Published : 14 Apr 2026, 01:39 AM
চৈত্রের আলো নিভে বৈশাখী ভোরের অপেক্ষায় কোটি বাঙালির প্রাণ। অতীতের ক্লেদ মুছে শুভবোধের বার্তা নিয়ে দুয়ারে হাজির নতুন বছর। গ্রাম, শহর, নগর, পাহাড় প্রস্তুত ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ বরণে।
বাংলা নববর্ষের প্রথম প্রভাতে দুঃখ-বেদনা, গ্লানি আর অসুন্দরকে ভুলে মুক্তির জয়গানে বাজবে বর্ষবরণের সুর; সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হবে- ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...’।
বিগত দিনের সব ‘প্রতিকূল আবর্জনা’ দূর করে ‘আরো মানবমুখী’ হওয়ার প্রত্যয় থাকবে এবারের বর্ষবরণের আয়োজনে। পাশাপাশি থাকবে ‘গণতন্ত্র পুনরুত্থানের’ বার্তা।
ছায়ানট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন আয়োজন করবে বর্ষবরণের নানা কর্মসূচি। ৪০ বছরের ধারাবাহিকতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবারও বৈশাখী মেলা আয়োজন করবে সাহিত্য একাডেমি। চট্টগ্রাম, যশোরসহ বিভিন্ন জায়গায় থাকছে বর্ষবরণের নানা আয়োজন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীকে নতুন বঙ্গাব্দের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। দুজনের শুভেচ্ছা বাণীতেই প্রত্যাশা আনন্দময় সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে এগোনোর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দিনটিকেই বেছে নিয়েছেন তার 'কৃষক কার্ড' বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধনের জন্য। মঙ্গলবার সকালে টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে।
এ কর্মসূচির আওতায় দেশের ২০ হাজার ৬৭১ জন ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে কৃষক কার্ড তুলে দেবে সরকার। এই কার্ডের আওতায় বছরে আড়াই হাজার টাকাসহ আরও কিছু সুবিধা পাবেন তারা।

চৈত্রের শেষ দিনে হালখাতা করে ব্যবসার হিসাব চুকানো বাংলার পুরনো রেওয়াজ। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের বাণীতে কণ্ঠ মিলিয়ে বৈশাখের প্রথম দিন বাঙালির প্রত্যাশা থাকে–বৈশাখের রুদ্র ঝড় পুরনো বছরের আবর্জনা উড়িয়ে নেবে; গ্রীষ্মের অগ্নিস্নানে শুচি হবে বিশ্ব ধরা।
বর্ষবরণের আগে সোমবার চৈত্র সংক্রান্তির নানা আয়োজনে বিদায় ঘটেছে ১৪৩২ বঙ্গাব্দের। চৈত্রসংক্রান্তিতে চারুকলা, বাংলা একাডেমিসহ নানা জায়গায় ছিল বর্ষবিদায়ের আয়োজন।
পঞ্জিকার পাতা উল্টে ১৪৩২ থেকে ১৪৩৩ সাল শুরু হওয়া সাধারণ ঘটনা হলেও বাঙালির জীবনে এই সাধারণ ঘটনার শুরুই হয় ভিন্ন মাত্রা নিয়ে।
কৃষি উৎসব বা রাজস্ব আদায়ের উপলক্ষ হিসেবে বৈশাখকে সামনে এনে বাংলা সাল প্রবর্তনের পর বাঙলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। বৈশাখের সেই উদযাপন রাজনৈতিক হয়ে ওঠে পাকিস্তান শাসনামলে।
পাকিস্তানের সেনাশাসক আইয়ুব খানের সময় যখন বাঙালির বাঙালিয়ানা নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করা হল, তখন এই বর্ষবরণ উৎসব হয়ে উঠেছিল বাঙালির আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার রাজনৈতিক হাতিয়ার। সেই চেতনাই পরে বাংলাদেশকে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতার বন্দরে পৌঁছে দেয়।
অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশকে পরেও নানা সংকটে দিশা দেখিয়েছে পহেলা বৈশাখের উৎসব; সে কারণেই এ দেশকে উল্টো পথে নেওয়ার চেষ্টায় বার বার আঘাত এসেছে এ উৎসবে।

‘অন্ধকারের অর্গল খুলে, আলোর ভুবনে যাত্রা’
বিগত দিনের সব ‘প্রতিকূল আবর্জনা’ দূর করে ‘আরো মানবমুখী’ হওয়ার প্রত্যয় নিয়ে এবারও বর্ষবরণে প্রস্তুত সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। আজন্ম বাংলা সংস্কৃতির চর্চা ও প্রসারে নিয়োজিত ছায়ানটের আহ্বান, ‘আমরা নির্বিঘ্নে সংস্কৃতি চর্চা করতে চাই'।
ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা বলেন, “বাঙালি যখন আপন বর্ষবরণের আয়োজন করছে, তখন মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধবাজরা হাজার বছরের পারস্য সভ্যতার ধ্বংসলীলায় মত্ত, বিশ্ব জনজীবন বিপর্যয়ের সম্মুখীন। সব শঙ্কা-অনিশ্চয়তা-আতঙ্কের অবসান চায় ছায়ানট, কামনা করে মানবজাতির শান্তি-কল্যাণ-স্বস্তি। স্বপ্ন দেখে, পৃথিবী জুড়েই মানবতা-সংহতি-সাম্য-সম্প্রীতির ফুল ফুটবে। সংকল্প হোক, মিলিত পথের সাথী হয়ে অন্ধকারের অর্গল খুলে, আলোর ভুবনে যাত্রা।
"ছায়ানটের বর্ষবরণের আয়োজনে বলতে চাই, 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির', সেখানেই বাঙালির জয়। বিগত বছরের সব প্রতিকূল আবর্জনা দূর করে আমরা হতে চাই, আরো মানবমুখী। নতুন বছর বাঙালিকে সে শক্তি জোগাক।"
ষাটের দশকে পাকিস্তানিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শহুরে আবহে রমনার বটমূলে প্রথম বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল ছায়ানটের হাত ধরে। সেই ধারাবাহিকতায় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন মঙ্গলবার ভোর সোয়া ৬টায়, রমনা বটমূলে নবীন আলোর সাথে ছায়ানটের সুরবাণীছন্দের সূচনা হবে।
এবারের অনুষ্ঠান গাঁথা হয়েছে আটটি সম্মেলক ও ১৪টি একক গান এবং দুটি পাঠ দিয়ে। এ আয়োজনে অংশ নেবেন প্রায় দুইশ শিল্পী।
সকালের স্নিগ্ধ প্রকৃতি এবং মানব ও দেশপ্রেমের গানের পাশাপাশি থাকছে লোক জনজীবনের সুর। বিশেষ সংযোজন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত গণসংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরী ও পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের দুর্দম গীতিকার-সুরকার মতলুব আলীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
রমনা উদ্যান থেকে দুই ঘণ্টার এই আয়োজন একযোগে সম্প্রচার করবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও প্রথম আলোর ওয়েব পোর্টাল এবং বিটিভি ও দীপ্ত টেলিভিশন।
ছায়ানটের ইউটিউব চ্যানেল (youtube.com/@chhayanautbd) ও ফেইসবুক পেইজেও (facebook.com/chhayanautbd) অনুষ্ঠান সরাসরি দেখা যাবে। বিলম্বিত সম্প্রচার করবে চ্যানেল আই টেলিভিশন।
ষাটের দশকে রমনার বটমূলে যে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করেছিল ছায়ানট, এখন তা বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।
১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া এ উৎসব-আয়োজন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া প্রতিটি পহেলা বৈশাখেই হয়েছে; নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়েছে সুরের মূর্ছনা আর কথামালায়। কোভিডের দুবছর এ আয়োজন করা হয় ভার্চুয়ালি।
২০০১ সালে ছায়ানটের বৈশাখ বরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। তাতে ১০ জন নিহত হন। এরপর থেকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই প্রতি বছর বর্ষবরণের এ আয়োজন হচ্ছে।

‘গণতন্ত্রের পুনরুত্থানের’ বার্তা
নতুন বাংলা বছরের প্রথম সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে যে ‘শোভাযাত্রা’টি অনুষ্ঠিত হয়, তা এবার হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে। প্রতিপাদ্য- ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’।
এতে থাকবে পাঁচটি বিষয়ের ভিন্ন ভিন্ন মোটিফ। এ শিল্পকর্মের মধ্যে থাকছে—মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া।
গত শতকের আশির দশকে সামরিক শাসনের অর্গল ভাঙার আহ্বানে পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়েছিল; সেটি পরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় রূপ নেয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায় এ কর্মসূচি।
কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরোধিতা করে আসছিল আওয়ামী লীগের সময় থেকেই। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই বিরোধিতা আরো জোরালো হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে চারুকলার শোভাযাত্রার নাম থেকে ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। নতুন নামকরণ হয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’।
