Published : 13 Apr 2026, 09:08 AM
নতুন বাংলা বছরের প্রথম সকালে যে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হতে যাচ্ছে, তাতে গণতান্ত্রিক উত্তরণসহ পাঁচটি বিষয়ে থাকছে ভিন্ন ভিন্ন মোটিফ।
এ শিল্পকর্মের মধ্যে থাকছে—মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া।
এর মধ্যে মোরগ দিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের কথা তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন আজহারুল ইসলাম শেখ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশে গত ১৮ বছর এক ফ্যাসিবাদী শাসনতন্ত্রের মধ্যে ছিল। সেখান থেকে একটা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এদেশ আবার গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা করেছে।
“তাই যে নতুন ভোর, নতুন দেশ, নতুন গণতন্ত্রের সূর্য উদিত হয়েছে, তাকে শুভকামনা জানাতেই আমাদের প্রতীকী মোরগ।
“মোরগ যেমন আমাদেরকে প্রভাতে সূর্য উঠার আগে জাগিয়ে দিয়ে শুভ কামনা জানায়, আমরাও এ দেশে গণতন্ত্রের পুনরুত্থানকে শুভকামনা জানাই। আমরা চাই, এদেশে আমার ন্যায়বিচার ফিরে আসুক।”
প্রতিবারই চারুকলা অনুষদ সমসাময়িক নানা বিষয় তুলে ধরে আয়োজন করে শোভাযাত্রা, যা নববর্ষ উদ্যাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ। এবার নববর্ষ উদ্যাপন হবে ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্যে।

শোভাযাত্রায় এবার দোতারার মোটিফ যুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আপনারা জানেন, সারা দেশে বাউলদের ওপর নানা হামলার ঘটনা ঘটেছে। আমরা তার প্রতিবাদ জানাতে চাই।
“একই সঙ্গে এদেশে আমাদের যে লোক গান আছে, তা হারিয়ে যেতে বসেছে। সেই সংস্কৃতিকে জাগাতে আমাদের এ আয়োজন।”
তাছাড়া শান্তির প্রতীক হিসেবে পায়রা, দেশীয় সংস্কৃতির নিদর্শন হিসেবে নারায়ণগঞ্জের লোকশিল্প জাদুঘরের কাঠের হাতি এবং কিশোরগঞ্জের টেপা আকৃতির ঘোড়া তুলে ধরতে চায় চারুকলা অনুষদ।
কারুশিল্প বিভাগের শিক্ষক রাকিন নাওয়ার বলেন, “আমাদের আয়োজনে হাতির যে প্রতীকী মোটিফটা আছে, তা নারায়ণগঞ্জের লোকশিল্প জাদুঘরের কাঠের হাতির আদলে বানানো; এটি অ্যাকাডেমিক জায়গা থেকে নেওয়া। আর পায়রা তো শান্তির প্রতীক।
“আমাদের দেশে, বিশ্বে যেসব গন্ডগোল চলছে তা থেকে আমরা চাই সকলের মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠা হোক। আর কিশোরগঞ্জের বিখ্যাত টেপা আকৃতির ঘোড়াগুলো আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির এক অন্যতম নিদর্শন। তাই আমাদের সংস্কৃতির প্রসার হোক, তার বার্তা তুলে ধরতে এ মোটিফ।”

আলপনা, পটচিত্র
চারুকলার সীমানাপ্রাচীরে আঁকা হয়েছে নকশি কাঁথার আলপনা; আর ভেতরে টানিয়ে রাখা হয়েছে পাঁচটি পটচিত্র।
এসব পটচিত্রে সুন্দরবনজীবীদের দেবী বনবিবি, বাংলা নববর্ষের প্রবর্তক মুঘল সম্রাট আকবর, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, লোকচিত্রকলা গাজীর পট এবং মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গলের অন্যতম চরিত্র বেহুলাকে তুলে ধরা হয়েছে।

