Published : 18 Feb 2026, 09:30 PM
পাঁচটি ‘মৌলিক বিষয়ের ভিত্তিতে’ নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করে জাতীয় স্বার্থ বুঝে নিতে কাজ কাজ করার কথা বলছেন নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
তার সেই পাঁচ বিষয়ের তালিকায় থাকছে সার্বভৌম সাম্য, পরস্পরের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা, কারও অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা, জাতীয় সম্মান-মর্যাদা এবং পারস্পরিক সুবিধা।
বুধবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় এক ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী বলেন, “আমরা আমাদের পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ডে আমাদের জাতীয় স্বার্থ পাই পাই করে বুঝে নেব। দিস ইজ আওয়ার ‘রেড লাইন’।”
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে নতুন সরকারের যে যাত্রা মঙ্গলবার শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে সাবেক কূটনীতিক খলিলুর রহমানকে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা খলিলকে নতুন মন্ত্রিসভায় বসানোর সিদ্ধান্ত অনেককে ‘বিস্মিত’ করেছে।
ওই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টিটিভের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বও সামলেছেন খলিল।
নতুন সরকারের প্রথম দিনে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সভায় যোগ দেওয়ার পর সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় নেপালি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালানন্দ শর্মার সঙ্গে বৈঠক করেন খলিলুর রহমান। নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছিলেন শর্মা।
নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিল বলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, তিনি আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি আজকে থেকে ৪৬ বছর আগে আমার পাবলিক সার্ভিসের সূচনা করি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। জীবনের এই প্রান্তে এসে আবার সেখানে এলাম। এটা একটা গুরুদায়িত্ব।
“গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আমরা আমাদের ফরেন পলিসি এবং তার অভিমুখ নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করেছি। কিছু কিছু কাজও করেছি, পুনরায় ভারসাম্যপূর্ণ করার জন্য। প্রধানমন্ত্রী তার বিভিন্ন ভাষণে একটি কথাই বলেছেন বারে বারে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। আমাদের ফরেন পলিসির মোটো হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমাদের স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করে আমরা আমাদের পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ড চালাব এবং তার পেছনে যে প্রিন্সিপলসগুলো, সেগুলো আমি স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছি।”
এরপর তিনি ওই পাঁচ ‘মৌলিক বিষয়ের’ কথা তুলে তিনি বলেন, “একতরফা কিছু নাই।”
জিয়াউর রহমানের সরকারের সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেওয়া খলিল বলেন, “এক হিসেবে আমরা মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাহেবের ফরেন পলিসিতে ফেরত যাচ্ছি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে আমরা সেটাই চেষ্টা করেছি।
“আমি যে সময় ফরেন সার্ভিসে জয়েন করি, তার তিনটা অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপের কথা আমার মনে পড়ে। ১৯৭৪ সালে আমরা জাতিসংঘের সদস্যপদ পাই, তার চার বছরের মধ্যে উনি আমাদেরকে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য পদে নির্বাচিত করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং জাপানের মত একটা শক্তিকে পরাজিত করে আমরা সেই নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলাম।”
দ্বিতীয় ও তৃতীয় ‘সাহসী’ পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “সবচাইতে আনকানেক্টেড একটা অঞ্চলে তিনি এই কানেক্টিভিটির কথা বলেছেন এবং সার্ককে প্রতিষ্ঠা করার বড় বড় কাজগুলো উনি করে গিয়েছিলেন।
“তৃতীয়ত, আঞ্চলিক শান্তি, বিশ্ব শান্তি রক্ষায় আল-কুদস কমিটিতে তার ভূমিকা। মানে আমাদের ফরেন পলিসি ওয়াজ নট অনলি পজিটিভ, ইট অলসো এক্সপ্যান্ডেড, ভেরি বোল্ড। আমরা সেই জায়গায় ফেরত যেতে চাই।”
নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি মনে করি বাংলাদেশ তার ভার অনুযায়ী কাজ রাখেনি, আমাদেরকে সেটা করতে হবে। আমি যে নীতিগুলোর কথা বলেছি, সেগুলোর ভিত্তিতে আপনারা খুবই দায়িত্বশীল ও সাহসী পররাষ্ট্রনীতি দেখতে পাবেন।”
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে ‘থমকে থাকা’ সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নে খলিল বলেন, “আমরা সকল দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চাই, আমাদের স্বার্থ বজায় রেখে।”
আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে মিয়ানমারের দিকে কেমন দৃষ্টি থাকবে–এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা রোহিঙ্গা বিষয়ে আমাদের যে নজরটা ছিল, সেটা কোনোভাবে কমবে না, বরং বাড়বে।
“এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আমরা মিয়ানমার সরকার এবং আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং সর্বপ্রথম আমরা আরেকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। সেই যোগাযোগগুলো অব্যাহত থাকবে। এই সমস্যার একটা আশু সমাধান করবার চেষ্টা আমরা করব। এবং আমি এ ব্যাপারে আশাবাদী।”
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেওয়া নির্বাচনের সময়ে ‘রেফারির ভূমিকায়’ থাকা একজন ব্যক্তি হিসাবে নতুন সরকারে জায়গা নেওয়া এবং বিএনপির ‘বিজয়ের প্রক্রিয়ায় জড়িত’ থাকার অভিযোগ সম্পর্কে খলিলের কাছে জানতে চান একজন সাংবাদিক।
উত্তরে তিনি বলেন, “অনেকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বলছে, তার মানে গণনা ঠিক হয় নাই, তাই তো? এটা বলছে তো? গুণে নেন আরেকবার। বুঝতেতো মুশকিল নাই।”
গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে খলিলুর রহমানকে ‘বিদেশি নাগরিক’ আখ্যা দিয়ে তাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল বিএনপি।
এখন সেই বিএনপির সরকারে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে খলিলুর রহমান বলেন, “আচ্ছা, আমি তো জোর করে যাইনি। তো, একেকজন সম্পর্কে একেকজনের একটা ধারণা থাকতে পারে প্রাথমিক। সেটা পরিবর্তন হয়, তাই না?”
সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার আশ্বাস দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমাদের পররাষ্ট্র বিষয়ের কর্মকাণ্ড সমস্ত বাংলাদেশের মানুষ নিয়ে করব এবং সেই বার্তাটার বাহক আপনারা।
“আমি শুধু একটা আশা করব, আপনাদের মিডিয়া এটা যেন অবজেক্টিভিটি বজায় রাখে, এটা যেন গুজবের কারখানা না হয়ে যায়। পররাষ্ট্রনীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, একটা কথার এদিক-সেদিক হয়ে গেলে আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে।”
নতুন বাস্তবতায় সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের বিষয়ে এক প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, “অবশ্যই এটা চ্যালেঞ্জিং এবং একইভাবে ইন্টারেস্টিং অবশ্যই।
“আমাদের পররাষ্ট্রনীতি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেটা বলেছেন, যে বিএনপির যেটা মোটো, সেটা হচ্ছে আমরা বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে সবার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখব।
“এবং ১৭ বছর পরে একটা পরিবর্তনের জন্য আমাদের পররাষ্ট্রনীতি। জনগণের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি, সেদিকে আমরা এগোতে চাই।”
ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির জায়গায় কোনো পরিবর্তন আসবে কি-না, এমন প্রশ্নে কৌশলী উত্তর দিয়ে তিনি বলেন, “দেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে যা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হওয়ার প্রয়োজন, সেটা আমরা করব।”