Published : 09 Apr 2026, 07:57 PM
জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষের ‘সাউন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম-এসআইএস’ পরিচালনা, মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে ‘অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের’ অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদুর রহিম জোয়ারদারসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আসা এ অভিযোগ অনুসন্ধান শুরুর তথ্য বৃহ্স্পতিবার দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের দিয়েছেন।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছে একাধিক নথি, ব্যয় হিসাব, দরপত্রের নথি, প্রাক্কলন, বিল-ভাউচার, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের পরিচয় চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি। সাত দিনের মধ্যে এসব সরবরাহ করা জরুরি বলে চিঠিতে বলেছে দুদক।
দুদকের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের গত ১৩ জানুয়ারি অভিযোগের ভিত্তিতে এ অনুসন্ধান চলছে।

অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন দুদকের সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাস।
এদিকে, গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনে শব্দযন্ত্রের বিভ্রাটের কারণে কার্যক্রম কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পরদিনের বৈঠকেও হেডফোন ও সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী।
এরপর ৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে আবারও শব্দযন্ত্র বিভ্রাটের ঘটনা ঘটে। সেদিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তার নিজের শব্দযন্ত্রও কাজ করছিল না। পরে তা মেরামত ও নামাজের বিরতির জন্য অধিবেশন ৪০ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হয়।
শব্দযন্ত্রে এই বিভ্রাট ‘অন্তর্ঘাত’ কি না তা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে ‘সংসদ কমিটি’। সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস নেতৃত্বাধীন এ কমিটিকে আগামী ৩ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
দুদক যে অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে, তাতে বলা হয়েছে, জাহিদুর রহিম জোয়ারদার, তার প্রতিষ্ঠান কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কিছু প্রকৌশলীর যোগসাজশে জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে স্থাপিত এসআইএস পরিচালনা, মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে ‘বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ আত্মসাৎ’ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আমদানির ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে বেশি দামি দেখিয়ে (ওভার ইনভয়েস) বিদেশে ‘অর্থ পাচারেরও’ অভিযোগ তোলা হয়েছে।
অভিযোগে তার বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য খাতে মেডিকেল ইকুইপমেন্ট কেনাকাটার মাধ্যমেও ‘শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের’ অভিযোগ আনা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী সরকারকে উৎখাতের দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভব গণভবন ও সংসদে ভবনে ঢুকে পড়ে বিক্ষোভকারীরা।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, সে সময় জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষের এসআইএস ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সচল করতে উদ্যোগ নেয় গণপূর্ত অধিদপ্তর। কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড ক্ষতিগ্রস্ত এসআইএস পরীক্ষা করে মেরামতের মাধ্যমে চালু করা সম্ভব বলে মত দেয় এবং একটি সম্ভাব্য খরচের হিসাব জমা দেয়।
এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রকৌশলীদের আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া ও সম্মানি ভাতা বাবদ ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা চেয়ে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষের সিউর ব্র্যান্ডের সিস্টেমটির সমমানের প্রযুক্তিগত বা প্রকৌশল বৈশিষ্ট্যের পণ্য বর্তমানে প্রস্তুতকারক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদন না করলেও পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা অব্যাহত ছিল।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের আগেও গণপূর্তের কিছু কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের যোগসাজশে পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এসআইএস মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ৯ কোটি টাকার প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছে।
দুদকের চিঠিতে প্রধান প্রকৌশলী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছে চার ধরনের তথ্য ও নথি চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষের এসআইএস পরিচালনা, মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ দরপত্র বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকলে তার পূর্ণাঙ্গ নথি।
এছাড়া চাহিদাপত্র, প্রশাসনিক অনুমোদন, কমিটি গঠনের পত্র, প্রাক্কলন, বাজার যাচাই প্রতিবেদন, দরপত্রের কাগজপত্র, উন্মুক্তকরণ ও মূল্যায়ন কমিটির রেজুলেশন, কার্যাদেশ, ‘স্টক রেজিস্টার’, ‘নোট শিট’, বিল পরিশোধের ভাউচার, ‘রেজিস্টার’ এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন।
এ কাজে অর্থবছরভিত্তিক কত টাকা খরচ হয়েছে, সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের এসআইএসসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ছিল কি না, বর্তমানে সিস্টেমটির অবস্থা কী, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টে সংসদ ভবনের এসআইএস ও সংশ্লিষ্ট অফিস কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং সে বিষয়ে কোনো কমিটি গঠন বা প্রতিবেদন হয়ে থাকলে তার কপিও চেয়েছে দুদক।
একই সঙ্গে এ কাজে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের নাম, পদবি ও বর্তমান ঠিকানাও চেয়েছে সংস্থাটি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, এর আগে নথিপত্র চেয়ে না পাওয়ায় অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিঘ্ন ও বিলম্ব হচ্ছে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অনুসন্ধান শেষ করতে এসব নথি সাত দিনের মধ্যে পাঠানো জরুরি।
পুরোনো খবর: