প্রবাসীদের জন্য এবার ভাবনায় ‘প্রক্সি ভোট’
সোমবার নির্বাচন কমিশনে এ সংক্রান্ত কমিটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকারের প্রক্রিয়ার বিষয়টি উপস্থাপন করেছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রযোগ নিশ্চিতে ‘প্রক্সি ভোটিং’ পদ্ধতির উপায় খুঁজছে নির্বাচন কমিশন।
প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি নিয়ে আগ্রহ না থাকলেও অনলাইন ভোটিং পদ্ধতি পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথাও ভাবা হচ্ছিল। এবার প্রক্সি ভোটিং পদ্ধতি কার্যকর করা যায় কি না সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞমত নিতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসবে নির্বাচন কমিশন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিব, এনআইডি উইংসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামনে সোমবার নির্বাচন কমিশনে প্রবাসীদের জন্য ‘প্রক্সি ভোট’ নিয়ে প্রেজেন্টেশনও উপস্থাপন করা হয়েছে।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ, যিনি ইসির এনআইডি ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয় কমিটিরও প্রধান।
ইসির তৃতীয় কমিশন সভা শেষে গত ৩০ জানুয়ারি এ নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া কীভাবে সহজ করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করেছেন তারা।
প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগে কোন পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে তা খতিয়ে দেখতে একটি কারিগরি কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান হিসেবে রয়েছেন ইসি সচিবালয়ের আইসিটি উইংয়ের সিস্টেম ম্যানেজার রফিকুল হক, আর আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন এনআইডি উইংয়ের পরিচালক (নিবন্ধন ও প্রবাসী অধিশাখা) আব্দুল মমিন সরকার।
এই কমিটিই সোমবার প্রবাসীদের প্রক্সি ভোটিং নিয়ে কমিশনের সামনে প্রেজেন্টেশন দেয়।
আব্দুল মমিন সরকার বলেন, “সবকিছু আগামী ৬/৭ মাসে সম্ভব। (ভোটের) সিডিউল ডিক্লেয়ারের আগে প্রক্সি ভোটারদের রেজিস্ট্রেশনটা করে ফেলব। ভোটের দিন ভোট দেবে। অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, রেজিস্ট্রেশনের জন্য যতটুকু সময় লাগে…স্বল্প সময়ে, স্বল্প খরচে, সহজ পদ্ধতিতে, প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার উপযোগী হিসেবে সব বিবেচনায় প্রক্সি ভোট ভালো মনে করছি।”
বর্তমানে দেশে ১২ কোটি ৩৭ লাখেরও বেশি ভোটার রয়েছে। জুনের মধ্যে আরও ৩০ লাখের বেশি ভোটার যুক্ত হবে এতে।
দেশের প্রায় কোটি নাগরিক প্রবাসে থাকে; যাদের উল্লেখযোগ্য অংশ ভোটের সময় ভোটাধিকার বঞ্চিত হন।
দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকারের বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
অন্তবর্তী সরকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়েও তৎপর হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও এ বিষয়ে সুপারিশ করেছে।
গত ১৬ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এবার আমরা প্রবাসী বাংলাদেশিদেরকে ভোট দেওয়া নিশ্চিত করতে চাই। অতীতে আমরা এ ব্যাপারে অনেকবার আশ্বাসের কথা শুনেছি। এই সরকারের আমলে এটা যেন প্রথমবারের মতো বাস্তবায়িত হয় এটা আমরা নিশ্চিত করতে চাই। এর জন্য একটা নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা করতে হবে।”
এরপর ১৮ ডিসেম্বর এক অনুষ্ঠানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে ‘সর্বাত্মক সহযোগিতার’ প্রতিশ্রুতি দেন অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা।
তবে এই দায়িত্ব মূলত নির্বাচন কমিশনের বলে মন্তব্য করেছেন আইন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
আর এ কাজে নির্বাচন কমিশনকে ‘সহযোগিতা করার’ বলে আশ্বাস দিয়েছেন কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
ডিসেম্বরের মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা প্রস্তুতির মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটের বিষয়ে এএমএম নাসির উদ্দিন কমিশনও তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
অল্প সময় ও খরচে প্রক্সি ভোটের বিষয়ে আগ্রহ
ইসির এনআইডি উইং পরিচালক (নিবন্ধন ও প্রবাসী অধিশাখা) মো. আব্দুল মমিন সরকার বলেন, “ফলোআপ মিটিং হিসেবে কমিশনের সামনে এটা (প্রেজেন্টেশন) উপস্থাপন করা হয়।
“আমরা কমিশনের কাছে তিনটি সিস্টেমের ওপরে একটা প্রেজেন্টেশন দিয়েছি। এগুলো হলো পোস্টাল ব্যালট, প্রক্সি ও অনলাইন ভোটিং পদ্ধতি। সবগুলোর টাইমলাইন, ব্যবস্থাপনা বিবেচনা করে কমিশন চিন্তা করছে প্রক্সি ভোটটাই অল্প সময়ের মধ্যে অ্যাপ্লিকেবল।”
সামনে এ বিষয়ে আরও মতামত নেওয়ার জন্য ৭ এপ্রিল একটি কর্মশালা করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ সংশ্লিষ্ট এক্সপার্টরা এ বিষয়ে মতামত দেবেন কোনটা কোনটা ভায়াবল হবে। যাচাই-বাছাই হবে, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বসবে কমিশন। এরপর আইন সংশোধন হবে,” বলেন এ কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত ও অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক হবে। তারপর প্রকিউরমেন্ট, পাইলটিং হবে। এরপর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
যেভাবে প্রক্সি ভোট
>> ভোটার তালিকায় নাম থাকতে হবে।
>> এনআইডি নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
>> অ্যাপ ডেভেলপ করবে ইসি।
>> নিবন্ধনের পর নির্ধারিত অ্যাপের মাধ্যমে সব করবে, কোনো দূতাবাসেরও সহযোগিতা লাগবে না।
>> সরাসরি ভোটার টু ইলেকশন কমিশন
>> বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকে রেজিস্ট্রেশন করা হবে।
ইসি কর্মকর্তারা বলেছেন, এ পদ্ধতিতে প্রবাসী যারা ভোটে দিতে চান, তারা প্রথমে একটা অ্যাপে ফেইস রিকগনিশনের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করবেন। প্রি-রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ভোটের আগ্রহ প্রকাশ করবেন। ওই রেজিস্ট্রেশনের সময় তার পক্ষে যিনি ভোট দেবেন, তার এনআইডি ও বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে।
রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকার সময় জানিয়ে দেবে, কারা কারা প্রক্সি ভোট দেবেন। তাদের জন্য আলাদা ভোটার তালিকার প্রয়োজন পড়বে না।
আব্দুল মমিন সরকার বলেন, “যিনি প্রক্সি ভোট দেবেন, তিনি নিজেও ভোটও দিতে পারবেন। এটা ওয়ান কাইন্ড অব পাওয়ার অব অ্যাটর্নি। প্রবাসীরা বিদেশে বসে রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন এবং উনার পক্ষে একজনকে (তার নির্বাচনি এলাকার) নির্ধারণ করে দিতে পারবেন প্রক্সি ভোটার হিসেবে।
“এটার একটা অথেনটিকেশন করে দেওয়া হবে, যাতে এলোমেলোভাবে কেউ এটার সুযোগ না নিতে পারে।”
