তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।”
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এ মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি (হুজি নেতা) মুফতি হান্নানের কাছ থেকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দুইবার স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে। আনোয়ার চৌধুরী হত্যাচেষ্টা মামলায় টিএফআই সেল থেকে এনে দ্বিতীয়বার তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়। আসামিদের ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থনের জবানবন্দি দেওয়ার আগে মুফতি হান্নানকে (অন্য মামলায়) ফাঁসি দেওয়া হয়। এছাড়া এ মামলায় এক ম্যাজিস্ট্রেট তিনজনের স্বীকারোক্তি নেন একদিনে, ‘অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে’।
হাই কোর্টের রায়ে মামলা পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিয়ে যে পর্যবেক্ষণ ছিল, সে বিষয়ে আপিল বিভাগ বলেছে, “এটি রাষ্ট্রের প্রশাসনের বিষয়। মাজদার হোসেন মামলার রায় অনুযায়ী এখানে বিচার বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তাই হাই কোর্টের রায়ের এ পর্যবেক্ষণ বাতিল করা হল।”
পরে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান সাংবাদিকদের বলেন, “২১ অগাস্টের গ্রেনেড মামলায় সব আসামিকে খালাস দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। সরকার কর্তৃক আনীত সব আপিল এবং পিটিশন খারিজ করে দিয়েছে আপিল বিভাগ। নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে হাই কোর্টের দেওয়া যে রায় তা বহাল আছে।
“হাই কোর্ট বিভাগ যে অভজারভেশন দিয়েছিলেন, যে এ মামলার তদন্ত ঠিকমতো হয়নি, এটি পুনঃতদন্ত করতে হবে, সে ব্যাপারে আপিল বিভাগ বলেছে–যেটা আমরা শর্ট অর্ডারে বুঝেছি–তা হল এটা রাষ্ট্রের কাজ, বিচার বিভাগের কাজ নয়। কাজেই এটা এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “নন আপিল্যান্ট, অর্থাৎ তারেক রহমানসহ যারা আপিল করতে পারেন নাই, তাদের খালাসে হাই হোর্টের রায়ও বহাল রাখা হয়ছে।”
শিশির মনির বলেন, “আজকের অবজারভেশনগুলো হল, যে কনফেশনগুলো দেওয়া হয়েছিল–১২টা স্বীকারোক্তি–এগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলোকে সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করেননি। এই স্বীকারোক্তিগুলো আদায় করা হয়েছে নির্যাতন এবং নিপীড়ন করে। এই স্বীকারোক্তি আদায় করার আগে কেনো ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশে তাদের পুলিশ কাস্টডিতে নেওয়া হয়নি।
“নেওয়া হয়েছিল টিএফআই (টাস্কফোর্স ইন্টেলিজেন্স) সেলে বিচারিক আদেশ ছাড়াই। একই দিনে একজন ম্যাজিস্ট্রেট তিনটি কনফেশন নিয়েছিলেন, প্রতিটি কনফেশন ৩৬ পৃষ্ঠার, আদালত সেটিও বলেছেন যে এটি আইন দ্বারা কখনও সিদ্ধ নয়।”
এ আইনজীবী বলেন, “আরও একটি কনফেশনের কথা বলেছেন, মুফতি হান্নানের কনফেশনের ব্যাপারে। তখন মুফতি হান্নান ছিলেন কনডেম সেলে। কনডেম সেল থেকে এনে তার কনফেশন রেকর্ড করা হয়েছিল। যখন ৩৪২ এ সকল আসামির স্টেটমেন্ট নেওয়া হয়েছিল, তার আগে মুফতি হান্নানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। কাজেই মুফতি হান্নানের ৩৪২ করা হয়নি।”
বিএনপি নেতা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, তারেক রহমানের নামে এখন আর কোনো মামলা নেই।

কী ঘটেছিল সেদিন
২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রা হওয়ার কথা ছিল। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের মাঝখানে একটি ট্রাক এনে তৈরি করা হয়েছিল মঞ্চ।
শোভাযাত্রার আগে সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। বক্তৃতা শেষ করে তিনি ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলার সময় ঘটে পর পর দুটি বিস্ফোরণ।
এরপর সামান্য বিরতি দিয়ে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ শুরু হয়। তারই মধ্যে শোনা যায় গুলির আওয়াজ।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকরা তখনও ভয়াবহতার মাত্রা বুঝে উঠতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে এগোতেই তারা দেখতে পান শত শত জুতো, স্যান্ডেল রাস্তায় ছড়ানো। তারই মধ্যে পড়ে রয়েছে মানুষের রক্তাক্ত নিথর দেহ; আহতদের আর্তনাদে ভয়াবহ এক পরিস্থিতি।
হামলায় আহতদের সাহায্য করতে আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীরা যখন ছুটে গেলেন, তখন পুলিশ তাদের ওপর টিয়ার শেল ছোড়ে। পুলিশ সে সময় হামলার আলামত সংগ্রহ না করে তা নষ্ট করতে উদ্যোগী হয়েছিল বলে পরে অভিযোগ ওঠে।
সেদিনের হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন। আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৪ অগাস্ট মারা যান। প্রায় দেড় বছর পর মৃত্যু হয় ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের। পরে সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪ জনে।
২১ অগাস্ট হামলায় নিহত অন্যরা হলেন শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রহমান, হাসিনা মমতাজ, রিজিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), রতন শিকদার, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মোশতাক আহমেদ, লিটন মুনশি, আবদুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, বিল্লাল হোসেন, আব্বাছ উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসিরউদ্দিন, আবুল কাসেম, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রহিম, আমিনুল ইসলাম, জাহেদ আলী, মোতালেব ও সুফিয়া বেগম। একজনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।
মঞ্চে উপস্থিত নেতাকর্মীরা বিস্ফোরণে মধ্যে মানববর্ম তৈরি করায় সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। কিন্তু গ্রেনেডের প্রচণ্ড শব্দে তার শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়।

মামলা বৃত্তান্ত
হামলার পরদিন মতিঝিল থানার তৎকালীন এসআই শরীফ ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। থানা পুলিশ, ডিবির হাত ঘুরে সিআইডি এই মামলার তদন্তভার পায়। কিন্তু তখনকার বিএনপি সরকারের সময়ে তদন্ত আর এগোয়নি।
পরে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হলে নতু তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। জানা যায়, হামলার বিষয়ে নোয়াখালীর জজ মিয়ার ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ দেওয়ার বিষয়টি ছিল নাটক।