এবারের বর্ষবরণে ‘মঙ্গল’ এবং ‘আনন্দ’ দুটো শব্দকেই বাদ দিয়ে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামকরণ করা হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে নাম পরিবর্তনের বিষয়ে বলেছেন, “পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে যে বিতর্ক, আমরা তার অবসান চাই। চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়, তার যে যে বৈশিষ্ট্য আছে, সবই থাকবে।”
এবার শোভাযাত্রার পুরোভাগে থাকবে পাঁচটি মূল মোটিফ–মোরগ, হাতি, দোতারা, ঘোড়া ও পায়রা।
সেই সঙ্গে থাকবে পাঁচটি পটচিত্র, তাতে সুন্দরবনজীবীদের দেবী বনবিবি, বাংলা পঞ্জিকার প্রবর্তক মুঘল সম্রাট আকবর, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, লোকচিত্রকলা গাজীর পট এবং মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গলের অন্যতম চরিত্র বেহুলাকে তুলে ধরা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন আজহারুল ইসলাম শেখ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশে গত ১৮ বছর এক ফ্যাসিবাদী শাসনতন্ত্রের মধ্যে ছিল। সেখান থেকে একটা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এদেশ আবার গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা করেছে। তাই যে নতুন ভোর, নতুন দেশ, নতুন গণতন্ত্রের সূর্য উদিত হয়েছে, তাকে শুভকামনা জানাতেই আমাদের প্রধান মোটিফ এবার প্রতীকী মোরগ।
“মোরগ যেমন আমাদেরকে প্রভাতে সূর্য ওঠার আগে জাগিয়ে দিয়ে শুভ কামনা জানায়, আমরাও এ দেশে গণতন্ত্রের পুনরুত্থানকে শুভকামনা জানাই। আমরা চাই, এদেশে আমার ন্যায়বিচার ফিরে আসুক।”

ধানমণ্ডিতে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’, শিল্পকলায় ‘মঙ্গল নাট্যাভিনয়’
পহেলা বৈশাখে ‘ঐতিহ্য’ ধরে রাখতে ‘মঙ্গল’ নাম দিয়েই শোভযাত্রা করার কথা বলেছেন একদল সংস্কৃতি ও নাট্যকর্মী।
‘বর্ষবরণ পর্ষদ’ এর ব্যানারে ‘জাগাও পথিকে, ও সে ঘুমে অচেতন’— এই প্রতিপাদ্য নিয়ে এবার পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন করবে বর্ষবরণ পর্ষদ।
মঙ্গলবার সকাল ৯টায় রাজধানীর ধানমন্ডি-২৭ নম্বর সড়কে দিনব্যাপী উন্মুক্ত আয়োজন শুরু হবে। সেখানে শোভাযাত্রা ছাড়াও থাকবে গান, আবৃত্তি, নৃত্য, মূকাভিনয়সহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন।
এ আয়োজনের উদ্যোক্তাদের বেশিরভাগই নব্বইয়ের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে হওয়া ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত তক্ষশিলা বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ নাদিমুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য। ২০২৪ সালের পর থেকে আমরা প্রতিবন্ধতার শিকার হয়েছি। নাম বদলে দিলেও আমাদের এই ঐতিহ্য, এই সংস্কৃতিকে আমরা রক্ষা করব অবশ্যই।”
অন্যদিকে নাট্যসংগঠন স্বপ্নদল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, 'বর্ষ আসুক বর্ষ যাক, থিয়েটার চিরসাথী থাক'- স্লোগানে বাংলা বর্ষবরণ উপলক্ষে ‘মঙ্গল নাট্যাভিনয়ে’ চিত্রাঙ্গদা নাটকের দুটি বিশেষ প্রদর্শনী করবে তারা।
পহেলা বৈশাখ বিকেল ৫টা ও সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে এ প্রদর্শনী দুটি হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিরায়ত সৃষ্টি কাব্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’র নির্দেশনা দিয়েছেন জাহিদ রিপন।

নানা আয়োজন
ঐতিহ্যকে সঙ্গী করে ছায়ানট ও চারুকলার আয়োজনের বাইরে পুরো দেশজুড়েই ছোট-বড় আয়োজনে রয়েছে বর্ষবরণের।
সরকারের এক তথ্যবিবরণীতে জানানো হয়েছে, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) ও ছায়ানট রমনা বটমূলে ১৪ এপ্রিল সকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করবে।
বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান আবশ্যিকভাবে জাতীয় সংগীত ও ‘এসো হে বৈশাখ’ গান পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হবে। সরকারি-বেসরকারি টিভি, রেডিওতে, বাণিজ্যিক রেডিও ও কমিউনিটি রেডিওতে অনুষ্ঠানগুলো সম্প্রচারের ব্যবস্থা হবে।
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ১৪ এপ্রিল থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী নববর্ষের মেলা, আলোচনা সভা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে।
আর বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন ২০ এপ্রিল থেকে ১৪ দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা আয়োজন করেছে।
নববর্ষ উপলক্ষে সকল কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে ঐতিহ্যবাহী খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা এবং শিশু পরিবারের শিশুদের নিয়ে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। সব জাদুঘর ও প্রত্নস্থান সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। শিশু-কিশোর, ছাত্রছাত্রী প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের বিনা টিকেটে প্রবেশের সুযোগ থাকবে।
প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় পহেলা বৈশাখে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। জেলা শহর ও সকল উপজেলায় বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকজ মেলা ও শিক্ষার্থীদের জন্য রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।
এছাড়া, উপজেলা প্রশাসন প্রতিটি ইউনিয়নে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ আয়োজনসহ বাংলা নববর্ষ উদযাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করবে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, কেন্দ্র ও একাডেমিগুলো তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠান আয়োজন করবে।
বাংলা নববর্ষ উদযাপনে অভিজাত হোটেল ও ক্লাবগুলোতে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করা হবে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্কের আশপাশে সুবিধাজনক স্থানে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র, প্রয়োজনীয় টয়লেট স্থাপন ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে।

অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে
বৈশাখের সকল অনুষ্ঠান ‘নির্ধারিত’ সময়ের মধ্যে শেষ করার অনুরোধ জানিয়েছেন ঢাকার পুলিশ কমিশনার মো. সারোয়ার।
রোববার রমনা বটমূলে বৈশাখীর মূল অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখতে এসে তিনি বলেন, “অনুষ্ঠানস্থলে কোনো প্রকার মুখোশ, ব্যাগ, ধারালো বস্তু ও দাহ্য পদার্থ নিয়ে আসা যাবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে এবং অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করতে হবে। কোনো ধরনের ফানুস বা আতশবাজি ফোটানো যাবে না এবং শব্দ দূষণ হয় এরকম কোনো বাঁশি ব্যবহার করা যাবে না।"
তিনি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়ে বলেন,"অনুষ্ঠানস্থলসমূহে সর্বসাধারণের প্রবেশের জন্য ভোর ৫টায় গেইট খোলা থাকবে এবং সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করে রমনা পার্ক ত্যাগ করতে হবে।"
রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান সকাল সোয়া ৬টা থেকে সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলবে। পার্কের অরুণোদয় গেইট, রমনা রেস্তোরাঁ গেইট ও শিশু পার্কের বিপরীতে অস্তাচল গেইট দিয়ে এ অনুষ্ঠানে প্রবেশ করা যাবে।
এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কমিশনার বলেন, "কোনো ধরনের হুমকি নেই। সব কিছু মাথায় রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে।"
তিনি বলেন, সকাল ৯টায় বৈশাখী শোভাযাত্রা শুরু হবে। চারুকলা থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ থানা মোড়, টিএসসি ক্রসিং (রাজু ভাস্কর্য), ঢাবি মেট্রো স্টেশন, তিন নেতার মাজার, দোয়েল চত্বর ক্রসিং হয়ে ইউটার্ন নিয়ে বাংলা একাডেমি, টিএসসি ঘুরে চারুকলায় গিয়ে শেষ হবে শোভাযাত্রা।
