Published : 09 Dec 2025, 08:25 PM
একটি বাড়িতে আটকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় এক সেনা কর্মকর্তা টেলিভিশন দেখছিলেন এবং সেখান থেকে ফোনে সংবাদ নিয়ন্ত্রণ করছিলেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যে বলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ।
মঙ্গলবার চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ট্রাইব্যুনাল-২ এ সাক্ষ্য দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক এই সমন্বয়ক।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে অপর দুই সদস্য ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিত এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবির।
এ দিন আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ (মো. আবুল হাসনাত), যিনি পরে এনসিপিতে যোগ দেন। কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার গোপালনগর গ্রামের এ বাসিন্দা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিলেন।
সাক্ষের শুরু থেকে হাসনাত আবদুল্লাহ জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ দেন। এরপর ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের সঙ্গে ঘটা বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দেন।
আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ছয়জন নিহত হওয়ার কথা তুলে ধরে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ওই দিন সারাদেশে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল চলাকালে রংপুরে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের ছাত্র ও একজন সমন্বয়ক আবু সাঈদকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। একইদিন চট্টগ্রামের ষোলশহরে ছাত্রদলের ওয়াসিমসহ সারাদেশে মোট ছয়জনকে পুলিশ ও ছাত্রলীগ গুলি করে হত্যা করে।
এর প্রতিবাদে পরদিন তারা সারাদেশে গায়েবানা জানাজা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ওইদিনই ইউজিসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা দেয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল হল বিকাল ৫টার মধ্যে খালি করার নির্দেশ দেয়।
তিনি বলেন, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হল থেকে মিছিল নিয়ে দোয়েল চত্বর হয়ে টিএসসি এর দিকে যেতে চাইলে রাজু ভাস্কর্যের সামনে পুলিশ ও বিজিবি তাদের ওপর টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।

“একইসাথে ডিজিএফআই আমাদেরকে গায়েবানা জানাজা কর্মসূচি প্রত্যাহারের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। আমরা যখন গায়েবানা জানাজা শেষ করে কফিন মিছিল নিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন বিজিবি ও পুলিশ আমাদের ওপর পুনরায় টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে আমিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য ছাত্র আহত হয়।”
আক্রমণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগসহ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন, বলে অভিযোগ করেন হাসনাত।
তিনি বলেন, ওইদিন তিনি সাইন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় তার মামার বাসায় চলে যান। হল বন্ধ করে দেওয়ায় তার সঙ্গে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিসও তার মামার বাসায় চলে যান।
“সেদিন রাতে ডিজিএফআই সদস্যরা আমার মামার বাসায় এসে সারজিস ও আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। আমরা তাদের সঙ্গে যেতে অস্বীকৃতি জানালে আমাদের পরিবারসহ আমাদেরকে ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়। ওইদিন রাতে আমাদেরকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় নিয়ে যাওয়া হয়।”
ওই সময়কার ঘটনা বর্ণনা করে তিনি বলেন, তাদের যাওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যে সেখানে তৎকালীন তিনজন মন্ত্রী- আনিসুল হক, তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত ও শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল প্রবেশ করেন। এরপর ডিজিএফআই ওই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে তাদের মিটিং করতে চাপ দেয় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। এ সময় নানাবিধ প্রলোভন, ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করে।
হাসনাত বলেন, কিন্তু তারা অন্য সমন্বয়ক নাহিদ, আসিফের সঙ্গে কথা না বলে কোনো মিটিং করতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর ওই তিনজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মা থেকে বের হয়ে যান।
“সেদিন মিটিং না করায় ডিজিএফআই আমাদের উপর ক্ষুব্ধ হয়। ডিজিএফআই আমাদেরকে বাসায় ফেরত না দিয়ে সেদিন রাতে মৎস্য ভবন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মাঝে একটি গোপন স্থানে, যা সেইফ হাউজ নামে পরিচিত, নিয়ে আটক রাখে। সেখানে আমাদেরকে ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন সংস্থার লোকজন জিজ্ঞাসাবাদ করে।”
তিনি বলেন, তাদের যেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তার (হাসনাতের) ঠিক পেছনে একটি টেলিভিশন সেট করা ছিল। জিজ্ঞাসাবাদকারী ওই কর্মকর্তা টেলিভিশন দেখছিলেন, কিন্তু হাসনাত দেখছিলেন না।
“আমাদেরকে যিনি জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন তিনি জিজ্ঞাসাবাদের সাথে সাথে টিভি দেখছিলেন, কিন্তু আমরা আমাদের পিছনে থাকা টিভি দেখতে পাচ্ছিলাম না। তিনি সেখান থেকে ফোন করে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, বিশেষ করে ডিবিসি, সময় টিভি ও একাত্তর টিভিতে ফোন করে নিউজ পরিবর্তন এবং স্ক্রল সংশোধনের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। সে অনুযায়ী টিভি চ্যানেলগুলো সংবাদ প্রচার করছিল এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে দেখানোর চেষ্টা করছিল।”
তাদের যে বাড়িতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল তা বাইরে থেকে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি মনে হলেও ভেতরটা ছিল আধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত, বলেন হাসনাত।