ঘটনার চার বছর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যার অভিযোগ এবং বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির।
জঙ্গি দল হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ২২ জনকে সেখানে আসামি করা হয়। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর অভিযোগ গঠন করে তাদের বিচারও শুরু হয়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটির অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে।
সিআইডির বিশেষ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ অধিকতর তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ৩ জুলাই আসামির তালিকায় আরও ৩০ জনকে যোগ করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন।
সেখানে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানসহ চার দলীয় জোট সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের নাম আসে।
২০০৮ সালের ১ নভেম্বর ১৬৪ ধারায় মুফতি হান্নানের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে গ্রেনেড হামলায় তারেক রহমানের সংশ্লিষ্টতার পাশাপাশি সে ঘটনার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের নানাদিক উঠে আসে বলে সে সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছিলেন।
তারা বলেছিলেন, জঙ্গিরা শেখ হাসিনাকে শত্রু ভাবে, সেটাকে কাজে লগিয়ে ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিনাশ’ করতে চাইছিলেন তারেক।
২০১২ সালের ১৮ মার্চ সম্পূরক অভিযোগপত্রের আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। নতুন করে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।
দণ্ডবিধি ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলার বিচার কাজ একই সঙ্গে চলে। রাষ্ট্রপক্ষের ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে মোট ২২৫ জন এ মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দেন। জামিনে ও কারাগারে থাকা ৩১ আসামির সবাই আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তাদের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন ২০ জন।
মামলার সাক্ষীদের মধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন ১৪ জন। আর আসামিদের মধ্যে ১৩ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর জজ আদালতের রায়ে ৪৯ আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
তাদের মধ্যে আটজন রাজনৈতিক নেতা, পাঁচজন সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং আট জন পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা। বাকি ৩১ জন হরকাতুল জিহাদের জঙ্গি। দণ্ডিত ১৮ আসামি সে সময় পলাতক ছিলেন।
জজ আদালতে কার কী সাজা হয়েছিল?
১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড
সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফ, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক আবদুর রহিম, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, পিন্টুর ভাই হরকাতুল জিহাদ নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন, আব্দুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মাদ, শেখ আব্দুস সালাম, কাশ্মিরী নাগরিক আব্দুল মাজেদ ভাট, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মুফতি হান্নানের ভাই মুহিবুল্লাহ মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে ডাক্তার জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলুবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামিম, মাইনুদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, মো. রফিকুল ইসলাম সবুজ, মো. উজ্জ্বল ওরফে রতন
১৯ জনের যাবজ্জীবন
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপির সাবেক এমপি কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, বিএনপির সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম আরিফ, হরকাতুল জিহাদ নেতা আব্দুল হান্নান ওরফে সাব্বির, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মাওলানা আব্দুর রউফ ওরফে পীর সাহেব, মো. খলিল, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই, বাবু ওরফে রাতুল বাবু, শাহাদত উল্যাহ ওরফে জুয়েল, আরিফ হাসান সুমন, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন।
১১ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড
সাবেক আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী, মামলার প্রথম দিকের তদন্ত কর্মকর্তা বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান ও এএসপি আব্দুর রশীদর ৩ বছরের জেল।
সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা ও আইজিপি শহিদুল হক, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাইফুল ইসলাম ডিউক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক এটিএম আমিন আহমদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদারের ২ বছরের কারাদণ্ড।
পুলিশের সাবেক উপ কমিশনার (পূর্ব) মো. ওবায়দুর রহমান এবং উপ কমিশনার (দক্ষিণ) খান সাইদ হাসানের ২ বছরের কারাদণ্ড।
সেই রায়ের দেড় মাসের মাথায় ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর রায়সহ মামলা দুটির নথিপত্র ও ডেথ রেফারেন্স হাই কোর্টে পাঠানো হয়। পরে তা সংশ্লিষ্ট শাখায় ডেথ রেফারেন্স মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
আরও কিছু প্রক্রিয়া শেষে ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর এ মামলার ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শুরু হয়।
তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে অবস্থান করার কারণে আইনের দৃষ্টিতে পলাতক। সে কারণে তিনি আপিল করতে পারেননি।
হাই কোর্টে গত ২১ নভেম্বর এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষ করে। এরপর ১ ডিসেম্বর বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের হাই কোর্ট বেঞ্চ আসামিদের সবাইকে খলাসের রায় দেন।
হাই কোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে এ বছর মার্চে আপিলের আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। সেখানে হাই কোর্টের রায় বাতিল চাওয়া হয়।
গত ১৭ জুলাই আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। এরপর ৩১ জুলাই, ১৯ অগাস্ট, ২০ ও ২১ অগাস্ট শুনানি হয়। পঞ্চম দিনের শুনানি শেষে রায়ের জন্য ৪ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করে দেয় আপিল বিভাগ।