Published : 16 Sep 2025, 04:55 PM
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে হত্যা ও রায় জালিয়াতির আলাদা দুই মামলায় জামিন দেয়নি আদালত।
মঙ্গলবার ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ (দ্বিতীয়) নার্গিস ইসলাম শাহবাগ থানায় করা রায় জালিয়াতির মামলায় তার জামিন আবেদন নাকচ করেন।
অপর দিকে জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় খায়রুল হকের জামিন নামঞ্জুর করে আদেশ দেন ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ (১৮তম) জাহাঙ্গীর হোসেন।
খায়রুল হকের আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহিন বলেন, “পৃথক দুই মামলায় আমরা সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের জামিন চেয়ে আবেদন করি। তবে আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন।
“আমরা উচ্চ আদালতে যাব। প্রত্যাশা করছি, সেখানে তিনি ন্যায় বিচার পাবেন, জামিন পাবেন।”
গত ২৪ জুলাই সকালে ধানমন্ডির বাসা থেকে খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় ওইদিন রাতে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
২৯ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে বেআইনি রায় দেওয়া ও জাল রায় তৈরির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
৩০ জুলাই তার সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এ মামলায় গত ৩১ জুলাই দন্ডবিধির ১২০-বি, যা অপরাধ মূলক ষড়যন্ত্র এবং ৪২০ যা প্রতারণা এ দুই ধারা সংযোজনের আবেদন করেন। আদালত আবেদনটি নভিভূক্তের আদেশ দেন।
আহাদ হত্যা মামলার বিবরণীতে বলা হয়েছে, গত বছরের ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় আন্দোলনের সময় আবদুল কাইয়ুম আহাদ গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। এ ঘটনায় তার বাবা আলাউদ্দিন এ বছর ৬ জুলাই যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন। মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৪৬৭ জনকে আসামি করা হয়।
দুর্নীতি ও রায় জালিয়াতির অভিযোগে গত বছরের ২৭ অগাস্ট শাহবাগ থানায় মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহা. মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন।
মুজাহিদুল ইসলাম সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ে ‘জালিয়াতির’ অভিযোগ এনে বলেছেন, “বিচারপতি খায়রুল সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কথায় প্রভাবিত হয়ে অবসরপরবর্তী ভালো পদায়নের লোভে দুর্নীতিমূলকভাবে শেখ হাসিনাকে খুশি করার জন্য ২০১১ সালের ১০ মে সংক্ষিপ্ত আদেশটি পরিবর্তন করে বেআইনিভাবে ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আপিল মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন।”
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়।
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আইনজীবী এম সলিম উল্লাহসহ কয়েকজন রিট আবেদন করেন। সেই রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে ২০০৪ সালে হাই কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়।
রিট আবেদনকারী ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০১১ সালের ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে রায় দেয় আপিল বিভাগ। তখন প্রধান বিচারপতি ছিলেন খায়রুল হক।
ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় প্রকাশ্য আদালতে ঘোষিত রায়ে সুপ্রিম কোর্ট দুই মেয়াদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পথ খোলা রেখেছিলেন। কিন্তু ওই বছর সেপ্টেম্বরে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের সময় ‘জালিয়াতি’ করা হয়।
গেল ১০ সেপ্টেম্বর পূর্বাচলে রাজউকের প্লট দুর্নীতি মামলায় এই সাবেক প্রধান বিচারপতিকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের এই মামলায় তার বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা তথ্য দিয়ে’ ১০ কাঠার প্লট নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
খায়রুল হক ২০১০ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেয়। তার মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ হয়ে যায়।
খায়রুল হক অবসরে যাওয়ার পর ২০১৩ সালের ২৩ জুলাই তাকে তিন বছরের জন্য আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই মেয়াদ শেষে কয়েক দফা পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ১৩ অগাস্ট আইন কমিশন থেকে পদত্যাগ করেন খায়রুল হক।