Published : 06 Nov 2025, 07:10 PM
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে কারিগরি সহযোগিতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ যে চিঠি দিয়েছে, তাতে কোনো ‘উপকার হবে না’ বলে মনে করছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তিনি চিঠির বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “এ ধরনের চিঠিতে কোনো কাজ হবে না। নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়।”
বাংলাদেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নয়’ এমন নির্বাচনে সহযোগিতা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে গত শনিবার জাতিসংঘকে চিঠি পাঠিয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ।
ঢাকায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রতিনিধি স্টেফান লিলার বরাবর দলের পক্ষে এ চিঠি পাঠান সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকছে না আওয়ামী লীগের।
জাতিসংঘকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, “অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা জাতিসংঘ এবং ইউএনডিপির প্রতি নির্বাচনি সহযোগিতা স্থগিতের, সব রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে জাতীয় সংলাপ ও সমঝোতাকে উৎসাহিত করার এবং যে কোনো নির্বাচনি সম্পৃক্ততার মূলভিত্তি হিসাবে মানবাধিকার ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।”
‘বাংলাদেশে ইউএনডিপির নির্বাচনি সহযোগিতা এবং জাতিসংঘ সনদের নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং মৌলিক অধিকারের মূলনীতি লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ’ শীর্ষক চিঠিতে বলা হয়, “বাংলাদেশে ইউএনডিপির নির্বাচনি সহযোগিতা, ব্যালট প্রজেক্ট এবং আসন্ন নির্বাচনের বিষয়ে সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বিষয়ে আমরা গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করছি, যে নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলকও নয়, বিশ্বাসযোগ্যও নয়।
“এই ধরনের সম্পৃক্ততা আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের মূলনীতি এবং অবাধ, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রসারের ক্ষেত্রে ইউএনডিপির ম্যান্ডেট লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করে।”
‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য’ নির্বাচনের পরিবেশের দাবি নিয়ে জাতিসংঘে উদ্বেগ জানানো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার অভিযোগ রয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধন করে সেই ব্যবস্থাই বাতিল করে দেয় আওয়ামী লীগ সরকার।
সে অনুযায়ী ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা হয় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়।
এর মধ্যে দশম ও দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের নির্দলীয় সরকারের দাবি পূরণ না হওয়ায় নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপিসহ বেশিরভাগ বিরোধী রাজনৈতিক দল।
তাদের বর্জনের ফলে দশম নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হয়ে যান। সেই সংসদকে ‘বিনা ভোটের সংসদ’ আখ্যা দেয় ভোট বর্জন করা বিএনপি।
বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলেও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠে। অধিকাংশ ভোট আগের রাতে হয়ে যাওয়ার অভিযোগের মধ্যে বিরোধীরা মাত্র সাতটি আসনে জয় পায়। সে নির্বাচনের নাম হয় ‘নীশিরাতের নির্বাচন’।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিএনপি ও সমমনাদের বর্জনে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক দেখাতে শরিক ও বিরোধীদল জাতীয় পার্টির জন্য আসন ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের সঙ্গে দলের বিদ্রোহীদের। এ নির্বাচনের নাম হয় ‘আমি আর ডামি’ নির্বাচন।
প্রশ্নবিদ্ধ ওই তিন নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ জয়ী হয় এবং ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে দেশ শাসন করে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে।
গতবছর ডিসেম্বরে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আংশিক বাতিল করে রায় দেয় হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ। তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরানোর পথ তৈরি হয়।
অবাধ ও নিরপেক্ষতা ‘নিশ্চিত করতে না পারায়’ আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত তিন জাতীয় নির্বাচনে ‘জনগণের আস্থা ধ্বংস করা হয়েছে’ বলে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয় ওই রায়ে।
‘জনগণের ভোট ছাড়া’ ওই নির্বাচনগুলো আয়োজনের অভিযোগে গত জুন মাসে একটি মামলাও করেছে বিএনপি। ওই তিন নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা নির্বাচন কমিশনের সব পদাধিকারীর পাশাপাশি ক্ষমতচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে সেখানে।
এসব নির্বাচনের মাধ্যমে টানা সাড়ে ১৫ বছর শাসন চালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ গত বছরের জুলাই-অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়। ওই আন্দোলন দমাতে গিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনার ‘বলপ্রয়োগের’ কথা উঠে এসেছে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে।
বিক্ষোভ দমতে চালানো সহিংসতায় প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানি এবং আরও কয়েক হাজার আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয় সেই প্রতিবেদনে।
ওই বিক্ষোভ দমনে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ সংঘটনের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার দলের নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিচার চলছে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচারেরও পথ তৈরি করেছে।
জাতিসংঘকে পাঠানো চিঠিতে শনিবার আওয়ামী লীগ বলছে, “শক্তিশালী নির্বাচনি প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার গুরুত্বকে আমরা স্বীকার করি। তবে, এই সহযোগিতা অন্তর্ভুক্তি এবং মৌলিক স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
“বর্তমানে বাংলাদেশে নিবর্তনমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং নাগরিক আটক কিংবা হুমকির মুখে এবং কোনো রাজনৈতিক সংলাপ বা ঐকমত্যের সুযোগ ভেঙে পড়েছে। এখানে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের উত্থান হয়েছে, যেটাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যরাও সক্রিয়ভাবে প্রচার করছেন। দেশের উদার মূল্যবোধ ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে গেছে।”
আওয়ামী লীগ বলছে, “আমরা বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় ইউএনডিপির ভূমিকা জরুরিভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানাই, যাতে তাদের এই সমর্থন কাউকে বাদ দেওয়া বা নির্যাতনের কারণ না হয়।
“বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য সত্যিকারের সংলাপ, সমঝোতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের পুনঃস্থাপন দরকার, যার মধ্যে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণও রয়েছে।”
জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি, জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলের দাবির মুখে গত মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ।
এরপর রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। এর ফলে, ছয় মেয়াদে দুই যুগের বেশি সময় সরকারে থাকা দেশের অন্যতম প্রাচীন এ দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
পুরনো খবর -জাতিসংঘে চিঠি দিয়ে নির্বাচনে সহায়তা বন্ধের আহ্বান আওয়ামী লীগের