Published : 26 Oct 2025, 11:39 PM
শ’ খানেক টনের ভায়াডাক্ট যে রাবারের ওপর চেপে বসে থাকে, মেট্রো লাইনের সেই বিয়ারিং প্যাড কীভাবে খসে পড়ে— সেই প্রশ্ন সামনে আসছে একজনের প্রাণহানির পর।
১৩ মাসের ব্যবধানে একই ধরনের ঘটনা কী করে পুনরাবৃত্তি হলো, সেই প্রশ্ন তুলেছেন খোদ সড়ক ও সেতু পরিবহন উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানও। অবশ্য গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর যে দুর্ঘটনা ঘটে, তাতে প্রাণহানি ঘটেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিয়ারিং বলতে সাধারণত গাড়ি বা ইঞ্জিনের যে কাঠামোকে বোঝানো হয়, সেতু বা উড়াল সেতুর বিয়ারিং প্যাড তেমনটা নয়। কম্পন প্রতিরোধের জন্য নিওপ্রেন বা প্রাকৃতিক রাবার দিয়ে তৈরি এই প্যাড বসে পিয়ার ও ভায়াডাক্টের সংযোগস্থলে। প্যাডের কোনোটির ভেতরে কয়েক পরতে থাকে স্টিলের কাঠামো, আর উপরে থাকে রাবার। এগুলো ওজনে অনেক ভারী হয়।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে সেতুর ‘কন্ডিশন সার্ভে’র কাজ করেন প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান, যার রয়েছে বিয়ারিং প্যাড কাজেরও অভিজ্ঞতা।

তিনি বলছেন, “সেতু তৈরির সময় এর পিয়ারের ওপর রাবারের বিয়ারিং প্যাড বসানোর একটা সিট তৈরি করা হয় অনেক স্ট্রাকচারে। সিট হচ্ছে সোজা বাংলায় বললে পিয়ারের উপরের অংশে চারদিকে একটা বিটের মতো করে দেওয়া, যাতে রাবারটা পড়ে না যায়।
“আবার অনেক ক্ষেত্রে আঠা দিয়েও রাবারটা প্লেস করা হয়। এটা ডিজাইনের ওপর ডিপেন্ড করে। তবে যেহেতু রাবারের ওই প্যাডের ওপর শ খানেক টনের ভায়াডাক্ট ওজন থাকে, তাই সেগুলো সচরাচর খসে পড়ে না।”
মনিরুজ্জামান বলছেন, “বিয়ারিং প্যাডটা মূলত রাবারের তৈরি। এর ভেতরে স্টিল প্লেটের কয়েকটা লেয়ার থাকে। দুটো মিলে কম্পোজিট একটা অ্যাকশন করে।
“যে ভাইব্রেশনটা উপর থেকে আসতেছে, সেটা পিয়ারে ড্যাম্প করে পাঠাচ্ছে। অর্থাৎ এটি ড্যাম্পার হিসেবেও কাজ করছে। এর দামও তুলনামূলক অনেক কম; কিন্তু গুরুত্ব অনেক বেশি।”
এই বিয়ারিং প্যাড কি প্রায়ই খুলে পড়ে, এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অভিজ্ঞতা থেকে মনিরুজ্জামান বলেন, “দুই-একটা কেসে দেখছি, টিল্টিংয়ের কারণে বিয়ারিং প্যাড খুলে গেছে বা বন্যায় পড়ে গেছে। এটাও খুব রেয়ার; অনেক পুরনো স্ট্রাকচারের ক্ষেত্রে এরকম ঘটতে পারে।”
কিন্তু মেট্রো লাইনের মতো নতুন স্থাপনার ক্ষেত্রে এরকম ঘটনা ১৩ মাসের ব্যবধানে দুইবার ঘটাকে কীভাবে দেখছেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে মনিরুজ্জামান বলেন, “যেই ভায়াডাক্টের নিচ থেকে সেটা খসে পড়েছে, সেখানে কোনো একটা গ্যাপ বা ফাঁকা তৈরি হতে পারে।
“অর্থাৎ সেই ভায়াডাক্টা আর বিয়ারিং প্যাডের উপর চাপ দিয়ে বসে নেই, সেখানে কিছুটা ফাঁকা থেকে গেছে; এটা একটা পসিবল কারণ হতে পারে।”
রোববার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকার খামারবাড়ি এলাকায় মেট্রো লাইনের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে ৩৬ বছর বয়সী আবুল কালামের মৃত্যু হয়। তিনি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ঈশ্বরকাঠি এলাকার জলিল চোকদারের ছেলে।

বুয়েটের পুরাকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক মনে করছেন, সেখানে কোনো নির্মাণ ত্রুটি ছিল, যেটা সংশোধন করা হয়নি। এজন্য পুরো কাঠামোর ‘সেইফটি অডিট’ করা প্রয়োজন।
তার ভাষ্যে, “পুরো একটা সেফটি অডিট না করে এটা আবার চালু করা ঠিক না। এই ঘটনা মানুষের মধ্যে যে ভয় তৈরি করেছে যে, উপর দিয়ে মেট্রোরেল গেলে না জানি কী খসে পড়ে!
