Published : 19 Oct 2025, 11:59 PM
ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দেরিতে ঢুকেছে বলে যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, সেটি ‘সত্য নয়’ বলছেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের যে ফায়ার ইউনিট রয়েছে, সেটিকেও ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না, এমন একটি গুঞ্জনও ছড়িয়েছে। এটিও নাকচ করে দিয়েছেন তিনি।
বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে এই অগ্নিকাণ্ড এবং তা ছড়িয়ে পড়া বিষয়ে ছড়ানো বিভিন্ন গুঞ্জন নিয়ে রোববার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম তার সঙ্গে কথা বলেছে।
রাগীব সামাদ বলেন, “অগ্নিকাণ্ডের পরপর একটি বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ায় যে, বিমানবন্দরের পার্কিং এলাকার একজন সুপারভাইজার এসে বলেছে, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এটা বিভ্রান্তিকর তথ্য।”
বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের প্রধান বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লেগেছে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে।
সে সময়ের ঘটনার বিবরণ দিয়ে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক বলেন, “প্রাথমিক তথ্যটা টাওয়ার (নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার) থেকে প্রথম আমাকে জানায়। তখনই আমি বলেছি, ‘ফায়ার ভেহিক্যাল মুভ করেছে?’ ওরা বলেছে, ‘জ্বি স্যার, মুভ করেছে।’ ফায়ার সার্ভিসকে কি জানানো হয়েছে? বলেছে, ‘না স্যার, আমরা কল দেব।’

“সাথে-সাথেই ওরা ওদের চ্যানেলে জানাতে-জানাতে আমি ফায়ার সার্ভিসের পরিচালককে কল করে বললাম, আপনার নিকটবর্তী ফায়ার ভেহিক্যালগুলো দ্রুত নিয়ে আসুন। এখানে আগুনের ঘটনা ঘটেছে।”
তিনি বলছিলেন, তখনই বিমানবন্দরে থাকা ফায়ার ইউনিটের গাড়িগুলোও সেখানে পৌঁছায়।
“আমাদের গাড়িগুলোও ওখানে গেছে। ওদেরকেও কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। এবং বাইরের ফায়ারের গাড়িগুলোকেও বিমানবন্দরে প্রবেশে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি।”
গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগীব সামাদ বলেন, “প্রথম কল আসে আমার কাছে ২টা ১৬-১৭ মিনিটের দিকে। এরপর আনুমানিক ২টা ২০-২২ মিনিটের দিকেই আমি ফায়ার সার্ভিসকে জানিয়েছিলাম।
“এরপর প্রথমে বিমানবাহিনী ঘাঁটি বাশার থেকে ফায়ার ভেহিক্যাল প্রথমে আসে। এরপর, ফায়ার সার্ভিসের উত্তরা স্টেশন থেকে প্রথম ইউনিটটি আসে।”
ফায়ার সার্ভিস বলছে, তারা ২টা ৩০ মিনিটে খবর পায় এবং ২টা ৫০ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। উত্তরা স্টেশন থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব দুই কিলোমিটারের মতো।
শাহজালাল বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সের যে অংশে কুরিয়ারের কাজকর্ম চলে, সেখানে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে কর্মীরা জানিয়েছেন।
অগ্নিকাণ্ডের পর পর সেখানে একটি কুরিয়ার শাখার লোকজন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের যে ফায়ার ইউনিট রয়েছে, তাদের ঢুকতে দিচ্ছিল না। এমন একটি গুঞ্জনও ছড়িয়েছে। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক বলছেন, ছুটির দিন হওয়ায় সেখানে এই অ্যাসোসিয়েশনের কোনো কর্মীই ছিল না।

“ওখানে কুরিয়ার সার্ভিসের যে অ্যাসোসিয়েশন আছে-আইএইএবি (ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ), যেখানে আগুন লাগে ওটা ওদেরই তত্ত্বাবধানের একটা অফিস। ভেতরের অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থাও তাদের নিজস্ব। এখানে যখন আগুন লাগে, তখন আসলে তাদের কোনো কর্মী ওখানে দেখা যায়নি আশেপাশে।”
ঘটনার একদিন পেরিয়ে গেলেও ওই ভবনের কেউ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি বলে দাবি করেন রাগীব সামাদ।
বলেন, “এখনো পর্যন্ত তাদের কেউ আশ্চর্যজনকভাবে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক হিসাবে সবাই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বিভিন্নজন, বিভিন্ন জায়গা থেকে পরিদর্শন করছে। কিন্তু, যাদের অফিস, তারা কেউ এখনো পর্যন্ত এটা নিয়ে যোগাযোগ করেনি।”
বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে লাগা আগুন ২৭ ঘণ্টা পর পুরোপুরি নেভার তথ্য দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের অপারেশন ও মেনটেইন্যান্স শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী।
