Published : 01 Jan 2026, 08:44 PM
রাজধানীর ফার্মগেটে মেট্রোরেল পথের পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে পথচারীর মৃত্যুর ঘটনায় ভায়াডাক্টের নকশা ও বিয়ারিং প্যাডের মানে ত্রুটি থাকতে পারে বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটি বৃহস্পতিবার যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
পরে সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলনকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তদন্ত প্রতিবেদনের কিছু অংশ প্রকাশ করা হয়।
গত ২৬ অক্টোবর দুপুরে ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের পশ্চিম পাশে ৪৩৩ নম্বর পিলারের ওপর থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে মাথায় আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান আবুল কালাম (৩৫) নামের এক পথচারী। সেদিনই পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়। পরে অন্তর্ভুক্ত করা হয় আরো কয়েকজনকে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শী, ট্রেনচালক, অপারেটর, মেট্রোরেল কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেয়। এছাড়া বিয়ারিং প্যাড প্রস্তুতকারী কোম্পানি, ঠিকাদার ও নকশা পরামর্শকদের সঙ্গেও কথা বলে।

প্রাপ্ত নকশা–সংক্রান্ত ডকুমেন্ট, তথ্য–উপাত্ত ও প্রতিবেদন বিশ্লেষণের পাশাপাশি বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাডের ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং ট্রেন চলাকালে কম্পন পরিমাপ করে কমিটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাডের ‘হার্ডনেস, কম্প্রেশন সেট ও নিওপ্রিন উপাদানের পরিমাণ’ প্রচলিত মানদণ্ড অনুযায়ী সঠিক ছিল না। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে দেশের বাইরে আরও পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
তদন্তে দেখা যায়, বিয়ারিং প্যাডগুলো কিছুটা ঢালু অবস্থায় (০.৮ শতাংশ স্লোপ) স্থাপন করা হয়েছিল, যা বিচ্যুতির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
কমিটি বলছে, ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের উভয় প্রান্তে বৃত্তাকার কার্ভ অ্যালাইনমেন্ট রয়েছে। তবে ভায়াডাক্টের সোজা অংশ ও বৃত্তাকার অংশের মধ্যে কোনো ট্রানজিশন কার্ভ ব্যবহার করা হয়নি। কার্ভ অ্যালাইনমেন্টের জন্য পৃথক মডেলিং ও বিশ্লেষণ না করে সোজা অ্যালাইনমেন্টের নকশা অনুসরণ করায় নকশাগত ত্রুটি থাকতে পারে।
ট্রেন চলাকালে কম্পন পরিমাপে দেখা যায়, বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাড সংশ্লিষ্ট পিয়ারগুলোতে (পিয়ার নম্বর ৪৩০ ও ৪৩৩) অন্যান্য পিয়ারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি কম্পন হয়। কার্ভ অ্যালাইনমেন্টের নকশাগত ত্রুটির কারণে এখানে অতিরিক্ত পার্শ্ববল সৃষ্টি হয়, যার সঙ্গে বিয়ারিং প্যাড সরে যাওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে বলে তদন্ত কমিটি ধারণা করছে।

এ ছাড়া তদন্তে দেখা যায়, কার্ভ অ্যালাইনমেন্ট ও নিকটবর্তী স্টেশন এলাকায় রেলট্র্যাকের নিচে নিওপ্রিন রাবারভিত্তিক ‘ম্যাস–স্প্রিং ড্যাম্পার সিস্টেম’ ব্যবহার করা হলেও দুর্ঘটনাস্থলসংলগ্ন মধ্যবর্তী অংশে রিজিড ট্র্যাক রাখা হয়েছে। কমিটির মতে, এসব স্থানে ‘ম্যাস–স্প্রিং ড্যাম্পার সিস্টেম’ ব্যবহার করা হলে কম্পন কমানো সম্ভব হত।
তবে তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার সঙ্গে কোনো ধরনের নাশকতার প্রমাণ পায়নি বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কমিটি পাঁচ দফা সুপারিশ করেছে।
কার্ভ অ্যালাইনমেন্ট এলাকায় বিয়ারিং প্যাড সরে যাওয়া ঠেকাতে জরুরি কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণ, থার্ড পার্টি কনসালট্যান্টের মাধ্যমে ভায়াডাক্ট ও ট্র্যাক নকশার গভীর বিশ্লেষণ, পুরো প্রকল্পের সেইফটি অডিট পরিচালনা, স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন এবং বিদেশি পরামর্শকদের কাছ থেকে স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে এসব সুপারিশে।
এর আগে গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সংঘটিত আরেকটি দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করেছে এবারের তদন্ত কমিটি।
তাতে দেখা যায়, ওই প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কিছু কারণ বলা হলেও কোনোটিই নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।

প্রথম দুর্ঘটনার পর পর্যাপ্ত সময় পাওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো বিস্তারিত প্রকৌশল বিশ্লেষণের মাধ্যমে মূল কারণ নির্ধারণ করতে পারেনি।
সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফের নেতৃত্বে এবারের তদন্ত কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম তৌফিক হাসান, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জাহিদুল ইসলাম এবং ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) লাইন–৫ প্রকল্প পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব। উপসচিব আসফিয়া সুলতানা ছিলেন সদস্যসচিব।
পরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীসহ আরও দুজন বিশেষজ্ঞকে কমিটিতে কো-অপ্ট করা হয়। তারা হলেন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক খান মাহমুদ আমানত ও অধ্যাপক রাকিব আহসান।
সম্ভাব্য নাশকতার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ফরেনসিক প্রতিনিধি হিসেবে সিআইডির এসএসপি মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকেও কমিটিতে নেওয়া হয়।
নয় বছর আগে, ২০১৬ সালে উত্তরায় মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২২ সালের শেষে এসে প্রকল্পের মতিঝিল পর্যন্ত কাজ শেষ হয়।
এর আগে ২০২১ সালে একনেক সভায় প্রকল্পটির মেয়াদ দেড় বছর বাড়ানো হয় এবং ব্যয় প্রায় ১১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।
জাপানের কারিগরি সহায়তা ও অর্থায়নে ২০২২ সালে মেট্রোরেল উদ্বোধনের সময় প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
পুরনো খবর
ভারী ভায়াডাক্ট চেপে থাকার পরেও কী করে খসে পড়ছে বিয়ারিং প্যাড?
মেট্রোতে দুর্ঘটনার পেছনে নকশার ত্রুটিও থাকতে পারে: ডিএমটিসিএল এমডি
মেট্রোরেল কি 'মাথার ওপরের শঙ্কা' হয়ে উঠছে?
আজকে বিদায় দিতে চাইনি: মেট্রো দুর্ঘটনায় নিহতের স্ত্রী
আগেও একবার খসে পড়েছিল মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড
বিয়ারিং প্যাড কী, কেন বসানো হয়?