শোভাযাত্রার পুরো পথ নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকবে। শোভাযাত্রার পাশ থেকে বিকল্প পথে শোভাযাত্রায় সমবেত হওয়া যাবে না।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা
নববর্ষ উপলক্ষে আলাদা বাণীতে জাতিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, “বাংলা নববর্ষ আমাদের প্রাণের সর্বজনীন উৎসব। এটি আমাদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ভেদাভেদ অতিক্রম করে পহেলা বৈশাখ আমাদের সবার জন্য হয়ে ওঠে এক আনন্দ ও মিলনের দিন।
“আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের ধারক ও বাহক হিসেবে এ উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম। বৈশাখের আগমনে আমাদের জীবনে জাগে নতুন প্রত্যাশা, নব প্রতিশ্রুতি ও অসীম সম্ভাবনার স্বপ্ন। অতীতের গ্লানি, বেদনা ও ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে আমরা এগিয়ে চলি নব উদ্যমে ও নব প্রত্যয়ে।”
রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “বৈশ্বিক বাস্তবতায় আজ আমরা নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এ প্রেক্ষাপটে আমাদের আরো সংযমী, ধৈর্যশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হব-এই প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।
“নববর্ষের এই উৎসব ও আনন্দমুখর মুহূর্তে আন্তরিক প্রত্যাশা-সকল অশুভ ও অসুন্দর দূরীভূত হোক; সত্য ও সুন্দরের গৌরবগাথা প্রতিধ্বনিত হোক সর্বত্র। বিদায়ী বছরের সকল দুঃখ-বেদনা মুছে যাক; নতুন বছর ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি।”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে দেশবাসীসহ বিশ্বের সকল বাংলাভাষী মানুষকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দিনটি আমাদের জীবনে প্রতি বছর ফিরে আসে নতুনের আহ্বান নিয়ে। নতুন বছরের আগমনে পুরোনো জীর্ণতা ও গ্লানি পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পহেলা বৈশাখের সঙ্গে আমাদের এ অঞ্চলের কৃষি, প্রকৃতি এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সম্পর্ক নিবিড়। তথ্যপ্রযুক্তির এই সুবর্ণ সময়েও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কৃষক তার ফসল উৎপাদনের দিনক্ষণ ঠিক করে। বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা পহেলা বৈশাখের মাধ্যমে নতুন করে উজ্জীবিত হয়।
“বৈশাখী মেলা, বৈশাখী শোভাযাত্রা, হালখাতার মত ঐতিহ্যবাহী আয়োজন আমাদের সংস্কৃতির বহুমাত্রিক সৌন্দর্যকে তুলে ধরে এবং আমাদেরকে ঐক্যবোধে উজ্জীবিত করে। বাংলা নববর্ষ আমাদের সামনে এনেছে নতুন প্রত্যাশা ও নতুন সম্ভাবনা। প্রকৃতির নবজাগরণ আর মানুষের অন্তরের আশাবাদ মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক প্রাণবন্ত উৎসবমুখর পরিবেশ।”
কৃষক, কৃষি ও কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন থেকে কৃষক কার্ড বিতরণ কর্মসূচি শুরু করার কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, “আগামী দিনগুলোতে এই কৃষক কার্ড বাংলাদেশের কৃষক এবং কৃষি অর্থনীতিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে, বাংলা নববর্ষে এটিই হোক আমাদের প্রত্যয় ও প্রত্যাশা।”
তারেক রহমান বলেন, “আমি আশা করি, বাংলাদেশের জনগণের যার যার ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত সহনশীলতা, উদারতা ও সম্প্রীতির চর্চা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে এবং বহুমতের সহাবস্থানকে সুদৃঢ় করবে।
“বিশ্ব আজ নানা সংকট ও সংঘাতে বিপর্যস্ত। এই প্রেক্ষাপটে শান্তি, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। নববর্ষের এই শুভক্ষণে আমরা যেন সংকীর্ণতা ও স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবকল্যাণের পথ অনুসরণ করি–এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।”