“এমনিতে আমাদের ঢাকা শহরে অনেক শঙ্কার মধ্যে মানুষকে থাকতে হয়; এখন মাথার ওপর আরেকটা শঙ্কা তৈরি করতে না চাইলে সেইফটি অডিট করতে হবে।”
অধ্যাপক সামছুল হক বলছেন, “রাবার প্যাডটা ওখানে একলা বসে না। তার সাথে কিন্তু ফ্রেম থাকে, সে যেন না সরে যায়— তার জন্য ব্যবস্থা আছে নিশ্চই।
“এটা শত বছর আগের টেকনোলজি। গত শতবছরে এটা অনেক পূর্ণতা পেয়েছে। আর আমাদের দেশে আরবান ভিড়ের মধ্যে এটা খুলে পড়ে যায়।”
এই অধ্যাপক বলেন, “এই মেট্রোরেল নির্মাণে আমরা তো টাকা কম দিই নাই। শুধু কনসালটেশনের জন্য ১১০০ কোটি টাকা নিয়েছে জাপানি কোম্পানি। এখন যেই জাপানি কনসালটেন্টের এটা বুঝে নেওয়ার কথা ছিল; তারা ঠিকভাবে বুঝে নেয়নি।”
স্থাপনাটি নতুন থাকতেই যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে ভবিষ্যতে কী হতে পারে তা নিয়ে শঙ্কিা প্রকাশ করে সামছুল হক বলেন, “মেট্রো রেলে এখনো আমরা হানিমুন পিরিয়ডে আছি, তাতেই এই অবস্থা। আমাদের এই স্থাপনাটা দুর্বল আছে, সেখানে মেইনটেন্যান্স ভালোভাবে করতে হবে।
“আমি বলব, এগুলো ১০০ বছরের একটা ম্যাচিউর সায়েন্স। সেই জায়গা থেকে আমি দেখি নির্মাণে কম্প্রোমাইজ করা হয়েছে। সেই হিসেবে আমি বলব, এই মৃত্যুর দায় কাউকে না কাউকে দিতে হবে। সামনে আরও মেট্রো হবে। এটার দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না হলে সামনেরগুলোতেও এরকম ঝুঁকি তৈরি হবে।
“অথচ মেট্রোরেলের মতো প্রজেক্টগুলো তৈরি করা হয় একেবারে ঝুঁকিমুক্তভাবে। চীনের ট্রেনগুলো দেখেন, এখন ওরা ৩০০ কিলোমিটার পার আওয়ার স্পিডে চালাচ্ছে, ৫০০ কিলোমিটারে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ওরা কীভাবে পারছে?”
এক বছরের মধ্যে যেহেতু দুইবার বিয়ারিং প্যাড খসে পড়েছে, সেই কারণে কারিগরি ত্রুটি ‘নিশ্চয়ই আছে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বলছে, গত বছর বিয়ারিং প্যাড সরে যাওয়ার ঘটনায় যে তদন্ত কমিটি হয়েছিল, তার সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মেট্রোরেল পরিচালনকারী কোম্পানি ডিএমটিসিএলের এমডি ফারুক আহমেদ বলেছেন, “আগের কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী সমস্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সবগুলো পিলার ফিজিক্যালি এক্সপার্ট দিয়ে পরিদর্শন করা হয়েছিল।”
রোববার দুপুরে ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে যখন তিনি কথা বলছিলেন, পাশেই ছিলেন সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। আঙ্গুল তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, “তাহলে এটা হলো কীভাবে?”
ওই ঘটনায় কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, জানতে চান সংবাদকর্মীরা।
জবাবে ডিএমটিসিএলের এমডি ফারুক বলেন, “তখন বলা হয়েছিল ডিফেক্ট লাইবেলিটি পিরিয়ডের মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছে। তাই ওই বিষয়টি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল তাদেরকে (ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে)। তারা তখন বলেছে, তারা সেটা সংশোধন করেছে।”
এ সময় উপদেষ্টা ফাওজুল বলেন, “এটা জাপানি ঠিকাদাররা করেছে। এখানে বলা হচ্ছে এটা ডিফেক্ট লাইবেলিটি পিরিয়ডের মধ্যে ঘটেছে। তবে এখন যে কমিটি হচ্ছে এই কমিটি আগের কমিটির রিপোর্টও দেখবে।”
রোববার দুর্ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।