রোববার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “শনিবার আগুন লাগার খবর পেয়ে আমরা একে একে ৩৭টা ইউনিট এখানে অক্লান্ত পরিশ্রম করে, শনিবার রাত ৯টা ১৮ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনি। আমরা ৪টা ৫৫ মিনিটে (রোববার) এটা সম্পূর্ণ নির্বাপণ ঘোষণা করেছি।”
ফায়ার সার্ভিসের তরফে বলা হয়েছে, যেখানে আগুনের সূত্রপাত, সেখানে স্টিলের স্ট্রাকচার থাকায় আগুন অনেকক্ষণ ধরে জ্বলেছে এবং বহুক্ষণ ধোঁয়া উড়েছে। সেই সঙ্গে বাতাসের কারণে অক্সিজেন সরবরাহ থাকায় আগুন নেভাতে এত সময় লেগেছে।
শাহজালাল বিমানবন্দরে যে অগ্নি নিরাপত্তা বিভাগ রয়েছে, তাদের মূল কাজ টার্মিনাল ভবন ঘিরেই। টার্মিনাল ভবন ছাড়া বিমানবন্দরের অন্যান্য কার্যালয়গুলোতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা থাকে বলে ভাষ্য বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের।
রাগীব সামাদ বলেন, “আমাদের শাহজালালের ফায়ার বিভাগের ক্যাপাসিটিতে টার্মিনালের ভেতরে বিভিন্ন বিভাগের সাথে তারা ওরিয়েন্টেশন করে। রিফ্রেশার ট্রেনিং করায় ওদের সঙ্গে। কীভাবে জরুরি মুহূর্তে ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করবে, সে বিষয়ে ট্রেনিং নিয়মিত দেওয়া হয়।
“কিন্তু, আমাদের যে আলাদা অফিস এখানে আছে, প্রতিটি অফিস তাদের নিজ ব্যবস্থাপনায় অগ্নি নির্বাপণের ব্যবস্থাটা রাখে। ওখানে আমাদের প্রবেশাধিকার নাই বা প্রয়োজন পড়ে না। যেহেতু, তারা এখানে একটা অফিস করেছে, তাদের অবশ্যই এই কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাটা রাখতে হবে।”
তিনি বলেন, “প্রশ্ন আসতে পারে, তারা এটা রক্ষণাবেক্ষণ করেছে কিনা, আমরা যাচাই করেছি কিনা। এই ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’টা সব সময় করা আমাদের সম্ভব হয় না। এটা ব্যবস্থা করা অবশ্যই ওই প্রতিষ্ঠানের বা অ্যাসোসিয়েশনের দায়িত্ব।”
আমদানি কার্গো এলাকায় ১৩২টি ফায়ার এক্সটিংগুইশার বোতল ছিল। সেই সঙ্গে চলতি বছরের জুন মাসেও বিমানবন্দরের ফায়ার ইউনিট এগুলো কীভাবে ব্যবহার করবে সে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল বলে জানান রাগীব সামাদ। এসব তথ্য নথিবদ্ধ থাকার কথাও বলেন তিনি।
“একইভাবে টার্মিনালেও প্রতিদিনই বিভিন্ন অফিস, লাউঞ্জে ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করতে হয়, সেটা সেখানে হয়। এটা আমাদের লগবুকেও রেকর্ড আছে।”
আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে জানতে চাইলে সম্ভাব্য কয়েকটি কারণের কথা বলেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক।
বলেন, “বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। তারা নিশ্চয়ই চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে এবং বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন দেবে। তবে, আমাদের টাওয়ার থেকে যখন জানিয়েছে, আমাকে বলা হয়েছিল যে, আট নম্বর গেইটের পাশে কুরিয়ার সার্ভিসের আশেপাশে থেকে আগুনটা হয়েছে।”
তার ধারণা, এখানে কয়েকভাবে অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
তিনি বলেন, “ওখানে (অগ্নি দুর্ঘটনাস্থলে) তাদের লোক সাধারণত ছুটির দিনে থাকে না। কাল (শনিবার) না থাকায় যেকোনো কিছু হতে পারে।”
রাগীব সামাদ বলেন, “যদি মানুষ থাকত, তাহলে হয়ত মনুষ্যঘটিত দুর্ঘটনার একটি সম্ভাবনা থাকতে পারত। সেটা না হলে হয়ত একটি বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের ঘটনা হতে পারে। এরকম সম্ভাব্য কিছু কারণ হতে পারে।
“কিন্তু, প্রাথমিকভাবে আমাদের ধারণা ওই কুরিয়ার অফিস থেকেই আগুনটা হয়েছে। কিন্তু, ঠিক কী কারণে আগুনের সূত্রপাত, এটা নিশ্চয় তদন্তকারী কমিটি উদঘাটন করতে পারবে।”
শাহজালাল বিমানবন্দরের আট নম্বর গেইট সংলগ্ন আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সে আগুন লাগার পর কয়েক ঘণ্টা ফ্লাইট ওঠানাম বন্ধ থাকে। রাত ৯টার দিকে ফের ফ্লাইট ওঠানামা শুরু হয়।
ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিটের পাশাপাশি বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন, আনসারসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেন।
এ ঘটনায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বিমান, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ পৃথক তদন্ত কমিটি করেছে।
রোববার দুপুরের দিকে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ও প্রস্তুতকারকদের সংগঠন-বিজিএমইএ এর একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
তারা জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডে পোশাক তৈরির কাঁচামাল, তৈরি পোশাক, স্যাম্পলসহ নানা পণ্য পুড়েছে। তবে, কী পরিমাণ ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য তারা দিতে পারেননি।