Published : 14 Jul 2025, 10:29 AM
তিন বছর আগে ঢাকার দোহারের মৈনট ঘাটে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে প্রাণ হারানো বুয়েট শিক্ষার্থী তারিকুজ্জামান সানির মৃত্যুর কারণ এখনো জানা যায়নি।
তার মৃত্যুর শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি মা, ছবি দেখলেই করেন কান্নাকাটি। আর বাবা গত হন সানির মৃত্যুরও দুই বছর আগে। এখন পরিবারটিতে কেবল সানির মা আর ভাই রয়েছেন।
২০২২ সালের ১৪ জুলাই ঢাকা থেকে ১৬ জনের একটি দল আটটি মোটরসাইকেলে করে দর্শনীয় স্থান মৈনট ঘাটে ঘুরতে যায়। রাতে ঘাটের তীরে পদ্মা নদীতে পড়ে নিখোঁজ হয় সানি। পরদিন দুপুরে ঘটনাস্থলের পাশ থেকে সানির মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস।
ওই দিন রাতে সানির সফরসঙ্গী ১৫ জনের বিরুদ্ধে নদীতে ফেলে হত্যার অভিযোগে মামলা করেন বড় ভাই হাসানুজ্জামান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুই ভাই আর আম্মাকে নিয়ে ছিল আমাদের সংসার। সানি মারা যাওয়ার পর আম্মা কেমন যেন হয়ে গেছেন। ঠিকমত খানও না। ওইদিন সানির জন্য আম্মা ভাত রান্না করছিলেন। ওকে খেয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু সানি তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে যায়। এরপর থেকে আম্মা আর ভাত খান না।
“সানির যে প্রিয় খাবারগুলো ছিলো সেগুলো খাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছেন। আম্মার কারণে ঘরে সানির কোনো ছবি নাই। ছবি দেখলে কান্নাকাটি করেন। ওর ব্যবহৃত জিনিসপত্রগুলো আগের মতই গুছিয়ে রাখা হয়েছে। সবই আছে, শুধু সানি নেই।”
সানি হত্যা মামলার আসামিরা হলেন-শরীফুল হোসেন, শাকিল আহম্মেদ, সেজান আহম্মেদ, রুবেল, সজীব, নুরজামান, নাসির, মারুফ, আশরাফুল আলম, জাহাঙ্গীর হোসেন লিটন, নোমান, জাহিদ, এটিএম শাহরিয়ার মোমিন, মারুফুল হক মারুফ ও রোকনুজ্জামান ওরফে জিতু।

সানির মৃত্যুর পর পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল আসামিদের, যারা বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। ঘটনার তিন বছর বাদেও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। কবে নাগাদ তদন্ত শেষ হবে তা বলতে পারছে না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
সবশেষ গত ৩ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ছিল। কিন্তু দোহারের কুতুবপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ি আদালতে প্রতিবেদন দিতে পারেনি। প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৬ অগাস্ট পরবর্তী দিন ঠিক করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা কুতুবপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ির এসআই নাসির উদ্দিন বলেন, মামলাটির কয়েকজন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে।
“চার মাস আগে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছি। এখনো মামলার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি। চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে বিচার-বিশ্লেষণ চলছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগবে। কারণ এটা একটা হত্যা মামলা।”
তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিয়েই কারও বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন দিতে হবে; তেমনই কাউকে অব্যাহতি দিতেও সুনির্দিষ্ট কারণ লাগবে। সুস্পষ্ট মতামতের ওপর ভিত্তি করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করব। তবে সময় লাগবে।”
কত দিন সময় লাগতে পারে তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা নাসির।

মামলার বাদী হাসানুজ্জামান বলেন, “রাষ্ট্র পুলিশকে দায়িত্ব দিয়েছে, মামলার তদন্ত চলছে। কয়েকজন তদন্ত কর্মকর্তা চেঞ্জ হয়েছে। দেশের প্রেক্ষাপটও চেঞ্জ হয়েছে। ভাই চলে গেছে। আর আসবে না। তবে সত্যটা বের হোক।
“কী কারণে ভাইটা মারা গেল, তিন বছরেও জানতে পারলাম না। তবে লেট হোক, কিন্তু আসল কারণটা বের হোক।”
তিনি বলেন, “সবার সামনে আমরা ভাইটা পানিতে ডুবে গেল। সেখানে উপস্থিত ১৫ জনের ৩০টা হাত। আর নদীর মাঝে কিন্তু পড়ে নাই, পাড়েই। মাত্র ২০ গজ দূরে। যেখানে পেট সমান পানি।
“পাশে বালু কাটার ড্রেজারের উপর রশি ছিলো। ভাইটা পানিতে ডুবে গেল, একটা মানুষও দেখল না।”
আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রণব কুমার দে বলেন, “মামলাটা তিন বছর হয়ে গেছে, তদন্তাধীন। এখনো কোনো প্রতিবেদন আসেনি। ভিকটিমসহ আসামিরা একত্রে ঘুরতে গিয়েছিল। ভিকটিম পা ফসকে পড়ে যায়। অন্যরা এটা দেখেনি।
“যখন টের পায়- তখন এলাকার লোকজন, থানা পুলিশ, নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেয়। এ ঘটনায় যদি তাদের কোনো সম্পৃক্ততা থাকতো, তাহলে কাউকে বিষয়টা জানাতো না। তার জন্য পাগলের মতো ঘুরতো না।”
ঘটনার সময় সানি বুয়েটের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার ডাঙ্গুর বেপারীকান্দি গ্রামে। পরিবারের সঙ্গে থাকতেন হাজারীবাগে।
বুয়েটে পড়াশোনা শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল সানির। সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই মৈনট ঘাটে তার মৃত্যু হয়।
তার ভাই হাসানুজ্জামান বলেন, “যে চলে গেছে, সে তো গেছেই। সুষ্ঠু তদন্তের অপেক্ষায় আছি। ১৫ জন দোষী কি না তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। দুর্ঘটনা ঘটতে ২ মিনিটও সময় লাগে না। কিন্তু সেখানে তো ১৫ জন মানুষ ছিল। আমার ভাই গেছে, আর কারো ভাই তো যায়নি। সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
“তবে আমার কাছে কয়েকটা বিষয় কেমন যেন লাগছে। সন্ধ্যার পর ঘটনাস্থলে কেউ থাকেন না; সানি যখন নদীতে পড়ে যায়- তখন কি একজন মানুষও সেখানে ছিল না? আর সে তো নদীর গভীরে পড়ে যায়নি, কিনারেই ছিল। দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, তবে একটা লজিক তো থাকতে হবে।”
আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রণব কুমার বলেন, “আমরাও চাই বিচার হোক। পা পিছলে পড়ে যাওয়ার বিচার। তিন বছর হয়ে গেল, এখনো তদন্তই শেষ করতে পারেনি।
“এতে আসামিরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রতি ধার্য তারিখে তাদের আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। আগামী ধার্য তারিখে আদালতকে মেনশন করব- যেন মামলার রিপোর্ট দ্রুত জমা দিতে তদন্ত সংস্থাকে তাগিদ দেন।”
আরও পড়ুন
মৈনট ঘাটে বুয়েট শিক্ষার্থীর মৃত্যু: হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন পেছাল
মৈনট ঘাটে বুয়েট শিক্ষার্থীর মৃত্যু: রিমান্ড শেষে ১৫ বন্ধু কারাগারে
মৈনট ঘাটে ডুবে বুয়েট শিক্ষার্থীর মৃত্যু: ১৫ সফরসঙ্গী রিমান্ডে