পটচিত্রী টাইগার নাজির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের যে এক ঐতিহাসিক নিদর্শন আছে তা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। সেই সাথে এবার আমরা এঁকেছি ‘পটচিত্র বাংলাদেশ’, যেখানে বায়ন্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের নূর হোসেন এবং চব্বিশের আবু সাঈদদের মত দেশপ্রেমিকের পট। আমাদের মধ্যে যেন দেশের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হয়, তার জন্য এ আয়োজন।”
চারুকলার দেয়ালে নকশি কাঁথার আলপনা আঁকার ব্যাখ্যায় চারুকলার ডিন আজাহারুল ইসলাম শেখ বলেন, “চারুকলা প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন থিমে এ আয়োজনগুলো করে থাকে। গতবার ছিল শখের হাড়ি, এবার নকশি কাঁথা।
“আমাদের সংস্কৃতি এতো বিস্তৃত; এত বিচিত্র অনুষঙ্গ আছে—যা আমরা তুলে ধরে শেষ করতে পারব না। তার পরও দেশীয় সংস্কৃতি বিকাশে আমরা এবার নকশি কাঁথার আলপনা এঁকেছি।”

থাকছে জ্যান্ত ঘোড়াও
গতবারের মতো এবারও শোভাযাত্রায় থাকবে জ্যান্ত ঘোড়া। ছিল জ্যান্ত হাতি রাখারও পরিকল্পনা। তবে হাতি না পাওয়ায় কেবল জ্যান্ত ঘোড়া থাকছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ।
তিনি বলেছেন, “গতবার আমাদেরকে ডিএমপি কয়েকটি ঘোড়া এনেছিল। এবারও আমাদের শোভাযাত্রায় থাকবে পুলিশের সেই ঘোড়া বহর।”
আয়োজন চার দিনের
পুরনো বছরকে বিদায় ও নববর্ষ উদ্যাপনে তিন দিনের আয়োজন থাকছে বলে জানিয়েছে চারুকলা অনুষদ।

বিদায়ি বছরের শেষ দিন সন্ধ্যায় বকুলতলায় নাচ-গান, কবিতা আবৃত্তি ও নাটকসহ নানা আয়োজনে পালন করা হবে চৈত্র সংক্রান্তি। নতুন বছরের প্রথম সকালে হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’।
সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হয়ে রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর ও বাংলা একাডেমি হয়ে পুনরায় চারুকলায় এসে এ আয়োজন শেষ হবে।
এর পরের দুইদিন থাকবে যাত্রাপালা ও পালাগানের আসর।
অধ্যাপক আজাহারুল ইসলাম বলেন, “চৈত্রসংক্রান্তি দিয়ে আমাদের আয়োজন শুরু। এরপর শোভাযাত্রা হবে; ওদিন এখানেই শেষ। কারণ আমাদের সবার তো ক্যাম্পাসের বাইরে প্রোগ্রাম থাকে।
“এরপর ১৫ এপ্রিল আমাদের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় একটা যাত্রাপালা হবে, যেটার নাম ‘বাগদত্তা’। আর ১৬ এপ্রিল নেত্রকোণার এক পালা দল এখানে পরিবেশনা করবেন তাদের পালা, যার নাম হচ্ছে ‘বিবি সুলতানা’।”
‘নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা নেই’
এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রার আয়োজন নিয়ে কোনো শঙ্কা দেখছেন না চারুকলা অনুষদের ডিন আজাহারুল ইসলাম শেখ।
তিনি বলেছেন, “এবারের আয়োজনে পুলিশ সার্বক্ষণিকভাবে থাকছে। আমরা ও প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা আছেন। আমরা সবাই মিলে কাজ করছি। এবার এখন পর্যন্ত শঙ্কা নেই।”

গত বছর শেখ হাসিনার ‘ফ্যাসিবাদের মুখাকৃতি’ মোটিফ এবং ‘শান্তির পায়রা’ মোটিফে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। তখন নতুন করে মোটিফ বানিয়ে আয়োজন সারা হয়।
নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেই অনুযায়ী, মুখোশ পরে ও ব্যাগ বহন করে ক্যাম্পাসে প্রবেশের সুযোগ নেই। তবে চারুকলা অনুষদের তৈরি মুখোশ হাতে বহন করা যাবে। ভুভুজেলা বাজানো বা বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সব কর্মসূচি বিকাল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে।
সোমবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারযুক্ত যানবাহন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবে। পহেলা বৈশাখে যান চলাচল, বিশেষ করে মোটরসাইকেল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
ছাত্র-শিক্ষকের দূরত্ব কি কমেছে?
গত শতকের আশির দশকে সামরিক শাসনের অর্গল ভাঙার আহ্বানে পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়েছিল; সেটিই পরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় রূপ নেয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতিও পায় এ কর্মসূচি।
কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরোধিতা করে আসছিল আওয়ামী লীগের সময় থেকেই। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই বিরোধিতা আরো জোরালো হয়।
সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে চারুকলার শোভাযাত্রার নাম থেকে ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। নতুন নামকরণ হয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’।
শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন, প্রতিকৃতি নিয়ে বিতর্কসহ নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গতবছর নববর্ষ উদ্যাপন করা হয়। ওই আয়োজনকে ‘স্বজনপ্রীতি দুষ্ট ও দেশের পরিবর্তনকালীন সময়ে রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী’ বর্ণনা করে তা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল অনুষদের ২৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা।
সেই টানা পড়নের রেশ না কাটতেই এবার ফের শোভাযাত্রার নাম বদলে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করেছে সরকার, যা নিয়ে সন্তুষ্ট না শিক্ষার্থীরা।

ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী মৃধা রাইয়ান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গতবার প্রায় শিক্ষার্থীরা আনন্দ শোভাযাত্রা বর্জন করেছিল। তখন তাদের ইচ্ছামতো নাম পরিবর্তন, ইচ্ছামতো আয়োজন…আগে কিন্তু আমরা করতাম সব।
“এখন এবারও যদি তাই হয়, তাহলে দিনশেষে আমরাই বাদ পড়ে যাচ্ছি। তবে না থাকার চেয়ে থাকাটা ভালো না? এজন্য আছি।”
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, “গতবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একক আধিপত্যে এ আনন্দ শোভাযাত্রা হয়েছে। এবার বিএনপির আধিপত্যে বৈশাখী শোভাযাত্রা হচ্ছে।
“ক্ষমতার পালাবদলে সংস্কৃতি নিয়ে এতো হীনমন্যতায় ভুগলে তো এ জাতি কখনো সামনে আগাতে পারবে না। সেখানে আমাদের শিক্ষকরাও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে বিএনপির সাথে সুর মেলাচ্ছে।”

ছাত্র-শিক্ষকের দূরত্ব প্রসঙ্গে অধ্যাপক আজাহারুল ইসলাম শেখ বলেন, “ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে কোন দূরত্ব নেই। আগেও কখনো ছিল না।
“গতবার কয়েকজন বয়কট করেছে, সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। এবার আমরা ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে নিয়ে কাজ করছি।”
শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন নিয়ে চারুকলার শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ দেখা গেছে।
শিক্ষার্থী মৃধা রাইয়ান বলেন, “গতবার আমাদের আয়োজক কমিটি বোঝাতে চেয়েছিল যে, আমরা আমাদের সেই আগের নামে ফেরত যাচ্ছি। তাই ‘মঙ্গল’ বাদ দিয়ে ‘আনন্দ’ শোভাযাত্রা।
“কিন্তু এবার তাইলে কেন আবার আনন্দ বাদ দিয়ে বৈশাখী? এটার ব্যাখ্যা এখন শিক্ষকদের দিতে বলেন।”
তবে ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, “নাম রাখা, না রাখা তো আমাদের হাতে না। সরকার চাইলে নাম পরিবর্তন করতে পারে।
“আমরা বাদেও তো একটা বৃহত্তর গোষ্ঠী আছে। তাই আমরা নামের চাইতে কাজকে প্রাধান্য দিচ্ছি।”