তিনি বলেন, ১৭ জুলাই দিবাগত রাত প্রায় আড়াইটা পর্যন্ত তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ফজরের সময় তাদের আবার ডেকে তুলে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ হয়।
“জিজ্ঞাসাবাদকালে ডিজিএফআইয়ের একজন সেনা কর্মকর্তা আমাকে বলেন, তিনি ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ১০ মিনিটে বিএনপির লাখো জনতার আন্দোলন নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন এবং আমাদের আন্দোলন একইভাবে নস্যাৎ করতে তার সময় লাগবে না।”
সাক্ষ্যে তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময়ে কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সেটআপ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাদের চাপ দিচ্ছিল আন্দোলন প্রত্যাহার করে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে এবং সেটি সংবাদ সম্মেলন করে জাতির কাছে জানাতে।
সে সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তারা অন্য সমন্বয়কদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না জানিয়ে হাসনাত বলেন, ডিজিএফআই সদস্যরা তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সমন্বয়কদের সঙ্গে যোগযোগ করে তাদের অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে তার ফোন দিয়ে সমন্বয়ক হাসিবের সঙ্গে যোগযোগ করে চানখারপুল থেকে তাকে তুলে এনে তাদের সঙ্গে আটক রাখে।
“সেখানে আমাদেরকে নানাভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। সমন্বয়ক হাসিব মাদ্রাসার ছাত্র হওয়ায় এবং খুব সম্ভবত তার বোন মাদ্রাসার ছাত্রী হওয়ায় তাকে শিবির ট্যাগ দিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়।”
তিনি বলেন, আটক থাকা অবস্থায় তারা জানতে পারছিলেন না সারা দেশে কী হচ্ছে এবং দেশবাসীও জানতে পারছিল না তাদের সঙ্গে কী হচ্ছে।
“দেশবাসীর কাছে আমাদেরকে ভিলেন বানানোর উদ্দেশ্যে আমরা সরকারের সাথে আলোচনায় বসেছি মর্মে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মিথ্যা খবর প্রচার করা হয়। আমাদেরকে যখনই মিডিয়ার সামনে আনা হচ্ছিল তখনই আমরা বলছিলাম আমাদের পূর্ব ঘোষিত শাটডাউন কর্মসূচি ও আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। কিন্তু গণমাধ্যম টিভি চ্যানেল, বিশেষ করে তিনটি চ্যানেল সময় টিভি, একাত্তর টিভি ও ডিবিসি আমাদের বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছিল।”
ডিজিএফআই এর তৎকালীন মহপরিচালক জেনারেল হামিদের পিএস পরিচয়ে নিলয় ও হাসনাত নামে দুজন সেনা কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে রুঢ় আচরণ করেন এবং তাদের গায়ে হাত তোলেন বলে হাসনাতের অভিযোগ।

হাসনাত নামের ওই সেনা কর্মকর্তা ডিজিএফআইয়ের পক্ষে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করছিলেন বলে হাসনাতের ভাষ্য।
১৮ জুলাই সারাদিন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় জানিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ওইদিন সন্ধ্যায় ডিজিএফআইয়ের ডিজিসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ওই ‘সেইফ হাউজে’ উপস্থিত হয়ে শেষবারের মত তাদের বৈঠক করে আন্দোলন প্রত্যাহারে চাপ প্রয়োগ করেন।
সেখান আটক থাকালে এসবি, এনএসআই, ডিজিএফআই, ডিবিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে আন্দোলন দমনের ক্রেডিট নেওয়ার প্রতিযোগিতা দেখতে পান বলে সাক্ষে তুলে ধরেন তিনি।
বাইরের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না বলে তিনি, সারজিস ও হাসিব সিদ্ধান্ত নেন যে তাদেরকে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের দাবিদাওয়া জানাতে দিলে তারা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় যাবেন। সে শর্তে তারা পদ্মায় যেতে রাজি হন এবং সংবাদ সম্মেলন করে তাদের দাবিদাওয়া লিখিতভাবে প্রকাশ করেন।
তারা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সরকারের সঙ্গে কোনো বৈঠকে যান নাই এবং শহীদদের রক্ত মাড়িয়ে তারা কোনো সংলাপ করতে পারেন না এবং তাদের পূর্বঘোষিত শাটডাউন কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
“দুঃখজনকভাবে মিডিয়া আমাদের বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ প্রচার করে। শাটডাউন কর্মসূচি যেন প্রত্যাহার করে নেই সেজন্য মিডিয়ার সামনেই পূর্ব উল্লেখিত সেনা কর্মকর্তা হাসনাত আমাদের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। আমরা অস্বীকৃতি জানালে তিনি তখন কিছু না বলে আমাদেরকে পুনরায় সেইফ হাউজে নিয়ে আসেন।
“সেখানে এসে দেখি আমাদের বক্তব্য সম্পূর্ণ বিকৃতভাবে প্রচার করে আন্দোলন প্রত্যাহার করেছি মর্মে খবর পরিবেশিত হতে থাকে, যা বাস্তব ঘটনার সম্পূর্ণ বিপরীত। সংবাদ সম্মেলনে আমাদের কথা কেটে দিয়ে শুধু দাবিগুলো প্রচারিত হতে থাকে। সেদিন রাতে আমাদেরকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়।”
পরদিন ১৯ জুলাই দুপুরে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়, বলেন হাসনাত।